শুরুতেই নষ্ট হয় ৩০% চামড়া, সংরক্ষণে প্রশিক্ষণ পাবেন মাদরাসা ছাত্ররা
চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে গত বছর প্রথমবারের মতো দেশের মসজিদ-মাদরাসায় লবণ বরাদ্দ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সে ধারবাহিকতায় এবারও বিভিন্ন মাদরাসায় বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ২০ কোটি টাকার লবণ। তবে এবার প্রথমবারের মতো চামড়া সংরক্ষণে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের দেওয়া হবে প্রশিক্ষণ। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সঠিকভাবে ছাড়ানো ও সংরক্ষণের অভাবে প্রতিবছর কোরবানির পশুর ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়। এর মধ্যে ২০ শতাংশেরও বেশি চামড়ায় কাটা-ছেঁড়া (ফ্লে কাট) বা পক্সের মতো ক্ষত থাকে। এতে কমে যায় এসব চামড়ার গুণগত মান ও বাজারমূল্য। এদিকে, কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে চলছে প্রস্তুতিমূলক নানান কর্মযজ্ঞ। সংস্কারকাজ চলছে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি)। অকেজো ও পুরোনো যন্ত্রপাতি, বিশেষ করে মোটর ও পাম্পগুলোর মেরামত এবং প্রতিস্থাপনের কাজ চলছে। সংস্কার চলছে কঠিন বর্জ্য রাখার ডাম্পিং স্টেশনের। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকারণে মজুত করা হচ্ছে প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল। তবে, যুদ্ধের কারণে ক্রয়াদেশ কমায় ও জ্বালানি সংকটে প্রায় ১৫ দিন ট্যানারিতে উৎপাদন বন্ধ ছিল। এতে প্রস্তুতিতে ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্যানারি মালিকরা।
চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে গত বছর প্রথমবারের মতো দেশের মসজিদ-মাদরাসায় লবণ বরাদ্দ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সে ধারবাহিকতায় এবারও বিভিন্ন মাদরাসায় বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ২০ কোটি টাকার লবণ। তবে এবার প্রথমবারের মতো চামড়া সংরক্ষণে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের দেওয়া হবে প্রশিক্ষণ।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সঠিকভাবে ছাড়ানো ও সংরক্ষণের অভাবে প্রতিবছর কোরবানির পশুর ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়। এর মধ্যে ২০ শতাংশেরও বেশি চামড়ায় কাটা-ছেঁড়া (ফ্লে কাট) বা পক্সের মতো ক্ষত থাকে। এতে কমে যায় এসব চামড়ার গুণগত মান ও বাজারমূল্য।
এদিকে, কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে চলছে প্রস্তুতিমূলক নানান কর্মযজ্ঞ। সংস্কারকাজ চলছে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি)। অকেজো ও পুরোনো যন্ত্রপাতি, বিশেষ করে মোটর ও পাম্পগুলোর মেরামত এবং প্রতিস্থাপনের কাজ চলছে। সংস্কার চলছে কঠিন বর্জ্য রাখার ডাম্পিং স্টেশনের। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকারণে মজুত করা হচ্ছে প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল। তবে, যুদ্ধের কারণে ক্রয়াদেশ কমায় ও জ্বালানি সংকটে প্রায় ১৫ দিন ট্যানারিতে উৎপাদন বন্ধ ছিল। এতে প্রস্তুতিতে ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্যানারি মালিকরা।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চামড়া শিল্পনগরীর প্রস্তুতি ধাপে ধাপে এগোচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য এখনো শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বৈঠক বাকি রয়েছে। এসব বৈঠকের পরই সামগ্রিক প্রস্তুতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পরিষ্কার হবে।
গত বছরের মতো এবারও প্রায় ২০ কোটি টাকার লবণ মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানায় বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে। এর লক্ষ্য হচ্ছে, এসব প্রতিষ্ঠান যেন কোরবানির চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারে এবং ন্যায্য মূল্য পায়।— বিসিক চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম
বিসিক চেয়ারম্যান বলেন, প্রাথমিকভাবে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো— গত বছরের মতো এবারও প্রায় ২০ কোটি টাকার লবণ মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানায় বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে। এর লক্ষ্য হচ্ছে, এসব প্রতিষ্ঠান যেন কোরবানির চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারে এবং ন্যায্য মূল্য পায়। গত বছর প্রথমবার এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, এবার সেটিকে আরও কার্যকর করতে লবণ বিতরণের পাশাপাশি যুক্ত করা হয়েছে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। প্রশিক্ষণের আওতায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং বিসিকের সমন্বয়ে মাদরাসা ও এতিমখানা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং কসাইদের চামড়া সংরক্ষণ ও লবণ প্রয়োগের সঠিক পদ্ধতি শেখানো হবে। দক্ষ কসাইদের সম্পৃক্ত করে এই প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হবে, যাতে মাঠপর্যায়ে বাস্তব দক্ষতা তৈরি হয়।
গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমবারের মতো চামড়া সংগ্রহে মসজিদ, মাদরাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে ২০ কোটি টাকার লবণ বরাদ্দ দেয়। সংগ্রহ করা চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা ছিল এর মূল লক্ষ্য। কোরবানির আগে গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন জানিয়েছিলেন, ‘চামড়ার মান রক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের লক্ষ্যে সারাদেশে ৩০ হাজার টন লবণ বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে। এসব লবণ বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসায় দেওয়া হবে। যতদিন না চামড়া ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করা সম্ভব হবে, ততদিন এগুলো সংরক্ষণ করা হবে।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বছরও ২০ কোটি টাকার লবণ বিতরণ করা হবে। সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ।
সম্প্রতি এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, এবারও চামড়া সংরক্ষণের জন্য বিসিকের মাধ্যমে বিনামূল্যে লবণ দেবে সরকার। প্রতিটি এলাকায় ব্যবসায়ী ও মসজিদ-মাদরাসায় চামড়া সংরক্ষণ করা হবে। আগামী কোরবানি ঈদে কোনো চামড়া যেন নষ্ট না হয়, সে জন্য ডিসিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মসজিদ-মাদরাসার দায়িত্বশীলদের ডেকে প্রশিক্ষণ দেবে সরকার। তারা কোরবানির পর চামড়া সংরক্ষণ করবেন।
গতবছর মাদরাসায় দেওয়া লবণ কতটা কাজে এসেছে
গত বছর প্রথমবারের মতো চামড়া সংগ্রহে বিভিন্ন মাদরাসায় লবণ দেওয়া হলেও এ উদ্যোগের পুরোটা কাজে আসেনি। এমন কিছু মাদরাসায় লবণ দেওয়া হয়েছিল, যেসব মাদরাসা চামড়া সংগ্রহ করে না। পরে ওইসব মাদরাসা বরাদ্দকৃত লবণ বিক্রি করে দেয়। এসব বিবেচনায় এ বছর মাদরাসা, মসজিদ ও লিল্লাহ বোর্ডিং নির্ধারণে আরও সর্তকর্তা অবলম্বণ করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সেজন্য এবার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম যুক্ত করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ ও লবণ দেওয়ার পদ্ধতি
কোরবানির পর ৭ দিন ঢাকায় কোনো চামড়া প্রবেশ করবে না
কোরবানির চামড়া সংগ্রহে তথ্য বিভ্রাট, নষ্ট ‘হাজার হাজার’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মাদরাসার প্রধান জাগো নিউজকে বলেন, গত বছর যে লবণ দিয়েছিল, তার মান একেবারেই খারাপ। আবার গ্রাম-গঞ্জের বিভিন্ন মাদরাসায় দেওয়া লবণ কাজে আসে না। কারণ, চামড়া সংরক্ষণ করার বিষয়ে সবাই অজ্ঞ নয়। বেশিরভাগ মাদরাসা চামড়া সংগ্রহের পর তা তাৎক্ষণিক বিক্রি করে দেয়। মূলত ঢাকার মাদরাসাগুলোতে চামড়া সংরক্ষণ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, এ বছর লবণ দেওয়ার জন্য উপজেলা অফিস থেকে এরই মধ্যে ফোন দিয়েছে। এবার কতোটুকু লবণ লাগবে তা জানতে চেয়েছে।
কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করছেন মাদরাসা শিক্ষার্থীরা/ ফাইল ছবি
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও সালমা ট্যানারির স্বত্বাধিকারী মো. সাখাওয়াত উল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, সরকার লবণ বিতরণের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে। মাদরাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থীরা চামড়া সংগ্রহ করলেও লবণ প্রয়োগে তাদের অভিজ্ঞতা নেই। ফলে সময়মতো ও সঠিকভাবে লবণ দেওয়া হয় না, এতে চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে— চামড়া সংগ্রহের পাশাপাশি আলাদা একটি প্রশিক্ষিত দল তাৎক্ষণিক লবণ প্রয়োগ করবে। তা না হলে এই উদ্যোগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
তিনি আরও বলেন, মাদরাসায় লবণ দেওয়া হলেও সিস্টেমটা ভালো হচ্ছে না। যেসব মাদরাসা বা এতিমখানায় লবণ দিচ্ছে সেখানে একটু ফলোআপ দরকার। মাদরাসা মূলত ছাত্রদের দিয়ে চামড়া সংগ্রহ করে। ছাত্রদের এই চামড়া সংগ্রহ করতে করতে রাত ৯ থেকে ১০টা পর্যন্ত বেজে যায়। ১০টার পর যখন চামড়াগুলো জড়ো হয়, তখন ওদেরকে বলে যে তোমরা এখন লবণ দাও। কিন্তু ছাত্রদের লবণ দেওয়ার কোনো অভিজ্ঞতা নেই, আর তারা তখন খুব ক্লান্ত থাকে। ফলে তখন আর চামড়াতে ওইভাবে লবণ দিতে পারে না। লবণ না দেওয়ার ফলে দেখা যাচ্ছে যে সকালবেলায় তখনও লবণ পড়ে আছে, চামড়াও পড়ে আছে— এটা গতবারের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বলছি। তাই মাদরাসাগুলোতে লবণ দেওয়ার জন্য আলাদা লোক রাখা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সিইটিপির দায়িত্বে থাকা ঢাকা ট্যানারি এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. গোলাম শাহনেওয়াজ জাগো নিউজকে বলেন, কোরবানির পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চামড়া প্রক্রিয়াজাতের প্রস্তুতি নেওয়া। গরুর চামড়ার ক্ষেত্রে জবাইয়ের ৮ ঘণ্টার মধ্যে রক্ত ও মাংস পরিষ্কার করে গড়ে ৮ থেকে ১০ কেজি লবণ সমানভাবে প্রয়োগ করতে হয়। ছাগলের চামড়ার ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ৩ থেকে ৪ কেজি। এই প্রক্রিয়াটিকেই আমরা ‘কিউরিং’ বলি। সঠিকভাবে কিউরিং করা হলে চামড়া দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যায়, ফলে একসঙ্গে চাপ না পড়ে ধাপে ধাপে প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হয়। এতে করে সিইটিপির ওপর চাপ কমে এবং শিল্পের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা সহজ হয়।
সরকার লবণ বিতরণের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে। মাদরাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থীরা চামড়া সংগ্রহ করলেও লবণ প্রয়োগে তাদের অভিজ্ঞতা নেই। ফলে সময়মতো ও সঠিকভাবে লবণ দেওয়া হয় না, এতে চামড়া নষ্ট হয়ে যায়।— বিটিএর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত উল্লাহ
তিনি বলেন, কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, লবণের পরিমাণ ঠিকভাবে দেওয়া হচ্ছে কি না, সময়মতো প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না — এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত মনিটরিং নেই। অনেক ক্ষেত্রে ১০ কেজির জায়গায় ২-৩ কেজি লবণ দেওয়া হয় বা দীর্ঘ সময় ফেলে রাখা হয়, যা চামড়ার মান নষ্ট করে। এছাড়া অদক্ষভাবে চামড়া ছাড়ানোর কারণেও বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। এসব কারণে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কাঁচা চামড়া প্রাথমিক পর্যায়েই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই সঠিক সময়, সঠিক পরিমাণ লবণ প্রয়োগ এবং দক্ষতার সঙ্গে চামড়া প্রক্রিয়াজাত নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
ট্যানারি মালিকদের প্রস্তুতিতেও ঘাটতি
এ বছর ট্যানারি মালিকেদের প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও সালমা ট্যানারির স্বত্বাধিকারী মো. সাখাওয়াত উল্লাহ। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, বর্তমানে ট্যানারিগুলোর প্রস্তুতি সন্তোষজনক নয়। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমাদের অধিকাংশ ক্রয়াদেশ স্থগিত রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে সবমিলিয়ে প্রায় ১৫ দিন উৎপাদন বন্ধ ছিল, ফলে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শিপমেন্টও হয়নি। এতে করে আর্থিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে— যার প্রভাব পড়ছে শ্রমিকের বেতন, ব্যবসায়িক দায়-দেনা এবং কোরবানির মৌসুমের প্রস্তুতিতে। কোরবানির সময় সারা বছরের প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয়, কিন্তু এ বছর প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারে চলছে সংস্কার
চামড়া যাতে সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করা যায় ও পরিবেশ দূষণ ঠেকাতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারে (সিইটিপি) সংস্কার কাজ চলছে। এ বিষয়ে সিইটিপির দায়িত্বে থাকা ঢাকা ট্যানারি এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. গোলাম শাহনেওয়াজ জাগো নিউজকে বলেন, বিগত বছরের মতোই এবারের কোরবানির জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) এ টু জেড ওভারহোলিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা কোরবানির ঈদ পর্যন্ত চলমান থাকবে। ইকুয়ালাইজেশন ট্যাংক থেকে শুরু করে বিভিন্ন মডিউল ও থিকেনিং ট্যাংকসহ সব গুরুত্বপূর্ণ অংশের সংস্কার করা হচ্ছে। এর ফলে সিইটিপির দক্ষতা ও ধারণক্ষমতা— দুটোই বাড়বে। পাশাপাশি কোরবানির পর যাতে কোনো ধরনের ঘাটতি না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল মজুত করা হচ্ছে। অকেজো ও পুরোনো যন্ত্রপাতি, বিশেষ করে মোটর ও পাম্পগুলোর মেরামত ও প্রতিস্থাপনের কাজও চলছে। এরই মধ্যে ৪০টির বেশি মোটর-পাম্প রিপেয়ারিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে, যা ঈদের আগেই স্থাপন ও প্রতিস্থাপন সম্পন্ন করা হবে। এতে সিইটিপির সামগ্রিক কার্যকারিতা ও পরিবেশগত মান উন্নত হবে।
আরও পড়ুন
কোরবানির পশুর চামড়া ছাড়াবেন যেভাবে
সাভারের ট্যানারি বর্জ্য কেড়ে নিচ্ছে ধলেশ্বরীর প্রাণ
ট্যানারির ‘অসম্পূর্ণ স্থানান্তরই’ চামড়া শিল্প ধসের কারণ
তিনি আরও বলেন, সলিড ওয়েস্ট ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে স্লাজ সংরক্ষণের জন্য দুটি পুকুর সংস্কারের কাজ চলছে, যাতে কোরবানির পর ফ্লেশিংসহ বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা না হয়। এছাড়া প্রতিবছরের মতো কোরবানির পরপরই ঢাকার বাইরে থেকে কাঁচা চামড়া তাৎক্ষণিক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যাতে একসঙ্গে অতিরিক্ত চাপ সিইটিপির ওপর না পড়ে। ধাপে ধাপে চামড়া প্রবেশের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর রাখা সম্ভব হয়— এ ধরনের সিদ্ধান্ত ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে নেওয়া হয়ে থাকে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর অবকাঠামোগত প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওভারহলিং, রাস্তা চলাচল উপযোগী রাখা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের বিষয়েও কাজ চলছে। তবে স্বল্প সময়ে শিল্পনগরীর সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব নয়, বর্তমান সক্ষমতাই বজায় রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি চামড়া ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে ঢাকার বাইরে থেকে কাঁচা চামড়া সরাসরি প্রবেশ নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক নির্দেশনাও বিবেচনায় রয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রিসভা কমিটির পক্ষ থেকে আরও কিছু সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
বর্তমানে ট্যানারিগুলোর প্রস্তুতি সন্তোষজনক নয়। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমাদের অধিকাংশ ক্রয়াদেশ স্থগিত রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে সবমিলিয়ে প্রায় ১৫ দিন উৎপাদন বন্ধ ছিল, ফলে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শিপমেন্টও হয়নি।— বিটিএর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত উল্লাহ
জাগো নিউজের এক প্রশ্নের উত্তরে বিসিক চেয়ারম্যান বলেন, সাভার চামড়া শিল্পনগরী বিসিকের অধীনে থাকবে নাকি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) অধীনে যাবে — এ বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ নিয়ে আগে গঠিত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে একটি টেকনিক্যাল কমিটি কাজ করছে, বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে রয়েছে। আইনগত, প্রশাসনিক ও কাঠামোগত নানান জটিলতা থাকায় এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। নির্দেশনা পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
দেশে এবার কোরবানিযোগ্য পশু এক কোটি ২৩ লাখ
দেশে এবার কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এটি এ বছরের সম্ভাব্য চাহিদার চেয়ে ২২ লাখেরও বেশি। এ বছর চাহিদা এক কোটি এক লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশুর।
সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, এ বছর সম্ভাব্য চাহিদার বিপরীতে ২২ লাখের বেশি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। ফলে কোরবানির পশুর কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই।
গতবছর রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয় কোরবানির পশুর চামড়া/ ছবি- জাগো নিউজ
তিনি জানান, এবার কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু ও মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল ও ভেড়া এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী। এ বছর সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে। রাজধানী ঢাকায় থাকবে ২৭টি হাট। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টি হাট বসবে। এসব হাটে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিক্যাল টিম দায়িত্ব পালন করবে।
এবারও অনলাইনে মিলবে কোরবানির পশু
গত কয়েক বছর ধরেই অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির পশু। বিষয়টি ধীরে ধীরে বেশি জনপ্রিয়ও হয়ে উঠছে। এবারও অললাইনে বসবে পশুর হাট।
এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন উর রশিদ বলেন, গত কয়েক বছরের মতো এবারও কোরবানির সময় অনলাইনে পশু বিক্রি হবে। এ জন্য কোনো খাজনা বা হাসিল নেওয়া হবে না।
ইএইচটি/কেএসআর
What's Your Reaction?