সনতনী পেশাতেই আটকে আছে নৃ-গোষ্ঠীরা
শেরপুরের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জনপদে বসবাসকারী নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের জীবন যেন আটকে আছে পুরোনো বাস্তবতায়। এই অঞ্চলের নৃ-গোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখনও কৃষিকাজ, মাছ শিকার, ধানের চারা রোপণ- ধান কাটা কিংবা লাকড়ি সংগ্রহের মতো সনাতনী পেশার ওপর নির্ভরশীল। কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত, দারিদ্র্য প্রকট; এর সঙ্গে দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা ও শিক্ষার সুযোগের সংকটে অনেক শিশুকেই অল্প বয়সে কাজে নামতে হচ্ছে। ফলে সময়ের সঙ্গে দেশের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা এগোলেও পিছিয়েই রয়ে গেছে সীমান্তের এই জনগোষ্ঠী। জানা গেছে, জেলার সীমান্তবর্তী শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলায় সাতটি সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। এর মধ্যে গারো, কোচ, হাজং, বানাই, ডালু, বর্মণ ও হদি সম্প্রদায়ের লোকজন রয়েছেন। আরও পড়ুন ৪ জনের লড়াইয়ে টিকে আছে রাজবাড়ীর সরকারি মুরগি খামার বেসরকারি সংস্থা আইইডির আদিবাসী সক্ষমতা উন্নয়ন প্রকল্পের পরিসংখ্যানে জেলায় গারো সাড়ে ১৬ হাজার, হাজং ৪ হাজার ৭০০, হদি ১০ হাজার ৬০০, বর্মণ ১৭ হাজার, কোচ সাড়ে ৩ হাজার, ডালু ১১০০, বানাই ১১০ জন বসবাস করছেন। ‘প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া শিক্ষাবৃত্তি, বাই সাইকেল ও সেলাইমেশিন উপহার দেওয়া হচ্ছে
শেরপুরের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জনপদে বসবাসকারী নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের জীবন যেন আটকে আছে পুরোনো বাস্তবতায়। এই অঞ্চলের নৃ-গোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখনও কৃষিকাজ, মাছ শিকার, ধানের চারা রোপণ- ধান কাটা কিংবা লাকড়ি সংগ্রহের মতো সনাতনী পেশার ওপর নির্ভরশীল। কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত, দারিদ্র্য প্রকট; এর সঙ্গে দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা ও শিক্ষার সুযোগের সংকটে অনেক শিশুকেই অল্প বয়সে কাজে নামতে হচ্ছে। ফলে সময়ের সঙ্গে দেশের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা এগোলেও পিছিয়েই রয়ে গেছে সীমান্তের এই জনগোষ্ঠী।
জানা গেছে, জেলার সীমান্তবর্তী শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলায় সাতটি সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। এর মধ্যে গারো, কোচ, হাজং, বানাই, ডালু, বর্মণ ও হদি সম্প্রদায়ের লোকজন রয়েছেন।
বেসরকারি সংস্থা আইইডির আদিবাসী সক্ষমতা উন্নয়ন প্রকল্পের পরিসংখ্যানে জেলায় গারো সাড়ে ১৬ হাজার, হাজং ৪ হাজার ৭০০, হদি ১০ হাজার ৬০০, বর্মণ ১৭ হাজার, কোচ সাড়ে ৩ হাজার, ডালু ১১০০, বানাই ১১০ জন বসবাস করছেন।
‘প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া শিক্ষাবৃত্তি, বাই সাইকেল ও সেলাইমেশিন উপহার দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের জীবনমান উন্নয়নে সব ধরনের সরকারি সহযোগিতা করা হবে।’
স্থানীয় নৃ-গোষ্ঠীর লোকজন বলছেন, পাহাড়ি জনপদে বসবাস করা বেশিরভাগ নৃ-গোষ্ঠীর লোকজন তাদের সনাতন পেশা কৃষি কাজ, মাছ শিকার, ধানের চারা রোপণ ও ধান কাটা, লাকড়ি কেটে বিক্রি করে দিন পার করেন। এখনো তাদের জীবনমানের উন্নয়ন তেমন হয়নি। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও চাকরি থেকে বঞ্চিত তারা।
নিজ বাড়িতে গরু পালন করে নৃ-গোষ্ঠীর সদস্যরা/ ছবি: জাগো নিউজ
ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের ছোট গজনির গীর্জাঘর এলাকার বাসিন্দা ডিবিশন সাংমা বলেন, আমাদের কর্মসংস্থানের ব্যপক অভাব। বাচ্চাদের পড়াশোনা করানোর মতো টাকা আয় হয় না, তাই কোনোমতে প্রাইমারি পড়িয়ে কাজে পাঠানো হয়। বিশেষ করে ছেলে বাচ্চারা ভ্যান গাড়ি, অটো রিকশা চালায় আর মেয়ে বাচ্চাদের পার্লারে পাঠানো হয়। যদি সরকারি পূর্ণ সহযোগিতা পেতাম তাহলে পড়াশোনা করিয়ে সন্তানদের যোগ্য করে তুলতাম।
