রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি : ১৩ বছরেও শুকায়নি ক্ষত
একদিনেই বদলে গিয়েছিল হাজারো জীবনের মানচিত্র এবং স্বপ্নযাত্রা। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল, সাভারের বুকে আটতলা ভবন ধসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু কংক্রিট নয়, চাপা পড়ে যায় স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ আর অসংখ্য পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। সেই ট্র্যাজেডির নাম— রানা প্লাজা ধস। এক যুগ পেরিয়ে গেলেও সেই ধ্বংসস্তূপের ধুলো আজও ঝরে পড়ছে ভুক্তভোগীদের জীবনে। একসময় বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া এই শিল্প-দুর্যোগে প্রাণ হারান ১ হাজার ১৩৪ জনেরও বেশি পোশাক শ্রমিক। জীবিত উদ্ধার হন ২ হাজারের বেশি মানুষ, যাদের অনেকেই আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন পঙ্গুত্ব, ট্রমা আর অনিশ্চয়তার ভার। প্রতি বছর দিবস আসে, স্মরণসভা হয়, প্রতিশ্রুতি শোনা যায়, কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা একই রয়ে গেছে— ক্ষতিপূরণ আর পুনর্বাসন কই? সাদ্দাম হোসেনের গল্প যেন সেই প্রশ্নেরই নির্মম প্রতিচ্ছবি। দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন ডান হাত, আর সেই সঙ্গে হারান কর্মক্ষমতা। অল্প কিছু সহায়তা পেলেও তা চিকিৎসার খরচই মেটাতে পারেনি। চাকরির চেষ্টা করেছেন বহুবার কিন্তু রানা প্লাজার আহত পরিচয় শুনলেই দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তার কণ্ঠে ক্ষোভ আর হতাশা মিলেমিশে একাকার। কন্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, যে
একদিনেই বদলে গিয়েছিল হাজারো জীবনের মানচিত্র এবং স্বপ্নযাত্রা। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল, সাভারের বুকে আটতলা ভবন ধসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু কংক্রিট নয়, চাপা পড়ে যায় স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ আর অসংখ্য পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। সেই ট্র্যাজেডির নাম— রানা প্লাজা ধস। এক যুগ পেরিয়ে গেলেও সেই ধ্বংসস্তূপের ধুলো আজও ঝরে পড়ছে ভুক্তভোগীদের জীবনে।
একসময় বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া এই শিল্প-দুর্যোগে প্রাণ হারান ১ হাজার ১৩৪ জনেরও বেশি পোশাক শ্রমিক। জীবিত উদ্ধার হন ২ হাজারের বেশি মানুষ, যাদের অনেকেই আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন পঙ্গুত্ব, ট্রমা আর অনিশ্চয়তার ভার। প্রতি বছর দিবস আসে, স্মরণসভা হয়, প্রতিশ্রুতি শোনা যায়, কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা একই রয়ে গেছে— ক্ষতিপূরণ আর পুনর্বাসন কই?
সাদ্দাম হোসেনের গল্প যেন সেই প্রশ্নেরই নির্মম প্রতিচ্ছবি। দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন ডান হাত, আর সেই সঙ্গে হারান কর্মক্ষমতা। অল্প কিছু সহায়তা পেলেও তা চিকিৎসার খরচই মেটাতে পারেনি। চাকরির চেষ্টা করেছেন বহুবার কিন্তু রানা প্লাজার আহত পরিচয় শুনলেই দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
তার কণ্ঠে ক্ষোভ আর হতাশা মিলেমিশে একাকার। কন্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, যেদিন হাত হারিয়েছি সেদিন আমার জীবনও থেমে গেছে, থেমে গেছে আমার পরিবারের অনেক স্বপ্ন। আমাদের প্রতি বছর ৫০০-১০০০ টাকা দিলে হবে না। আমাদের স্থায়ী পুনর্বাসন দরকার। সরকার আসে সরকার যায়, আমরা প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন পাই না। এবার নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা আমাদের দাবির যৌক্তিক বাস্তবায়ন হবে।
সেদিনের দুর্ঘটনায় মেরুদণ্ডে আঘাত পাওয়া এক নারী শ্রমিক শিলা। ধ্বংসস্তূপের সেই দিনটির কথা মনে করলে আজও কেঁপে ওঠেন। ভারি কাজ আর করতে পারেন না, মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ, প্রতিদিন ওষুধের ওপর নির্ভরশীল জীবন।
শিলা বলেন, আমার সব স্বপ্ন থেমে গেছে। টাকা-পয়সার অভাবে ঠিকমতো ভাতও খেতে পারি না, কিন্তু প্রতিদিন ২৬-২৭টা ওষুধ খেতে হয়। কথাগুলো বলতে বলতে চোখ ভিজে ওঠে তার।
রানা প্লাজার পঞ্চম তলার সুইমিং অপারেটর নিলুফা বেগম ভাঙা পা নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলেন, পঙ্গু হয়ে আমাদের অনেক শ্রমিক এখন ভিক্ষাও করছে। এটা আমাদের জন্য লজ্জার। ১৩ বছর পার হয়ে গেল, সরকারের পর সরকার বদলাল কিন্তু আমাদের ভাগ্য বদলায় না। আমরা ন্যায়বিচার চাই। নতুন সরকারের কাছে আমরা আমাদের পুনর্বাসনের দাবি জানাই।
আটতলার সুইং অপারেটর শিউলি খানমের অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। আগের দিনই ভবনে ফাটলের খবর পেয়েছিলেন। কাজে যেতে চাননি। কিন্তু মালিকপক্ষের হুমকি, কাজে না এলে বেতন বন্ধ। বাধ্য হয়ে কাজে আসেন তিনি। মালিক পক্ষ ইচ্ছের বিরুদ্ধে কাজে এনে তাকে ঠেলে দেয় মৃত্যুফাঁদে।
আজ চিকিৎসার খরচ চালাতে জমিজমা বিক্রি করতে হয়েছে।
সরকারি সহায়তা কী পেয়েছেন এমন প্রশ্নে তার সোজা জবাব, কিছুই পাইনি। প্রতিশ্রুতি নয় আমি ইনসাফ চাই, পুনর্বাসন চাই।
ছয় তলার শ্রমিক সালেহা আজও বুঝতে পারেন না কেন তারা ক্ষতিপূরণ পাননি। তিনি বলেন, আমরা একবেলা খাই, আরেকবেলা না খেয়ে থাকি। শুনেছি আমাদের জন্য বিদেশ থেকে সহায়তা এসেছে কোটি কোটি টাকা, তাহলে এত টাকা গেল কোথায়? প্রশ্ন ছুড়ে দেন তিনি।
তার অভিযোগ, তহবিল এসেছে, কিন্তু সেই টাকা পৌঁছায়নি প্রকৃত ভুক্তভোগীদের হাতে।
রানা প্লাজা সার্ভাইভার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও আট তলায় কর্মরত আহত শ্রমিক হৃদয়ের দাবি, দেশ-বিদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা সহায়তা এলেও শ্রমিকরা তার সঠিক হিস্যা পাননি।
সংগঠনের নেতাদের ভাষায়, শ্রমিকদের নাম ব্যবহার করে অনেকেই ব্যবসা করেছে। ধসের আগের দিন ভবনে বড় ধরনের ফাটল দেখা যায়। কিন্তু সেটি গুরুত্ব পায়নি। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন সাংবাদিকরা। তৎকালীন মালিক পক্ষ বিষয়টিকে ‘তুচ্ছ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল, যার মাশুল দিতে হয়েছে হাজারো মানুষকে।
আহত শ্রমিকরা বলছেন, রানা প্লাজা আজ শুধু একটি দুর্ঘটনার নাম নয়, এটি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন, ন্যায়বিচারের প্রশ্ন, রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিশ্রুতির পরীক্ষা। ধ্বংসস্তূপ সরেছে বহু আগেই, কিন্তু সেই ধ্বংসের ভিতরে চাপা পড়ে থাকা মানুষের আর্তনাদ আজও থামেনি। দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করলেই বেঁচে যাই আমরা এবং আমাদের পরিবার।
আহত শ্রমিকরা জানান, ঘটনার মামলা চলছে, কিন্তু গতি ধীর। মূল অভিযুক্ত কারাগারে থাকলেও সংশ্লিষ্ট অনেকেই রয়েছেন বাইরে। সময় যত যাচ্ছে, ততই ক্ষীণ হচ্ছে ন্যায়বিচার আর পূর্ণ ক্ষতিপূরণের আশা।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, পরিকল্পনা কাগজে, আমাদের জীবন বাস্তবে, আর নিতে পারছি না, বড্ড ক্লান্ত আমরা। কবে শেষ হবে অপেক্ষার পালা?
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, ভবনের জায়গা এখন প্রশাসনের অধীনে। সেখানে কমার্শিয়াল প্লেস এবং আবাসিকের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ করে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
What's Your Reaction?