দেশে বর্তমানে প্রায় ২৪.৫ কোটি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যার মাধ্যমে মাসিক লেনদেনের পরিমাণ ১.৫ ট্রিলিয়ন টাকারও বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশের মোবাইল ইন্টারনেট প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হলেও এখনো ব্যবহারগত বৈষম্য (Usage Gap) একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ডিভাইসের উচ্চ মূল্য, ডিজিটাল দক্ষতার অভাব, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং প্রাসঙ্গিক কনটেন্টের সীমাবদ্ধতা এখনো বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে।
বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস-২০২৬ উদযাপন উপলক্ষ্যে ‘ডিজিটাল জীবনধারা: সংযোগে স্থিতি, সহনশীলতায় শক্তি’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রাজধানীর আগারগাঁওস্থ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) ভবনে আয়োজিত সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্যে বিটিআরসি’র স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আমিনুল হক বলেন, ডিজিটাল সংযোগ এখন কেবল প্রযুক্তিগত সুবিধা নয় বরং অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি অপরিহার্য জীবনরেখায় পরিণত হয়েছে। একটি সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল সমাজ গড়ে তুলতে নির্ভরযোগ্য কানেক্টিভিটি ও নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেমিনারে ‘Connectivity as the Lifeline of a Resilient Digital Economy’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জেডটিই করপোরেশন বাংলাদেশ লিমিটেডের ডেপুটি চিফ টেকনিক্যাল অফিসার সৈয়দ মো. সামশুর রহমান। ‘Digital Payments as Critical Rails of Economic Continuity’ বিষয়ে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বিকাশ-এর চিফ এক্সটার্নাল অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার মেজর জেনারেল (অব.) শেখ মো: মনিরুল ইসলাম। From Access to Impact: Delivering Meaningful Digital Services for Inclusive Growth শীর্ষক উপস্থাপনা করেন গ্রামীণফোনের চিফ বিজনেস অফিসার ড. আসিফ নাইমুর রশিদ।
পরবর্তীতে বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের কমিশনার জনাব মাহমুদ হোসেন এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন বিডিজবস ডটকমের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও এ কে এম ফাহিম মাশরুর, রবি আজিয়াটা লিমিটেডের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম, ইন্টারক্লাউড লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসিবুর রশিদ এবং শিক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শিখো’র প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও শাহীর চৌধুরী।
প্যানেল আলোচনায় বক্তারা বলেন, বর্তমান বিশ্বের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক লেনদেন এবং নাগরিক সেবার প্রতিটি ক্ষেত্র এখন ডিজিটাল সংযোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। তাই একটি স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সাশ্রয়ী ইন্টারনেট, মানসম্মত টেলিযোগাযোগ সেবা, নিরাপদ ডাটা অবকাঠামো এবং সহজলভ্য স্মার্ট ডিভাইস নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বক্তারা আরও বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতে সেবার মান উন্নয়নের সঙ্গে বিনিয়োগের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। গ্রাহকদের মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে অব্যাহত বিনিয়োগ প্রয়োজন। একইসঙ্গে ডাটা ও স্মার্টফোনের উচ্চমূল্য ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। তারা মনে করেন, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সেবার ওপর বিদ্যমান কর ও শুল্ক যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা গেলে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী ডিজিটাল সেবার আওতায় আসবে এবং শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আলোচকরা আরও বলেন, দেশে বিপুল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক অর্থনীতির যুগে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা বলেন, ডাটা ও ডিভাইস মানুষের হাতে পৌঁছে দিলে সাধারণ মানুষ নিজেরাই প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠবে। তাই ডিজিটাল সেবায় প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা কমিয়ে আরও বেশি মানুষের হাতে স্মার্টফোন ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে হবে।
সেমিনারে আগত অতিথিদের সম্মাননা স্মারক প্রদান করেন বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান মো. আবু বকর ছিদ্দিক। সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, টেলিকম রেগুলেটরকে সব পক্ষের অবস্থান ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হয়। সরকার, শিল্পখাত ও জনগণের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করে টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল খাতের উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়াই বিটিআরসির অন্যতম দায়িত্ব। তিনি বলেন, নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ডিজিটাল নির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সকলকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
এদিন সেমিনারে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষাবিদ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস-২০২৬ উদযাপনের অংশ হিসেবে টেলিকম সংশ্লিষ্ট সেমিনার এই আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও দিবস উপলক্ষ্যে ১৭ ও ১৮ মে দুইদিনব্যাপী বিটিআরসি প্রাঙ্গণে আয়োজিত টেলিকম মেলায় মোবাইল অপারেটর, মোবাইল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, টাওয়ার কোম্পানি, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার, আইসিএক্স অ্যাসোসিয়েশন, ব্যাংক, রোবোলাইভসহ টেলিকম ও প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট ৩০টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেছে।
মেলায় টেলিকম খাতসংশ্লিষ্ট দর্শনার্থী ছাড়াও বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন এবং বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ আগত দর্শনার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করে। মেলা চলবে ১৮ মে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত।