চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ও পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে নগরী। সরকারিভাবে হেরিটেজ ঘোষিত এই এলাকাকে ঘিরে নতুন করে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার খবরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সুর জোরালো হচ্ছে।
রোববার (১৯ এপ্রিল) সকালে সিআরবি সাত রাস্তার মোড়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে সিআরবি রক্ষা পরিষদ নামের একটি ব্যানারে। যেখানে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরাও সংহতি প্রকাশ করে অংশ নেন।
সিআরবি একদিকে চট্টগ্রামের ফুসফুস হিসেবে পরিচিত, অন্যদিকে নগরের একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। সেই জায়গায় হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব নতুন নয়। প্রায় এক দশক আগে ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এই প্রকল্প পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
পরবর্তীতে ২০২০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। একই বছরের ১৮ মার্চ বাংলাদেশ রেলওয়ে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে। এরপর ২০২১ সালের শুরুতে নির্ধারিত স্থানে প্রকল্পের সাইনবোর্ড স্থাপন করা হলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে এবং শুরু হয় তীব্র বিরোধিতা।
এ প্রকল্পের পরিকল্পনা ও সহযোগী সংস্থা হিসেবে রয়েছে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব কর্তৃপক্ষ (পিপিপি), আর কার্যনির্বাহী সংস্থা বাংলাদেশ রেলওয়ে। বাস্তবায়ন ও পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় ইউনাইটেড চট্টগ্রাম হাসপাতাল লিমিটেডকে। কিন্তু শুরু থেকেই এ উদ্যোগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক সমাজ। পরিবেশবাদী সংগঠন, সংস্কৃতিকর্মী, চিকিৎসক, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণির মানুষ সিআরবির জীববৈচিত্র্য ও ঐতিহ্য রক্ষার দাবিতে একত্রিত হন।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও এ প্রকল্পকে ঘিরে ব্যাপক সমালোচনা দেখা যায়। এমনকি দলটির মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ স্থানীয় নেতাদের অনেকেই প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করেন। দীর্ঘ ৪৮০ দিনের আন্দোলন, মানববন্ধন, বিক্ষোভ এবং নাগরিক প্রতিরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত সরকার সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণ না করার ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতে ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে আন্দোলনকারীরা তাদের কর্মসূচি স্থগিত করেন।
কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবারও এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে—এমন খবর সামনে আসতেই নতুন করে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। গত কয়েক দিনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংগঠন বিবৃতি দিয়ে এই উদ্যোগের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং স্থায়ীভাবে প্রকল্প বাতিলের দাবি তুলেছে। তাদের মতে, একটি সংরক্ষিত ও ঐতিহ্যবাহী এলাকায় বেসরকারি হাসপাতাল নির্মাণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান দেখা যাচ্ছে। সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন রোববার সকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, সিআরবিতে গাছ কেটে কোনো ধরনের হাসপাতাল বা স্থাপনা নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি চট্টগ্রামবাসীর আবেগের জায়গা এবং জনগণ কখনো এমন উদ্যোগ মেনে নেবে না। তার এই বক্তব্যে আন্দোলনকারীরা নতুন করে উৎসাহ পেয়েছেন।
বর্তমান সরকারের মন্ত্রীরাও এই প্রকল্প ঘিরে অবস্থান স্পষ্ট করতে শুরু করেছেন। রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সিআরবি এলাকা পরিদর্শনের ঘোষণা ঘিরেও নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে। আন্দোলনকারীরা মনে করছেন, এই পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রকল্পটি পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা হতে পারে। তাই আগেভাগেই তারা মাঠে নেমে প্রতিবাদ জোরদার করেছেন।
সিআরবি শুধু একটি খালি জমি নয়, এটি চট্টগ্রামের পরিবেশ, ইতিহাস এবং সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে রয়েছে শতবর্ষী বৃক্ষ, প্রাকৃতিক জলাধার এবং জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধ উপস্থিতি। নগরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন সবুজ অঞ্চল খুবই সীমিত। তাই এই জায়গায় যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণ ইস্যুটি এখন শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই, এটি পরিণত হয়েছে নাগরিক অধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ঐতিহ্য রক্ষার বৃহত্তর আন্দোলনে। অতীতের মতো এবারও জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
মানববন্ধনে সিআরবি রক্ষা পরিষদের আহ্বায়ক ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, সিআরবি সরকার কর্তৃক হেরিটেজ হিসেবে ঘোষিত একটি এলাকা। এখানে কোনো ধরনের বাণিজ্যিক বা বেসরকারি স্থাপনা নির্মাণ আইনের পরিপন্থি। প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও কালো টাকার মালিকরা এই প্রকল্পের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখলের চেষ্টা করছে।
ডা. মাহফুজুর রহমান বিকল্প প্রস্তাবও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রামে হাসপাতাল নির্মাণের প্রয়োজন হলে পাহাড়তলী এলাকার পরিত্যক্ত হাজি ক্যাম্প অথবা কুমিরা এলাকার টিবি হাসপাতালকে ব্যবহার করা যেতে পারে। এসব জায়গা ব্যবহার করলে একদিকে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ সম্ভব হবে, অন্যদিকে সিআরবির মতো সংবেদনশীল এলাকা রক্ষা পাবে।