সামনে বাংলাদেশ, গভীর সংকটে পড়া অস্ট্রেলিয়ান পেস বোলিংয়েরও বড় পরীক্ষা
ক্রিকেটে বয়স কখনোই শেষ কথা নয়- এ কথা যেন বারবার প্রমাণ করে চলেছেন অস্ট্রেলিয়ার একঝাঁক অভিজ্ঞ পেসার। প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজলউড, মিচেল স্টার্ক ও স্কট বোল্যান্ড- চারজনের বয়স যোগ করলে সংখ্যাটা ১৪০’র কাছাকাছি। অথচ মাঠে নামলে এখনো তারা বিশ্বের যে কোনো ব্যাটিং লাইনআপের জন্য আতঙ্কের নাম। কিন্তু সময়ের নিয়ম বড় নির্মম। বয়স বাড়ে, শরীরের ওপর চাপ বাড়ে, চোটের ঝুঁকি বাড়ে। ঠিক সে জায়গায়ই দাঁড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ার পেস বোলিং এখন প্রবেশ করতে যাচ্ছে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। আগামী ১২ মাস অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে এই চার পেসারের জন্য হতে যাচ্ছে বড় পরীক্ষা। শুরুটা হচ্ছে বাংলাদেশকে দিয়ে। টাইগারদের বিপক্ষে ডারউইনে ১৩ আগস্ট শুরু হতে যাওয়া টেস্ট দিয়ে শুরু হবে তাদের দীর্ঘ পথচলা। সব মিলিয়ে এক বছরে ২০টি টেস্ট খেলার সম্ভাবনা অস্ট্রেলিয়ার। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠতে পারলে সংখ্যাটা দাঁড়াতে পারে ২১-এ। এরপরও শেষ নয়- কামিন্স, হ্যাজলউড ও স্টার্কের সামনে আছে ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপও। অর্থাৎ সামনে শুধু ম্যাচ নয়, ম্যাচের পর ম্যাচ। শরীরের ওপর একের পর এক পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তিই হয়ে উঠতে পারে
ক্রিকেটে বয়স কখনোই শেষ কথা নয়- এ কথা যেন বারবার প্রমাণ করে চলেছেন অস্ট্রেলিয়ার একঝাঁক অভিজ্ঞ পেসার। প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজলউড, মিচেল স্টার্ক ও স্কট বোল্যান্ড- চারজনের বয়স যোগ করলে সংখ্যাটা ১৪০’র কাছাকাছি। অথচ মাঠে নামলে এখনো তারা বিশ্বের যে কোনো ব্যাটিং লাইনআপের জন্য আতঙ্কের নাম। কিন্তু সময়ের নিয়ম বড় নির্মম। বয়স বাড়ে, শরীরের ওপর চাপ বাড়ে, চোটের ঝুঁকি বাড়ে। ঠিক সে জায়গায়ই দাঁড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ার পেস বোলিং এখন প্রবেশ করতে যাচ্ছে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে।
আগামী ১২ মাস অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে এই চার পেসারের জন্য হতে যাচ্ছে বড় পরীক্ষা। শুরুটা হচ্ছে বাংলাদেশকে দিয়ে। টাইগারদের বিপক্ষে ডারউইনে ১৩ আগস্ট শুরু হতে যাওয়া টেস্ট দিয়ে শুরু হবে তাদের দীর্ঘ পথচলা। সব মিলিয়ে এক বছরে ২০টি টেস্ট খেলার সম্ভাবনা অস্ট্রেলিয়ার। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠতে পারলে সংখ্যাটা দাঁড়াতে পারে ২১-এ। এরপরও শেষ নয়- কামিন্স, হ্যাজলউড ও স্টার্কের সামনে আছে ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপও।
অর্থাৎ সামনে শুধু ম্যাচ নয়, ম্যাচের পর ম্যাচ। শরীরের ওপর একের পর এক পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তিই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। সেই দুর্বলতারই নাম- অভিজ্ঞ পেস আক্রমণ।
স্পিন বোলিং কোচ ড্যানিয়েল ভেট্টরির সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার প্রধান কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ডস
কামিন্সের বয়স এখন ৩৩। হ্যাজলউড ৩৫, স্টার্ক ৩৬ এবং বোল্যান্ড ৩৭। বয়সের হিসাব বলছে অবসরের দিকে তারা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু পারফরম্যান্স বলছে, এখনই তাদের সরিয়ে দেওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং অস্ট্রেলিয়া এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, যেখানে এই চারজনকে একসঙ্গে সুস্থ রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় কৌশল।
কারণ তাদের পেছনে যে প্রস্তুত বিকল্প দাঁড়িয়ে আছে, সেই তালিকাটা খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়।
চার মহীরুহের ছায়ায় অপেক্ষায় কারা?
অস্ট্রেলিয়ার প্রথম সারির পেস আক্রমণের পরের সারিতেও অভিজ্ঞতার কমতি নেই। মাইকেল নেসেরের বয়স ৩৬, ব্রেন্ডন ডগেট ৩২। অর্থাৎ চার মূল পেসারের বিকল্প হিসেবেও অস্ট্রেলিয়ার হাতে এখন তরুণদের ভিড় নেই, যারা দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য এখনই প্রস্তুত।
এখানেই উদ্বেগটা সবচেয়ে বেশি। অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেট একসময় বিশ্বমানের ফাস্ট বোলার তৈরির জন্য বিখ্যাত ছিল। একের পর এক প্রজন্মে উঠে এসেছে এমন সব পেসার, যারা জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছেন; কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পাইপলাইন আগের মতো সমৃদ্ধ দেখাচ্ছে না।
ঝাই রিচার্ডসন
এ কারণেই অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচক, কোচ এবং স্পোর্টস সায়েন্স ও স্পোর্টস মেডিসিন দলের সামনে এখন বড় প্রশ্ন- বর্তমান পেস আক্রমণকে কতদিন ধরে রাখা যাবে এবং তাদের জায়গা নেওয়ার মতো পরবর্তী প্রজন্মকে কত দ্রুত তৈরি করা সম্ভব?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই জুলাইয়ের শেষ দিকে ব্রিসবেনের অ্যালান বোর্ডার ফিল্ডে বসেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের গুরুত্বপূর্ণ কোচিং ব্যক্তিরা।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধান কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড, নতুন বোলিং কোচ জেমস ফ্র্যাঙ্কলিন, জাতীয় পেস বোলিং কোচ অ্যাডাম গ্রিফিথ, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার দুইবারের শেফিল্ড শিল্ডজয়ী কোচ রায়ান হ্যারিস, কুইন্সল্যান্ডের বোলিং কোচ হামিশ বেনেটসহ অনেক অভিজ্ঞ কোচ সেখানে ছিলেন।
আলোচনার টেবিলে ছিল ব্যাটিং গভীরতা, ঘরোয়া পিচ, কেন্দ্রীয় চুক্তি, সূচি, খেলোয়াড় উন্নয়ন- তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার পেস বোলিংয়ের ভবিষ্যৎ।
পেস বোলারদের সবচেয়ে বড় শত্রু- চোট
বয়সের সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ চোট। বিশেষ করে কোমরের স্ট্রেস ইনজুরি বা ‘স্ট্রেসি’- যা অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট মহলে বেশ পরিচিত শব্দ। চারজনের কেউই চোটের অভিজ্ঞতা থেকে মুক্ত নন।
প্যাট কামিন্সের ক্যারিয়ারটাই সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে কোমরের সমস্যার কারণে তিনি প্রায় ছয় বছর টেস্ট ক্রিকেটের বাইরে ছিলেন। পরে নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা পেসার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু ৩২ বছর বয়সে আবারও কোমরের স্ট্রেস ইনজুরি তাকে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে পাঠায়। গত এক বছরে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাত্র একটি ম্যাচ খেলতে পেরেছেন।
জ্যাভিয়ের বার্টলেট
জশ হ্যাজলউডেরও চোটের ইতিহাস দীর্ঘ। কৈশোরেই কোমরের স্ট্রেস ফ্র্যাকশ্চারের অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। ২৭ বছর বয়সেও নতুন করে স্ট্রেস ইনজুরিতে পড়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে পাশের পেশির চোট, হ্যামস্ট্রিংয়ের সমস্যা এবং অ্যাকিলিসের চোট তাকে ভুগিয়েছে। গত এক বছরে তিনি কোনো টেস্ট খেলেননি। অস্ট্রেলিয়ার শেষ ১৪টি আন্তর্জাতিক টেস্টের মধ্যে খেলতে পেরেছেন মাত্র পাঁচটিতে।
অন্যদিকে মিচেল স্টার্ক ও স্কট বোল্যান্ড তুলনামূলকভাবে বেশি ধারাবাহিকভাবে মাঠে থেকেছেন। কিন্তু তারাও পুরোপুরি চোটমুক্ত নন।
২৩ বছর বয়সে স্টার্কের কোমরে স্ট্রেস ফ্র্যাকচার হয়েছিল। এরপর পায়ের পাতা ও শিনেও চোট পেয়েছেন। বোল্যান্ডের ক্ষেত্রে আশ্চর্যের বিষয়, এখন পর্যন্ত কোনো স্ট্রেস ফ্র্যাকচার হয়নি। তবে হাঁটু ও পায়ের সমস্যায় ভুগতে হয়েছে তাকেও। অর্থাৎ শরীরের বয়স যত বাড়ছে, ঝুঁকির জায়গাগুলোও তত স্পষ্ট হচ্ছে।
১২ মাসে ২০ টেস্ট- কতটা চাপ নিতে প্রস্তুত অস্ট্রেলিয়ার পেসাররা?
পেসারদের চোট আর আঘাতের দীর্ঘ ইতিহাসই ভাবাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট থিঙ্কট্যাঙ্কদের। আগামী এক বছরে ২০টি টেস্ট। ২১টিও হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এখানেই আসছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
এক বছরে ২০টি টেস্ট এমনিতেই ভয়ংকর ব্যস্ত সূচি। তার সঙ্গে আছে ভ্রমণ, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট। আর অস্ট্রেলিয়ার এই চার পেসারের তিনজনকে ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের কথাও মাথায় রাখতে হচ্ছে। অর্থাৎ তাদের শুধু বর্তমান সিরিজের জন্য প্রস্তুত থাকলেই হবে না। পুরো সময়টা শরীরকে ধরে রাখতে হবে।
২০২৩ সালেও অস্ট্রেলিয়ার সূচি ছিল কঠিন। ভারত সফর, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল, অ্যাশেজ এবং ওয়ানডে বিশ্বকাপ- সব মিলিয়ে ছিল ঠাসা কর্মসূচি। কিন্তু এবার পরিস্থিতি আরও কঠিন, কারণ একই ধরনের ব্যস্ততার মুখোমুখি হতে হচ্ছে চার বছর বেশি বয়স নিয়ে। তখন যে শরীর ৩০ বছর বয়সে চাপ সামলেছে, এখন সেই শরীরই ৩৩, ৩৫, ৩৬ কিংবা ৩৭ বছরের।
ক্রিকেট যত আধুনিক হচ্ছে, ততই ফাস্ট বোলারদের শরীরের ওপর চাপ বাড়ছে। ঘণ্টায় ১৪০-১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করা, দীর্ঘ স্পেলে বোলিং করা, বারবার ল্যান্ডিংয়ের ধাক্কা সামলানো- সবকিছুর একটা মূল্য আছে। আর বয়স বাড়লে সেই মূল্য আরও বেশি।
তাই শুধু বোলিং নয়, এখন লড়াই ব্যবস্থাপনারও
অস্ট্রেলিয়ার জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্ভবত চার পেসারকে সব ম্যাচ খেলানো নয়; বরং কোন ম্যাচে কাকে খেলানো হবে, কখন বিশ্রাম দেওয়া হবে এবং কিভাবে তাদের শরীরকে দীর্ঘ সময় সতেজ রাখা যাবে- সেই পরিকল্পনা।
অস্ট্রেলিয়ার কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ডও বিষয়টিকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখছেন। ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে জাতীয় দল পর্যন্ত সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে- এমনটাই মনে করছেন তিনি।
কারণ জাতীয় দলের পেস আক্রমণ যত শক্তিশালীই হোক, ভবিষ্যতের জন্য বিকল্প তৈরি না হলে একটা সময় সেই শক্তিই সংকটে পরিণত হতে পারে।
এ কারণেই ঘরোয়া ক্রিকেটে তরুণ পেসারদের সুযোগ দেওয়া, তাদের শরীরের ওপর নজর রাখা, চোট প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য ধীরে ধীরে প্রস্তুত করা এখন অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম বড় দায়িত্ব।
বাংলাদেশের বিপক্ষেই শুরু নতুন পরীক্ষার
অস্ট্রেলিয়ার সামনে এই দীর্ঘ যাত্রার প্রথম ধাপ বাংলাদেশ। ১৩ আগস্ট ডারউইনে শুরু হচ্ছে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ। কাগজে-কলমে অস্ট্রেলিয়া এগিয়ে থাকলেও সিরিজটি তাদের জন্য শুধু বাংলাদেশের বিপক্ষে আরেকটি দ্বিপক্ষীয় লড়াই নয়। এটি তাদের পেস আক্রমণের স্থায়িত্ব যাচাইয়েরও একটি পরীক্ষা।
কামিন্স কি টানা ম্যাচের চাপ সামলাতে পারবেন? হ্যাজলউড কি চোট কাটিয়ে দীর্ঘ স্পেলে বোলিং করার মতো অবস্থায় আছেন? স্টার্ক কি বয়সের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আগের সেই ভয়ংকর গতি ও সুইং ধরে রাখতে পারবেন? আর বোল্যান্ড- ৩৭ বছর বয়সে যিনি এখনো অস্ট্রেলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র, তিনি কতদিন এই পর্যায়ের ক্রিকেট চালিয়ে যেতে পারবেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো বাংলাদেশের বিপক্ষে দুই টেস্টেই পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। কিন্তু এই সিরিজ থেকেই শুরু হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার আগামী এক বছরের কঠিন পথচলা।
চার অভিজ্ঞ পেসার এখনো অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা এখনো ম্যাচ জেতাতে পারেন, ব্যাটারদের ভড়কে দিতে পারেন, কঠিন পরিস্থিতি থেকে দলকে ফিরিয়ে আনতে পারেন। কিন্তু ক্রিকেটের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো- কেউই সময়কে হারাতে পারেন না।
‘ফাদার টাইম’ শেষ পর্যন্ত অপরাজিতই থাকে
অস্ট্রেলিয়ার এই চার পেসার সেই সময়কে যতদিন সম্ভব ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন কি না, তার উত্তরই হয়তো ঠিক করবে আগামী কয়েক বছরে বিশ্ব ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্য কতটা অটুট থাকবে।
অস্ট্রেলিয়ার পেস ডিপার্টমেন্টে তাৎক্ষণিক ব্যাকআপদের অবস্থাও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। অ্যাশেজে দুর্দান্ত পারফর্ম করা মাইকেল নেসেরও ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে কোমরের স্ট্রেস ফ্র্যাকশ্চারে ভুগেছেন। গুরুতর হ্যামস্ট্রিং চোট থেকে ফিরেছেন মাত্র ১৮ মাস আগে, এর মধ্যেই আগস্টের শুরুতে আবার পড়েছেন কাফের চোটে।
ব্রেন্ডন ডগেটের ক্যারিয়ারেও আছে একাধিক স্ট্রেস ফ্র্যাকশ্চারের ইতিহাস। গত গ্রীষ্মে দুটি হ্যামস্ট্রিং চোটের ধাক্কা সামলাতে হয়েছে তাকে। এর একটি ছিল টেস্ট অভিষেকের আগে, অন্যটি ছিল গুরুতর- যে চোটের কারণে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় শেফিল্ড শিল্ড শিরোপা জয়ের দৌড়েও থাকতে পারেননি।
সিন অ্যাবটের অবস্থাও খুব আলাদা নয়। ৩৪ বছর বয়সী এই পেসার ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার দুটি টেস্ট স্কোয়াডে ছিলেন। এমনকি অ্যাশেজের প্রাথমিক দলেও জায়গা পেয়েছিলেন নেসেরের জায়গায়। কিন্তু প্রথম টেস্টের আগে শেষ শেফিল্ড শিল্ড ম্যাচেই হ্যামস্ট্রিং চোটে পড়েন। ফলে অভিজ্ঞতার দিক থেকে শক্তিশালী মনে হলেও অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণের বিকল্প বেঞ্চটিও চোটের ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়।
অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট খেলা অস্ট্রেলিয়ার উঠতি বয়সী পেস বোলাররা
এরপরের সারিতে থাকা ঝাই রিচার্ডসনের অবস্থাও বেশ হতাশার। সেপ্টেম্বরে ৩০ পূর্ণ করতে যাওয়া এই পেসার অ্যাশেজে চার পেসারের আক্রমণের অংশ হিসেবে একটি টেস্ট খেলেছিলেন; কিন্তু এরপরই ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বাদ পড়েছেন। নির্বাচকরা মনে করছেন, তার দীর্ঘ ইনজুরি ইতিহাসের কারণে তিন পেসারের আক্রমণে টানা খেলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
গত সাত বছরে রিচার্ডসনের ডান কাঁধে অস্ত্রোপচার হয়েছে তিনবার, হ্যামস্ট্রিংয়ে একবার। কৈশোরেই ভুগেছেন কোমরের স্ট্রেস ফ্র্যাকশ্চারে। অর্থাৎ প্রতিভা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও শরীরই যেন বারবার তার পথের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার ভবিষ্যৎ পেস আক্রমণে দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে বড় আশার নাম হিসেবে দেখা হচ্ছিল ল্যান্স মরিসকে। ঘণ্টায় ১৪৫ কিলোমিটারের আশপাশে নিয়মিত বল করতে পারা এই পেসারকে মিচেল স্টার্ক-পরবর্তী যুগের ‘হাই-বল-স্পিড’ অস্ত্র হিসেবে ভাবা হয়েছিল। ২০২২-২৩ মৌসুমে টেস্ট দলে ঢোকার আলোচনায় আসার পর থেকেই তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল বড় প্রত্যাশা; কিন্তু সেই প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি শরীর।
মরিসের বয়স এখন ২৮। অথচ নিচের পিঠের স্ট্রেস ফ্র্যাকশ্চার তাকে বারবার মাঠের বাইরে ঠেলে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যতে একই জায়গায় আরও চোট এড়াতে গত বছর তার মেরুদণ্ডের সমস্যাগ্রস্ত কশেরুকায় স্ক্রু ও কেবল দিয়ে অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। অলরাউন্ডার ক্যামেরন গ্রিনও ২০২৪ সালে পঞ্চমবারের মতো স্ট্রেস ফ্র্যাকশ্চারে আক্রান্ত হওয়ার পর একই ধরনের অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন।
মরিস ২০২৫ সালের মার্চের পর আর কোনো ম্যাচ খেলেননি। এখন ধীরে ধীরে তার বোলিং লোড ১০০ শতাংশের দিকে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পেসারের শরীরের ওপর যে ভয়াবহ চাপ পড়ে, সেখানে দীর্ঘ বিরতির পর আবার সর্বোচ্চ পর্যায়ে ফিরতে পারা নিজেই বড় পরীক্ষা।
আরেকটি আশার নাম জেভিয়ার বার্টলেট। ২৭ বছর বয়সী এই পেসার সাম্প্রতিক সময়ে অস্ট্রেলিয়ার সাদা বলের ক্রিকেটে নিয়মিত মুখ হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে চোটমুক্ত সময়টা তাকে জাতীয় দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রে পরিণত করেছে। তবে তার ক্যারিয়ারেও আছে চোটের দীর্ঘ ইতিহাস। বিশের কোঠার শুরুর দিকে একাধিক স্ট্রেস ফ্র্যাকশ্চারের পর সম্প্রতি নিজের শরীরকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পেরেছেন তিনি।
মাইকেল নেসের
সমস্যা হলো, সাদা বলের ক্রিকেটে বার্টলেটের চাহিদা এত বেশি যে লাল বলের ক্রিকেটে নিজেকে তৈরি করার সুযোগই কমে গেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন টি-টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজির আগ্রহও তাকে ব্যস্ত রাখছে। ফলে ২০২৩-২৪ মৌসুমের শুরু থেকে তিনি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেছেন মাত্র ১৪টি ম্যাচ। টেস্ট ক্রিকেটের জন্য একজন পেসারকে যে দীর্ঘ প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক লাল বলের ক্রিকেট দরকার, সেখানে এই সংখ্যাটি খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়।
স্পেন্সার জনসন, রাইলি মেরেডিথ ও বিলি স্ট্যানলেক- এই তিনজনের মধ্যেও এমন কিছু গুণ রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণে কাজে লাগতে পারে। উচ্চতা ও গতি- দুটিই আছে তাদের। কিন্তু তিনজনেরই বড় ধরনের চোটের ইতিহাস রয়েছে। ফলে তারাও ধীরে ধীরে সাদা বলের ক্রিকেটের দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়ছেন।
এদিকে ৩১ বছর বয়সী নাথান এলিসও কার্যত সাদা বলের ক্রিকেটকেই নিজের ভবিষ্যৎ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। গতি হয়তো অন্যদের মতো ভয়ংকর নয়; কিন্তু স্কিড, নিয়ন্ত্রণ ও বৈচিত্র্যে তিনি কার্যকর। তবে সেই দক্ষতা দেখানোর জন্য লাল বলের ক্রিকেটে নিয়মিত থাকা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে অবশ্য এমন কিছু পেসার আছেন, যাদের দিকে তাকিয়ে আশাবাদী হওয়ার কারণ রয়েছে। নাথান ম্যাকঅ্যান্ড্রু ও ফার্গাস ও’নিল গত পাঁচ বছরে শেফিল্ড শিল্ডে সাফল্য ও ধারাবাহিকতার দিক থেকে অন্যদের ছাড়িয়ে গেছেন। ৩৩ বছর বয়সী ম্যাকঅ্যান্ড্রু এবং ২৫ বছরের ও’নিল- দুজনের পথ অবশ্য এক নয়।
বিশেষ করে ও’নিলকে পরবর্তী প্রজন্মের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো বয়সে থাকা পেসার হিসেবে দেখা হচ্ছে। শেফিল্ড শিল্ডে তার সাফল্যও যথেষ্ট। একইভাবে ৩৩ বছর বয়সী জোয়েল প্যারিসও ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্দান্ত পারফর্ম করেছেন। তবে চোটের কারণে তাকে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া খুব হিসাব করে ব্যবহার করে।
তবু এখানেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। শেফিল্ড শিল্ডে তাদের সাফল্যের বড় অস্ত্র হলো নিখুঁত লাইন-লেন্থ, সুইং ও সিম মুভমেন্ট। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে কেবল নিখুঁততা যথেষ্ট নয়। প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজলউড ও স্কট বোল্যান্ড একই ধরনের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে বাড়তি গতি ও বাউন্সও তৈরি করতে পারেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেই বাড়তি গতি ও বাউন্সের জায়গাটিই ঘরোয়া ক্রিকেটের সফল পেসারদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
তবে অস্ট্রেলিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার আলো একেবারে নিভে যায়নি। ২০২৪ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী দলের চার পেসার- কালাম ভিডলার, মাহলি বিয়ার্ডম্যান, টম স্ট্রেকার ও চার্লি অ্যান্ডারসনকে ঘিরে প্রত্যাশা বড় হচ্ছে।
বিয়ার্ডম্যান বিগব্যাশ লিগে নজরকাড়া পারফরম্যান্সের পর অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেও অভিষেক করেছেন। তবে এখনো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার অভিষেক হয়নি। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আগ্রহ তৈরি হলেও টেস্ট ক্রিকেটের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য তাকে এখনো অনেকটা সময় ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে।
ভিডলারের অবস্থাটা অবশ্য একটু আলাদা। ২০২৫ সালের মার্চে শেফিল্ড শিল্ড ফাইনালে মাত্র তৃতীয় প্রথম শ্রেণির ম্যাচেই চার উইকেট নিয়ে নিজের সামর্থ্যের বড় প্রমাণ দিয়েছিলেন তিনি। এমন পারফরম্যান্সই অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে ভবিষ্যতের তারকাদের নিয়ে আশার জন্ম দেয়।
কিন্তু দুর্ভাগ্য এখানেও পিছু ছাড়েনি। বিয়ার্ডম্যান ও ভিডলার- দুজনই বর্তমানে স্ট্রেস ফ্র্যাকশ্চার থেকে সেরে ওঠার প্রক্রিয়ায় আছেন। অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়ার সামনে ছবিটা এখন বেশ পরিষ্কার- বর্তমানের চার মহাতারকা এখনো নিজেদের জায়গায় দুর্দান্ত, কিন্তু তাদের পেছনে যে প্রজন্মকে দাঁড়ানোর কথা, সেই সারিতেই চোটের দীর্ঘ ছায়া। অভিজ্ঞতা, গতি ও সামর্থ্যের ঘাটতি নয়; বরং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, কে কতদিন শরীরকে টেস্ট ক্রিকেটের নিষ্ঠুর পরিশ্রমের জন্য প্রস্তুত রাখতে পারবেন।
আর সেই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে, কামিন্স-হ্যাজলউড-স্টার্ক-বোল্যান্ড যুগ শেষ হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়া আবারও বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর পেস আক্রমণ ধরে রাখতে পারবে কি না।
অস্ট্রেলিয়া দলের ফিজিও নিক জোন্স (বামে) বোলারদের ফিটনেস পর্যবেক্ষণ করছেন
অস্ট্রেলিয়ার কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ডের কাছে বিষয়টি তাই শুধু ‘কে কাকে প্রতিস্থাপন করবে’- এমন সরল কোনো সমীকরণ নয়। বয়সী পেসারদের সামলানো এবং অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী তরুণদের ধীরে ধীরে গড়ে তোলা- দুটিই একসঙ্গে করতে হবে। আর এই কাজটিই হতে যাচ্ছে অত্যন্ত জটিল।
ম্যাকডোনাল্ড বলেন, ‘বয়স্ক এই দলটাকে ম্যানেজ করা এবং অনূর্ধ্ব-১৯ থেকে উঠে আসা প্রতিভাদের গড়ে তোলার বিষয়টি অবিশ্বাস্য রকম জটিল হতে যাচ্ছে।’
তবে তরুণদের ওপর এখনই অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপ দিতে নারাজ তিনি। স্টার্কের গতির সঙ্গে, কিংবা কামিন্সের নিখুঁত লাইন-লেংথের সঙ্গে কাউকে তুলনা করে দেখার পক্ষপাতী নন অস্ট্রেলিয়া কোচ।
তার ভাষায়, ‘আমরা সবসময় পরের প্রজন্মকে তুলনা করতে চাই। প্রায় এমন একটা তকমা দিয়ে দিই যে, এই খেলোয়াড় মিচেল স্টার্কের বলের গতি বা প্যাট কামিন্সের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণের জায়গাটা পূরণ করবে। কিন্তু আমি মনে করি, তাদের নিজেদের একটা পরিচয় তৈরি হবে। তারা নিজেদের মতো করে বেড়ে উঠবে।’
ম্যাকডোনাল্ডের বিশ্বাস, অস্ট্রেলিয়ার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের কাঠামো এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী। ফলে নতুন প্রজন্মকে সময় দেওয়াটাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বয়স্ক পেসারদের পরবর্তী স্তরে যারা আছে, তাদেরও এই পরিবর্তনের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি বলেন, ‘বয়স্ক এই দলের সঙ্গে তরুণদের মাঝেও কিছু খেলোয়াড় আছে। পুরো প্রক্রিয়ায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আমি চাই না তরুণদের তুলনা করা হোক। আমি চাই তারা নিজেদের ক্যারিয়ার নিজেদের মতো করে গড়ে তুলুক এবং তাদের সময় দেওয়া হোক। খেলোয়াড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবসময় একটা তাড়াহুড়া থাকে- পরবর্তী স্তর কেমন হবে, কে জায়গা নেবে। কিন্তু আশা করি আমাদের এই বয়স্ক পেসাররা আরও কয়েক বছর খেলবে। আমাদের সেই সময়টুকু দিতে হবে, যাতে মাঝের ব্যবধানটা পূরণ করা যায়।’
এই ‘মাঝের ব্যবধান’-এ কথাটিই সামনে এনেছেন সাবেক অস্ট্রেলিয়ান পেসার রায়ান হ্যারিস। ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ১১৩টি টেস্ট উইকেট নেওয়া হ্যারিস নিজেও ছিলেন একটি প্রজন্মের সেতুবন্ধন। গ্লেন ম্যাকগ্রা, ব্রেট লি, জেসন গিলেস্পি ও মাইকেল ক্যাসপ্রোভিচদের যুগের পর কামিন্স-স্টার্ক-হ্যাজলউডদের উত্থানের মাঝের সময়ে অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণের অন্যতম ভরসা ছিলেন তিনি।
হ্যারিসও মনে করেন, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে প্রতিভার ঘাটতি নেই। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বিশেষ ধরনের পেসারের অভাব স্পষ্ট। ‘দেশজুড়ে আমাদের বোলিংয়ের গভীরতা খুব ভালো। ১৩০ কিলোমিটার গতির আশপাশে বল করতে পারে- এমন অনেক ভালো বোলার আছে। সম্ভবত আমাদের একমাত্র ঘাটতি হলো, যারা ধারাবাহিকভাবে ভালো গতিতে বল করতে পারে। আর স্টার্ক ও হ্যাজলউডের মতো লম্বা গড়নের পেসারের সংখ্যাও কম’- বলেন হ্যারিস।
অস্ট্রেলিয়ার মাঝের প্রজন্মটাই কোথায়?
অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান পেস বোলিংয়ের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক জায়গা সম্ভবত ২৪ থেকে ৩০ বছর বয়সী ক্রিকেটারদের স্তর। এই বয়সের এমন কোনো দল নেই, যারা একদিকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত, অন্যদিকে প্রবীণ চার পেসারের ওপর চাপ কমিয়ে তরুণদের উঠে আসার সময় করে দিতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ের পেসারদের উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা অ্যাডাম গ্রিফিথের কাছে এর ব্যাখ্যাটা অনেকটাই সহজ- এটা ক্রিকেটেরই একটি চক্র, ‘এটা একটা চক্র। যখন আপনার কাছে এমন একটি শক্তিশালী দল থাকে, যারা দীর্ঘদিন ধরে খেলছে, তখন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুযোগ কমে যায়। আপনি পরের স্তরটাকে হারিয়ে ফেলেন, কারণ তাদের খেলার সুযোগই হয় না,’ বলেন গ্রিফিথ।
অস্ট্রেলিয়া অবশ্য এর আগেও এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। প্রায় দুই দশক আগে, ২০০৭ সালে গ্লেন ম্যাকগ্রাথ টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। ২০০৮ সালে জেসন গিলেসপি ও মাইকেল ক্যাসপ্রোভিচ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ান। ব্রেট লি ২০০৯ সালে চোটের কারণে ৩২ বছর বয়সে টেস্ট ক্রিকেট ছাড়েন, যদিও আরও তিন বছর সীমিত ওভারের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন। স্টুয়ার্ট ক্লার্কও ২০০৯ সালে ৩৪ বছর বয়সে শেষ টেস্ট খেলেন।
স্কট বোল্যান্ড
তবে সেই সময় অস্ট্রেলিয়ার হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা ছিল- ২৪ থেকে ৩০ বছর বয়সী একদল প্রস্তুত পেসার। রায়ান হ্যারিস, মিচেল জনসন ও পিটার সিডল মিলে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৬৪৭টি টেস্ট উইকেট নিয়েছেন। ঘরের মাঠে ২০১৩-১৪ অ্যাশেজে ইংল্যান্ডকে ৫-০ ব্যবধানে হারানো দলেও ছিলেন তারা। একই মৌসুমে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতেও সিরিজ জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া।
শুধু তারাই নন, বেঞ্চে ছিলেন বেন হিলফেনহাস ও ডগ বোলিঞ্জারের মতো অভিজ্ঞ পেসারও। হিলফেনহাস ২৮.৫০ গড়ে ৯৯টি টেস্ট উইকেট নিয়েছেন, আর বোলিঞ্জারের ঝুলিতে ছিল ৫০ উইকেট।
সেই প্রজন্মের আরেকটি বড় সুবিধা ছিল- তাদের অনেকের কাছেই ছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য প্রয়োজনীয় বাড়তি গতি। ফলে নির্বাচকদের হাতে বিকল্প ছিল। এমনকি কামিন্স, স্টার্ক, হ্যাজলউড ও তরুণ জেমস প্যাটিনসনের মতো পরবর্তী প্রজন্মকে পুরোপুরি তৈরি হওয়ার আগেই টেস্ট ক্রিকেটে ঢুকিয়ে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল অস্ট্রেলিয়া।
শুরুতে ফল সবসময় প্রত্যাশামতো আসেনি। বিশেষ করে অ্যাওয়ে অ্যাশেজে এই তরুণদের বেশ কিছু কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেই সিদ্ধান্তই অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণের ভিত শক্ত করে দেয়। বর্তমান বাস্তবতায় সেই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিত বলে মনে হচ্ছে।
এখনকার তরুণদের পাশে দাঁড়ানোর মতো একই বয়সের, একই সঙ্গে অভিজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক মানের পেসার খুব বেশি নেই। ফলে একদিকে চার অভিজ্ঞ পেসারের ওপর বাড়তে থাকা কাজের চাপ, অন্যদিকে তরুণদের দ্রুত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি- দুটিই একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে অস্ট্রেলিয়াকে।
কেন এ অবস্থা হলো, তার সম্ভাব্য কারণ নিয়েও আলোচনা চলছে অস্ট্রেলিয়ার কোচিং মহলে। এর মধ্যে অন্যতম আলোচনার বিষয় ছিল শেফিল্ড শিল্ডের পিচ, কোকাবুরা বলের পরিবর্তন এবং বোনাস পয়েন্টের কাঠামো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিল্ডের উইকেটে আগের তুলনায় ঘাসের উপস্থিতি বেড়েছে। একই সঙ্গে নতুন ধরনের ডাবল-ল্যাকার কোকাবুরা বলও আগের সংস্করণের তুলনায় বেশি মুভ করে।
আর বোনাস পয়েন্টের কাঠামোও দলগুলোকে আক্রমণাত্মক ক্রিকেটে উৎসাহিত করছে। দ্রুত উইকেট পড়লে ম্যাচ দ্রুত এগোয়, চার দিনের মধ্যেই ফল পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। আর সরাসরি জয় মানেই বেশি পয়েন্ট। ফলে শেফিল্ড শিল্ডে দ্রুত ফল পাওয়ার প্রতিযোগিতা যত বাড়ছে, ততই প্রশ্ন উঠছে- এই পরিবেশ কি দীর্ঘমেয়াদি টেস্ট পেসার তৈরির জন্য আদর্শ?
মিচেল স্টার্ক
তবে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রকাশ্য উদ্বেগ এতদিন ছিল ব্যাটিংয়ের গভীরতা নিয়ে। কিন্তু এর একটি অনিচ্ছাকৃত প্রভাব পড়তে পারে পেস বোলিংয়েও। শেফিল্ড শিল্ডের বর্তমান কন্ডিশনে ঘণ্টায় ১৩০ কিলোমিটারের নিচে গতিতে বল করা, সুইং-সিম আদায় করতে পারা পেসাররা হয়তো বেশি সুবিধা পাচ্ছেন। বিপরীতে বাড়তি গতি ও বাউন্স তৈরি করতে পারেন- এমন বোলারদের বিকাশ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার পেস বোলিং উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা অ্যাডাম গ্রিফিথের মতে, এর পেছনে কন্ডিশনের বড় ভূমিকা আছে, ‘আমি মনে করি কন্ডিশনগুলো এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে। বল নড়াচড়া করে, ফলে খুব বেশি গতির বোলার সবসময় প্রয়োজন হয় না। বরং অনেক সময় বেশি গতির বোলাররাই এসব কন্ডিশনে সেরা বিকল্প নয় এবং তারা বেশি রান দিয়ে ফেলতে পারে।’
তার ব্যাখ্যা, গত কয়েক বছরে শেফিল্ড শিল্ডের অনেক উইকেটে ১২৫ থেকে ১৩০ কিলোমিটার গতিতে বল করা, কিন্তু নিয়মিত সিম মুভমেন্ট আদায় করতে পারা বোলারদের ব্যাটারদের জন্য বেশি কঠিন হয়ে উঠতে দেখা গেছে।
‘যারা ১২৫-১৩০ কিলোমিটার গতিতে দৌড়ে এসে বলটাকে নড়াচড়া করাতে পারে, গত চার-পাঁচ বছরে আমরা যে ধরনের কন্ডিশন দেখেছি, সেখানে তাদের খেলা অনেক কঠিন। সে কারণেই তারাই শেষ পর্যন্ত ভালো বোলার হয়ে উঠছে,’ গ্রিফিথের বিশ্লেষণ।
তবে অস্ট্রেলিয়ার সব রাজ্য দলের কোচ মনে করেন না যে পিচই এই সমস্যার একমাত্র কারণ। আবার পেসারদের সুবিধা করে দিতে শিল্ডের উইকেট একেবারে ব্যাটিংবান্ধব করে দেওয়ার পক্ষেও কেউ নন।
রায়ান হ্যারিসও মনে করেন, শিল্ডের উইকেটকে যতটা খারাপ বলা হচ্ছে, বাস্তবে হয়তো ততটা নয়। তবে তার মতে, উইকেটের বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি। একই ধরনের কন্ডিশনে বারবার খেলার পরিবর্তে পেস, বাউন্স, সুইং ও স্পিন- সব ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে তরুণ ক্রিকেটারদের। এ জন্য ঐতিহ্যবাহী ও আন্তর্জাতিক ভেন্যুগুলোতে আরও বেশি শেফিল্ড শিল্ড ম্যাচ আয়োজনের পক্ষপাতী তিনি।
‘আমরা আরও বেশি এমসিজি, এসসিজি কিংবা পার্থ স্টেডিয়ামে খেলতে চাই। এ বছর পার্থ স্টেডিয়ামে একটি ম্যাচও আছে। তবে আমরা যদি কখনো ভালো বাউন্স পাওয়া উইকেট পাই, আবার কখনো এমন উইকেট পাই যেখানে অনেক বেশি স্পিন হয়- অর্থাৎ সব উইকেট যদি একই ধরনের না হয়, তাহলে ক্রিকেট আরও ভালো হবে। আমরা আরও বেশি শিখব এবং আমাদের খেলোয়াড়রাও আরও ভালো হবে,’ বলেন হ্যারিস।
পরিসংখ্যানও অবশ্য একটি মজার বৈপরীত্য দেখাচ্ছে। টেস্ট অভিষেকের আগে ২০০১ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ৩৮টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে হ্যারিসের বোলিং গড় ছিল ৩৩.৫১। অথচ বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম সম্ভাবনাময় পেসার ফার্গাস ও’নিল মাত্র ৪৯ ম্যাচেই ২০০ প্রথম শ্রেণির উইকেট নিয়েছেন, গড় মাত্র ১৯.৪৩।
গত পাঁচ মৌসুমে শেফিল্ড শিল্ডে অন্তত ১০০ উইকেট নেওয়া চারজন সিমারের একজন ও’নিল, যাদের প্রত্যেকের গড় ২২-এর নিচে। তুলনাটা আরও তাৎপর্যপূর্ণ- ২০১০ সালে হ্যারিসের টেস্ট অভিষেকের আগের সমান পাঁচ মৌসুমে কোনো সিমারের গড়ই ২৪.৬৫-এর নিচে ছিল না।
অর্থাৎ শেফিল্ড শিল্ডে বর্তমান সময়ের বোলাররা নিঃসন্দেহে অসাধারণ কার্যকর। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সাফল্য আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটের জন্য ঠিক কতটা প্রস্তুত করে তুলছে তাদের?
কলাম ভিডলার
ও’নিল নিজেও অস্ট্রেলিয়া ‘এ’ দলের হয়ে ভারত সফরের সময় এই পার্থক্যটি টের পেয়েছেন। শেফিল্ড শিল্ডে যে ধরনের উইকেটে একটু ফুল লেংথে বল করলেই অতিরিক্ত সাইডওয়ে মুভমেন্ট পাওয়া যায়, ভারতের নিষ্প্রাণ উইকেটে সেই কৌশল খুব একটা কাজে আসেনি।
দ্রুত বোলিংয়ের সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ছে
তবে গতি বাড়ানোর এই প্রচেষ্টার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও বড় একটি ঝুঁকি। কারণ দ্রুত বোলিং শুধু প্রতিপক্ষের ব্যাটারের জন্য কঠিন নয়, বোলারের শরীরের জন্যও ভয়ংকর পরিশ্রমের। আর এখানেই অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
দেশটির ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত এখন যে বিষয়টি ভাবাচ্ছে, সেটি হলো- ফাস্ট বোলারদের ইনজুরি, বিশেষ করে কোমরের হাড়ে স্ট্রেস ফ্র্যাকশ্চার।
সমস্যাটি এখন আর শুধু জাতীয় দলের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। অস্ট্রেলিয়ার বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের পথচলাতেও এর ছাপ স্পষ্ট। এমনকি ১২-১৩ বছরের কম বয়সী ক্রিকেটারদের মধ্যেও অতিরিক্ত বোলিংয়ের কারণে কোমরের হাড়ে স্ট্রেস ফ্র্যাকশ্চার দেখা যাচ্ছে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ের খেলোয়াড়দের মধ্যেও এই ধরনের হাড়ের চোট ক্রমেই বড় সমস্যা হয়ে উঠছে।
তরুণ পেসার ক্যালাম ভিডলার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বিষয়টির ভয়াবহতা বুঝেছেন। ‘কেউ কেউ এটাকে এক ধরনের রাইট অব প্যাসেজ বা পেসার হওয়ার পথে স্বাভাবিক একটি ধাপ বলে মনে করেন। কিন্তু আমি মনে মনে আশা করছিলাম, আমাকে যেন এর মধ্য দিয়ে যেতে না হয়,’- ভিডলার বলেছেন।
অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পেস বোলিংয়ের দিকে তাকালেই সমস্যাটির ব্যাপ্তি বোঝা যায়। ভিডলার, মাহলি বিয়ার্ডম্যান ও চার্লি অ্যান্ডারসনের মতো তরুণরা পেশাদার ক্রিকেটের একেবারে শুরুর দিকেই চোটের ধাক্কা খাচ্ছেন।
অন্যদিকে ল্যান্স মরিস ও ক্যামেরন গ্রিনকে ক্যারিয়ারের মাঝামাঝি বয়সে কোমরের সমস্যার কারণে অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে। তাদের মেরুদণ্ডে স্ক্রু ও কেবল বসানো হয়েছে। অথচ তাদের বোলিংয়ের ওপর যতটা সতর্কতার সঙ্গে নজর রাখা হয়েছিল, অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থাপনা খুব কমই দেখা যায়।
স্পেন্সার জনসনের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। মাত্র ২৯ বছর বয়সে তিনি কোমরের স্ট্রেস ফ্র্যাকশ্চারে আক্রান্ত হন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, তার আগে উল্লেখযোগ্য কোনো কোমরব্যথার ইতিহাসও ছিল না।
আর প্যাট কামিন্সের ঘটনাটি তো অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেসারদের একজন হওয়া সত্ত্বেও ৩২ বছর বয়সে আবারও কোমরের স্ট্রেস ফ্র্যাকচারে আক্রান্ত হন তিনি। তার আগে বোলিংয়ের পরিমাণ বা কাজের চাপ নিয়ে এমন কোনো বড় সতর্ক সংকেতও পাওয়া যায়নি, যা দেখে আগাম এই চোটের আশঙ্কা করা সম্ভব ছিল।
অর্থাৎ শুধু কাজের চাপ কমিয়ে, বিশ্রাম দিয়ে কিংবা আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্স ব্যবহার করলেই যে এই সমস্যা পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব- তারও নিশ্চয়তা নেই।
দুই দশকের তথ্যেও বাড়ছে উদ্বেগ
এই সমস্যার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছেন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের প্রধান ফিজিওদের একজন নিক জোন্স। ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া ও অস্ট্রেলিয়া দলের সঙ্গে ১৪ বছরের পেশাদার ক্রিকেটে কাজ করতে গিয়ে কোমরের হাড়ের স্ট্রেস ইনজুরি নিয়ে বিস্তর গবেষণা ও অভিজ্ঞতা হয়েছে তার।
তবু এত অভিজ্ঞতার পরও সমস্যাটির সমাধান খুঁজে পেতে তিনি এখনো বেশ হতবাক। ‘এটা এখনো আমাদের ক্রিকেটে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি- এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই,’ বলেছেন জোন্স। গত মাসে অস্ট্রেলিয়ার পেস বোলিং কোচদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তিনি কোমরের হাড়ে স্ট্রেস ইনজুরি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন।
এই তথ্য এক-দুই বছরের নয়। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার গত দুই দশকের ডেটা নিয়ে তৈরি হয়েছে সেই গবেষণা। জোন্সের আগে অ্যালেক্স কুন্টুরিস, কেভিন সিমস, ডেভিড বিকলি ও রিচার্ড স’এর মতো বিশেষজ্ঞরা যে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, সেটিও এর অংশ।
সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে নতুন করে সতর্কতার ঘণ্টা বাজিয়েছে। কারণ কোমরের স্ট্রেস ফ্র্যাকশ্চারের সংখ্যা আবারও ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের ভয়াবহ পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে।
২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার বয়সভিত্তিক ও পাথওয়ে ব্যবস্থায় সতর্ক ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত এমআরআই পরীক্ষার মাধ্যমে এই ধরনের ইনজুরি তুলনামূলকভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি আবার বদলাতে শুরু করেছে।
আর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো- এই হিসাব কেবল ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার পাথওয়ে সিস্টেমের। অস্ট্রেলিয়ার সামগ্রিক ক্রিকেট পরিবেশে সমস্যাটি আরও বিস্তৃত।
টম হিল ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটে আট বছর জোন্সের সহকর্মী হিসেবে প্রধান চিকিৎসক ছিলেন। পরে তিনি পার্থে স্পোর্টস মেডিসিন নিয়ে ব্যক্তিগত চিকিৎসা শুরু করেন। তার অভিজ্ঞতা আরও বেশি উদ্বেগজনক। ‘কমিউনিটি ক্রিকেটে আমি সপ্তাহে পাঁচ-ছয়জন শিশুকে দেখি, যাদের কোমরের হাড়ে স্ট্রেস ফ্র্যাকচার হয়েছে,’- বলেছেন হিল।
এই বাস্তবতাই অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে, কিভাবে তরুণ পেসারদের গড়ে তোলা হবে, অথচ অতিরিক্ত ব্যবহারে তাদের শরীর ভেঙে পড়তে দেওয়া হবে না?
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে এই সমস্যার শিকড় কতটা গভীরে, তা বোঝা যায় আক্রান্তদের বয়স দেখলেই। কোমরের স্ট্রেস ফ্র্যাকশ্চারে আক্রান্ত কিছু শিশুর বয়স মাত্র ‘১২ বছর।’ বোলিংয়ের সময় কোমরের মেরুদণ্ডের ওপর যে বিপুল চাপ পড়ে, তার সঙ্গে শরীরের পাশের দিকে বাঁকানো এবং বিপরীতমুখী ঘূর্ণন যোগ হয়। অথচ মানুষের কোমরের মেরুদণ্ড মূলত সামনে-পেছনে বাঁকানোর জন্যই বেশি উপযোগী। ফলে দ্রুত বোলিংয়ের পুনরাবৃত্তিমূলক চাপ বাড়ন্ত বয়সের শরীরে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।
ল্যান্স মরিস
বাড়ন্ত হাড়ও পূর্ণবয়স্ক হাড়ের তুলনায় অনেক বেশি সংবেদনশীল। বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, পুরুষের পেশি-হাড়ের পূর্ণ বিকাশ এবং সর্বোচ্চ হাড়ের ঘনত্ব অর্জনের প্রক্রিয়া প্রায় ২৬ বছর বয়স পর্যন্ত চলতে পারে। ফলে কিশোর বয়সে অতিরিক্ত বোলিংয়ের চাপ শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
আর একবার কোমরের স্ট্রেস ফ্র্যাকচার হলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। নিক জোন্সের তথ্য অনুযায়ী, এমন চোট একবার হওয়ার পর পুনরায় হওয়ার সম্ভাবনা ‘৩৩ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে।’
বড় চারজনের চেয়েও বেশি বল করছে কিশোররা
চিকিৎসা ও স্পোর্টস সায়েন্স দলের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা এখানেই। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলের প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজলউড, মিচেল স্টার্ক কিংবা স্কট বোলান্ডের মতো অভিজ্ঞ পেসাররা যে পরিমাণ বল করেন, অনেক সময় তার চেয়েও বেশি বল অনুশীলনে করে ফেলছে বয়সভিত্তিক পর্যায়ের কিশোরেরা।
অস্ট্রেলিয়ার অভিজাত ক্রিকেট কাঠামোর পেসারদের অনেকেই সপ্তাহে মোটামুটি- ৯০ থেকে ১২০ বল, অর্থাৎ ১৫-২০ ওভার বল করেন। সেটিও দুই বা তিনটি সেশনে ভাগ করে, ম্যাচের সূচি এবং বয়স অনুযায়ী।
এমনকি পেশাদার পর্যায়েও এখন আলোচনা চলছে- একটি বোলিং সেশনের পর এক দিন নাকি দুই দিন বিশ্রাম দরকার? নির্দিষ্ট সময় পরপর পাঁচ থেকে ১০ দিনের ‘ডি-লোড’ বা কম চাপের সময় রাখা উচিত কি না? খেলোয়াড়ের বয়স, শরীরের অবস্থা এবং আগের ইনজুরির ইতিহাস অনুযায়ী এসব পরিকল্পনা করা প্রয়োজন কি না- এসব প্রশ্নও গুরুত্ব পাচ্ছে।
কিন্তু কমিউনিটি ক্রিকেটে চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক কিশোর প্রায় প্রতিদিনই বোলিং করছে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় পর্যায়ের ওয়ার্কলোড গাইডলাইন রয়েছে। সম্প্রতি সেগুলো আরও হালনাগাদও করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশনা কতটা মানা হচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
জোন্সের ভাষায়, ‘আমাদের কমিউনিটি ক্রিকেটে জাতীয় ওয়ার্কলোড গাইডলাইন আছে, যেগুলো আমরা সম্প্রতি হালনাগাদ করেছি। কিন্তু চ্যালেঞ্জ হলো, বাস্তবে সেগুলো মেনে চলার হার খুব শক্তিশালী নয়। আর প্রতিভাবান বাচ্চারা ভালো হওয়ার কারণে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় টানা হচ্ছে।’
অর্থাৎ প্রতিভাই অনেক সময় তাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যে ছেলেটি অন্যদের চেয়ে ভালো বল করছে, তাকে আরও বেশি ম্যাচে খেলানো হচ্ছে, আরও বেশি অনুশীলন করানো হচ্ছে, আরও বেশি বোলিং করানো হচ্ছে। অথচ সেই বয়সেই হয়তো তার শরীর সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা চায়।
শুধু ওয়ার্কলোড নয়, প্রশ্ন উঠছে বোলিং অ্যাকশন নিয়েও
তবে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের অভিজ্ঞ মহল মনে করে, সমস্যার পুরোটা শুধু কাজের চাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বোলিংয়ের কৌশল বা অ্যাকশনও গুরুত্বপূর্ণ। ড্যারিল ফস্টার বিশ্বজুড়ে ফাস্ট বোলারদের কোমরের স্ট্রেস ইনজুরি নিয়ে গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ। সত্তরের দশকের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি পেসার ডেনিস লিলির স্ট্রেস ফ্র্যাকশ্চার থেকে ফিরে আসার সময়ও খুব কাছ থেকে কাজ করেছিলেন তিনি। পরে দুই দশক ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার কোচ ছিলেন। কাজ করেছেন এমআরএফ পেস ফাউন্ডেশন ও লিলির বোলিং একাডেমিতেও।
জস হ্যাজলউড
এখনও পার্থের ক্রাইস্টচার্চ গ্রামার স্কুলে তরুণ কোচদের সহায়তা করেন ফস্টার। তার মতে, ছোট বয়স থেকেই পেসারদের এমন বোলিং অ্যাকশন তৈরি করা প্রয়োজন, যা তাদের শরীরের ওপর তুলনামূলক কম চাপ সৃষ্টি করবে।
‘এটা একটা মহামারি,’- ফস্টার সরাসরি বলেন। ‘এটা এতটা ভয়াবহ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি বলছি না যে ১০০ শতাংশ চোট বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু ১৩-১৪ বছর বয়সে যারা দ্রুত বোলিং করতে চায়, তাদের অন্তত ৮০ শতাংশকে আমরা যদি ২০-এর কোঠায় পৌঁছে দিতে পারি এবং তখনও তাদের সম্ভাবনাময় ফাস্ট বোলার হিসেবে ধরে রাখতে পারি, সেটাই বড় সাফল্য।’
তবে এখানে আবার একটি জটিল উদাহরণ সামনে আসে- ভারতের জসপ্রিত বুমরাহ। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পেসার ও কোচ রায়ান হ্যারিসের মতে, বোলিং অ্যাকশন নিয়ে অতিরিক্ত কঠোর নিয়ম তৈরি করাও বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ ক্রিকেটে এমন কিছু বোলার আছেন, যাদের অস্বাভাবিক অ্যাকশনই তাদের সাফল্যের অন্যতম কারণ।
‘আপনার কাছে যদি জসপ্রিত বুমরাহ কিংবা লাসিথ মালিঙ্গার মতো কেউ থাকে, আপনি যদি দেখেন তারা কিভাবে বোলিং করছে, তাহলে কি তাদের টেকনিক্যালি- ভুল- বলে অ্যাকশন বদলে দেওয়ার চেষ্টা করবেন? উত্তর হলো না,’ হ্যারিসের যুক্তি।
মজার ব্যাপার, বুমরাহ নিজেও লিলির প্রযুক্তিগত দর্শনের অনুসারী। অথচ বুমরাহর মেরুদণ্ডেও রয়েছে স্ক্রু ও কেবল। ক্যামেরন গ্রিন, ল্যান্স মরিসসহ অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের একাধিক পেসারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। অর্থাৎ শুধু ‘সঠিক’ অ্যাকশন তৈরি করলেই যে ইনজুরি ঠেকানো যাবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। তারপরও দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সফল ও টেকসই কিছু পেসারের গল্প হয়তো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়।
স্টার্ক-বোলান্ডের শৈশবেই লুকিয়ে আছে উত্তর?
মিচেল স্টার্কের শৈশবের ইতিহাস বেশ আলাদা। ‘ছোটবেলায় আমি বোলিং করতাম না, উইকেটকিপার ছিলাম,’- স্টার্ক বলেছেন। ‘১৫ বছর বয়স পর্যন্ত আমি বোলিং শেখাই শুরু করিনি।’
তার ধারণা, হয়তো এটিই কোনোভাবে তাকে সাহায্য করেছে। ছোটবেলা থেকেই নিয়মিত বোলিং করার অভ্যাস না থাকায় কৃত্রিম কংক্রিটের উইকেটে অসংখ্য ওভার করার অভিজ্ঞতাও তার হয়নি। ফলে কোমরের ওপর সেই দীর্ঘমেয়াদি চাপও পড়েনি।
স্কট বোলান্ডের গল্প আরও চমকপ্রদ। তিনি পেশাদার ক্রিকেটে এসেছেন তুলনামূলক দেরিতে- ২২ বছর বয়সে। এখন প্রায় ৩০ হাজার পেশাদার ডেলিভারি এবং ৫০০ প্রথম শ্রেণির উইকেটের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। কিন্তু একবারও তার কোমর ভাঙেনি।
‘১৪ বছর বয়স পর্যন্ত আমি মূলত ব্যাটার ছিলাম, একটু-আধটু বোলিং করতাম,’- বোলান্ড বলেন। অনূর্ধ্ব-১৬ পর্যায়েও তিনি নিয়মিত শুধু বোলার ছিলেন না। নিজের কাজিনের সঙ্গে কখনো কিপিং করতেন, কখনো বোলিং করতেন। কোনো পাথওয়ে প্রোগ্রামে থেকে প্রতিদিন বোলিং করার অভ্যাসও হয়নি।
‘আমি সপ্তাহে মাত্র দুবার বোলিং করতাম। তখন বুঝতাম না, কিন্তু এখন মনে হয়—ওই ছোট ছোট বিরতিগুলো শরীরের জন্য কতটা ভালো ছিল,’ তার উপলব্ধি।
মাইকেল নেসেরের গল্পেও একই ধরনের মিল পাওয়া যায়। কৈশোরের শুরুতে বড় ভাইকে বাড়ির পেছনের উঠানে নিয়মিত বোলিং করতে গিয়ে তার কোমরে স্ট্রেস ফ্র্যাকশ্চার হয়েছিল। তবে তার বাবা ছিলেন অর্থোপেডিক স্পাইন সার্জন। ফলে পরবর্তী কিশোর বয়সে নেসেরকে দ্রুত বোলিং করতে দেননি। বরং শুধু অফস্পিন করতে দিয়েছিলেন।
এর ফলে তিনি কিছু সময় ব্যাটার হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। কুইন্সল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-১৯ প্রোগ্রাম থেকে বের হওয়ার পর গ্রেড ক্রিকেটে ফিরে গিয়ে আবার সিম বোলিং শুরু করেন।
‘আমি মনে করি, এখনও খেলা চালিয়ে যেতে পারার অন্যতম কারণ হলো, এত অল্প বয়সে আমার পিঠে অতিরিক্ত -কিলোমিটার- জমা হয়নি। জুনিয়র পর্যায়ে বোলিং বন্ধ রাখা আমার জন্য এক অর্থে আশীর্বাদ ছিল। যদিও এর ফলে আমি একটু দেরিতে বিকশিত হয়েছি,’ নেসের বলেন।
নেসের, স্টার্ক ও বোলান্ডের অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্যাট কামিন্স ও ক্যামেরন গ্রিনের পথচলার বড় পার্থক্য আছে। দুজনকেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে শেফিল্ড শিল্ড ক্রিকেটে দ্রুত তুলে আনা হয়েছিল। অভিষেকের পর টানা তিন ম্যাচে নিউ সাউথ ওয়েলসের হয়ে কামিন্স করেছিলেন ‘১৩৬ ওভার।’ তৃতীয় ম্যাচেই করেছিলেন ৬৫ ওভার।
এর মাত্র ছয় মাস পর টেস্ট অভিষেকে ৪৪ ওভার বল করার পর শরীর ভেঙে পড়ে। গ্রিনের কাজের চাপ এতটা ভয়াবহ ছিল না। কিন্তু ক্যারিয়ারের শুরুতে টানা তিনটি শিল্ড ম্যাচ খেলার পর তিনিও চোটে পড়েন।
স্টার্কের প্রথম কোমরের স্ট্রেস ফ্র্যাকশ্চার এসেছিল ২৩ বছর বয়সে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত টানা ক্রিকেট খেলে তখন তিনি কার্যত থামার সুযোগই পাননি। তবে পরবর্তী সময়ে বিশেষায়িত শক্তিবর্ধক অনুশীলন ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে শরীরকে এমনভাবে তৈরি করেছেন, যা তাকে অবিশ্বাস্য স্থায়িত্ব দিয়েছে।
মিচেল স্টার্ক যেন অন্য গ্রহের
৩৬ বছর বয়সেও ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার বা তার বেশি গতিতে টেস্টের পর টেস্ট বোলিং করে যাচ্ছেন মিচেল স্টার্ক। নেসেরের কাছে এর ব্যাখ্যা খুব সহজ। ‘সে একজন ফ্রিক,’- হাসতে হাসতে বলেছেন নেসের।
নিক জোন্সও স্টার্ককে অস্ট্রেলিয়ার দেখা অন্যতম সেরা অ্যাথলেট হিসেবে মনে করেন। তার মতে, স্টার্কের কিছু জেনেটিক সুবিধা আছে। কিন্তু শুধু জিন দিয়ে এত দীর্ঘ ক্যারিয়ার সম্ভব নয়। এর সঙ্গে রয়েছে অসাধারণ পরিশ্রম, শৃঙ্খলা, মানসিক দৃঢ়তা এবং শরীরের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম মনোযোগ।
অস্ট্রেলিয়ার শারীরিক সক্ষমতা বিভাগের প্রধান রস হেরিজও স্টার্ককে বলেছেন, ‘ইউনিকর্ন’।
অ্যাশেজের সময় স্টার্ককে প্রায় অলিম্পিক অ্যাথলেটের মতো প্রস্তুতি নিতে দেখা গেছে। পাঁচ টেস্টের সিরিজ শেষ করতে শরীরকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখতে তিনি অ্যালকোহল প্রায় পুরোপুরি বাদ দিয়েছিলেন। বাড়ি ফেরার সময় এমন ফ্লাইটও বেছে নিয়েছেন, যাতে দ্রুত নিজের বিছানায় ফিরে পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারেন।
বাড়িতে বসিয়েছেন সনা। ব্যবহার করেন ইনফ্রারেড থেরাপি। পুষ্টিবিদের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করেন। অর্থাৎ শরীরের যত্নে বড় বিষয়গুলোর পাশাপাশি এক শতাংশের ক্ষুদ্র সুবিধাগুলোকেও তিনি গুরুত্ব দেন। এই কারণেই হয়তো ১০৫ টেস্টে ৪৩৩ উইকেট নেওয়ার পরও তার শরীর এখনও তাকে থামতে বাধ্য করেনি।
একটি পাঁচ দিনের টেস্টে স্টার্কের শরীর কতটা কাজ করে, তার একটি চমকপ্রদ হিসাব দিয়েছেন হেরিজ। একটি ম্যাচে মাঠে দাঁড়িয়ে তিনি মোট প্রায় ৫৪ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করেন। এর মধ্যে ১১ কিলোমিটার দৌড়ান ঘণ্টায় ১১ কিলোমিটারের বেশি গতিতে। প্রায় ৬ কিলোমিটার থাকে ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটারের বেশি গতির মধ্যে।
তার সর্বোচ্চ রান-আপ গতি ঘণ্টায় ২৪.৫ কিলোমিটার- অর্থাৎ অল্প সময়ের জন্য বিশ্বমানের মিডল-ডিস্ট্যান্স দৌড়বিদদের গতির কাছাকাছি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্টার্ক ছোটবেলায় অ্যাথলেটিক্সে সক্রিয় ছিলেন। বোলিং শেখার আগেই তিনি দৌড় ও শরীরচর্চার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন।
দ্রুত বোলারদের ইনজুরি কমানোর পুরোনো তত্ত্বগুলোর একটি ছিল- ভালো দৌড়বিদ তৈরি করো, তারপর ভালো ফাস্ট বোলার তৈরি হবে। লিলির সময়কার সেই দর্শনের কিছুটা যেন হারিয়ে গেছে।
রায়ান হ্যারিসের মতে, কোনো তরুণ পেসারের রান-আপ যদি দক্ষ না হয়, তাহলে শুরু থেকেই সেটি ঠিক করার জন্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত। কারণ রান-আপ যত কার্যকর হবে, বোলিংয়ের সময় শরীরের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তত কমবে।
স্টার্ক নিজেও মনে করেন, ছোটবেলায় যদি তিনি শক্তিবর্ধক অনুশীলন সম্পর্কে আরও জানতেন, তাহলে আরও আগে শুরু করতেন। এখন তার সূচিতে আট থেকে ১০ সপ্তাহের বিশেষ ট্রেনিং ব্লক থাকে, যেখানে মূল লক্ষ্য শরীরের শক্তি পুনর্গঠন। দীর্ঘ মৌসুমে ক্লান্তির কারণে যে শক্তি কমে যায়, সেটি ফিরিয়ে আনা হয় ওই সময়।
তার শারীরিক লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে ১০০ কেজি পাওয়ার ক্লিন এবং নিজের শরীরের ওজনের ছয় গুণ পর্যন্ত আইসোমেট্রিক মিড-থাই পুল। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিটি বোলারের শরীরের শক্তি ও ভারসাম্য পরিমাপ করতে বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে আইসোমেট্রিক বেল্ট স্কোয়াটে স্টার্ক দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী পেসারদের একজন।
বিশেষ করে শরীরের পোস্টেরিয়র চেইন- পিঠ, কোমর, হ্যামস্ট্রিং ও নিতম্বের পেছনের অংশ, শক্তিশালী রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়। এই অংশগুলো শক্তিশালী হলে কোমরের মেরুদণ্ডের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। কিন্তু সমস্যা আবার সেই একই জায়গায়, সময় কোথায়?
একজন ক্রিকেটার যদি একই সঙ্গে টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট খেলতে চান, তাহলে শরীরকে গড়ে তোলার জন্য আট থেকে ১০ সপ্তাহ আলাদা করে বের করা প্রায় অসম্ভব।
ব্যস্ত ক্যালেন্ডারও ক্রিকেটারদের বড় শত্রু
২০১১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৩ সালের আগস্ট- মাত্র দুই বছরে স্টার্ক খেলেছিলেন, ৯০টি ম্যাচ। বল করেছিলেন ১১৩৪ ওভার। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, বিগ ব্যাশ, ওয়ানডে কাপ, শেফিল্ড শিল্ড, সফর ম্যাচ, টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি- সবই ছিল সেই সূচিতে। এমনকি ইয়র্কশায়ারের হয়ে তিন ফরম্যাটেও খেলেছেন।
শেষ পর্যন্ত ভারত ও ইংল্যান্ড সফরের পর শরীর আর চাপ নিতে পারেনি। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি আইপিএলে খেলেননি। ব্যক্তিগতভাবে সেটি ছিল বড় আর্থিক ত্যাগ; কিন্তু সেই সময়টুকু নিজের শরীরের জন্য বিনিয়োগ করেছিলেন। সম্ভবত সে সিদ্ধান্তই তাকে আরও কয়েক বছর উচ্চ পর্যায়ে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।
পরে আইপিএলে ফিরেছেন, কিন্তু সময় বের করতে টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছেড়ে দিয়েছেন। কারণ ৩৬ বছর বয়সে এসে সবকিছু একসঙ্গে করা তার কাছেও অসম্ভব।
‘৩৬ বছর বয়সে এখন আমার জন্য এটা অনেক বেশি। তাই একটি সাদা বলের ফরম্যাট ছেড়ে দিয়েছি,’- স্টার্ক বলেছেন। ‘প্রত্যেকের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। কিন্তু একই সময়ে তিন ফরম্যাট সামলানো মোটেও সহজ নয়।’
অ্যালান বর্ডার ফিল্ডের পাশের রে লিন্ডওয়াল ওভালে এক অনুশীলন সেশনে অস্ট্রেলিয়ার তরুণ পেসার ক্যালাম ভিডলারকে দেখা যাচ্ছিল। পাশের নেটে বল করছিলেন মিচেল স্টার্ক।
ভিডলার নিজের রান-আপ ও ক্রিজে গ্যাদারিং নিয়ে স্টার্কের কাছ থেকে পরামর্শ নিচ্ছিলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে স্টার্কের মাথায় ঘুরছিল আরও বড় একটি প্রশ্ন। ‘সে শুধু ক্রিকেট খেলতে চায়। আপনি কিভাবে একটা বাচ্চাকে বলবেন, একটু থামো?’
প্রশ্নটির মধ্যেই যেন অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান পেস বোলিংয়ের পুরো সংকটটা লুকিয়ে আছে। স্টার্ক নিজেও চান ওই চার-পাঁচজন তরুণ পেসার এখনই ২৫ বছর বয়সী হোক। কারণ তাহলে তারা হয়তো পরিণত, শক্তিশালী এবং প্রস্তুত টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে জাতীয় দলের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকত। ‘আমি চাই ওই চার-পাঁচজন এখনই ২৫ বছরের হতো। তাহলে তারা যখন দরজা দিয়ে বের হতো, তখন প্রায় প্রস্তুত টেস্ট ক্রিকেটার থাকত,’ স্টার্ক বলেন।
অস্ট্রেলিয়ার তরুণ পেসারদের সময় দরকার, অথচ তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অভিজ্ঞ পেসারদের সময় ফুরিয়ে আসছে। একদিকে কামিন্স, হ্যাজলউড, স্টার্ক ও বোলান্ডের বয়স বাড়ছে। অন্যদিকে ভিডলার, বিয়ার্ডম্যান, অ্যান্ডারসনদের শরীর এখনও প্রস্তুত হওয়ার পথে।
মাঝখানে যে প্রজন্মটি সেতু তৈরি করার কথা ছিল, অস্ট্রেলিয়া সেখানে সবচেয়ে বড় শূন্যতার মুখে। আর ক্রিকেটের সবচেয়ে নির্মম সত্যটি হলো- সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না।
আইএইচএস/
What's Your Reaction?