শিশুশ্রম ইস্যুতে মার্কিন শুল্কের পেছনে আছে রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক স্বার্থ

বাংলাদেশে শিশুশ্রম ও জোরপূর্বক শ্রম ইস্যুকে সামনে এনে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের চেষ্টা করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তার মতে, শিশুশ্রম নিরসনে সহায়তা বা সহযোগিতার উদ্যোগ না নিয়ে রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের আলোচনা প্রশ্নের জন্ম দেয়। এর পেছনে মানবিক উদ্বেগের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থও থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি। মার্কিন সরকারের নতুন করে শুল্ক আরোপের বিষয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ফোর্সড লেবারের কথা বলা হচ্ছে। এখানে দুটো জিনিস। এগুলো তারা তাদের লেন্স দিয়ে দেখার চেষ্টা করে। আমাদের দেশের বাস্তবতাকে তারা ঠিকমতো নেয় না। ইটভাটাসহ অন্যান্য জায়গায় শিশুশ্রম আছে। পারিবারিক প্রয়োজনে এটা যায়। কিন্তু এটাকে দেখিয়ে, এটার সুরাহা হিসেবে আমার দেশের রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করবে কি না, এটা হলো প্রশ্নের ব্যাপার।’ ‘এখানে যদি এমন হতো- বাংলাদেশে শিশুশ্রম আছে আর মার্কিন যুক্ত

শিশুশ্রম ইস্যুতে মার্কিন শুল্কের পেছনে আছে রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক স্বার্থ

বাংলাদেশে শিশুশ্রম ও জোরপূর্বক শ্রম ইস্যুকে সামনে এনে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের চেষ্টা করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।

তার মতে, শিশুশ্রম নিরসনে সহায়তা বা সহযোগিতার উদ্যোগ না নিয়ে রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের আলোচনা প্রশ্নের জন্ম দেয়। এর পেছনে মানবিক উদ্বেগের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থও থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি।

মার্কিন সরকারের নতুন করে শুল্ক আরোপের বিষয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ফোর্সড লেবারের কথা বলা হচ্ছে। এখানে দুটো জিনিস। এগুলো তারা তাদের লেন্স দিয়ে দেখার চেষ্টা করে। আমাদের দেশের বাস্তবতাকে তারা ঠিকমতো নেয় না। ইটভাটাসহ অন্যান্য জায়গায় শিশুশ্রম আছে। পারিবারিক প্রয়োজনে এটা যায়। কিন্তু এটাকে দেখিয়ে, এটার সুরাহা হিসেবে আমার দেশের রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করবে কি না, এটা হলো প্রশ্নের ব্যাপার।’

‘এখানে যদি এমন হতো- বাংলাদেশে শিশুশ্রম আছে আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটা সহায়তা তহবিল করেছে শিশুশ্রম যাতে না থাকে। কিন্তু এটা না করে যখন রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক চাপানো হয় ১০ শতাংশ, তখনই প্রশ্নটা আসে। এটা কী শিশুশ্রমিকদের ওপর ভালোবাসার কারণে, না কি তারা যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছিল (পাল্টাপাল্টি), যা তাদের আদালত বাতিল করলো। পরে তাদের প্রেসিডেন্ট বিশেষ ক্ষমতাবলে আরও ১০ শতাংশ করলো। যেটা ১৫০ দিন পর্যন্ত করলেন। যা আগামী জুলাইয়ে থাকবে না। তো এখানে ফোর্সড লেবার ইত্যাদি দেখিয়ে আবার ১০ শতাংশ যাতে করা যায়। সুতরাং এখানে অবশ্যই একটা রাজনৈতিক অর্থনীতি আছে,’ যোগ করেন তিনি।

মিডিয়া ব্রিফিংয়ে ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি: উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার কিছুটা কমলেও তা প্রকৃত উন্নতির প্রতিফলন নয়; বরং ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ও রাইট-অফের মতো পদক্ষেপের কারণে সংকট আড়াল হয়েছে।

ফাহমিদা খাতুন জানান, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মার্চে কমে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে এই হ্রাসকে প্রকৃত সম্পদমানের উন্নতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং রাইট-অফের কারণে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার চিত্র আড়াল হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে ১৭টি ব্যাংকের অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (একিউআর) কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে ছয়টি ব্যাংকের পর্যালোচনায় প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত খেলাপি ঋণের তথ্য পাওয়া গেছে, যা ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঙ্গে প্রকাশিত তথ্যের বড় ধরনের অমিলের ইঙ্গিত দেয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের মে মাসে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্যের হার ছিল ৪৩ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মার্চে বেড়ে ৫৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে অ্যাডভান্স-ডিপোজিট রেশিও (এডিআর) ০.৮৯ থেকে কমে ০.৮৪ হয়েছে। এতে বোঝা যায়, ব্যাংকগুলোর হাতে অর্থ থাকলেও ঋণ বিতরণে সতর্কতা বেড়েছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণচাহিদা দুর্বল রয়েছে।

ব্যাংক খাত সংস্কারে কঠোর ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং নীতি বাস্তবায়ন, নিয়ন্ত্রক শিথিলতা ধীরে ধীরে প্রত্যাহার এবং পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠিত ঋণসহ প্রকৃত খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশের সুপারিশ করেছে সিপিডি। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও তদারকি সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

রাজস্ব খাত নিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জুলাই-মার্চ সময়ে রাজস্ব আদায় বেড়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। বর্তমান লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শেষ প্রান্তিকে ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা বাস্তবে অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন। জুলাই-এপ্রিল সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা।

তিনি জানান, গত এক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। ফলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং তা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।

মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি নিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতেই মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে পৌঁছেছে। জ্বালানি, পরিবহন ও সেবাখাতের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এ চাপ আরও বাড়ছে।

তিনি জানান, এলপিজির দাম মার্চ থেকে জুনের মধ্যে ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে চাল, ডাল, ডিমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ, তবুও মূল্যস্ফীতির তুলনায় তা কম হওয়ায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।

সিপিডির গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তি বলেন, সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দামের ঊর্ধ্বগতির প্রেক্ষাপটে কিছু সমন্বয় প্রয়োজন ছিল। তবে দ্বিতীয় দফায় জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল না বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বর্তমানে নিম্নমুখী এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নিজস্ব অর্থায়নের মাধ্যমে এ চাপ সামাল দিতে পারতো।

এসএম/একিউএফ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow