সাপ লাজুক প্রাণী: হত্যা করলে ৭ বছরের জেল-১০ লাখ টাকা জরিমানা

অভিলাষ মাহমুদ বাংলাদেশে বর্ষা এলে প্রকৃতি যেমন নতুন রূপ পায়, তেমনি গ্রামীণ ও শহরতলির মানুষের মনে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন আতঙ্কও ভর করে। এই আতঙ্কের নাম সাপ। বর্ষা ও শরৎকালে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাপ দেখা যাওয়ার খবর নাটকীয়ভাবে বাড়তে থাকে। আর এর সঙ্গে সঙ্গেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নানা ভিডিও, মনগড়া গুজব ও অন্ধ আতঙ্ক। কোথাও সাপ দেখামাত্র পিটিয়ে মারার হিড়িক পড়ে, আবার কোথাও সম্পূর্ণ বিষহীন ও নিরীহ সাপকেও বিষধর ভেবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। অথচ রূঢ় বাস্তবতা হলো, মানুষের তুলনায় সাপই মানুষের কাছ থেকে শতগুণ বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে। চিরন্তন ভয়, প্রাচীন কুসংস্কার এবং সঠিক তথ্যের অভাবের কারণে প্রতিবছর এ দেশে অসংখ্য নিরীহ প্রাণী প্রাণ হারাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নানা ভিডিও, মনগড়া গুজব ও অন্ধ আতঙ্ক বন্যপ্রাণী বিজ্ঞানী ও সরীসৃপ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে পাওয়া অধিকাংশ সাপই মানুষের জন্য প্রাণঘাতী নয়। দেশে প্রায় একশরও বেশি প্রজাতির সাপের উপস্থিতি রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র গুটিকয়েক প্রজাতির সাপ মারাত্মক বিষধর। বাকি অধিকাংশ সাপই সম্পূর্ণ নির্বিষ কিংবা এমন মৃদু বিষযুক্ত, যা মানুষের কোনো

সাপ লাজুক প্রাণী: হত্যা করলে ৭ বছরের জেল-১০ লাখ টাকা জরিমানা

অভিলাষ মাহমুদ

বাংলাদেশে বর্ষা এলে প্রকৃতি যেমন নতুন রূপ পায়, তেমনি গ্রামীণ ও শহরতলির মানুষের মনে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন আতঙ্কও ভর করে। এই আতঙ্কের নাম সাপ। বর্ষা ও শরৎকালে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাপ দেখা যাওয়ার খবর নাটকীয়ভাবে বাড়তে থাকে। আর এর সঙ্গে সঙ্গেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নানা ভিডিও, মনগড়া গুজব ও অন্ধ আতঙ্ক।

কোথাও সাপ দেখামাত্র পিটিয়ে মারার হিড়িক পড়ে, আবার কোথাও সম্পূর্ণ বিষহীন ও নিরীহ সাপকেও বিষধর ভেবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। অথচ রূঢ় বাস্তবতা হলো, মানুষের তুলনায় সাপই মানুষের কাছ থেকে শতগুণ বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে। চিরন্তন ভয়, প্রাচীন কুসংস্কার এবং সঠিক তথ্যের অভাবের কারণে প্রতিবছর এ দেশে অসংখ্য নিরীহ প্রাণী প্রাণ হারাচ্ছে।

jagonewsসামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নানা ভিডিও, মনগড়া গুজব ও অন্ধ আতঙ্ক

বন্যপ্রাণী বিজ্ঞানী ও সরীসৃপ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে পাওয়া অধিকাংশ সাপই মানুষের জন্য প্রাণঘাতী নয়। দেশে প্রায় একশরও বেশি প্রজাতির সাপের উপস্থিতি রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র গুটিকয়েক প্রজাতির সাপ মারাত্মক বিষধর। বাকি অধিকাংশ সাপই সম্পূর্ণ নির্বিষ কিংবা এমন মৃদু বিষযুক্ত, যা মানুষের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। কিন্তু সাধারণ মানুষের চোখ এই পার্থক্য বোঝে না। তাদের কাছে সব সাপই সমান অপরাধী এবং মৃত্যুর দূত। এই ঢালাও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে প্রকৃতির এক অপরিহার্য অংশ আজ চরম সংকটে।

