সংকট কাটাতে নিজেদের মাটিতেই তেল-গ্যাস খুঁজছে ভারত

ইরান যুদ্ধের কারণে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকট কাটাতে ও আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে নিজ ভূখণ্ডে তেল ও গ্যাসের ব্যাপক অনুসন্ধান শুরু করেছে ভারত। দেশটির পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী হারদীপ সিং পুরী জানিয়েছেন, সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশীয় সরবরাহ বৃদ্ধির এই প্রক্রিয়াকে নতুন গতি দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় হরমুজ প্রণালিতে নিষেধাজ্ঞার কারণে বড় ধরণের বিঘ্নের সম্মুখীন হয়েছিল বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (LPG)-এর দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা ভারত। বর্তমানে যুদ্ধবিরতি ও বৈরিতা থামানোর জন্য একটি সাময়িক মার্কিন-ইরান চুক্তি কার্যকর থাকায় উপসাগরীয় জলপথ দিয়ে তেল ও গ্যাস চালান আবারও প্রবাহিত হচ্ছে এবং ভারতে জারি করা জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা ও মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরী সংবাদ সংস্থা এএফপি -কে বলেন, আমরা বর্তমানে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার বর্গ কিলোমিটার (৯৬ হাজার ৫০০ বর্গ মাইল) অনাবিষ্কৃত এলাকায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছি। উৎপাদন ও আমদানির পরিসংখ্যান ব

সংকট কাটাতে নিজেদের মাটিতেই তেল-গ্যাস খুঁজছে ভারত

ইরান যুদ্ধের কারণে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকট কাটাতে ও আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে নিজ ভূখণ্ডে তেল ও গ্যাসের ব্যাপক অনুসন্ধান শুরু করেছে ভারত। দেশটির পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী হারদীপ সিং পুরী জানিয়েছেন, সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশীয় সরবরাহ বৃদ্ধির এই প্রক্রিয়াকে নতুন গতি দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় হরমুজ প্রণালিতে নিষেধাজ্ঞার কারণে বড় ধরণের বিঘ্নের সম্মুখীন হয়েছিল বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (LPG)-এর দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা ভারত। বর্তমানে যুদ্ধবিরতি ও বৈরিতা থামানোর জন্য একটি সাময়িক মার্কিন-ইরান চুক্তি কার্যকর থাকায় উপসাগরীয় জলপথ দিয়ে তেল ও গ্যাস চালান আবারও প্রবাহিত হচ্ছে এবং ভারতে জারি করা জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা ও মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহার করা হচ্ছে।

মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরী সংবাদ সংস্থা এএফপি -কে বলেন, আমরা বর্তমানে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার বর্গ কিলোমিটার (৯৬ হাজার ৫০০ বর্গ মাইল) অনাবিষ্কৃত এলাকায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছি।

উৎপাদন ও আমদানির পরিসংখ্যান

বৈশ্বিক পরিমাপদণ্ডে ভারত একটি মাঝারি মানের তেল উৎপাদনকারী দেশ। তেল মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ভারতের অভ্যন্তরীণ অপরিশোধিত তেল উৎপাদন ছিল ২৫.৯৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন। এই উৎপাদন ভারতের অপরিশোধিত তেলের চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশ পূরণ করে, যা দৈনিক প্রায় ৫ লাখ ২২ হাজার ব্যারেলের সমান। এই উৎপাদন চিত্রটি ২০১১ সালের দৈনিক সর্বোচ্চ ৯ লাখ ব্যারেল উৎপাদনের চেয়ে অনেকটাই কম।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই তীব্র জ্বালানি সংকটের সময় ভারত তার অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী দেশের সংখ্যা ২৭ থেকে বাড়িয়ে ৪১-এ উন্নীত করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল। নতুন এই তালিকায় ইরান, ভেনেজুয়েলা, বেশ কয়েকটি আফ্রিকান দেশ ও রাশিয়ার কাছ থেকে বড় পরিমাণে তেল কেনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এদিকে, রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ উভয় পক্ষই এর আগে নয়াদিল্লির সমালোচনা করেছিল। সমালোচকদের যুক্তি ছিল- এটি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে মস্কোর যুদ্ধকে অর্থায়ন করছে।

তবে এই বিষয়ে পুরী বলেন, ভারতের একটি ‘বাস্তবধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি’ রয়েছে, যা যে কোনো ‘আদর্শগত বিবেচনার’ চেয়ে নিজেদের জ্বালানি চাহিদাকে ওপরে স্থান দেয়।

জ্বালানি সম্ভাবনা: আন্দামান ও নিকোবর

ভারতের অভ্যন্তরীণ অপরিশোধিত তেলের উৎপাদন মূলত দেশটির পশ্চিমাঞ্চল- যেমন মুম্বাই অফশোর ফিল্ড, রাজস্থান ও গুজরাট ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে কেন্দ্রীভূত। তবে থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া সীমান্তবর্তী পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল ও ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বীপের শৃঙ্খল আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ‘জ্বালানি সম্ভাবনার একটি মহাসমুদ্র’ দেখছেন বলে দাবি করেছেন মন্ত্রী পুরী। বিশাল আন্দামান অববাহিকাটি ভূতাত্ত্বিকভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার হাইড্রোকার্বন-সমৃদ্ধ অববাহিকাগুলোর মতোই।

পুরী গত জুনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ‘অয়েল ইন্ডিয়া’ কর্তৃক আন্দামান সাগরে খনন করা একটি অনুসন্ধানমূলক কূপের গ্যাস ফ্লেয়ারের ভিডিও পোস্ট করেছিলেন। ভিডিওটি প্রকাশের সময় তিনি বলেন, আমাদের হাইড্রোকার্বন রিজার্ভের সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে আমাদের সমুদ্র উপকূলে বিপুলসংখ্যক গভীর সমুদ্র ও অতি-গভীর সমুদ্র কূপ খননের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই কাজে নয়াদিল্লি পেট্রোব্রাস, টোটালএনার্জি, বিপি, শেল ও এক্সনমোবিল -এর মতো বিশ্বখ্যাত গভীর সমুদ্র অনুসন্ধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করছে।

একই আন্দামান সাগরে ভারত সরকার ৯ বিলিয়ন বা ৯০০ কোটি ডলারের ‘গ্রেট নিকোবর আইল্যান্ড প্রজেক্ট’ বা প্রকল্প প্রস্তুত করছে, যার অধীনে একটি মেগাপোর্ট বা বিশাল বন্দর, বিমানবন্দর ও শহর নির্মাণ করা হবে। এটি মূলত প্রাচীন বনে ঘেরা ও পৃথিবীর অন্যতম বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত একটি দূরবর্তী দ্বীপে ভারতের একটি কৌশলগত ঘাঁটি তৈরি করবে।

‘সমুদ্র মন্থন’ মিশন: ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

তেল আমদানির নির্ভরতা কমানোর এই প্রচেষ্টা অবশ্য মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের আগেই শুরু হয়েছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০২৫ সালের আগস্টে ভারতের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ‘সমুদ্র মন্থন’ মিশন চালু করেছিলেন। এই নামটি হিন্দু পুরাণের একটি কেন্দ্রীয় ঘটনা থেকে নেওয়া হয়েছে, যার অর্থ ‘মহাসমুদ্রের আলোড়ন বা মন্থন’।

মোদী সেসময় বলেছিলেন, আমরা সমুদ্রের তলদেশে তেলের মজুদ, গ্যাসের মজুদ খোঁজার লক্ষ্যে মিশন মোডে কাজ করতে চাই। এ কারণে ভারত ‘জাতীয় গভীর সমুদ্র অনুসন্ধান মিশন’ শুরু করতে যাচ্ছে।

তবে ১.৪ বিলিয়ন বা ১৪০ কোটি মানুষের দেশ ভারতের ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ চাহিদা এই নির্ভরতা কমানোর পথে বড় চ্যালেঞ্জ। ২০৭০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের সরকারি অঙ্গীকার সত্ত্বেও জ্বালানির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে ভারত নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পারমাণবিক শক্তি ও ইথানলের সঙ্গে পেট্রোলের মিশ্রণে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

মন্ত্রী পুরী বলেন, আজ ভারতের জ্বালানি ব্যবহার বিশ্বের বাকি অংশের তুলনায় তিন গুণ দ্রুত গতিতে বাড়ছে। এটি ২০২১ সালের দৈনিক ৫ মিলিয়ন বা ৫০ লাখ ব্যারেল থেকে লাফিয়ে বর্তমানে প্রায় ৫.৬ মিলিয়ন বা ৫০ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে। শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির ওপর ভর করে এই সংখ্যা শিগগির দৈনিক ৬ মিলিয়ন বা ৬০ লাখ ব্যারেল স্পর্শ করবে।

ভবিষ্যত নিয়ে তিনি ‘ব্যতিক্রমীভাবে আশাবাদী’ উল্লেখ করে বলেন, আমি এটা জেনে আনন্দিত যে আমাদের অনুসন্ধান ও উৎপাদন (ই অ্যান্ড পি) বাড়ছে এবং বিশ্বাস করুন, এটি খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হলেও তার আশা অনেক উঁচুতে।

তিনি যোগ করেন, আমরা তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে একটি বড় উপায়ে- ১০ বিলিয়ন বা ১ হাজার কোটি ডলারের প্রোগ্রামের মাধ্যমে আর্থিক সংস্থান বা রাজস্ব দিচ্ছি। এর মাধ্যমে আমরা ১০ লাখ কিলোমিটারের অনাবিষ্কৃত এলাকায় প্রবেশ করছি।

সূত্র: এএফপি

এসএএইচ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow