নফসের ট্রাফিক সিগন্যাল
রমাদান এলে মনে অদৃশ্য সিগন্যাল জ্বলে ওঠে—
নফসকে লাল, সবরকে সবুজ
সাহরি ভোজন ওয়াক্তের মধ্যে থেকে রোজার নিয়্যতে
ফজরের সময়ের মধ্যে অজু সেরে কেবলামুখি
নিয়্যত উচ্চারণে না রেখে থাকুক অন্তরে
প্রত্যেক সালাতে খুশুখুজু হোক আরো অন্তরঙ্গ
কুরানুল করিম তেলাওয়াত গভীর মনোনিবেশে।
দুপুরে শরীরে ক্লান্তি এলেও গীবতের জিভে তালা—
ভঙ্গুর তালা না কোনো, ঈমানের ভারি তালা
অফিসের চেয়ারগুলোও থাকে যে সংযমে
কফির সুগন্ধ মেশিন নিদ্রায় থাকে সারাবেলা
সময় আজ সাওমে, সে কাউকে গিলতে চায় না।
আসরে ছায়ারা কাত হয়ে দাঁড়ায় দোয়ার লাইনে
ইফতারের আগে মেসকের নিঃশ্বাস-
থাকে বিসমিল্লাহ উচ্চারণের অপেক্ষা
খেজুরের মিষ্টি নয়, মাগফিরাতের তাড়না জিভে লাগে
ইফতার গ্রহণে এক অনাবিল প্রশান্তি দেহমন জুড়ে।
মাগরিব পেরোলে রাত মোলায়েম হয়ে আসে
তারাবির কিয়ামে দাঁড়িয়ে পিঠ সোজা থাকে—
আজকের ভুলগুলো সামনে দৃশ্যমান
সিজদায় আনত হলে অহঙ্কার হয় নতজানু
কুরআনের পংক্তি উচ্চারণে মনের কল্মষ হতে থাকে দূর।
রমাদান শেষে চাঁদ বদলে তাকওয়ার পরীক্ষা শুরু
এই সংযম মাসের না হয়ে হোক সারাবছরের
ঈদের খুশিতে সবর টিকে থাক শাবানের চাঁদ তক
খুশির উচ্ছ্বাসে নফস সিগন্যাল না ভাঙে যেনো!
২।
সিয়াম : সাবর ও তাকওয়ার নূর
মুসলিম বিশ্বে এখন সিয়াম সাধন চলছে,
রমাদানের রহমত নাযিল হচ্ছে নিঃশব্দ আকাশে।
চাঁদের হিলাল দেখে শুরু হয় নিয়ত,
অন্তরে জেগে ওঠে ইখলাসের দীপ।
সাহরির স্নিগ্ধ মুহূর্তে ফজরের আজান ভেসে এলে
হৃদয় কাঁপে ইবাদতের শওকে।
দিনভর সাবর, সিয়াম, তাকওয়া—
নফসের সঙ্গে এক নীরব জিহাদ।
রিযিক সামনে থাকলেও রোজাদার বলে,
আল্লাহু আকবার, এ আমার পরীক্ষা।
ক্ষুধা ও তৃষ্ণা হয়ে ওঠে জিকির, হয়ে ওঠে
কুরআনের আয়াতের প্রতিধ্বনি।
রমাদান মানে রহমাহ, মাগফিরাহ, নাজাতের প্রতিশ্রুতি।
দু’হাত তুলে করা দু’আ ছুঁয়ে যায় আরশের ছায়া।
তারাবির কিয়ামে দাঁড়িয়ে চোখ ভিজে
ওঠে তিলাওয়াতের সুরে।
লাইলাতুল কদরের খোঁজে রাত জেগে থাকে বান্দার হৃদয়।
সদকা ও যাকাতের উষ্ণতায় নরম হয়
সমাজের কঠিন প্রাচির।
ইফতারের আগে সেই নিঃশব্দ মুহূর্ত—
যেখানে কবুল হয় প্রার্থনা।
খেজুরে প্রথম কামড়, বিসমিল্লাহ বলে
ভাঙে দিনের দীর্ঘ সিয়াম।
মাগরিবের আজান যেন জান্নাতের সুসংবাদ।
এই মাসে শয়তান শৃঙ্খলিত,
খুলে যায় রহমতের দরওয়াজা।
সবরের ভেতর জন্ম নেয় শুকর,
শুকরের ভেতর জন্ম নেয় নূর।
সিয়াম শেখায় উম্মাহর ঐক্য,
শেখায় উখুওয়াহর বন্ধন।
তাকওয়ার আলোয় পরিশুদ্ধ হয় রুহ,
পর্দা সরে যায় গাফলতের।
রমাদান শেষে ঈদের তাকবিরে
ঝরে পড়ে আনন্দাশ্রু।
সিয়াম শেষ হয়, কিন্তু ইমানের সফর
থেকে যায় চিরকাল, আলহামদুলিল্লাহ।
৩
চাঁদরাতের পরের সকাল
রমজানের সংযম শেষে ঈদের সকাল
আসে নরম আলো মেখে।
মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসে তাকবির,
শহর জেগে ওঠে কৃতজ্ঞতায়।
নয়া কাপড়ের গন্ধে মিশে থাকে
সেমাইয়ের দুধ-এলাচের উষ্ণতা।
শিশুর চোখে ঈদ মানে রঙিন বিস্ময়,
বড়দের চোখে একফোঁটা অশ্রুসহ স্বস্তি।
সিজদায় নত হয়ে মানুষ গুনে এক মাসের ধৈর্য।
প্রার্থনার মধ্যে সম্পর্কগুলো নতুন করে শ্বাস নেয়।
কোলাকুলির মুহূর্তে ভেঙে যায় দূরত্বের দেয়াল।
হাত মেলানোর শব্দে ওঠে ভ্রাতৃত্বের প্রতিধ্বনি।
ফিতরার দান পৌঁছে যায় অভাবী দরজায়।
ঈদ তখন হয়ে ওঠে ন্যায়বোধের অনুশীলন।
রান্নাঘরের হাঁড়িতে ফুটতে থাকে আনন্দ।
অতিথির পদধ্বনিতে উঠোন ভরে ওঠে গল্পের রঙে।
বাবা-মা তাকিয়ে থাকেন সন্তানের হাসির দিকে।
মায়ের তৃপ্তি—সবাই একসঙ্গে খাচ্ছে,
এটাই তাঁর ঈদ।
দূর দেশে থাকা প্রিয়জনের ফোন: “ঈদ মোবারক”—
শব্দের ভেতর দিয়ে জেগে ওঠে ঘরের গন্ধ।
দিন শেষে যখন রোদ নরম হয়ে আসে,
মনে হয় এই আলো একটু বেশি মানবিক।
ঈদ আমাদের শেখায়—অল্পতেই পূর্ণতা আছে,
ভাগ করে নিলে ঈদ হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় ইবাদত।
৪
সিজদার নীরবতা
ফজরের আলো ভাঙে অন্ধকারের বুক
অজুর পানিতে ধুয়ে যায় রজনির ক্লান্তি
মসজিদের পথে পা ফেললেই হৃদয় নরম
আজান সর্বদা চেনা কারো আহ্বান।
দুনিয়াবি শব্দ ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়
কিয়ামে দাঁড়িয়ে মানুষ বুঝে নিজের ক্ষুদ্রতা
রুকুতে আনত হলে ভেঙে পড়ে অহঙ্কার
সিজদায় গেলে নীলাকাশ কাছে আসে।
দোয়ার আর্তিরা মিশে যায় অশ্রুজলে
তওবা করে গেলে হালকা হয় বুক
সালাম ফেরালে শান্ত লাগে পৃথিবীটা
আল্লাহু আকবর—লীন করে দেয় সব ভয়।
৫
তাকওয়ার পথ
রমাদানের চাঁদ উঠলে হৃদয়ে সংযম শুরু
সাহ্রি হতে মাগরিব পর্যন্ত সবরের অনুশীলন
ক্ষুধা শেখায় অভাবীদের কথা মনে রাখা
তৃষ্ণা শেখায় নিয়ামতের কদর।
কোরআনের আয়াত নেমে আসে আলোর মতো
তারাবির কিয়ামে রাত হয় দীপ্ত
নফসের সঙ্গে অন্তরে নিরব যুদ্ধ চলে
তওবার দরজা খোলা থাকে প্রতিটি নিঃশ্বাসে
জাকাতের হাতে গলে যায় সঞ্চিত অহং
ভাইয়ের মুখে হাসি দেখলে পূর্ণ হয় ইবাদাত
ঈদের সকাল আসে ক্ষমার সুগন্ধ নিয়ে
তাকওয়া পথের চিহ্ন হয়ে থাকে মনে।