আমাদের সমাজে সাপকে নিয়ে অসংখ্য ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। গ্রামাঞ্চলে একটি অত্যন্ত সাধারণ বিশ্বাস হলো, সব বড় আকৃতির সাপই বিষধর। বাস্তবে এই ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। অনেক বিশাল আকৃতির সাপ, যেমন অজগর বা দাঁড়াশ, সম্পূর্ণ বিষহীন। এরা বিষ প্রয়োগ করে শিকার ধরে না; বরং শরীরের পেশিশক্তি দিয়ে শিকারকে জড়িয়ে ধরে নিয়ন্ত্রণ করে। উল্টোদিকে, অনেক ছোট ও শান্ত আকৃতির সাপ, যেমন কালাচ বা মেটে সাপ, অত্যন্ত বিষধর হতে পারে। তাই শুধু বাহ্যিক আকার বা দৈর্ঘ্য দেখে কোনো সাপ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া চরম বিপজ্জনক এবং মূর্খতা। আরেকটি বহুল প্রচলিত বিশ্বাস হলো, সাপ মানুষকে তাড়া করে বা মানুষের পিছু নেয়।

jagonewsমাত্র গুটিকয়েক প্রজাতির সাপ মারাত্মক বিষধর

প্রাণিবিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে বলেছেন, সাপ অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির প্রাণী এবং তারা সাধারণত মানুষকে এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করে। মানুষ কাছাকাছি চলে এলে বেশির ভাগ সাপই প্রথমে পালানোর পথ খোঁজে। কোনো কারণে সংকীর্ণ জায়গায় আটকা পড়লে, চরম আতঙ্কিত হলে কিংবা মানুষের পা অসাবধানতাবশত তার ওপর পড়লে, তবেই সে আত্মরক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে আক্রমণাত্মক আচরণ করে। অর্থাৎ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাপের কামড় কোনো পূর্বপরিকল্পিত আক্রমণ নয়, বরং এটি তাদের বেঁচে থাকার একটি তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া।

লোককথা, রূপকথা আর চলচ্চিত্রের প্রভাবে সমাজে আরও একটি ধারণা গভীরভাবে গেঁথে আছে-সাপ নাকি মানুষের মুখ চিনে রাখে এবং পরবর্তীতে প্রতিশোধ নেয়। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ হয়েছে যে সাপের মস্তিষ্কের গঠন এমন নয় যে তারা মানুষের অবয়ব মনে রেখে প্রতিশোধের পরিকল্পনা করতে পারবে। সাপের স্মৃতিশক্তি খুবই সীমিত এবং তাদের কোনো প্রতিশোধ নেওয়ার অনুভ‚তিই নেই। সিনেমা ও উপন্যাসের কাল্পনিক গল্পগুলোকে সত্য মনে করে মানুষ অবলীলায় এই নিরীহ প্রাণীদের শত্রæ বানিয়ে ফেলছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে আরেকটি সাপের নাম নিয়ে চরম আতঙ্ক ও গুজব তৈরি হয়েছে, সেটি হলো রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া। একসময় বরেন্দ্র অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকলেও দেশের বিভিন্ন নদী অববাহিকায় এই সাপের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরঞ্জিত প্রচারণার কারণে মানুষ এখন এতটাই আতঙ্কিত যে, সাধারণ মেটে সাপ বা অজগরের বাচ্চাকে চন্দ্রবোড়া ভেবে পিটিয়ে মারছে। অথচ সত্য হলো, এই সাপটি অলস প্রকৃতির এবং সে নিজে থেকে কখনো মানুষকে তাড়া করে কামড়াতে আসে না। ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকার সময় যখন মানুষের অজান্তে তার ওপর পা পড়ে, তখনই সে কামড় দেয়।

সাপের কামড়ের চিকিৎসা নিয়েও আমাদের দেশে ভুলের কোনো শেষ নেই। সাপে কাটলে এখনো বহু মানুষ ওঝা, কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁকের পেছনে মূল্যবান সময় নষ্ট করে। গ্রামাঞ্চলে অনেক সময় নির্বিষ সাপে কাটার পর ওঝার ঝাড়ফুঁকে মানুষ ভালো হয়ে যায়, কারণ সেই সাপে কোনো বিষই ছিল না। কিন্তু সাধারণ মানুষ মনে করে ওঝার অলৌকিক ক্ষমতাতেই বুঝি প্রাণ বাঁচল। এই ভুল বিশ্বাসের কারণে যখন কোনো বিষধর সাপ কামড়ায়, তখনো মানুষ ওঝার কাছে যায় এবং সঠিক চিকিৎসার অভাবে রোগী মারা যায়। এছাড়া ক্ষতস্থানে ব্লেড দিয়ে কেটে রক্ত বের করা, শক্ত করে রশি বা তার দিয়ে বাঁধা এসব আদিম পদ্ধতি রোগীর অবস্থা আরও জটিল করে তোলে। শক্ত বাঁধনের কারণে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে আক্রান্ত অঙ্গটি পচে যায়, যা পরবর্তীতে কেটে ফেলতে হয়।

চিকিৎসকদের মতে, সাপে কামড়ালে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সবার আগে শান্ত রাখতে হবে এবং তার আতঙ্ক দূর করতে হবে। কারণ ভয়ের কারণে হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলে বিষ শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত অঙ্গটি একদম নড়াচড়া করা যাবে না, যেন হাড় ভেঙে গেলে মানুষ যেভাবে স্থির রাখে। এরপর যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় সব সরকারি হাসপাতালেই সাপের কামড়ের কার্যকর ওষুধ বা অ্যান্টিভেনম সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া যায়। সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে শতভাগ রোগীকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব।

jagoবাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী বন্যপ্রাণী বা সাপ হত্যা করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ

প্রকৃতির এক বিশাল ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে এই সাপ। আমরা হয়তো অনেকেই জানি না যে, কৃষিজমিতে ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে তারা অলিখিতভাবে কৃষকের সবচেয়ে বড় বন্ধু। একটি বড় সাপ বছরে শত শত ইঁদুর খেয়ে ফসলের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। সাপ যদি প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে ইঁদুরের উপদ্বব এতটাই বেড়ে যাবে যে দেশের খাদ্য উৎপাদন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। এছাড়া সাপের বিষ থেকে তৈরি হচ্ছে হৃদরোগ, ক্যানসার ও ব্যথানাশক অসংখ্য মূল্যবান জীবনরক্ষাকারী ওষুধ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতিতেও সাপের অবদান অনস্বীকার্য।

বন উজাড়, নদী ভরাট, ফসলি জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং নির্বিচারে বাসস্থান ধ্বংসের কারণে সাপের স্বাভাবিক জীবনচক্র আজ বিপন্ন। তারা নিজেদের বাঁচার তাগিদেই বাধ্য হয়ে অনেক সময় মানুষের লোকালয়ে বা ঘরে চলে আসছে। এটিকে সাপের আগ্রাসন ভাবা ভুল, এটি আসলে তাদের টিকে থাকার এক করুণ সংগ্রাম।

বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী বন্যপ্রাণী বা সাপ হত্যা করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। আইন ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। তাই কোথাও সাপ দেখা গেলে সেটিকে না মেরে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং প্রশিক্ষিত সাপ উদ্ধারকর্মী বা বন বিভাগের সহায়তা নেওয়াই একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।

সাপ নিয়ে মানুষের মনে ভয় থাকাটা স্বাভাবিক, কারণ এটি মানুষের আদিম এক প্রবৃত্তি। কিন্তু সেই ভয় যেন অজ্ঞতা আর কুসংস্কারের কারণে অন্ধ ঘৃণায় রূপ না নেয়। প্রকৃতির প্রতিটি জীব একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। ভুল ধারণা আর গুজব পরিহার করে বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানচর্চার মাধ্যমেই মানুষ ও সাপের এই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটানো সম্ভব। সাপকে প্রকৃতির শত্রু না ভেবে একে বাস্তুসংস্থানের এক অপরিহার্য ও দরকারী সদস্য হিসেবে দেখার মানসিকতাই পারে একটি সভ্য ও সচেতন সমাজ গড়ে তুলতে।

লেখক: কবি, বার্তা বাহক ও গাল্পিক

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow