শিল্প প্রদর্শনী: মূর্ত, বিমূর্ত ও বিবর্তিত প্রাণ
শুভজিৎ বাগচী শিল্প কি কেবলই সৃজনশীল শ্রম, নাকি নিছক একটি ধারণা? দেওয়ালের একপাশে যদি থাকে মোনালিসার চিত্রকর্ম এবং অন্যপাশের দেওয়ালে টেপ দিয়ে আটকানো একটি সাধারণ কলা, তাহলে দুটিই কি শিল্পের মর্যাদা পায়? আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে ‘চিত্রসূত্র’ শিল্পের এক শাশ্বত বর্ণনাকে লিপিবদ্ধ করেছিল। ‘তরঙ্গাগ্নিশিখাধূমবৈজয়ন্ত্যম্বরাদিকম্। বায়ুগত্যা লিখেদ্যস্তু বিজ্ঞেয়ঃ স তু চিত্রবিৎ ॥২৮॥’ (চিত্রসূত্র, বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ, ৪৩তম অধ্যায় তৃতীয় খণ্ড, শ্লোক ২৮) তরঙ্গ, অগ্নিশিখা, ধূম্রজাল কিংবা বাতাসের হিল্লোলে কম্পমান পতাকা, সকল কিছুকে যিনি বায়ুর গতিতে রেখায়, রঙে প্রকাশ করতে পারেন, তিনিই প্রকৃত চিত্রবিৎ। এই ভূখণ্ডের শিল্পের ইতিহাস কেবল ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ নয়। অজন্তার গুহাচিত্রের সেই সুদক্ষ শিল্পীদের তুলির টান, নালন্দার তালপাতার পুথিতে ফুটে ওঠা সূক্ষ্ম অলঙ্করণ কিংবা পাণ্ডু রাজার ঢিবিতে তাম্রযুগীয় মৃৎপাত্রের গায়ে আঁকা সেই আদিম জ্যামিতি সবই যেন বাংলার এই পলিমাটির ঘ্রাণের মতো বাঙালির মননে গেঁথে আছে। শিল্পের এই দীর্ঘ মিছিলে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন বৈশ্বিক ফ্রেমে ভারতের হারানো নিজস্বতা খুঁজতে ‘ওয়াশ’ পদ্ধত
শুভজিৎ বাগচী
শিল্প কি কেবলই সৃজনশীল শ্রম, নাকি নিছক একটি ধারণা? দেওয়ালের একপাশে যদি থাকে মোনালিসার চিত্রকর্ম এবং অন্যপাশের দেওয়ালে টেপ দিয়ে আটকানো একটি সাধারণ কলা, তাহলে দুটিই কি শিল্পের মর্যাদা পায়? আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে ‘চিত্রসূত্র’ শিল্পের এক শাশ্বত বর্ণনাকে লিপিবদ্ধ করেছিল। ‘তরঙ্গাগ্নিশিখাধূমবৈজয়ন্ত্যম্বরাদিকম্। বায়ুগত্যা লিখেদ্যস্তু বিজ্ঞেয়ঃ স তু চিত্রবিৎ ॥২৮॥’ (চিত্রসূত্র, বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ, ৪৩তম অধ্যায় তৃতীয় খণ্ড, শ্লোক ২৮) তরঙ্গ, অগ্নিশিখা, ধূম্রজাল কিংবা বাতাসের হিল্লোলে কম্পমান পতাকা, সকল কিছুকে যিনি বায়ুর গতিতে রেখায়, রঙে প্রকাশ করতে পারেন, তিনিই প্রকৃত চিত্রবিৎ। এই ভূখণ্ডের শিল্পের ইতিহাস কেবল ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ নয়। অজন্তার গুহাচিত্রের সেই সুদক্ষ শিল্পীদের তুলির টান, নালন্দার তালপাতার পুথিতে ফুটে ওঠা সূক্ষ্ম অলঙ্করণ কিংবা পাণ্ডু রাজার ঢিবিতে তাম্রযুগীয় মৃৎপাত্রের গায়ে আঁকা সেই আদিম জ্যামিতি সবই যেন বাংলার এই পলিমাটির ঘ্রাণের মতো বাঙালির মননে গেঁথে আছে। শিল্পের এই দীর্ঘ মিছিলে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন বৈশ্বিক ফ্রেমে ভারতের হারানো নিজস্বতা খুঁজতে ‘ওয়াশ’ পদ্ধতিতে ছবি আঁকলেন কিম্বা ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষে জয়নুল আবেদিন যখন শীর্ণকায়, রুগ্ন, কেবল অস্থিটুকু সম্বল মানুষের মিছিলে কালো তুলির আঁচড় দিলেন; তখন শিল্প কেবল ‘অনুভব’ করানোর গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠল একেকটি জ্বলন্ত ‘প্রতিবাদ’।
