সাপ অবমুক্ত-চিকিৎসা করাই মনির হোসেনের কাজ

‘সাপ’ নামটি শুনলেই সবার মধ্যে আতংকের কাজ করে। আর কোথাও দেখা মিললে তো কথাই নেই। হত্যা না করা পর্যন্ত যেন স্বস্তি আসে না। মূলত মানুষের কাছে সাপ হচ্ছে ভয় আর আতংকের নাম। অথচ সাপকে রক্ষা করার জন্য জীবনকে তুচ্ছ করে কাজ করে যাচ্ছেন মনির হোসেন। গত দুই বছরে তিনি ৮৬টি সাপ অবমুক্ত ও পাঁচটি সাপকে চিকিৎসা দিয়েছেন। বর্তমানে তার অধীনে দুটি সাপ চিকিৎসাধীন। সুস্থ হলেই মাদারীপুর বন বিভাগের সহযোগিতায় তা অবমুক্ত করা হবে। কুড়িগ্রামের রৌমারি উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়নের ধনারচর পূর্বপাড়া এলাকার আব্দুল জলিল ও ফুলমতি বেগমের ছেলে মনির হোসেন (২৮)। ছয় ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি সপ্তম। বর্তমানে মাদারীপুর শহরের ২ নম্বর শকুনি এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। পড়াশোনার জন্য ২০১৭ সাল থেকে মাদারীপুর আছেন। মাদারীপুর সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক (সম্মান) ও গতবছর পদার্থ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। আলাপকালে জানা যায়, মনির হোসেন প্রথমে পঞ্চগড় থেকে এবং পরে বরিশাল বন বিভাগ থেকে সাপ বিষয়ে বিশেষ ট্রেনিং নেন। এর পাশাপাশি ওয়াইল্ড লাইফ অ্যান্ড স্নেক রেসকিউ টিম ইন বাংলাদেশ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমেও ট্রেনিং নেন তিনি। পরে সংগঠনের

সাপ অবমুক্ত-চিকিৎসা করাই মনির হোসেনের কাজ

‘সাপ’ নামটি শুনলেই সবার মধ্যে আতংকের কাজ করে। আর কোথাও দেখা মিললে তো কথাই নেই। হত্যা না করা পর্যন্ত যেন স্বস্তি আসে না। মূলত মানুষের কাছে সাপ হচ্ছে ভয় আর আতংকের নাম। অথচ সাপকে রক্ষা করার জন্য জীবনকে তুচ্ছ করে কাজ করে যাচ্ছেন মনির হোসেন।

গত দুই বছরে তিনি ৮৬টি সাপ অবমুক্ত ও পাঁচটি সাপকে চিকিৎসা দিয়েছেন। বর্তমানে তার অধীনে দুটি সাপ চিকিৎসাধীন। সুস্থ হলেই মাদারীপুর বন বিভাগের সহযোগিতায় তা অবমুক্ত করা হবে।

কুড়িগ্রামের রৌমারি উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়নের ধনারচর পূর্বপাড়া এলাকার আব্দুল জলিল ও ফুলমতি বেগমের ছেলে মনির হোসেন (২৮)। ছয় ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি সপ্তম। বর্তমানে মাদারীপুর শহরের ২ নম্বর শকুনি এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। পড়াশোনার জন্য ২০১৭ সাল থেকে মাদারীপুর আছেন। মাদারীপুর সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক (সম্মান) ও গতবছর পদার্থ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন।

আলাপকালে জানা যায়, মনির হোসেন প্রথমে পঞ্চগড় থেকে এবং পরে বরিশাল বন বিভাগ থেকে সাপ বিষয়ে বিশেষ ট্রেনিং নেন। এর পাশাপাশি ওয়াইল্ড লাইফ অ্যান্ড স্নেক রেসকিউ টিম ইন বাংলাদেশ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমেও ট্রেনিং নেন তিনি। পরে সংগঠনের সদস্য হিসেবে সাপ রক্ষার জন্য যাত্রা শুরু করেন মনির হোসেন।

গত দুই বছর ধরে নীরবে অনেকটাই প্রচারবিমুখ মনির সাপ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন। রাত নেই, দিন নেই, ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সাপ দেখার ফোন পেলেই সেখানে ছুটে যান। সাপকে সুস্থভাবে উদ্ধার করে বন বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী অবমুক্ত করেন। আর যদি কোনো সাপকে পিটিয়ে আহত করা হয়, তাহলে বন বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। পরে সুস্থ হলে অবমুক্ত করা হয়।

সাপ অবমুক্ত-চিকিৎসা করাই মনির হোসেনের কাজ

মাদারীপুর, শরীয়তপুর, চাঁদপুর, গোপালগঞ্জ, খুলনা, ফরিদপুর, মুন্সিগঞ্জ, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী ও কুড়িগ্রাম থেকে দুই বছরে খৈয়া গোখরা, বেত আচড়া, দাঁড়াশ, কাল নাগিনীসহ নানাজাতের ৮৬টি সাপ অবমুক্ত করেছেন মনির হোসেন।

আরও পড়ুন:
ঘুম থেকে উঠে দেখেন বুকের ওপর বসে আছে ৮ ফুটের অজগর
মাদারীপুরে বেড়েছে সাপে কাটা রোগী, সবচেয়ে বেশি শিবচরে
হন্যে হয়ে ঘুরেও পাওয়া গেল না এন্টিভেনম, সাপের কামড়ে শিশুর মৃত্যু
জারুল গাছের মগডালে ৮ ফুট লম্বা অজগর

একবার খোঁজ পান, কুমিগ্রামের রৌমারিতে একজন সাপুড়ের কাছে একটি অজগর অসুস্থ অবস্থায় রয়েছে। পরে চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করে সাপটি অবমুক্ত করেন।

বর্তমানে মাদারীপুর সদর উপজেলার পাচখোলা ইউনিয়নের জাজিরা এলাকা ও শহরের শকুনি লেকের দক্ষিণ পাড় এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া দুটি দাঁড়াশ সাপকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

এ পর্যন্ত পাঁচটি সাপকে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন মনির হোসেন। আহত সাপ দুটিকে স্থানীয়রা পিটিয়ে জখম করেছেন। সাপ দুটির ক্ষত স্থান পরিষ্কার করে নিয়মিত মলম দিচ্ছেন এই সাপপ্রেমী। সাপ দুটিকে আলাদা দুটি প্লাস্টিকের বক্সে রাখা হয়েছে। সুস্থ হলেই মাদারীপুর বন বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী লোকালয়হীন কোনো জায়গায় অবমুক্ত করা হবে।

গত এক সপ্তাহে মাদারীপুর সদর উপজেলার পাচখোলা ইউনিয়নের জাজিরা এলাকা থেকে একটি বড় দাঁড়াশ সাপ, শহরের শকুনি লেকের দক্ষিণ পাড় এলাকা থেকে একটি দাঁড়াশ সাপ এবং সবশেষ শরীয়তপুর জেলার জাজিরা থেকে একটি কালনাগিনী সাপ উদ্ধার করেছেন এই যুবক। এদের মধ্যে দুটির চিকিৎসা চলছে। একটি অবমুক্ত করা হয়েছে।

মনির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাপ মানুষের ক্ষতি করে না। বাংলাদেশের বেশিরভাগ সাপের বিষ নেই। এটি আমাদের সমাজে একটি অবহেলিত প্রাণী। সাপকে ঘিরে রয়েছে নানা কুসংস্কার।’

সাপের উপকারিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একটি দাঁড়াশ সাপ বছরে কৃষকের এক লাখ টাকার ফসলকে ইঁদুরের হাত থেকে রক্ষা করে। তবে শুধু ভয় আর আতংকের জন্য উপকার করা এই প্রাণীকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। তাই আমি এ ব্যাপারে মানুষজনের মধ্যে সচেতনতা বাড়তে কাজ করছি।’

সাপ অবমুক্ত-চিকিৎসা করাই মনির হোসেনের কাজ

মনির হোসেন বলেন, ‘বাসাবাড়ি বা লোকালয়ে সাপের সন্ধান পেলে তা উদ্ধার করে বন বিভাগের মাধ্যমে অবমুক্ত করা হয়। আমি চাই সমাজের প্রতিটি মানুষের মধ্যে থেকে সাপের আতংক দূর হোক। মানুষের মধ্যে সাপ নিয়ে নানা কুসংস্কার রয়েছে, সেগুলোও দূর হোক। সবাই জানুক ও বুঝুক সাপ মারলে নয়, বরং সাপ বাঁচালেই প্রকৃতির উপকার হয়।’

আরও পড়ুন:
কামড়ের পর জীবিত রাসেল ভাইপার নিয়ে হাসপাতালে কৃষক
সাপকে বাঁচাতে দুই ঘণ্টার অস্ত্রোপচার-৮০টি সেলাই
বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ৭ সবুজ সাপ

মাদারীপুর পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের কম্পিউটার শিক্ষক রাহাত তালুকদার সোহান বলেন, ‘মনির আমার বন্ধু। ও দীর্ঘদিন ধরে সাপ নিয়ে কাজ করছে। কোনো ফোন পেলেই মনির সেখানে ছুটে যায়। গিয়ে সাপ উদ্ধার করে অবমুক্ত করে। কোনো সাপ অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। অনেক সময় আমি নিজেও ওর সঙ্গে থেকে অভিযানে সহযোগিতা করি।’

স্থানীয় কামাল হোসেন বলেন, ‘কয়েকদিন আগে শকুনি লেকপাড়ের একটি বাসা থেকে মনিরকে সাপ উদ্ধার করতে দেখেছি। কি ভয়ংকর ব্যাপার! সাপ শুনলেই তো ভয়ে গায়ে কাঁটা দেয়। সেখানে মনির সাপ ধরে তা অবমুক্ত এমনকী চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। নিজ চোখে না দেখলে তা বিশ্বাসই করতাম না।’

শহরের শকুনি এলাকার বাসিন্দা তাহমিনা বেগম। তিনি বলেন, ‘সাপ একটি ভয়ের বিষয়। নাম শুনলেই ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে। তাছাড়া দাঁড়াশ বা জাতি সাপ খুব ভয়ংকর। ওকে ব্যথা দিলে সাত সমুদ্র পার হয়ে এসেও কামড় দেবে—এমন কথা আমরা দাদা-দাদির কাছ থেকে শুনে আসছি। অথচ মনির সেই সাপের চিকিৎসা করছেন।’

মনির হোসেনের বিষয়ে মাদারীপুর বন বিভাগের বন বিষয়ক কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘তিনি দীর্ঘদিন ধরে সাপ উদ্ধার করে অবমুক্ত করছেন। শুধু তাই নয়, আহত সাপকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন। তবে আমরা বন বিভাগ থেকে ওষুধের ব্যবস্থা করি। আমাদের কাছেও কেউ ফোন করে সাপের সংবাদ জানালে, আমরা মনির হোসেনকে ফোন করি। এরপর তিনি সেখানে গিয়ে সাপ উদ্ধার করেন। পরে তা সঠিক জায়গায় অবমুক্ত করা হয়।’

তিনি বলেন, ‘আসলে সাপ প্রকৃতির বন্ধু কিন্তু অনেকেই ভয় পেয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলেন, যা ঠিক নয়। মনির এই ব্যাপারে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাই তিনি দক্ষতার সঙ্গে কাজগুলো করে থাকেন।’

এসআর/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow