শিক্ষার্থীদের ভাবনায় স্বাধীনতা দিবস
২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে শুরু হয়েছিল বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ, যার চূড়ান্ত বিজয় আসে ১৬ ডিসেম্বর। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, লাখো নারীর সম্ভ্রম আর অসংখ্য মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। এই স্বাধীনতা হঠাৎ প্রাপ্ত কোনো দান নয়, নয় কারও করুণা। এটি অর্জিত এক সমুদ্র রক্তের বিনিময়ে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশ বদলেছে, উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে নানা খাতে, এগিয়ে চলছে ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে, এই স্বাধীনতার স্বাদ আমরা কতটা পেয়েছি? নতুন প্রজন্ম কীভাবে দেখছে স্বাধীনতাকে? সেই ভাবনাগুলোই তুলে ধরেছেন দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। স্বাধীনতা হোক সবার জন্য ‘স্বাধীনতা মানে অন্যের ক্ষতির কারণ না হওয়া। স্বাধীনতা মানে শুধু নিজেকে নিয়ে না ভাবা; বরং স্বাধীনতা মানে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে মুক্ত পৃথিবীতে আনন্দ নিয়ে বাঁচতে চাওয়া। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নিজের জীবন নিয়ে যেসব সাধারণ মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাদের কী তাড়িয়ে বেড়াত? তারা কি শুধু ভেবেছিলেন নিজের
২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে শুরু হয়েছিল বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ, যার চূড়ান্ত বিজয় আসে ১৬ ডিসেম্বর। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, লাখো নারীর সম্ভ্রম আর অসংখ্য মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।
এই স্বাধীনতা হঠাৎ প্রাপ্ত কোনো দান নয়, নয় কারও করুণা। এটি অর্জিত এক সমুদ্র রক্তের বিনিময়ে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশ বদলেছে, উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে নানা খাতে, এগিয়ে চলছে ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে, এই স্বাধীনতার স্বাদ আমরা কতটা পেয়েছি? নতুন প্রজন্ম কীভাবে দেখছে স্বাধীনতাকে?
সেই ভাবনাগুলোই তুলে ধরেছেন দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।
স্বাধীনতা হোক সবার জন্য
‘স্বাধীনতা মানে অন্যের ক্ষতির কারণ না হওয়া। স্বাধীনতা মানে শুধু নিজেকে নিয়ে না ভাবা; বরং স্বাধীনতা মানে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে মুক্ত পৃথিবীতে আনন্দ নিয়ে বাঁচতে চাওয়া। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নিজের জীবন নিয়ে যেসব সাধারণ মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাদের কী তাড়িয়ে বেড়াত? তারা কি শুধু ভেবেছিলেন নিজের স্বার্থ? একদিন সকালে স্বাধীন দেশের সূর্যটা উঠবে, এটাই তো ছিল তাদের স্বপ্ন। সূর্যটা তো উঠেছিল সবার জন্যই। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ব্যক্তিগত প্রাপ্তির চেয়ে অনেক বড় অর্জন হলো একটি দেশ। এই দেশকে নিয়ে আমরা গর্ব করি। তাই স্বাধীনতা দিবসে নাম না জানা অসংখ্য যোদ্ধাদের স্মরণ করার পাশাপাশি আশা ব্যক্ত করি এমন বাংলাদেশের, যে বাংলাদেশে স্বাধীনতা হবে সবার জন্য। সবাই একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়াই হবে স্বাধীনতার আসল অর্থ।’
জুবায়ের ইবনে কামাল
শিক্ষার্থী, গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
শহীদদের রক্ত যেন বৃথা না যায়
‘সময় পাল্টেছে। দেশ দ্বিতীয়বার স্বাধীন হয়েছে। আমাদের সোনার বাংলা মুক্তি পেয়েছে ফ্যাসিবাদের হাত থেকে। তাই দেশের এই স্বাধীনতা রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই। কথায় আছে স্বাধীনতা অর্জন করার চাইতে রক্ষা করা কঠিন। এক ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্ত হয়ে দেশ যেন আর কোনো ফ্যাসিবাদের হাতের কব্জায় বন্দি হতে না পারে সে ব্যাপারে ছাত্রসমাজের সর্বোপরি দেশের জনগণের সজাগ দৃষ্টি রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ২৪ এর এই জুলাই স্পিরিটকে ধারণ করে সুন্দর সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমাদের সবারই জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একজোট হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমানতালে কাজ করে যেতে হবে। দেশের প্রতিটি সেক্টর থেকে দুর্নীতির কালো হাত ভেঙে দিতে আমাদের হতে হবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তবেই তো ২৪ এর জুলাই বিপ্লবে নিঃস্বার্থভাবে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেওয়া শহিদ আবু সাইদ, মুগ্ধ, ফাইয়াজ, বন্ধু ফয়সালসহ নাম না জানা আরো অনেক শহিদের দেশের স্বার্থে দেওয়া এ জীবন সার্থক হবে- এবারের বিজয় দিবসে এটাই আমার প্রত্যাশা।’
মো. সৈয়দুর রহমান
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
স্বাধীনতাহীনতায় কেউ বাঁচতে চায় না
‘১৯৭১ সালের এই দিনে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়ে বাঙালি জাতি স্বাধীন যাত্রা শুরু করে। স্বাধীন দেশের, স্বাধীন বাঙালি জাতির সবচেয়ে গৌরবের দিন, দীর্ঘ পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন পথে ঘুরে দাঁড়ানোর দিন। স্বাধীনতাহীনতায় কেউ বাঁচতে চায় না। স্বাধীনতা মানে আত্মমর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকা। সব ধরনের অনাচার, বৈষম্য, শোষণ ও নির্যাতন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে বাঁচা। স্বাধীনতার চেয়ে সুখ আর কিছু হতে পারে না। আর আমরা বাঙালিরা বিজয় এবং স্বাধীনতা দুটোই পেয়েছি। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন বাঙালি জাতি আমরা। স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ বর্তমানে ডিজিটাল বাংলাদেশের গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। সামনে আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে স্বাধীন বাংলাদেশ, স্বাধীন বাঙালি জাতির এমনটাই প্রত্যাশা।’
তারানা তানজিনা মিতু
শিক্ষার্থী, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম
শিশুর কল্পনা যাতে দেয়ালে আটকে না যায়
‘স্বাধীনতা হলো- একটি সাদা শুভ্র পাখির মতো। মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ায়, এক বন থেকে আরেক বনে যায়। গলা ছেড়ে নিজের মতো করে গান গায়। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে আহারের সন্ধানে। সন্ধ্যার আকাশে বেলা গড়িয়ে পড়লে, সে আবার নিজের ঘরে ফিরে আসে। মানুষও স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পছন্দ করে। তাই বলে স্বাধীনতা বলতে যা খুশি, তা-ই করা নয়। নিজের কার্যক্রম দ্বারা চারপাশের কোনো কিছুর স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হলে তাকে স্বাধীনতা বলে না।’
‘মানুষ হিসেবে এই উপলব্ধিটুকু থাকা অত্যন্ত জরুরি। খাঁচায় বন্দী পাখি হঠাৎ ছাড়া পেলে, সে পাখিই কেবল জানে, মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ানোর স্বাদ কেমন হয়! শিশুকে মুক্ত পাখির মতো স্বাদ নিতে দেওয়ার পাশাপাশি তাকে কল্পনা করতে দিতে হবে। একটি নিরাপদ, স্বাধীন ও সমৃদ্ধশীল আবাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য শিশুর কল্পনা যাতে দেয়ালে আটকে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’
মো. খশরু আহসান
শিক্ষার্থী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
স্বাধীনতার যেন দাম রাখতে পারি
‘১৯৭১ সালে বাংলার দামাল ছেলেরা, যারা ঘুড়ি ওড়ানোর বয়সে হাতে তুলে নিয়েছিল অস্ত্র শুধু দেশের জন্য, রুখে দাঁড়িয়েছিল পৃথিবীর অন্যতম সুসজ্জিত সেনা বহরের সামনে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ এক মহানায়ক, আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন স্বাধীনতার। নিঃসন্দেহে স্বাধীনতা ঘোষণার দিনটি যেকোনো জাতির জন্য আনন্দের দিন, কিন্তু আমাদের দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করে সেই স্বাধীনতার দিনটিকে বাস্তবে অর্জন করতে হয়েছিল, এ জন্য আমরা পালন করি বিজয় দিবস, যা পৃথিবীর খুব কম দেশেই আছে। আমাদের এত কষ্টে পাওয়া স্বাধীনতার দাম যেন রাখতে পারি, এগিয়ে যেতে পারি দৃঢ় প্রত্যয়ে, বঙ্গবন্ধু এবং অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের চেতনায় নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারি, সেই প্রত্যাশাই আজকের এই দিনে।’
রাদিয়া শানজান ইশমা
শিক্ষার্থী, কুমুদিনী সরকারি কলেজ, টাঙ্গাইল
সোনার বাংলাদেশ তৈরি হোক
‘১৯৭১ সালে স্বাধীনতার যে পরিপ্রেক্ষিত তৈরি হয়, তা হঠাৎ করে আসেনি। এই জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া ‘মুজিব’ নামের এক মহিরুহ। হাজার বছর ধরে পরাধীন-পর্যুদস্ত যে জাতি আধমরা থেকে পুরো মরায় পরিণত হচ্ছিল ক্রমশ; বজ্র হুংকারে শুধু নয়, আদরে-সোহাগে প্রাণের প্রবাহে স্পন্দন তুলে তিনি একটি বিন্দুতে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন।’
বঙ্গবন্ধু সব সময় বলতেন, ‘সোনার দেশ গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই।’ কথাটি অর্ধশত বছর পরেও এখনো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক; স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে সোনার মানুষ প্রয়োজন, যে বাংলাদেশ শিল্প-বাণিজ্য, অর্থনীতি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, উদ্ভাবনসহ সব খাতেই হবে যথেষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায় সক্ষম। আমাদের দেশে কোটি কোটি সোনার মানুষ তৈরি হোক। সোনার বাংলাদেশ তৈরি হোক, স্মার্ট বাংলাদেশ তৈরি হোক।’
মো. আশিকুর রহমান
শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
শেষকথা
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে দাঁড়িয়ে তরুণদের এই বহুমাত্রিক ভাবনা আমাদের সামনে একদিকে গর্বের ইতিহাস তুলে ধরে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের দায়ও মনে করিয়ে দেয়। স্বাধীনতা শুধু অর্জনের নয় তার মর্যাদা রক্ষা, সবার জন্য নিশ্চিত করা এবং আগামী প্রজন্মের কাছে তা আরও সমৃদ্ধ করে তুলে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
What's Your Reaction?