সানলাইফে ‘কাগুজে’ সম্পদের পাহাড়, গ্রিন ডেল্টার ৮৫০ কোটি টাকা উধাও
সম্পদ দেখানো হয়েছে ৪৬১ কোটি টাকার বেশি, অথচ এর বড় একটি অংশ বাস্তবে নগদায়নযোগ্য নয়। বিপরীতে গ্রাহকের পাওনা ৩০৯ কোটি টাকার বেশি। সব দায় পরিশোধের মতো লাইফ ফান্ডে নগদ অর্থও নেই। এমন আর্থিক অবস্থায় ২০২৩ সালে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৪৩ দশমিক ১২ শতাংশ মালিকানা কিনে নেয় গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ও এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলো। এই মালিকানা অধিগ্রহণে গ্রিন ডেল্টার প্রায় শত কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। একই সঙ্গে ২০০৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদন, বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও অন্য নথি পর্যালোচনায় কারসাজি ও হিসাবের গোঁজামিলের মাধ্যমে কোম্পানিটির তহবিল থেকে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ১ কোটি ৫৪ লাখ ১৯ হাজার ৩০৫টি শেয়ার কিনে নেয় গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স। এসব শেয়ার ছিল কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৪৩ দশমিক ১২ শতাংশ। প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ৫০ টাকা হিসাবে এ শেয়ার কেনায় মোট মূল্য দাঁড়ায় ৭৭ কোটি ৯ লাখ ৬৫ হাজার ২৫০ টাকা। আরও পড়ুন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ হারানোর শীর্ষে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স এছাড়া গ্রি
সম্পদ দেখানো হয়েছে ৪৬১ কোটি টাকার বেশি, অথচ এর বড় একটি অংশ বাস্তবে নগদায়নযোগ্য নয়। বিপরীতে গ্রাহকের পাওনা ৩০৯ কোটি টাকার বেশি। সব দায় পরিশোধের মতো লাইফ ফান্ডে নগদ অর্থও নেই।
এমন আর্থিক অবস্থায় ২০২৩ সালে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৪৩ দশমিক ১২ শতাংশ মালিকানা কিনে নেয় গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ও এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলো।
এই মালিকানা অধিগ্রহণে গ্রিন ডেল্টার প্রায় শত কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। একই সঙ্গে ২০০৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদন, বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও অন্য নথি পর্যালোচনায় কারসাজি ও হিসাবের গোঁজামিলের মাধ্যমে কোম্পানিটির তহবিল থেকে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ১ কোটি ৫৪ লাখ ১৯ হাজার ৩০৫টি শেয়ার কিনে নেয় গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স। এসব শেয়ার ছিল কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৪৩ দশমিক ১২ শতাংশ। প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ৫০ টাকা হিসাবে এ শেয়ার কেনায় মোট মূল্য দাঁড়ায় ৭৭ কোটি ৯ লাখ ৬৫ হাজার ২৫০ টাকা।
এছাড়া গ্রিন ডেল্টার পাঁচটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সানলাইফের আরও ৩৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়। এর মধ্যে গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ১০ শতাংশ, গ্রিন ডেল্টা ক্যাপিটাল লিমিটেড ৮ শতাংশ, জিডি অ্যাসিস্ট লিমিটেড ৬ শতাংশ, গ্রিন ডেল্টা সিকিউরিটিজ লিমিটেড ৬ শতাংশ এবং প্রফেশনাল অ্যাডভান্সমেন্ট বাংলাদেশ লিমিটেড ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ শেয়ার নেয়।
অবশিষ্ট ৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ শেয়ার কেনেন ফারজানা চৌধুরীসহ গ্রিন ডেল্টা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৮ কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে ফারজানা চৌধুরী ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ, সৈয়দ মইনুদ্দিন আহমেদ ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ, মো. রফিকুল ইসলাম ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ, রুবাইয়াত আহমেদ শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ, মো. তানভীর ইয়াজদানি শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ, বেল্লাল হোসেন পাটোয়ারি শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ, সুভাসিস বড়ুয়া শূন্য দশমিক শূন্য ২ শতাংশ এবং সৈয়দ আলিয়ুল আহবাব শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ শেয়ার নেন।
৪৬১ কোটি টাকার সম্পদ, কিন্তু নগদায়নযোগ্য নয়
সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার কেনার সময় কোম্পানিটির সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছিল ৪৬১ কোটি ১ লাখ ৩১ হাজার ৫৬৩ টাকা। এর মধ্যে বকেয়া ও ল্যাপস পলিসির প্রিমিয়াম হিসেবে দেখানো হয় ৩৩৮ কোটি ৪ লাখ ১১ হাজার ৯৯২ টাকা।
এছাড়া বিটিএ টাওয়ারে কেনা ফ্লোরের পুনর্মূল্যায়ন বাবদ ১৩ কোটি ৫৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫২০ টাকা, সরকারি খাতে আয়কর বাবদ অগ্রিম প্রদান ৬ কোটি ৬০ লাখ ১ হাজার ৬৯৭ টাকা এবং পিপলস লিজিংয়ে ১ কোটি টাকা সম্পদ হিসেবে দেখানো হয়।
তবে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব সম্পদের বড় অংশই বাস্তবে নগদায়নযোগ্য নয়।
বকেয়া প্রিমিয়ামের ৩৩৮ কোটি টাকার বেশি আদায়ের সুযোগ নেই বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্তে উঠে এসেছে। কারণ, এসব প্রিমিয়ামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পলিসিই এরই মধ্যে ল্যাপস (মেয়াদ শেষ) হয়ে গেছে।
বিটিএ টাওয়ারের ফ্লোরটি ৯ কোটি ১৬ লাখ ১১ হাজার ৯৩৬ টাকা দিয়ে কেনা হয়েছিল। প্রতিবছর অবচয় দেখানোর কারণে ২০২৩ সালে এসে ওই ফ্লোরের হিসাবি মূল্য শূন্য হয়ে যায়। এরপরও পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে সেটির মূল্য ১৩ কোটি ৫৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫২০ টাকা দেখানো হয়েছে। ফলে এই অর্থও বাস্তবে আদায় বা নগদায়নের সুযোগ নেই।
আয়কর বাবদ দেখানো ৬ কোটি ৬০ লাখ ১ হাজার ৬৯৭ টাকা ইতোমধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে। ফলে এ অর্থও ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই। একইভাবে পিপলস লিজিংয়ে থাকা ১ কোটি টাকাও আদায় হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সব মিলিয়ে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০১ কোটি ৮২ লাখ ২০ হাজার ৩৫৪ টাকা।
দায় ৩৭০ কোটি, গ্রাহকের পাওনা ৩০৯ কোটি টাকা
কোম্পানিটির মোট দায়ের পরিমাণ ৩৬৯ কোটি ৯৯ লাখ ৮৫ হাজার ৮৮৮ টাকা। এর মধ্যে গ্রাহকের পাওনা ৩০৯ কোটি ৩৭ লাখ ১৯ হাজার ৯৭৯ টাকা।
এছাড়া সরকারি ভ্যাট ও ট্যাক্স বাবদ পাওনা ৩১ কোটি ৬৪ লাখ ৩৪ হাজার ৭৩৮ টাকা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাওনা ৫ কোটি ৩২ লাখ ৬৯ হাজার ৭৭৯ টাকা, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের পাওনা ১ কোটি ৭৪ লাখ ২৫ হাজার ৩৩২ টাকা এবং অফিস ভাড়া বাবদ বকেয়া ২ কোটি ৬০ লাখ ১৭ হাজার ৫৪১ টাকা। প্রকৃত সম্পদ ও মোট দায়ের ব্যবধান হিসাবে কোম্পানিটির ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২৫৮ কোটি ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৩৪ টাকা।
গ্রাহকের পাওনা পরিশোধে চুক্তি লঙ্ঘন
সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, মালিকানা হস্তান্তরের আগে ইস্যু করা সব বিমা পলিসির দায়ভার বর্তমান কোম্পানির ওপর বর্তায়। এসব বকেয়া বিমা দাবি নিষ্পত্তিতে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ আইনত বাধ্য এমন শর্তও রয়েছে চুক্তিতে।

বিমা খাতের দাপটে ঘুরে দাঁড়ালো শেয়ারবাজার
তবে অভিযোগ রয়েছে, সানলাইফের গ্রাহকদের বকেয়া বিমা দাবি নিষ্পত্তিতে গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স তথা সানলাইফের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না। এমনকি মালিকানা হস্তান্তরের পরও সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের ওয়েবসাইটে নতুন পরিচালকদের তথ্য হালনাগাদ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ কারণে মালিকানা পরিবর্তনের পরও কোম্পানিটির তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে গ্রাহকরা একাধিক মামলা করেছেন।
চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের সিইও ফারজানা চৌধুরীসহ সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের লিগ্যাল নোটিশও দেওয়া হয়েছিল। কোম্পানিটির তৎকালীন চেয়ারপারসন অধ্যাপক রুবিনা হামিদের নেতৃত্বাধীন পর্ষদ ২০২৪ সালের ১০ মার্চ এ নোটিশ পাঠায়।
গ্রিন ডেল্টার তহবিল থেকে উধাও ৮৫০ কোটি টাকা
সানলাইফের মালিকানা অধিগ্রহণের পাশাপাশি গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোম্পানিটির ২০০৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আর্থিক প্রতিবেদন, বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং অন্য নথিপত্র যাচাই করে কারসাজি ও হিসাবের গোঁজামিলের মাধ্যমে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা তহবিল থেকে সরিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে কারসাজির মাধ্যমে ইক্যুইটি বৃদ্ধির হিসাব দেখিয়ে তহবিল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ৩৬৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। ইক্যুইটি বৃদ্ধির এই হিসাব দেখাতে পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে সম্পদের মূল্য বাড়ানো হয় ১৪৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এসব সম্পদ বিক্রি হওয়ার আগেই পুনর্মূল্যায়ন রিজার্ভ থেকে ৫৪ কোটি টাকা ডিভিডেন্ড হিসেবে তুলে নেওয়া হয়।
এছাড়া বেআইনিভাবে অন্যান্য খাতে অগ্রিম বাবদ পরিশোধ দেখানো হয়েছে ২২৫ কোটি টাকা। অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে ১৭১ কোটি টাকা। মুনাফা থাকার পরও ব্যাংক থেকে ২৬৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। হিসাবের গোঁজামিলের মাধ্যমে ইক্যুইটি ৫৪ কোটি টাকা এবং ক্যাশ-ফ্লো ১৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা কম দেখানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে গ্রাহকের জমা দেওয়া প্রিমিয়াম, ভ্যাট ও ট্যাক্সের অর্থ গোপন করা, অবৈধ ব্যয়, অতিরিক্ত কমিশন প্রদান, বাকি ব্যবসা, প্রিমিয়াম হার লঙ্ঘন ও পুনর্বিমা না করে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এছাড়া কোম্পানির মুখ্য নির্বাহীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে প্রভাব খাটিয়ে বিশেষ নিরীক্ষকের কার্যক্রম স্থগিত করে দেওয়া এবং বিশেষ নিরীক্ষক ও তদন্ত দলকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ না করার কারণে গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসির অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ চিত্র আড়ালেই থেকে গেছে।
এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে জাগো নিউজের পক্ষ থেকে গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফারজানা চৌধুরীর মোবাইলে যোগাযোগ করা হয়। তবে তিনি মোবাইল ফোন রিসিভ করেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর তাকে আবার ফোন দেওয়া হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এরপর কোম্পানিটির সচিব মো. ওলিউল্লাহ খানের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জাগো নিউজের প্রতিবেদকের পরিচয় পেয়েই মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর তাকে আবার ফোন দেওয়া হলেও আর কোনো সাড়া দেননি।
সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও পিপলু বিশ্বাসের মন্তব্য নিতেও জাগো নিউজের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনিও কোনো সাড়া দেননি।
এমএএস/এএসএ
What's Your Reaction?