সেই হাজার বছরের বৌদ্ধিক ও নান্দনিক বিবর্তনেরই বর্তমান মঞ্চ হিসেবে অনুষ্ঠিত হলো, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের এবারের বার্ষিক শিল্প প্রদর্শনী। স্নাতক প্রথম বর্ষের নবীন হাতের পেন্সিল স্টিল লাইফ থেকে শুরু করে মাস্টার্সের শিল্পীদের পরিণত এক্সপেরিমেন্টাল পেইন্টিং, ল্যান্ডস্কেপ, সফ্ট স্কালফচার, কিংবা ব্র্যান্ড ডিজাইনসহ প্রায় দেড় শতাধিক কাজের সমাহার।
পোস্ট-মডার্ন বা উত্তর-আধুনিক বিশ্বে দাঁড়িয়ে আজকের তরুণ শিল্পী কেবল সুন্দরের উপাসক নন। তার সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ: একদিকে তাকে যেমন বায়ুর গতিতে ‘অনুভব’ সৃষ্টি করতে হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনই সমাজ ও সময় নিয়ে দর্শককে ‘চিন্তা’ করতে বাধ্য করতে হচ্ছে। এই প্রদর্শনী কেবল একগুচ্ছ চিত্রকর্মের সমাহার নয়, বরং এটি সেই প্রাচীন গুহাচিত্র থেকে শুরু হওয়া হাজার হাজার বছরের শিল্প-তর্কের এক আধুনিক সংকলন। তবে তা সত্যিই মানসম্পন্ন কি না সেটি কিছু কাজের পর্যালোচনা করে দেখা যাক: শিল্পের চিরায়ত ব্যাকরণ যখন একজন স্রষ্টার তুলিতে নবজাতকের মতো রূপান্তর লাভ করে; তখন সেই বিবর্তনের প্রথম পাঠ নিতে আমাদের প্রথমেই তাকাতে হয় শিল্পী বিশাল পালের শিল্পকর্ম ‘চিত্তের বিবর্তন’-এর দিকে। এটি একটি নিরীক্ষাধর্মী এক্রেলিক চিত্রকর্ম। ক্যানভাসের মূল উপাদানগুলোর মাঝে একটি নীল আবক্ষ ভাস্কর্য, মোনালিসার পুনর্নির্মাণ, এবং ডাক্ট টেপে আটকানো একটি কলা। দেখামাত্র কনটেক্সট জানা দর্শক বুঝে নেবেন: শেষেরটি মাউরিজিও ক্যাটেলানের সেই বিখ্যাত ‘কমেডিয়ান’ (২০১৯)—মিয়ামি আর্ট বাজেলে ৬.২ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হওয়া একটি কলা, যা সমসাময়িক শিল্পবাজারের উন্মাদনা এবং অর্থহীনতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তুমুল বিতর্ক তুলেছিল। মোনালিসা পশ্চিমের প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পের প্রতীক। আর নীল মানুষটি? সে দেখছে। আসলে কী দেখছে? এই উন্মাদনা? নাকি পোস্টমডার্ন আইডিয়ার কাছে প্রাতিষ্ঠানিক শিল্প বিবর্তনের কোনো এক বিমূর্ত বিষাদ?
এখানেই প্রশ্নটা জমে ওঠে। নীল রঙে আঁকা বাদামি মানুষটি কী বলতে চায়? ইভ ক্লাঁইয়ের ইন্টারন্যাশনাল ক্লেইন ব্লু বিমূর্ত আধিপত্যের নীল, যা ফরাসি ক্যানভাসে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দাবি করেছিল, শিল্পী বিশাল কি সেই নীল ধরতে চেয়েছেন। তাহলে এই নীলটা দূরত্বের, পরিচয়সংকটের। এই মানুষটি ঔপনিবেশিক আয়নায় নিজেকে দেখছেন; পশ্চিমের শিল্পের সামনে তার অবস্থানটা কী, বোঝার চেষ্টা করছেন। মোনালিসার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বিস্মিত না সংশয়ী, সেই দ্বন্দ্বটাই কাজকে ভিন্ন মাত্রা সংযোগ করে। এবং দর্শকমাত্রই ভাবতে হয়, শিল্প এতটাই অর্থহীন হয়ে গেছে যে একটা কলাই শিল্প?
বিশাল পালের চিত্রে যে বিবর্তনের রেখা আমরা দেখলাম, তা যখন রূপক ছাড়িয়ে এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ায়; তখনই আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় পরবর্তী শিল্পী আতিকা রহমানের এই সৃষ্টিতে। এটিও একটি নিরীক্ষাধর্মী এক্রেলিক চিত্রকর্ম। এই কাজটির কাছে একটা শারীরিক অস্বস্তি জমে এবং এটাই সম্ভবত শিল্পীর উদ্দেশ্য। একটি নারীমুখ, কিন্তু বিচ্ছিন্ন পাশে ভাসমান একটি কান, একটি চাবি, কাঁটাচামচ আর পটভূমিতে লাল রেখার জ্যামিতিক বিভাজন। একটি চোখ থেকে রক্তের ধারা নিচে নামছে। এটি সাররিয়েলিস্ট ঘরানার কাজ, কিন্তু ইউরোপীয় সাররিয়েলিজমের সরল উত্তরাধিকার নয়। সালভাদোর দালি বা রেনে মাগ্রিতের কাছে বিচ্ছিন্নতা ছিল একটি দার্শনিক ও যুক্তিকে ভেঙে দেওয়ার আনন্দ। এখানে বিচ্ছিন্নতাটা অনেক বেশি শারীরিক, অনেক বেশি কষ্টের। কান আছে কিন্তু শোনা হচ্ছে না, চাবি আছে কিন্তু কোনো তালা নেই, কাঁটাচামচ আছে কিন্তু কিছু খাওয়া হচ্ছে না। এ সকল রূপক দিয়ে শিল্পী যেন বলতে চায় সম্পর্কের ভেতরকার বধিরতা, নিয়ন্ত্রণ আর এক গভীর অপ্রাপ্তির রূপান্তর।
রঙের সাহস আছে। বহুরঙা বিমূর্ত পটভূমির বিপরীতে মুখের আর্থ টোন একটা প্রয়োজনীয় উত্তেজনা তৈরি করেছে। ব্রাশওয়ার্ক জোরালো, বিশেষত মুখের গড়নে। কিন্তু রচনাগতভাবে কাজটি কেন্দ্রহীন, সব প্রতীক সমান মনোযোগ দাবি করায় কোনোটাই পুরো মনোযোগ পাচ্ছে না। শ্রেণিবিন্যাস নেই, দর্শকের চোখ কোথায় শুরু করবে, কোথায় থামবে, বোঝা যাচ্ছে না। পোস্টমডার্ন শিল্পে বিক্ষিপ্ততা একটি নান্দনিক সিদ্ধান্তও হতে পারে কিন্তু সেই সিদ্ধান্তটি সচেতন হতে হয়, আকস্মিক নয়।
দৃশ্যমান এই বিবর্তনের সমান্তরালে শিল্পের অন্তর্নিহিত দর্শন যখন কোনো নিথর বস্তুর আধারে প্রাণ পায়; তখন আমাদের আলোচনা এক নতুন মাত্রা ধারণ করে শিল্পী সিনথিয়া আক্তার শান্তার শিল্পকর্মে। এটি প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় কাজ। ক্যানভাসটি দৈর্ঘে ৫ ফুট এবং প্রস্থে ৪ ফুট। একটি শাড়ি পরা বাদামি বর্ণের নারী, মাথার পেছনে আভামণ্ডল, আর তাকে ঘিরে ইউরোপীয় বারোক চিত্রশৈলীর কিউপিড সেই পাখাওয়ালা শিশুরা যারা রাফায়েলের সিস্টিন মাদোনা বা বোত্তিচেল্লির ক্যানভাসে বাস করে। কাজটির আইকনোগ্রাফিক রাজনীতি সুস্পষ্ট। পাশ্চাত্যের ধর্মীয় চিত্রকলায় ঐশ্বরিক মাতৃত্বের যে কাঠামো মাদোনা অ্যান্ড চাইল্ড তা সর্বদাই শ্বেতাঙ্গ, ইউরোপীয় মুখের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিল্পী সেই কাঠামোটিকে বাংলাদেশের একজন সাধারণ নারীর শরীরে প্রতিস্থাপিত করেছেন; লাল শাড়ি, কপালে বিন্দি, গায়ের রং বাদামি। এটি আর্ট হিস্ট্রির একটি ক্লাসিক কাঠামোর ডিকলোনাইজেশন।
ফ্রান্টজ ফ্যানন যখন বলেছিলেন উপনিবেশ মানুষের আত্মপরিচয়কে ধ্বংস করে, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে শিল্পকর্মটি কি আত্মপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে? কারিগরি দক্ষতার প্রমাণ স্পষ্ট। আলোছায়ার বিন্যাস চিন্তাশীল, নারীর মুখের সূক্ষ্মতা মনোযোগী, শিশুদের শরীরের ভলিউম এবং উষ্ণ বর্ণ মিলিয়ে একটা ধ্রুপদী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। নারীর মুখে যে একটা দূরত্ব বা বিষণ্ণতার আভাস; সেটা যদি ইচ্ছাকৃত হয়, তাহলে কাজটা আরও গভীর হয়; কারণ ঐশ্বরিকতার ভার বহন করাটাও একটা মানবিক কষ্টের গল্প। রাফায়েলের মাদোনারা সব সময় শান্ত ও আলোকিত কিন্তু এই নারীটি কি আসলে সেই ভূমিকাটাকে বহন করতে রাজি আছেন? প্রশ্নটা কাজের মধ্যেই থেকে গেছে এবং এটাই এই কাজের সবচেয়ে ভালো দিক।
একই শিল্পীর এটি আরও একটি এক্রেলিক ল্যান্ডস্কেপ প্রদর্শিত হয়। প্রদর্শনীর সবচেয়ে শান্ত কাজ এবং সেই শান্তিতে আছে এক অদ্ভুত শক্তি। জন কনস্টেবল বলতেন, আকাশই হলো শিল্পের মূল আবেগ বা অনুভূতির ‘মুখ্য অঙ্গ’ (লেসলি, সি.আর., মেমোরিস অব দ্য লাইফ অব জন কনস্টেবল, ১৮৪৩)। তা-ই আলোর উৎস এবং আলোই দৃশ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে। এ কাজে শিল্পী সেই নীতিটাই অনুসরণ করেছেন। ছায়ার গভীরতা দিয়ে আলোকে বোঝানো হয়েছে। গাছের কাণ্ডে আলো-ছায়ার স্তর, পাতার স্বচ্ছতার ভেতর দিয়ে যে আলো পড়ছে, মাটির ওপর দীর্ঘ ছায়া এসব মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট দিনের নির্দিষ্ট সময়ের অনুভূতি তৈরি হয়েছে। ব্রাশস্ট্রোকের বৈচিত্র্য লক্ষণীয়; ঘাসের জন্য আলাদা, গাছের ত্বকের জন্য আলাদা, পাতার জন্য আলাদা। ইম্প্রেশনিজমের সঙ্গে তুলনাটা অনিবার্য কিন্তু এ কাজে ইম্প্রেশনিস্ট ভাঙা আলোর বদলে একটু বেশি টেকসই, শান্ত বর্ণনার ধরন। বরং এটি অনেক বেশি বাংলাদেশের নিজস্ব ল্যান্ডস্কেপ ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। আর এখানেই দৃশ্যটি প্রতীকী থেকে বিস্তৃত হয়ে একটি বসন্ত দুপুরের সতেজতা ঢেলে দেয় দর্শকের প্রাণে।
মহাজাগতিক বিশালতা আর মানবিক যন্ত্রণার এই স্পর্ধিত সত্যকে আলিঙ্গন করতেই আমাদের পর্যালোচনার পরবর্তী ধাপে শিল্পকর্মটির অবতারণা। শিল্পী বর্ষা রানী দেবনাথের ‘অদৃশ্য মুখোশ’ শিরোনামে একটি নিরীক্ষাধর্মী চিত্রকর্ম। একজন নারীর মুখ বাঁধা এবং একটি সাপ আক্রমণাত্মক ভাবে আছে। চারপাশে গ্রহ-উপগ্রহ: পৃথিবী, শনি, একটি ভেঙে পড়া লাল গ্রহ। দুপাশে দুটি ভিনগ্রহের মুখ, একটি নীল তারাখচিত, একটি ফাটলধরা, দুটো হৃৎপিণ্ড, আগুন সদৃশ পাহাড়। পটভূমিতে গভীর রাতের অন্ধকার নীল।
ফ্রিদা কাহলোর সঙ্গে একটি তুলনা এড়ানো কঠিন। কিন্তু সেই তুলনাটা করাও জরুরি, কারণ এখানে পার্থক্যটাই গুরুত্বপূর্ণ। কাহলো যেখানে নিজের শরীরকেই রণক্ষেত্র বানাতেন, তাঁর কাজে অটোবায়োগ্রাফি এবং কসমোলজি একসঙ্গে চলতো। এখানে নারীটি আরও সর্বজনীন। এ সর্বজনীনতাটাই কখনো কখনো কাহলোর থেকে বেশি কার্যকর; কারণ দর্শক নিজেকে সেই মুখে দেখতে পান। প্রতীকসমূহ অনেক, কিন্তু সেটা এখানে সমস্যা নয়। কারণ সবকিছু একটি কেন্দ্রীয় ভাবের চারদিকে সংগঠিত। সাপ বাধার প্রতীক, ভাঙা গ্রহ বিপন্নতার, মুখবন্ধ নারী এসব বোঝার একাকী বাহক। রঙের নিয়ন্ত্রণ এ কাজের সবচেয়ে বড় সাফল্য নীল পটভূমি, উষ্ণ রঙের মুখ, সবুজ রুক্ষত্বকযুক্ত সাপ এবং লাল গ্রহের মধ্যে রঙিন উত্তেজনা সুচিন্তিত।
প্রদর্শনীটিকে একটি বৃহত্তর প্রশ্নের সামনে রাখলে কিছু বিষয় স্পষ্ট হয়। বিশ্বশিল্পে পোস্টমডার্নিজম যে বিচ্যুতি এনেছিল, মহাআখ্যানের অবিশ্বাস, অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন, পরিচয়ের রাজনীতি, তার প্রভাব এখন এ দেশের চারুকলার শ্রেণিকক্ষেও পৌঁছেছে। ক্যাটেলানের কলার উপস্থিতি, বারোক আইকনোগ্রাফির ডিকলোনাইজেশন, সাররিয়েলিজমের দেশীয় রূপান্তর, এগুলো দেখায় যে শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক শিল্পসংলাপের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু একটি উদ্বেগও আছে। পোস্টমডার্ন শিল্পে ধারণার প্রাধান্য এতটাই বেশি যে, নির্মাণগত দক্ষতাকে অনেকে গৌণ মনে করেন। এ প্রদর্শনীর একাধিক কাজে ধারণাটি এগিয়ে আছে কিন্তু রঙের সংহতি বা রচনার শ্রেণিবিন্যাস পিছিয়ে। এটি স্বাভাবিক বিকাশের পর্যায় কিন্তু বিপদ আছে।
বাংলাদেশের চারুকলার ঐতিহ্য একটি দ্বিধার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে পশ্চিমের শিল্পতাত্ত্বিক আলোচনার টান, অন্যদিকে নিজের তথ্য বিস্মৃতি। জয়নুল যেভাবে দুটোকে এক করেছিলেন, পশ্চিমের কৌশল ও বাংলার কষ্ট, সেই সংশ্লেষণটা এখনো চলছে, এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। এ প্রদর্শনী সেই অসম্পূর্ণ সংশ্লেষণের একটি জীবন্ত মুহূর্ত। চিত্রসূত্রের শেষ কথাটি মনে পড়ে: ‘এই গ্রন্থে শুধু ইঙ্গিত দেওয়া হলো, হে রাজন—এ বিষয় একশত বছরেও সম্পূর্ণ বলা যাবে না।’ (‘ন শক্যো বিস্তরাদ্বক্তুং বর্ষাণামপি শতৈরপি। সংক্ষেপতস্তু তদুদ্দিষ্টং যন্ন শক্যং সবিস্তরম্॥’ বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ (তৃতীয় খণ্ড), ৪৩তম অধ্যায়, শ্লোক নম্বর ৩৮।)
এসইউ
What's Your Reaction?