স্থানীয় কোচ আদিবাসী নেতা মিথুন কোচ বলেন, সমাজে বাস করা একটা বৃহৎ জনগোষ্ঠী এখনও আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। মানসম্মত কর্মসংস্থানের অভাবে বেকার বেশিরভাগ লোকজন। যারা কাজ করে তারাও সনাতনী কাজের মধ্যেই আটকে আছে। তাই সরকারের কাছে দাবি, গারো পাহাড়ি এলাকায় বাস করা আদিবাসীদের স্বীকৃতি দিয়ে তাদেরকে আধুনিক কর্মমুখী করে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে তারাও দেশ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখবে।
‘আদিবাসী দিবসে আমরা সরকারের কাছে আদিবাসীর স্বীকৃতি ও নিজস্ব ভূমি কমিশন চাই। এ অঞ্চলের আদিবাসীরা বেশিরভাগ বেকার, বেকারত্ব দূরীকরণে সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা পেলে অন্যান্য সমাজের মানুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে আমরাও সমান ভূমিকা রাখতে পারবো।’
স্থানীয় স্কুল শিক্ষক ও সমাজসেবক নিধিরঞ্জন কোচ বলেন, এখানে ভালো রাস্তাঘাট নেই, কাঁচা সড়কেই পথ চলতে হয়। এতে ভোগান্তি আরও বেড়ে যায় বর্ষায়। সেতু না থাকায় শিক্ষার্থীরা পাহাড়ি কালাঘোঁষা নদী, স্বোমেশরী নদীতে ভিজে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করে। তাছাড়া আমাদের এই জনপদে দারিদ্র্যের হার ভয়াবহ, যার কারণে বাচ্চারা একটু বড় হলেই কাজের সন্ধানে বেরিয়ে যায়। আর পড়ালেখা হয়ে ওঠে না।
স্কুল শিক্ষিকা শিউলী ম্রং বলেন, এক সময় সমৃদ্ধ ভাষা ও সংস্কৃতি থাকলেও, কালের বিবর্তনে ও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে নিজেদের চর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ভুলতে বসেছে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। তাই সরকারের কাছে দাবি, আমাদের এ অঞ্চলে একটি কালচারাল একাডেমি চাই।
স্থানীয় শিক্ষক ও আদিবাসী নেতা বিহার জাম্বল বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এখানে নৃ-গোষ্ঠীদের জীবনমান উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেনি। নানান প্রতিকূলতায় আমরা পিছিয়ে আছি। সরকারের সহযোগিতা এখানকার সবার মধ্যে পৌঁছায় না। অনেকেই সরকারি সহযোগিতার খোঁজও পায় না।
তিনি আরও বলেন, কিছু এনজিও কাজ করলেও বিগত কয়েকবছর ধরে কার্যক্রম বন্ধ বেশিরভাগ এনজিওগুলো। এখানে আদিবাসীদের পড়াশোনার হার খুবই কম, এর কারণ দারিদ্র্যতা, যাতায়াতের ব্যবস্থা খারাপ, দিকনির্দেশনার অভাব। তাই সরকারের সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন।
‘বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এখানে নৃ-গোষ্ঠীদের জীবনমান উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেনি। নানান প্রতিকূলতায় আমরা পিছিয়ে আছি। সরকারের সহযোগিতা এখানকার সবার মধ্যে পৌঁছায় না। অনেকেই সরকারি সহযোগিতার খোঁজও পায় না।’
শ্রীবরদী উপজেলার ট্রাইব্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহ-সভাপতি মনিংটন মারাক জাগো নিউজকে বলেন, আদিবাসী দিবসে আমরা সরকারের কাছে আদিবাসীর স্বীকৃতি ও নিজস্ব ভূমি কমিশন চাই। এ অঞ্চলের আদিবাসীরা বেশিরভাগ বেকার, বেকারত্ব দূরীকরণে সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা পেলে অন্যান্য সমাজের মানুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে আমরাও সমান ভূমিকা রাখতে পারবো।
জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া শিক্ষাবৃত্তি, বাই সাইকেল ও সেলাইমেশিন উপহার দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের জীবনমান উন্নয়নে সব ধরনের সরকারি সহযোগিতা করা হবে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল বলেন, আমার শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতীতে বিপুলসংখ্যক নৃ-গোষ্ঠীর লোকজন বাস করেন। তাদের জীবনমান উন্নয়নের ব্যপারে আমার নানাবিধ পরিকল্পনা রয়েছে।

সাইকেলের ঘণ্টায় জেগে ওঠা এক গ্রাম
তিনি আরও বলেন, এখানে থাকা শিশুদের শতভাগ শিক্ষা নিশ্চিতকরণ ও বাল্যবিয়ের ব্যপারে জিরো টলারেন্স নীতি থাকবে। রাস্তাঘাটগুলোর অবস্থা তেমন ভালো নেই, এসব রাস্তাঘাটের উন্নয়নসহ যাবতীয় কাজ করা হবে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এসব ব্যপারে কথাবার্তা চলছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোফাজ্জল হোসেন খাঁন জাগো নিউজকে বলেন, নৃ-গোষ্ঠীদের নিজস্ব ভাষা রক্ষায় সরকার নিজস্ব ভাষার পাঠ্যবই করেছে। তবে কিছু কিছু বিদ্যালয়ে ভাষা শিক্ষার জন্য শিক্ষক সংকট রয়েছে। শিক্ষকদের চাহিদাপত্র সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দেওয়া আছে।
এনএইচআর/এএসএম
What's Your Reaction?

