‘সালিশ’ শেষ হয় কিন্তু শেষ হয় না হুরবানুর কথার রেশ

খৈয়াম কাদের নূর কামরুন নাহার একাধারে কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সাহিত্য-আলোচক এবং অনুষ্ঠান-উপস্থাপক। শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনগুলোর প্রত্যেকটিতে তার উপস্থিতি জলছাপের মতো স্বকীয়। তিনি ব্যক্তি হিসেবে চলন-বলন ও কর্ম-যাপনে যেমন সুঠাম, শিল্প সৃজনেও ঠিক তেমনই নিপুণ ও নৈর্ব্যক্তিক। তার সাহিত্যকর্মে অকারণ প্যাচালের অবতারণা অনুপস্থিত। আবার ঊনবর্ণনাজাত অপূর্ণতাও তার সৃষ্টিকে রুগ্ন করে না। তার ভাবনা, ভাষা, গঠন, প্রকরণ, অলঙ্করণ ও উপস্থাপন—সবই পরিমিত এবং প্রাসঙ্গিক। তার রচনায় আবেগের তারল্য থাকে না, থাকে না বাস্তবতার অরাস্য রুক্ষতা। বরং সেখানে মুদ্রিত এবং চিত্রিত হয় এ দুইয়ের যৌক্তিক ও শৈল্পিক সামঞ্জস্য। তার সাহিত্য জীবনকে প্রতিবিম্বিত এবং প্রত্যায়িত করে দ্রষ্টার ভঙিমায়, বিচারক বা ভিকটিমের অবস্থান থেকে নয়। ফলে তার সাহিত্য একইসঙ্গে জীবনঘনিষ্ঠ এবং নৈর্ব্যক্তিক হয়ে ওঠে; সৃষ্টি করে নিরপেক্ষ ও নির্বিশেষ বোধিভাস্কর্য। তাম্রলিপি প্রকাশনী ঢাকা থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘বাঘের আঁচড়’ শিরোনামে নূর কামরুন নাহারের একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। বক্ষমান লেখায় এই গ্রন্থের সূচনা-গল্পটি নিয়ে খুব সংক্ষেপে কি

‘সালিশ’ শেষ হয় কিন্তু শেষ হয় না হুরবানুর কথার রেশ

খৈয়াম কাদের

নূর কামরুন নাহার একাধারে কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সাহিত্য-আলোচক এবং অনুষ্ঠান-উপস্থাপক। শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনগুলোর প্রত্যেকটিতে তার উপস্থিতি জলছাপের মতো স্বকীয়। তিনি ব্যক্তি হিসেবে চলন-বলন ও কর্ম-যাপনে যেমন সুঠাম, শিল্প সৃজনেও ঠিক তেমনই নিপুণ ও নৈর্ব্যক্তিক। তার সাহিত্যকর্মে অকারণ প্যাচালের অবতারণা অনুপস্থিত। আবার ঊনবর্ণনাজাত অপূর্ণতাও তার সৃষ্টিকে রুগ্ন করে না। তার ভাবনা, ভাষা, গঠন, প্রকরণ, অলঙ্করণ ও উপস্থাপন—সবই পরিমিত এবং প্রাসঙ্গিক। তার রচনায় আবেগের তারল্য থাকে না, থাকে না বাস্তবতার অরাস্য রুক্ষতা। বরং সেখানে মুদ্রিত এবং চিত্রিত হয় এ দুইয়ের যৌক্তিক ও শৈল্পিক সামঞ্জস্য। তার সাহিত্য জীবনকে প্রতিবিম্বিত এবং প্রত্যায়িত করে দ্রষ্টার ভঙিমায়, বিচারক বা ভিকটিমের অবস্থান থেকে নয়। ফলে তার সাহিত্য একইসঙ্গে জীবনঘনিষ্ঠ এবং নৈর্ব্যক্তিক হয়ে ওঠে; সৃষ্টি করে নিরপেক্ষ ও নির্বিশেষ বোধিভাস্কর্য। তাম্রলিপি প্রকাশনী ঢাকা থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘বাঘের আঁচড়’ শিরোনামে নূর কামরুন নাহারের একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। বক্ষমান লেখায় এই গ্রন্থের সূচনা-গল্পটি নিয়ে খুব সংক্ষেপে কিছু কথা বলা হলো।

গল্পটির শিরোনাম ‘সালিশ’। এ গল্পের আলোচনা কয়েকটি স্তরে বিন্যস্ত করা যায়। যেমন- বিষয়বস্তু, ঘটনা পরম্পরার বিস্তারণ, কাহিনি ও আখ্যানিক ঐক্য, বলার কৌশল ও ভঙিমা, চরিত্র-চিত্রায়ণ, ভাষা-বৈশিষ্ট্য ও শিল্প-প্রকরণ এবং ক্যাটাস্ট্রফিক ক্লাইমেক্স।

গল্পের বিষয়বস্তু

গল্পটির বিষয়বস্তু বাংলাদেশের চিরায়ত গ্রামজীবনের বৈবাহিক সম্পর্ককেন্দ্রিক। বাংলা গল্পসাহিত্যের ইতিহাস-বিচারে বিষয়টি নতুন নয়। তবে গ্রামভিত্তিক প্রাকৃত-সমাজে নরনারীর দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগতভাবে কতগুলি আর্থসামাজিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও মনো-দৈহিক প্রসঙ্গ সক্রিয় ভূমিকা রাখে। এই গল্পের লেখক সেসবের এমন তাত্ত্বিক ও বাস্তবানুগ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন যে পুরোনো বিষয়টি নতুনরূপে আবির্ভূত হয়েছে। গ্রামের দরিদ্র গেরস্থ করিম মিয়া। মেয়েদের বিয়েশাদি দিতে গিয়ে প্রায় ভূমিহীন হয়ে পড়ে। অভাব কাটাতে বড় ছেলে শরীফকে অন্যের জমিতে গতর খাটাতে লাগায়। কিন্তু সংকট যায় না। গাঁয়ের লোকজনের পরামর্শে জমির শেষ টুকরোটি কট রেখে ছেলেকে বিদেশে পাঠায় সংসারে সচ্ছলতা আনার জন্য। ভাগ্য বৈরী। দালারের খপ্পরে পড়ে সে দেশে ফিরে আসে শূন্য হাতে। ‌‘অভাবী মানুষকে পরামর্শ দেবার মানুষের অভাব নেই।’ এ পর্যায়ে গ্রামের লোকজন শরীফকে বিয়ে করানোর পরামর্শ দেয় বেশ জোরেশোরে। ভিন গাঁয়ের মেয়ে ‘হুরবানু’র সাথে সম্বন্ধের প্রস্তাব আনে পুবপাড়ার হানিফ। হানিফ করিম মিয়াকে বলে—‘মাইয়্যার বাড়ির অবস্থা বালা। ভাইগন্তী মাইয়্যা। গরে লইয়া আও। দেখবা সংসারের চেহারা ফিরব।’ ‘করিম মিয়া মেয়ে দেখে কিছুদিন গুম হয়ে ছিল।’ কারণ ‘হুরবানুর রং কালো, লম্বা, ঢেঙ্গা শরীর। বড় কপাল। ছোট ছোট দুটো চোখ। চোখের ওপরের ভ্রুর অংশটা একটু ফোলা ফোলা। নাকটা সামান্য বোঁচার দিকে। লম্বা চেহারায় বেক্কল ভাব সাঁটা।’ এই প্রেক্ষিতে ঘটক হানিফ বলে—‘মাইয়্যার সব বালা শুধু মাইয়্যা কালা। এইডা কোনো ব্যাপার না। খুব কামের মাইয়্যা।’ অন্যদিকে ‘আশপাশের দুএকজন মুরুব্বিও বলে ‘মাইয়্যা কালা এডা ঠিক কিন্তু তুমার পুতের সুরত কী? আর বেকার পোলা, হুদা হাত, গরের চাল ভাঙা, এমুন জায়গায় হাইদ্দা তুমারে কেডা মাইয়্যা দিব।’ হ্যাঁ, ‘কথাটা পুরাই খাঁটি। কারণ শরীফও একটা বদসুরত ছেলে। মাথাটা শরীরের তুলনায় বেঢপ বড়, কপালের হাড় উঁচু, তাই চোখ দুটো একেবারে কোটরের ভিতর। পুরু কালো ঠোঁট, থুতনিটা নিচের দিকে সরু হয়ে ঝুলানো। গাট্টাগোট্টা খাটো দেহ, গায়ের রং মাশাল্লাহ কালো।’

অবশেষে সাতপাঁচ ভেবে করিম মিয়া রাজি হয়ে যায়। শরীফের বউ হয়ে হুরবানু চলে আসে করিম মিয়ার বাড়িতে। হুরবানুর বাপের কাছ থেকে পাওয়া যৌতুকের টাকায় গ্রামের সড়কের মুখে পান বিড়ি সিগারেটের দোকান দেয় করিম। হুরবানুর বিদেশবাসী ভাইয়ের পাঠানো টাকায় শরীফ ও তার ছোট ভাই সাজাহান (সজীব) মেকানিকের কাজ শেখে। আয়রোজগার বাড়তে থাকে, করিম মিয়ার সাংসারিক অবস্থার উন্নতি হয়। বাড়িঘরের চেহারা বদলে যায়। কিন্তু কথায় আছে গতরে তেল ধরলে মনেও রং লাগে। হুরবানুকে শরীফের আর ভালো লাগে না। হুরবানু খুব কর্মঠ এবং লক্ষ্মী মেয়ে। তার কোনো আলসেমি নেই, অভিযোগ অনুযোগ নেই। নেই কোনো চাহিদা এবং দাবি। কথা বলে না বললেই চলে। শাশুড়ি আসমা বেগমের নির্দেশনা এবং নিজের বিবেচনা মোতাবেক অবিরাম কাজ করে। ইতোমধ্যে ঘরে একটি কন্যা সন্তান এসেছে। নাম পরী, এখন বয়স আড়াই বছর। বাচ্চাটিও মায়ের মতোই শান্ত। সব মিলিয়ে হুরবানুর আগমনের পর থেকে করিমের সংসার অভাবমুক্ত এবং মর্যাদাপূর্ণ। এতকিছু সত্ত্বেও শরীফের একটিই কথা—‘আমার কালা বউ বালা লাগে না।’ বিষয়টি সুরাহার জন্য মেল বা সালিশ বসে। গ্রামের চেয়ারম্যান, মেম্বার ও মসজিদের হুজুরসহ আরও দশজন সমবেত হয় করিম মিয়ার আঙিনায়। হুরবানুর বাপ-ভাই আসে। নানামুখে নানাকথা হয়। ফয়সালার শেষপ্রান্তে এসে চেয়ারম্যান হুরবানুর কথা শুনতে চায়। সদা নীরব হুরবানু উত্তরহীনতার অনুরণনঋদ্ধ এমন এক ক্ষুদ্র কথা উচ্চারণ করে যার ওজন অনির্ণেয় এবং দৈর্ঘ্যে অন্তহীন। সালিশ শেষ হয়, রায় অনুক্ত রয়ে যায় অথবা রায় হয় না; হুরবানুর কথা ক্রমাগত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে সালিশের দর্শক-শ্রোতা এবং গল্পের পাঠকদের বোধিকর্ণে। শেষহীনতার রেশ নিয়ে গল্প শেষ হয়, কিন্তু শেষ হয় না গল্প, শেষ হয় না পাঠকমনের কৌতূহল ও জিজ্ঞাসা।

ঘটনা-পরম্পরার বিস্তারণ

কাহিনি-নির্ভর সাহিত্যে গল্পসংশ্লিষ্ট চরিত্র বা চরিত্রগুলোকে কেন্দ্র করে কতগুলো ঘটনা আবর্তিত হয়। এইসব ঘটনার পারম্পর্যিক প্রবাহ সৃষ্টির ক্ষেত্রে কয়েক ধরনের ন্যারেটিভ টেকনিক ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তার মধ্যে একটি হলো কার্যকারণিক ধারাবাহিকতা বা ক্যজ অ্যান্ড এফেক্ট অর্ডার। কামরুন নাহারের গল্পে ঘটনা পরম্পরার এই ধারাটিই প্রযুক্ত হয়েছে। যেমন- মেয়েদের বিয়ে সংক্রান্ত খরচ মেটাতে গিয়ে করিম মিয়া প্রায় ভূমিহীন হয়ে পড়ে। পরিণতিতে ছেলে শরীফ মিয়াকে পরের জমিতে জন খাটাতে হয়। একপর্যায়ে অবশিষ্ট জমিটুকু কট রেখে ছেলেকে বিদেশে পাঠায় সংসারে প্রাণ ফেরানোর আশায়। কিন্তু দালালের হাতে প্রতারিত হয়ে সে শূন্য হাতে দেশে ফেরে। ফলে পরিবারের দারিদ্র্য আরও চরম আকার ধারণ করে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য শরীফকে একটি স্বচ্ছল পরিবারে বিয়ে করায় যৌতুকের বিনিময়ে। মেয়ে পছন্দ নয়। তবু বিয়ে হয় টাকার জন্য। পুত্রবধূ হুরবানুর বাবা ও ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের গুণে করিম মিয়ার সংসারে সুদিন ফিরে আসে। আর করিম মিয়ার এই সুদিন হুরবানুর জন্য বয়ে আনে চরম দুর্দিন। অর্থাৎ সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরায় হুরবানুর স্বামী শরীফসহ পরিবারের প্রায় সব সদস্যের আচরণ ও মনোভঙ্গিতে ভয়ংকর পরিবর্তন ঘটে। শরীফ এখন আর হুরবানুকে নিয়ে খাইতে চায় না। কারণ হুরবানু কালো, অসুন্দর। শরীফের নিজের সুরতও কুৎসিত, বেঢপ। তাতে কী। সে তো পুরুষ মানুষ। বিষয়টি নিয়ে শেষ পর্যন্ত করিম মিয়ার বাড়িতে সালিশ বসে। মেলের প্রধান ব্যক্তি এলাকার চেয়ারম্যান। উপস্থিত হয় স্থানীয় মেম্বার, মসজিদের হুজুর এবং গ্রামের মানুষ। নীরবে-নিঃশব্দে অবিরাম কাজ করায় অভ্যস্ত হুরবানুর একটি ছোট্ট কথা সব কলরব স্তব্ধ করে দেয়। ফিকশনাল সাহিত্যে গল্প শুরু করার ক্ষেত্রেও লেখকরা নানান কৌশল অবলম্বন করেন। নূর কামরুন নাহার তার গল্পটি কাহিনির গোড়া থেকে শুরু করেননি। মধ্যখান থেকে শুরু করে প্রাসঙ্গিকতার সূত্রপথে গল্পের গোড়াতে গিয়ে ঘটনাবলির ক্রমপরম্পরার ধারায় আবার শনৈঃ শনৈঃ এগিয়ে গেছেন গল্পের ক্যাটাস্ট্রফির দিকে।

কাহিনি ও আখ্যানিক ঐক্য

আখ্যান ও কাহিনি-কেন্দ্রিক সাহিত্যে গল্প তৈরি, গল্পের বিন্যাস ও গল্প পরিবেশনায় ঐক্য বা ইউনিটি সংরক্ষণের একটি ধ্রুপদী রেওয়াজ আছে। ঐক্যগুলো হলো—কাহিনির কার্যকারণিক ঐক্য বা ইউনিটি অব অ্যাকশন, ঘটনাসমূহ সংঘটনের স্থানিক ঐক্য বা ইউনিটি অব প্লেইস এবং কাহিনি সংঘটনের সময়গত ঐক্য বা ইউনিটি অব টাইম। বর্তমান গল্পে এই তিনটি ঐক্যই যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। বলা যায়, এ ক্ষেত্রে গল্পকার যথেষ্ট দক্ষতা ও পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন।

