রাসুলের (সা.) প্রতি ভালোবাসা

রাসুলের প্রতি ভালোবাসা মানুষের ইমানের এক গভীরতম অনুভূতি। এই ভালোবাসা কেবল আবেগের বিষয় নয়; এটি আত্মার টান, জীবনের দিশা এবং আত্মসমর্পণের এক অনন্য রূপ। মহানবী হজরত মুহাম্মাদের (সা.) জীবন ও চরিত্র এমনই এক আকর্ষণ সৃষ্টি করেছিল, যা মানুষের অন্তরকে পরিবর্তন করে দিত। তাঁর সাহচর্যে এসে মানুষ শুধু তাঁকে ভালোবাসেনি, বরং নিজের জীবন, পরিবার, এমনকি অস্তিত্ব পর্যন্ত তাঁর জন্য উৎসর্গ করতে দ্বিধা করেনি। এই ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হলেন হযরত জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.)। শৈশবে জায়েদ এক কঠিন বিপদের মুখোমুখি হন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত আদরের সন্তান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ডাকাতদের হাতে পড়ে তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। সেই সময়কার আরব সমাজে দাসপ্রথা ছিল সাধারণ বিষয়। বন্দী মানুষদের বাজারে বিক্রি করা হতো। ছোট্ট জায়েদও সেই নির্মম দাসপ্রথার শিকার হন। এক পর্যায়ে তাকে কিনে নেন হাকিম নামের একজন ব্যক্তি, যিনি ছিলেন হজরত খাদিজার (রা.) আত্মীয়। পরবর্তীতে তিনি জায়েদকে খাদিজার (রা.) কাছে উপহার হিসেবে দেন। খাদিজার (রা.) ঘরে গিয়ে জায়েদের জীবন নতুন মোড় নেয়। তিনি সেখানে একজন দাসের বদলে পরিবারের একজন সদস্যের মতো আচরণ

রাসুলের (সা.) প্রতি ভালোবাসা

রাসুলের প্রতি ভালোবাসা মানুষের ইমানের এক গভীরতম অনুভূতি। এই ভালোবাসা কেবল আবেগের বিষয় নয়; এটি আত্মার টান, জীবনের দিশা এবং আত্মসমর্পণের এক অনন্য রূপ। মহানবী হজরত মুহাম্মাদের (সা.) জীবন ও চরিত্র এমনই এক আকর্ষণ সৃষ্টি করেছিল, যা মানুষের অন্তরকে পরিবর্তন করে দিত। তাঁর সাহচর্যে এসে মানুষ শুধু তাঁকে ভালোবাসেনি, বরং নিজের জীবন, পরিবার, এমনকি অস্তিত্ব পর্যন্ত তাঁর জন্য উৎসর্গ করতে দ্বিধা করেনি। এই ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হলেন হযরত জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.)।

শৈশবে জায়েদ এক কঠিন বিপদের মুখোমুখি হন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত আদরের সন্তান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ডাকাতদের হাতে পড়ে তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। সেই সময়কার আরব সমাজে দাসপ্রথা ছিল সাধারণ বিষয়। বন্দী মানুষদের বাজারে বিক্রি করা হতো। ছোট্ট জায়েদও সেই নির্মম দাসপ্রথার শিকার হন।

এক পর্যায়ে তাকে কিনে নেন হাকিম নামের একজন ব্যক্তি, যিনি ছিলেন হজরত খাদিজার (রা.) আত্মীয়। পরবর্তীতে তিনি জায়েদকে খাদিজার (রা.) কাছে উপহার হিসেবে দেন। খাদিজার (রা.) ঘরে গিয়ে জায়েদের জীবন নতুন মোড় নেয়। তিনি সেখানে একজন দাসের বদলে পরিবারের একজন সদস্যের মতো আচরণ পান। খাদিজার (রা.) কাছে তিনি মায়ের মমতা ফিরে পান।

পরবর্তীতে যখন খাদিজার (রা.) সঙ্গে মহানবীর (সা.) বিবাহ হয়, তখন জায়েদ তাঁর সেবায় নিয়োজিত হন। এখান থেকেই শুরু হয় জায়েদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মহানবীর (সা.) সান্নিধ্যে এসে তিনি এমন এক চরিত্র, এমন এক ভালোবাসা অনুভব করেন, যা তার পুরো জীবন বদলে দেয়। নবীজির (সা.) আচরণ, দয়া, মমতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং আন্তরিকতা জায়েদের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মহানবী (সা.) কখনো কাউকে দাস হিসেবে দেখেননি; তিনি মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করেছেন। তাঁর এই মানবিক আচরণই জায়েদের অন্তরে অগাধ ভালোবাসা সৃষ্টি করে। জায়েদ বুঝতে পারেন, এই মানুষটি শুধু একজন ‘প্রভু’ নন; তিনি একজন সত্যিকারের অভিভাবক, একজন পথপ্রদর্শক।

এদিকে, অনেক বছর পর হজযাত্রীদের মাধ্যমে জায়েদের পিতা হারিসা জানতে পারেন যে তার হারানো সন্তান মক্কায় জীবিত আছেন। এই সংবাদ পেয়ে তিনি আর দেরি করেননি। দ্রুত মক্কায় এসে মহানবীর (সা.) কাছে উপস্থিত হন এবং সন্তানকে তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আবেদন জানান। বিনয়ের সঙ্গে বলেন, তিনি যে কোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত, শুধু তার সন্তানকে ফিরিয়ে দিতে হবে।

হারিসার কথা শুনে মহানবী (সা.) কোনো মূল্য বা মুক্তিপণ দাবি করলেন না, অন্য কোনো শর্তও নয়, শুধু বললেন—জায়েদ নিজেই সিদ্ধান্ত নিক, সে আমাদের সঙ্গে থাকবে নাকি আপনাদের সঙ্গে চলে যাবে। জায়েদ চলে যেতে চাইলে আমাদের দিক থেকে কোনো বাঁধা থাকবে না।

জায়েদকে ডাকা হলে সবাইকে বিস্মিত করে দিয়ে তিনি তার বাবার সঙ্গে যেতে অস্বীকার করলেন। তিনি বললেন, মহানবীই (সা.) তার বাবা, খাদিজা (রা.) তার মা; তিনি তাঁদের ছেড়ে যেতে চান না।

এই সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায় একজন সাধারণ দাস হিসেবে পাওয়া জায়েদের প্রতি নবীজি (সা.) ও খাদিজার (রা.) মমতা কত গভীর ছিল। একজন মানুষ নিজের জন্মদাতা পিতাকে ছেড়ে অন্য কারো কাছে থাকতে চায়—এটি তখনই সম্ভব, যখন সেই অন্য ব্যক্তি তার হৃদয়ে অসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার স্থান অধিকার করে নেয়। জায়েদের কাছে মহানবী (সা.) ছিলেন এমনই এক মহামানব, যার ভালোবাসা সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছিল।

হারিসা বিস্মিত হলেও নিজের সন্তানের এই সিদ্ধান্ত মেনে নেন। জায়েদকে মহানবীর (সা.) কাছে রেখে তিনি নিজের এলাকায় ফিরে যান।

এই ঘটনার পর নবীজি (সা.) জায়েদকে নিজের পালক পুত্র ঘোষণা করেন। জায়েদ সবার কাছে ‘জায়েদ ইবনে মুহাম্মাদ’ বা মুহাম্মাদের ছেলে জায়েদ হিসেবে পরিচিত হতে থাকেন। তখনও নবীজি (সা.) নবুয়্যত লাভ করেননি। পরবর্তীতে নবীজি (সা.) নবুয়্যত লাভ করার পর পবিত্র কোরআনে মানুষকে তার প্রকৃত পিতার নামে ডাকার ও পরিচয় দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলে জায়েদ আবার তার পুরনো পরিচয় ‘জায়েদ ইবনে হারেসা’য় ফিরে যান।

মহানবী (সা.) নবুয়্যত লাভ করার পর প্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম ছিলেন জায়েদ ইবনে হারেসা। ইসলাম প্রচারে নবীজির একজন বিশ্বস্ত সহচন হয়ে ওঠেন তিনি। নবীজির (সা.) জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তায়েফ সফরে সাহাবিদের মধ্যে শুধু তিনিই নবীজির (সা.) সঙ্গে ছিলেন।

বিয়ের বয়সে উপনীত হলে নবীজি (সা.) জায়েদের (রা.) বিয়ে দেন নিজের ফুফাতো বোন জয়নবের (রা.) সঙ্গে। কিন্তু তাদের বৈবাহিক জীবন সুখের হয়নি। পরবর্তীতে জায়েদের (সা.) বিয়ে হয় উম্মে আয়মানের (রা.) সঙ্গে। জায়েদ ও উম্মে আয়মানের (রা.) ঘর আলো করে নবীজির (সা.) আরেকজন প্রিয় সাহাবি হজরত উসামার (রা.) জন্ম হয়। নবীজি (সা.) উসামাকে নিজের নাতিদের মতই স্নেহ করতেন।

৮ম হিজরিতে সংঘটিত মুতা যুদ্ধে মুসলিম বাহিনির নেতৃত্বে ছিলেন জায়েদ ইবনে হারেসা (রা.)। ওই যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।

ওএফএফ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow