দেশের শিল্প ও আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। ১৯৮৬-৮৭ অর্থবছরে বন্দর থেকে ঢাকার কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) পর্যন্ত রেলপথে কনটেইনার পরিবহন শুরু হয়।
বিদেশি কোম্পানির সাথে চুক্তি ইস্যুতে অচলাবস্থায় আমদানি কনটেইনারের মজুত ২ হাজার ছাড়িয়ে যায়। রেলওয়ে ইঞ্জিন বাড়িয়ে দ্রুত কনটেইনার জট কমিয়ে ২০০টিতে নিয়ে আসে। এখন ঈদের আগে ও পরে ইঞ্জিন সরবরাহ অস্বাভাবিক কমিয়ে ফেলায় ফের কনটেইনার জট বেড়েছে। চট্টগ্রামে রেলওয়ের সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডে অন্তত ৫টি কনটেইনার ট্রেন লোডিং পরও ইঞ্জিন সংকটে আটকে রয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, রোজার মাঝামাঝি পর্যন্ত পণ্য পরিবহনের জন্য ইঞ্জিন বাড়িয়ে দৈনিক ৬টি উন্নীত করে রেলওয়ে। কিন্তু ঈদের এক সপ্তাহ আগে ১টি রেখে বাকি ৫টি ইঞ্জিন সরিয়ে নেয় রেলের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগ। ফলে চাহিদা থাকলেও কনটেইনার ও জ্বালানিবাহী ট্রেন চালাতে পারছে না রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগকে বার বার তাগাদা দেওয়া হলেও কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না তারা। অনেক আমদানিকারক ব্যবসায়ী ঈদকে সামনে রেখে পণ্য আমদানি করলেও ইঞ্জিনের কারণে দেশব্যাপী সরবরাহ করতে পারেনি তারা।
জানা গেছে-১৬ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রামে আমদানি কনটেইনারের ৯টি ট্রেন লোডিং অবস্থায় ছিল। একটি মাত্র ইঞ্জিন দিয়ে উভয় পথে ট্রেন চালানোর মাধ্যমে গত এক সপ্তাহে ৪টি ট্রেন ঢাকার কমলাপুর আইসিডিতে পরিবহন করা হয়েছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর অভ্যন্তরে কনটেইনারের মজুত ২৫০ থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হলেও শুধুমাত্র কনটেইনারের অভাবে পণ্যবাহী ট্রেন চালাতে পারছে না রেলওয়ে। এতে ব্যবসায়ীদের আমদানি পণ্য, এমনকি রফতানিমুখী কনটেইনারগুলো ঢাকা থেকে বন্দরে আনতে না পেরে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
রেলের পরিবহন বিভাগের তথ্যমতে, রেলওয়েতে পণ্য পরিবহন খাতে ইঞ্জিনের চাহিদা ১৯টি। তবে ১৬টি হলেও কাঙ্ক্ষিত চাহিদা অনুযায়ী ট্রেন পরিচালনা করতে পারে রেলওয়ে। কিছুদিন আগে পণ্যবাহী ট্রেন খাতে ইঞ্জিনের সংখ্যা অস্বাভাবিক কমে গেলে বন্দরের কনটেইনার জটের কারণে ইঞ্জিনের সংখ্যা বাড়িয়ে সার্ভিস বাড়ানো হয়। কিন্তু সম্প্রতি রেলের যাত্রী পরিবহণকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে পণ্য খাতের দৈনিক ৫-৬টি ইঞ্জিন থেকে ১টি রেখে বাকি সবগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের আগে ও পরের তিন দিন মোট ৬ দিন সারাদেশের সড়কগুলোতে পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পচনশীল ও খাদ্যপণ্য ছাড়া অন্যান্য পণ্যের ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, লরি চলাচলের অনুমতি না থাকায় অনেক ব্যবসায়ী জরুরি প্রয়োজনে রেলপথে পণ্য পরিবহনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু রেলের পক্ষ থেকে ইঞ্জিন সরবরাহ কমিয়ে ফেলায় বড় সংকটের মধ্যে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
সাম্প্রতিক সময়ে ঈদযাত্রা ও ঈদ ফেরত সড়কে তীব্র যানজট, যানবাহনের অতিরিক্ত ভাড়া এবং জ্বালানি সংকটের কারণে রেলের ওপর ব্যবসায়ীদের আগ্রহ বাড়লেও ইঞ্জিন সরবরাহজনিত সংকটে এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান পরিচালক কর্মকর্তা মোহাম্মদ সফিকুর রহমান কালবেলাকে জানান, সরকার রেলওয়ের যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে চায়। রমজানের আগে থেকেই রেলওয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ পণ্যবাহী ট্রেন পরিবহন করে বন্দর ও আইসিডিতে থাকা কনটেইনারের জট শূন্যের কোটায় নামিয়ে এনেছিল। তবে ঈদ ও ঈদ পরবর্তী যাত্রী পরিবহনকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে। আমরা যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগকে এই বিষয়ে তাগাদা দিয়েছি, ইঞ্জিন সরবরাহ বাড়িয়ে দিতে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের দৈনিক ইঞ্জিনের চাহিদা ১২০টির মতো। পূর্বাঞ্চলের ৬৯ শতাংশ মিটারগেজ ইঞ্জিন অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়ায় প্রায়শই নষ্ট থাকছে অধিকাংশ ইঞ্জিন। এমনকি পথিমধ্যে কিংবা ট্রেন ছাড়ার আগেও ইঞ্জিন বিকলতার কারণে ট্রেন সার্ভিস পরিচালনা দুরূহ হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে প্রতিদিন ৭০-৭২টি ইঞ্জিন সরবরাহ হয়, যার কারণে প্রায়ই কানেক্টিং ইঞ্জিন দিয়ে বিভিন্ন ট্রেন পরিচালনা করতে হয়। তবে ঈদের আগে পূর্বঘোষিত ১০-১২টি বাড়তি ইঞ্জিনের মধ্যে ১০টি বাড়ানো হয়েছে। এ কারণে সোমবার পূর্ব রেলের ইঞ্জিনের সরবরাহ রয়েছে ৮২টি। এরপরও যাত্রীবাহী ট্রেনকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে পণ্য খাতকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। এতে রেলের মাধ্যমে পরিচালিত আমদানি-রফতানি পণ্য নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভোগান্তির মধ্যে পড়েন ব্যবসায়ীরা।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের আগে সড়কে যানজট, দুর্ঘটনা, বাড়তি ভাড়াসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে রেলপথে পণ্য পরিবহনের চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে ঈদের আগে ও পরে সড়কে অতি প্রয়োজনীয় ছাড়া কোনো পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল না করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জরুরি শিপমেন্ট রয়েছে এমন পণ্য দ্রুত বন্দরে পৌঁছাতে ব্যবসায়ীদের মূল ভরসা থাকে রেলপথ। এই সময়ে মাত্র একটি ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন সার্ভিস পরিচালনার কারণে আমদানি রফতানির সাথে যুক্ত ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের সংকটের মধ্যে পড়েছেন।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী সাদেকুর রহমান জানান, এতদিন ধরে পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য পর্যাপ্ত ইঞ্জিন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঈদে যাত্রী পরিবহন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় কিছু ইঞ্জিন সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এরপরও কয়েকদিনের মধ্যে পণ্য পরিবহনের জন্য ইঞ্জিনের সংখ্যা বাড়ানো হবে।
ইঞ্জিন সরবরাহ বাড়াতে ইতোমধ্যে কয়েক দফায় রেলের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগকে বিশেষ চিঠি দিয়েছে পরিবহন বিভাগ। চিঠিতে বলা হয়েছে, পণ্য খাতে ১৩টি ইঞ্জিন চাহিদার মধ্যে দেওয়া হয়েছে মাত্র একটি। ১২ মার্চ থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত পণ্য খাতে ইঞ্জিনের সরবরাহ অস্বাভাবিক কমিয়ে দেওয়ায় লোডিং ৯টি কনটেইনার ট্রেন লোডিং অবস্থায় বসে রয়েছে। আবার ১২ মার্চ থেকে ৯৫২ নং জ্বালানি পরিবহনের খালি ট্রেন আখাউড়া স্টেশনে (ডাউন ট্রেন) বসে রয়েছে।
অপরদিকে, ১৩ মার্চ থেকে ৯৬১ নং শ্রীমঙ্গলগামী জ্বালানিবাহী ট্রেন লোডিং অবস্থায় সিজিপিওয়াইতে পড়ে রয়েছে। আমদানি-রফতানি ছাড়াও দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য পরিবাহিত জ্বালানি দ্রুত পৌঁছাতে ইঞ্জিন সরবরাহ বাড়াতে বিশেষ অনুরোধ করা হয়।
রেলের পরিবহন খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, রেলওয়ে রাজস্ব আয়ের চেয়েও দেশের আমদানি -রফতানি, জ্বালানি নিরাপত্তাসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে কাজ করে। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এমনিতে দেশে জ্বালানি সমস্যা দেখা দিয়েছে।
দেশব্যাপী লোডশেডিং-এর পরিমাণও বেড়েছে। এমতাবস্থায় তিনদিন ধরে একটি জ্বালানি লোড করা ট্রেন বসে থাকায় দেশের জ্বালানি সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। অন্যদিকে যুদ্ধের কারণে অনেক দেশে রফতানি পণ্য পৌঁছানোর সময় বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু কমলাপুর আইসিডিতে বন্দরের উদ্দেশ্যে লোড হওয়া কনটেইনারগুলো কয়েকদিন ধরে ইঞ্জিনের অভাবে আসতে পারছে না।