ইউনিটি অব অ্যাকশনের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সব প্রসঙ্গ, অনুষঙ্গ এবং উপসঙ্গ কেবল হুরবানুকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। অন্য কথায় সব ঘটনা হয় তার থেকে উৎপন্ন বা উদ্গত হয়, অথবা অন্যত্র উৎপন্ন হয়ে অনিবার্যভাবে তার দিকেই ধাবিত হয়। গল্পজুড়ে শেষপ্রান্তের একটিমাত্র ঊনকথা বাদে আর কোথাও তাকে কোনো কথা বলতে দেখা যায় না। অথচ সব চরিত্রের সমস্ত কথা শুধু তাকে নিয়ে। সব ঘটনার উৎসে, প্রান্তে, উপান্তে এবং পরিপ্রান্তে কেবলই হুরবানু। অর্থাৎ পুরো গল্পটি হুরবানুময়। এভাবে গল্পের অ্যাকশনটি একেবারে এক-কেন্দ্রিক হয়ে ওঠে এবং হুরবানু হয়ে ওঠে গল্পের প্রটাগোনিস্ট তথা একমাত্র কেন্দ্রীয় চরিত্র।

স্থানিক ঐক্য বা ইউনিটি অব প্লেইসের ক্ষেত্রে দেখা যায়, গল্পটি শুরু হয় করিম মিয়ার বাড়ি বা আঙিনায়, শেষও হয় সেখানেই। এই গল্পের প্রধান ন্যারেটার গল্পকার নিজে। তিনি কাহিনির ঘটনা বিন্যাসের বর্ণনায় শরীফের বিদেশে যাওয়ার কথা বলেছেন, হুরবানুর বাপের বাড়ির কথা বলেছেন, হুরবানুর ভাইয়ের বিদেশে থাকার কথা বলেছেন, পুবপাড়ার কথা বলেছেন—কিন্তু এর সবকিছুই করিম মিয়ার পরিবারের বসবাসের ঠিকানাকেন্দ্রিক। দ্বিতীয় প্রধান বর্ণনাকারী হুরবানুর শাশুড়ি আসমা বেগম এবং সংগত কারণেই তার কথার উৎসস্থল একান্তভাবেই করিম মিয়ার বাড়ি। আর গল্পের চূড়ান্ত পর্বে যে মেল বা সালিশ বসে তার স্থানও করিম মিয়ার বাড়ির আঙিনা। অর্থাৎ গল্পের শুরু, অগ্রগতি ও পরিণতির প্রয়োজনে লেখককে বিভিন্ন স্থান ও জায়গার কথা বলতে হয়েছে, কিন্তু সব ঘটনার অকুস্থল একটিই এবং তা হলো করিম মিয়ার বাড়ি। সুতরাং এই গল্পে স্থানিক ঐক্য পুরোপুরি রক্ষিত হয়েছে।

ইউনিটি অব টাইমের ব্যাপারটি এখানে আরও স্পষ্ট। গল্প-সাহিত্যের প্রাণস্পন্দন হলো সংকট ও দ্বন্দ্ব তথা ক্রাইসিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট। এই গল্পে দেখা যায়, সংকটের শুরু কোনো এক ভোরে এবং পরিণতিও সেইদিনেরই শেষভাগে। যেমন—‘আজও ফজরের আজানের সাথে সাথে বিছানা ছাড়ে হুরবানু। সব সেরে উঠান ঝাঁট দেওয়া শুরু করে। উঠান ঝাঁটের শব্দ শুনে প্রতিদিনের মতোই আসমা ওঠে। কিন্তু আজ আর ওজুর বদনার দিকে না গিয়ে উঠানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলে—‘আজগা আর উডান ঝাড়ু দেওনের কাম কী?’ গরম ভাত শ্বশুরের পাতে প্রতিদিন হুরবানুই বেড়ে দেয়। ভাত বেড়ে দেবার সংকেত হলো নামাজ সেরে পিছদোরে এসে শ্বশুরের গলা খাকারি দেওয়া। আজ শ্বশুরের কোনো গলা খাকারি শোনে না হুরবানু। দরজার সিঁড়িতে বসে মিটসেফ থেকে শাশুড়ির ভাতের পাতিল নামানোর শব্দ শোনে। ভাত বাড়ার শব্দ শোনে। শ্বশুর পাটিতে বসে খাচ্ছেন সেটাও সে পেছন ফিরেই বুঝতে পারে। কোনোরকম কথা আর শব্দ ছাড়াই ভাত খাওয়া শেষ করে হম্মুখদোর দিয়ে শ্বশুরের বাইরে যাবার শব্দও পায় সে।’ এই বর্ণনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় আজকে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা বাড়ির অন্যদের মতো হুরবানুও সম্যক অবগত আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে তার দৈনন্দিন কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখেনি। বরং প্রতিদিনের মতো একদম নির্বিকারভাবে সে সংসারের যাবতীয় কাজ করছে। মধ্যাহ্নের পর করিম মিয়ার বাড়ির আঙিনাতেই মেল বা সালিশ বসে এবং এই মেলের সিদ্ধান্তহীন সমাপ্তির মধ্য দিয়ে গল্পেরও পরিসমাপ্তি ঘটে।

গল্প বলার কৌশল ও ভঙিমা

লেখক গল্প বলার কৌশলে বিভিন্ন ধারার সমন্বয় ঘটিয়েছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফার্স্টহ্যান্ড ন্যারেশান এসেছে লেখকের নিজের মুখ থেকে। এই বর্ণনা প্রাথমিক ও মৌলিক হওয়ার ফলে এখানকার তথ্য-প্রসঙ্গগুলো পাঠকের কাছে অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। লেখকের নিজের বলা কথাগুলো স্টাইলের দিক থেকে বর্ণনামূলক এবং বিবৃতিমূলক; যদিও কখনো কখনো তা সংলাপীয় (ডায়ালগিক) নাট্যরূপও (ড্রামাটিক) ধারণ করে। অন্যদিকে দ্বিতীয় কথক আসমা বেগমের বর্ণনায় সৃষ্টি হয়েছে উপস্থাপনিক বৈচিত্র্য। এই ন্যারেটারের কথাগুলো সাধারণত স্বগতোক্তি বা আত্মকথন। তবে নীরব শ্রোতামুখী কিছু একক-কথনও আছে। সাহিত্যের সমঝদার ও বিজ্ঞজনেরা জানেন নাট্য-সাহিত্যের মনোলগ কাব্যসাহিত্য এবং কথাসাহিত্যেও ড্রামাটিক মনোলগ ফর্মে ব্যবহৃত হয়। এটি খুবই শক্তিদীপ্ত একটি কথন-কৌশল। মনোলগিক কথনে একইসঙ্গে কথক এবং কথনের উদ্দিষ্ট চরিত্রের ব্যক্তি-স্বভাব ও অন্তর্চিন্তনের উন্মোচন ঘটে। বস্তুতপক্ষে উদ্দিষ্ট চরিত্রের উন্মোচনটিই প্রবলতর হয়। একইভাবে স্বগতোক্তিও বক্তার পাশাপাশি বক্তব্যলগ্ন ব্যক্তি ও ব্যক্তিদের বাহ্য এবং অন্তর্গত স্বভাবের তথা মনোজতের বোধি ও দৃষ্টিগ্রাহ্য চিত্র অঙ্কন করে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিমূর্ত ব্যক্তিত্বকে মূর্ত করে তোলে।

আলোচ্য গল্পে দেখা যায়, আসমা বেগমের একক-কথন ও স্বগতোক্তির মাধ্যমে তার নিজের ব্যক্তিচারিত্র যতটা না ব্যক্ত হয় তারচে ঢের বেশি অভিব্যক্ত হয় হুরবানুর চরিত্র এবং ব্যক্তিত্ব। মজার ব্যাপার হলো, হুরবানু নিজে কিন্তু কোনো কথা বলে না। তার নিজের কোনো প্রকাশ নেই, প্রচার নেই। তার প্রকাশ তার দায়িত্ব পালন, কর্ম সম্পাদন। সেটিও আসে শাশুড়ি আসমা বেগম এবং অন্যদের কথা থেকে। এ প্রসঙ্গে হুরবানু সম্পর্কে গল্পকারের নিজের কথা—‘ননদ-ননাসরা আইলে সারা দিন নিঃশব্দে কাম করে। আসমা বেগমের সব কথা নীরবে শুনে। কোনো কথার রা নাই, কোনো কামে না নাই। কোনো মানুষের লগে কোনো কথা লাগানো নাই। হাতের কাজের নকশি চোখ জুড়াইয়া দেয়। সারা দিন এমুন খাটে যে মাঝে মইধ্যে খুব মায়া লাগে। বউ কথা কম কয় এইডা নিয়া আসমা বেগমের আফসোস নাই, মাইয়্যা মানুষের এত মুখ লাড়নের কী কাম! এসব ভাবলে বউরে আবার অপছন্দ হয় কেমনে!’ দ্রষ্টব্য—কথাগুলো লেখকের নিজের মুখ থেকে উৎকলিত কিন্তু তার নিজের অবস্থান থেকে উৎপাদিত নয়। বরং আসমা বেগম ও হুরবানুর অবস্থানজাত কথাই তিনি নিজের ঠোঁটে তুলে নিয়েছেন। এতে করে কথাগুলো অনেক বেশি আক্ষরিক এবং বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে হুরবানুকে নিয়ে আসমা বেগমের আত্মকথন লেখকের ভাষায়—‘বাপের বাড়িতে গিয়ে বোঝা হইতে হইব। আর যদি কেউ নেয়ও দোজবর ছাড়া কি আর বিয়া বইতে পারব। কোলের মাইয়্যাডা রাইখা যাইতে হইব। মাইয়্যা মানুর জীবনডাই জানি (যানি) কেমুন, বেবিচ্যাইরা বানাইছে আল্লায়। বউডার বুকের ভেতর কেমন হুহু করতাছে তা কে জানে। কান পেতে শুনতে ইচ্ছা হয় আসমার। কিন্তু বউয়ের মুখে কোন কথা নেই। এই যে আজ তিনমাস ধরে এত কথা এত উথাল-পাতাল, বউ একদিন একটা কথাও বলে নাই। আসমা বার দুই হম্মুখদোর আর পিছদোর করে। তারপর ভাবে–এইডা কি মানু না অন্যকিছু। এত কিছুর মইধ্যেও যন্ত্রের লাহান কাম কইরা যাইতাছে। আর হেই যে পিছদোরে বসা দিছে অহনও বইসাই আছে। ভিতরটা মনে লয় চৈত মাসের রোদের লাহান খা খা করতাছে। মুহে নি তার কোনো চিন আছে।’ এই বক্তব্য দুটির মধ্য দিয়েই হুরবানুর ব্যক্তিমানস পূর্ণরূপে প্রতিবিম্বিত হয়েছে। তবে এখানে একটি কথা আছে, আর তা হলো বক্তব্য উপস্থাপনায় লেখকের অসতর্কতা ও উন্নাসিকতা। গল্পটির বিভিন্ন অংশের মতো এখানেও প্রান্তিক লোককথার সাথে প্রমিত কথার ভীষণ রকমের দূষণদুষ্ট মিশ্রণ ঘটেছে, যা বক্তব্যের মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্যকে অনেকখানি বিঘ্নিত করেছে। এই ভাষা মিশ্রণের ফলে কোন কথা কার মুখের তা-ও খানিকটা অনির্দিষ্ট হয়ে পড়ে। এ সত্ত্বেও বলতেই হয়—গল্প পরিবেশনার ধরনটি গল্পকারের আরেকটি বিশেষ কৌশল। উল্লিখিত কথনকৌশলগুলোর বাইরে ডায়ালগিক এবং পলিলগিক কথোপকথনও যথারীতি উপস্থিত এই গল্পে। গল্পের বিস্তারণ পর্বে এবং বিশেষ করে মেল বা সালিশ পর্বে কথোপকথনের এই কৌশল স্পষ্ট। এখানে চেয়ারম্যান, মেম্বার, ইমাম, গ্রামবাসী, শরীফ, করিম, হুরবানুর বাবা, হুরবানু— বিভিন্নজনের কথার সমারোহ আছে। এরূপ বহুমুখী কথোপকথনের মাধ্যমে একদিকে নির্বাচিত সমাজমানসের একটি চিরায়ত চিত্র যেমন অঙ্কিত হয়েছে; অন্যদিকে গল্পের কাহিনিও তেমন বাস্তবানুগভাবে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে।

চরিত্র-চিত্রায়ণ

কথাসাহিত্যের অনিবার্য প্রসঙ্গ চরিত্র-চিত্রায়ণ। চিত্রিত চরিত্র বা চরিত্রগুলোকে ঘিরে কিছু প্রাসঙ্গিক ঘটনা সংঘটিত হয় এবং সে ঘটনাগুলোর সম্মিলিত রূপই গল্প বা কাহিনি হয়ে ওঠে। সুতরাং চরিত্র বা চরিত্রগুলোর জীবন পরিক্রমাই গল্পসাহিত্যের প্রাণ, শরীর ও সত্তা। ফিকশনাল সাহিত্যে চরিত্র-চিত্রায়ণ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে কখনো কখনো পাঠক লেখক ও তার সাহিত্যকর্মের নাম ভুলে যায় কিন্তু কোনো কোনো চরিত্রের নাম ভোলে না। সেসব চরিত্র কিংবদন্তির মতো মানুষের মুখে মুখ ঘোরে; নূর কামরুন নাহারের ‘হুরবানু’ হয়তো এইসব চরিত্রের মতো কিংবদন্তিতুল্য অবিস্মরণীয় নয় কিন্তু সে মানব-মনের সংবেদনশীল স্তরে স্থান পাবার যোগ্য অবশ্যই। হুরবানু খুব গুণবতী মেয়ে। সে নির্বিবাদী, শান্ত-স্বভাবী, কর্মঠ এবং দায়িত্বশীল। নিরলসভাবে সংসারের সমস্ত কাজকর্ম করে। পরিবারের সবার সেবা করে। পুরো বাড়ি পরিচ্ছন্ন রাখে, সাজিয়েগুছিয়ে রাখে। সে সেলাই-ফোঁড়াইয়ের নকশি কাজ জানে। তার কোনো চাহিদা নেই, অভিযোগ নেই। তার পরী নামে আড়াই বছরের একটি মেয়ে বাচ্চা আছে। সে তারও যথাযথ যত্ন নেয়। তার সুবাদেই করিম মিয়ার সংসার স্বচ্ছলতার মুখ দেখেছে, গ্রামে সম্মান পাচ্ছে। এতকিছু সত্ত্বেও কয়েকমাস যাবৎ তাকে ভীষণ মানসিক পীড়নে রাখা হয়েছে। এই নিপীড়ন নিয়েও তার কোনো রা নেই, প্রতিবাদ নেই। এককথায় বউ হিসেবে, স্ত্রী হিসেবে তার কোনো ত্রুটি নেই, দোষ নেই; বলা যায় কোনো তুলনাও নেই। তবু সে ভীষণ দোষী। কারণ তার নারীদেহে রূপের ঘাটতি আছে। সুতরাং তার সমস্ত গুণপনা তুষের মতো ফানুস হয়ে গেছে। শরীফ আজ নির্দয়ভাবে তাকে অস্বীকার করছে। এমনকি তার মাছুম বাচ্চাটির কথাও কেউ ভাবছে না। সালিশের চেয়ারম্যান মেম্বার ইমাম এবং গ্রামবাসীও না। এইভাবে হুরবানু একটি করুণদশী অসহায় চরিত্র হয়ে উঠেছে। ফলে পাঠক-অন্তরে তার জন্য সহজাত সহানুভূতি জন্ম নেয়।

হুরবানুর শাশুড়ি আসমা বেগমের চরিত্রটিও পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে। পুত্রবধূ হুরবানুর প্রতি তার কোনো অভিযোগ নেই। মনে হয় তেমন কোনো অনুরাগও নেই। সে আপনাআপনি হুরবানুকে নিয়ে ভাবে। হুরবানুর কুরূপতা নিয়ে তার কখনো কখনো একটু অস্বস্তি বোধ হয়। আবার মায়াও হয়। হুরবানুর দিকে তাকিয়ে নারী-জীবনের যে অসহায়ত্ব সে দেখে; সেটিও তাকে আবগতাড়িত করে। তার নিজের ভেতরের নারীত্বটিও কেঁদে ওঠে। অন্যদিকে অবুঝ শিশু পরীর কথাও সে ভাবে। পরীর মাতৃহারা হওয়ার সম্ভাবনা তাকে উদ্বিগ্ন করে। এসবের পাশাপাশি চেয়ারম্যান, মেম্বার, মসজিদের হুজুর এবং গ্রামবাসীর যে সমন্বিত চরিত্র অঙ্কিত হয়েছে তা-ও প্রণিধানযোগ্য। চেয়ারম্যান মনে করে শিশু মাইয়্যার দায়িত্ব শরীফ নেবে, হুরবানুর বাপ-ভাইয়ের দেওয়া টাকাসহ অন্যান্য জিনিসও সে ফেরত দেবে। তাহলে তো আর কোনো সমস্যা থাকে না। একইসাথে উপস্থিত লোকজন শরীফের বিশ্রি চেহারা নিয়ে কথা বললে সে তাদের ধমক দিয়ে বলে ‘স্বর্ণের আংটি বেঁকাও ভালো জানেন না আপনারা?’ এই কথার মাধ্যমে মানবিক সমতাহীন পুরুষতন্ত্রের যে উৎকট স্বরূপ তারই প্রকাশ ঘটেছে। পাশাপাশি যৌতুকের অর্থ ফেরত দেওয়া এবং মাছুম শিশু পরীর দায়িত্ব শরীফের নেওয়াতেই যেন সব সমস্যা সমাধান হয়ে গেল। গ্রাম্য মোড়লিপনার অসুস্থ গড্ডালিকায় চলা চেয়ারম্যানের জীবনে তো মনুষ্যত্ব এবং মানবিকতার কোনো পাঠ নেই। লোকমত বা লোকবিশ্বাসের স্থিরতাহীন স্বভাবটিও এখানে চিত্রিত হয়েছে। লোকেরা মাঝেমাঝে কিছু কথা বলে, কিন্তু চেয়ারম্যানের ধমকে তারা সেখান থেকে সরে দাঁড়ায়। আবার চেয়ারম্যান যা কিছু বলে; তারা নির্বিচারে তাতে সায় দেয়। সবার জানা, এটিও আমাদের সমাজ ব্যবস্থার এক চিরায়ত এবং নিষ্ঠুর চিত্র। চরিত্র সম্পর্কিত আলোচনার অস্তপাতে এসে বলা যায়, হুরবানু একটি ট্রাজিক চরিত্র। তবে একটু গভীরভাবে ভাবলে বোঝা যায়, তার চেয়েও অধিক ট্রাজিক চরিত্র পরী। সে বোঝে না, জানে না তার জীবনে কী ঘটতে যাচ্ছে। কারণ সে মাছুম, সে অবুঝ। সুতরাং সাহিত্যের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ মোতাবেক সে-ই এই গল্পের সবচেয়ে করুণ ভিকটিম।

ভাষা-বৈশিষ্ট্য ও শিল্প-প্রকরণ

সব জানরার সাহিত্যই ভাষার শিল্প। আর শিল্প মানেই সেখানে কোনো না কোনোরূপ চারু ও কারু-কর্ষণ থাকবে। নূর কামরুন নাহারের আলোচ্য গল্প ‘সালিশেও’ সেই সাহিত্যীয় শিল্পরূপ যথাঅর্থেই বিদ্যমান। এই গল্পের ভাষা ও শিল্প-প্রকরণের সঙ্গে গল্পটির আখ্যানিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। এখানে সেটিং হিসেবে চিত্রিত হয়েছে চিরায়ত গ্রামবাংলার প্রাকৃত জীবন-যাপনের ঐতিহ্যলগ্ন সামূহিক ক্ষেত্র এবং আবহ। ফলে গল্পের কাহিনিতে যুগপৎ-সংমিশ্রণে ব্যবহৃত হয়েছে শিক্ষিত সমাজের শালীন ও শীলিত ভাষা এবং পল্লি-গাঁয়ের লৌকিক ও আঞ্চলিক কথ্য বচন। কয়েকটি উদাহরণ—মুরগির খোঁয়াড়, ডাক্কুর ডাক্কুর আওয়াজ, ওজুর বদনা, মুতের খেতা, মাইয়্যা মানুষ, মানু, নাপাক শরীর, শাইত, লাকড়ি, ভাইগন্তি মাইয়্যা, ঢেঙ্গা, বেঢপ, বদসুরত, পুত, পোলা, হুদা, হাইদ্দা, কেডা, এইডা, গাট্টাগোট্টা, বউডা, মানুডা, আফনে, কেমুন, বেক্কল, হুনে, বাপ-পুত, বেবিচ্যাইরা, বেইনসাইফা, কালা, দোজবর, দিমু, মেল, হ, হুনছি, বেঢক, এমুন মাদানে চুলডি ভিজাইল্যা কেরে, ঝাঁট, গলা খাকারি, নাইওর, দোচালা ঘর, খাওন, এইডা কি মানু, যন্ত্রের লাহান কাম কইরা যাইতাছে, মাইয়্যা মানুর জীবনডাই জানি কেমুন, তাইলে বউ লইয়া খাইবা না ক্যা, হম্মুকদোর, পিছদোর, থেইক্যা, হেইডা, উসুল, টেহা, কওন, আবিয়াইত্তা ইত্যাদি শব্দ ও শব্দব্ন্ধ। চিত্রিত চরিত্রদের নিজ সমাজজাত এবং নিত্যকর্মে ব্যবহৃত এইসব কথা, উক্তি ও বচনের শরীরে এক ধরনের স্থানিক ও পারিবেশিক রং, রস ও স্বাদ প্রযুক্ত থাকে। আর ভাষার এই বিশেষ চারিত্র্য বৈশিষ্ট্যের মাঝে থাকে অনন্য সাধারণ শ্রুতিসৌন্দর্য। বাড়তি রসদ হিসেবে কথোপকথনের নাটকীয় ইঙ্গিত, উচ্চারণ-ধ্বনির স্বর-ব্যঞ্জনা এবং আঞ্চলিক বাচনভঙির অভিদ্যোতনা তো আছেই। সব মিলিয়ে ‘সালিশ’ গল্পটির ভাষা প্রকরণ ও সৌন্দর্য সৃজনে পরিমিত ও মার্জিত মানের একটি শিল্পরূপ দাঁড়িয়ে গেছে বলেই প্রতীয়মান হয়। গল্পটির সার্বিক মানমূল্যায়নে বলা যায় এর কাহিনিকে তিন অঙ্ক বিশিষ্ট একটি অসাধারণ নাটকে রূপান্তর সম্ভব।

ক্যাটাস্ট্রফিক ক্লাইমেক্স

গল্পের ক্যাটাস্ট্রফি আকস্মিক নয়, আবার আকস্মিক। ক্লাইমেক্সের ব্যাপারটিও একইরকম। আকস্মিক নয় এই জন্য যে, গল্পটি পড়তে পড়তে পাঠকের মনে ধীরে ধীরে এমন ধারণা জন্মাতে থাকে যে, আজকের সালিশের মাধ্যমেই হয়তো হুরবানুকে তালাক দেওয়া হবে। এই অন্যায় ও অমানবিক তালাকের আঘাতটি সয়ে নেবার জন্য পাঠক খানিকটা মানসিক প্রস্ততিও নিয়ে ফেলে। কিন্তু সালিশে এরকম কোনো সিদ্ধান্ত আসে না। আবার তালাক যে হলো না, বা হবে না তা-ও নিশ্চিত নয়। ফলে পাঠকের মনে একটি অস্পষ্ট সাসপেনশন তৈরি হয়। তবে অন্তত এই মুহূর্তে তালাকের ঘোষণা আসলো না বলে পাঠক-চিত্তে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো ক্যাথারসিসের অনুভূতিও সৃষ্টি হয়। হুরবানু ও তার অবুঝ কন্যা পরীর জীবনের অনিশ্চিত পরিণতি নিয়ে পাঠকের মনে যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার জন্ম হয় তা যেন ঝুলে পড়ে। পাঠক অস্থির হয়ে ওঠে। কী হলো! কী হবে? অন্যদিকে গল্পের ক্লাইমেক্সটি আকস্মিক এই জন্য যে, হুরবানুর মতো অতি নিরীহ এবং অতি স্বল্পবাক একজন লাজুক গৃহবধূ অতি শান্ত ভঙিমায় মহাবিপ্লবীর মতো অতি ক্ষুদ্র একটি প্রতিবাদী কথা ‘আমারে আপনারা আবিয়াইত্তা বানাইয়া দেন’ বলে মহা বিকট শব্দের কামান দাগিয়ে দেয়। এতে মেলের সমস্ত কোলাহল স্তব্ধ হয়। পাঠকমনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরও ঘনীভূত হয়, কৌতূহল দীর্ঘায়িত হয়। সালিশ তথা গল্প সমাপনের এই সিদ্ধান্তহীনতা থেকে অনুমিত হয় যে, গল্পটি রচনাকালে ছোটগল্প সম্পর্কিত রবীন্দ্রনাথের সংজ্ঞাটি নূর কামরুন নাহারের অন্তরে পুরোমাত্রায় জারি ছিল।

তাই বলা যায়, নূর কামরুন নাহারের ছোটগল্প ‘সালিশ’ শেষ হয়, কিন্তু শেষ হয় না এর রেশ? পাঠকের ভাবনায় দুলতে থাকে অনিঃশেষ কৌতূহল, অজস্র জিজ্ঞাসা!

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাবেক উপাধ্যক্ষ, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow