সেই আলাপ আর হলো না, পরিবারের বুকেই রেখে গেলেন চিরতৃষ্ণার এক শূন্যতা

ইফতার শেষ করার কিছু সময় পার হয়েছে। সারাদির রোজা রাখার ক্লান্তি তখনো পুরোপুরি কাটেনি আহমদ আলীর। তবু ফোনটা বেজে উঠতেই তিনি দেরি করেননি। ওপাশ থেকে এক গ্রাহকের পানির অর্ডার। নিজের ট্যাংকভর্তি পানি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন তিনি। ৫৫ বছর বয়সী আহমদ আলীর গন্তব্য ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমান শহরের এক বাসা। কাজ একটাই, পানি পৌঁছে দেওয়া। কত রাত, কত ভোর তিনি এভাবেই ছুটেছেন। পরিবারকে ভালো রাখার দায় কাঁধে নিয়ে এ ছুটে চলা। ২৫ বছরের প্রবাসজীবন তাকে শিখিয়েছে, রোজগারের জন্য ঘাম ঝরানোই একমাত্র পথ। কিন্তু সেদিনের যাত্রা ছিল অন্যরকম। গ্রাহকের দরজায় কড়া নাড়ার আগেই আচমকা আকাশ চিরে নেমে আসে মৃত্যু। ইরান থেকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র সোজা আছড়ে পড়ে তার পানিবাহী গাড়ির ওপর। মুহূর্তের মধ্যে সব শেষ। যে মানুষটি কয়েক মিনিট আগেও ভাইদের বলেছিলেন, ‘রাত ১০টার দিকে কথা বলব’ তিনি আর কথা বলার সুযোগ পেলেন না। রাত ১০টার আগেই নিভে গেল তাঁর জীবন প্রদীপ। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিহত হন ছালেহ আহমদ ওরফে আহমদ আলী। মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার গাজিটেকা (বাঁশত

সেই আলাপ আর হলো না, পরিবারের বুকেই রেখে গেলেন চিরতৃষ্ণার এক শূন্যতা

ইফতার শেষ করার কিছু সময় পার হয়েছে। সারাদির রোজা রাখার ক্লান্তি তখনো পুরোপুরি কাটেনি আহমদ আলীর। তবু ফোনটা বেজে উঠতেই তিনি দেরি করেননি। ওপাশ থেকে এক গ্রাহকের পানির অর্ডার। নিজের ট্যাংকভর্তি পানি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন তিনি। ৫৫ বছর বয়সী আহমদ আলীর গন্তব্য ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমান শহরের এক বাসা। কাজ একটাই, পানি পৌঁছে দেওয়া। কত রাত, কত ভোর তিনি এভাবেই ছুটেছেন। পরিবারকে ভালো রাখার দায় কাঁধে নিয়ে এ ছুটে চলা। ২৫ বছরের প্রবাসজীবন তাকে শিখিয়েছে, রোজগারের জন্য ঘাম ঝরানোই একমাত্র পথ। কিন্তু সেদিনের যাত্রা ছিল অন্যরকম।

গ্রাহকের দরজায় কড়া নাড়ার আগেই আচমকা আকাশ চিরে নেমে আসে মৃত্যু। ইরান থেকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র সোজা আছড়ে পড়ে তার পানিবাহী গাড়ির ওপর। মুহূর্তের মধ্যে সব শেষ। যে মানুষটি কয়েক মিনিট আগেও ভাইদের বলেছিলেন, ‘রাত ১০টার দিকে কথা বলব’ তিনি আর কথা বলার সুযোগ পেলেন না। রাত ১০টার আগেই নিভে গেল তাঁর জীবন প্রদীপ।

শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিহত হন ছালেহ আহমদ ওরফে আহমদ আলী।

মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার গাজিটেকা (বাঁশতলা) গ্রামের সন্তান আহমদ আলী। সবার কাছে তিনি ছালেহ আহমদ নামেই বেশি পরিচিত। তিন ভাই ও আট বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। তরুণ বয়সেই পাড়ি জমান প্রবাসে। তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৫ বছর। পরিশ্রমে কখনো ক্লান্ত হননি তিনি। 

দুর্ঘটনার পর আজমান পুলিশ তার নিথর দেহ উদ্ধার করে নিয়ে যায় শেখ খলিফা মেডিকেল সিটিতে। সেখানের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালে ছুটে যান সেখানে থাকা তার ছোট দুই ভাই, জাকির হোসেন ও বোরহান আহমদ। কিন্তু ভাইকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পাননি তারা।

গ্রামের মানুষ তাকে মনে রেখেছে পরিশ্রমী, নিরহংকার,রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে। গত বছর শেষবার দেশে এসে পরিবারের সঙ্গে কিছুদিন কাটিয়েছিলেন। তিন মাস আগে আবার ফিরে যান কর্মস্থলে। হয়ত ভেবেছিলেন, আর কিছুদিন পরেই আবার ফিরবেন। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না।

দুই ছেলে ও এক মেয়ের জনক ছিলেন তিনি। বড় ছেলে আব্দুল হক কিছুদিন বাবার সঙ্গে আজমানে ছিলেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে ফিরে আসেন। এখন সেই ছেলেই বাবাহীন সংসারের বড় অবলম্বন।


সোমবার (২ মার্চ) রাতে সরেজমিনে গাজিটেকা গ্রামের বাড়িতে গেলে দেখা যায়, শোকের ভারে নুয়ে পড়েছে পুরো পরিবার। উঠোনে নীরবতা। ঘরের ভেতর কান্নার শব্দ থেমে থেমে ভেসে আসে। প্রতিবেশীরা এসে ভিড় করছেন, সান্ত্বনার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না কেউই।

ছোট ভাইয়ের স্ত্রী শেলি বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘খবরটা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। ভাবছিলাম গুজব। পরে নিশ্চিত হলাম ভাই আর নেই’।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার দিবাগত গভীর রাতে প্রথমে ‘বোমা হামলায়’ মৃত্যুর খবর আসে আহমদ আলীর। কিন্তু নিশ্চিত হতে সময় লাগে। কফিলের মাধ্যমে যখন মৃত্যুসংবাদ নিশ্চিত হয়। তার পূর্বের এই অপেক্ষার সময়টুকু ছিল পরিবারের কাছে সবচেয়ে কঠিন দুশ্চিন্তার।

সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ছিল তার শেষ বার্তা। দুর্ঘটনার কিছু আগে ভাইদের মুঠোফোনে একটি ভয়েস রেকর্ড পাঠিয়েছিলেন। কণ্ঠে ছিল স্বাভাবিকতার ছাপ। বলেছিলেন, রাত ১০টার দিকে কথা বলব। হয়ত বলতে চেয়েছিলেন পরিবারের কথা, হয়ত জানতে চেয়েছিলেন গ্রামের খবর। কিন্তু সে আলাপ আর হয়নি।


গত ২৭ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার স্ত্রীর সঙ্গে ছিল তার শেষ ফোনালাপ। পরদিন শনিবার পরিবার মৃত্যুর খবর পায়। এক দিনের ব্যবধানে স্বপ্নভরা সংসার ভেঙে যায়।

বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গালিব চৌধুরী জানান, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সোমবার দুপুরে তিনি নিহত প্রবাসীর বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রী সন্তান ও স্বজনদের খোঁজখবর নিয়েছেন। কোনো সমস্যা রয়েছে কিনা জানার চেষ্টা করেছেন। এব্যাপারে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে তিনি স্বজনদের আশ্বাস প্রদান করেছেন। 

এর আগে থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান খান নিহত সালেহ উদ্দিন ওরফে আহমদ আলীর বাড়িতে গিয়ে স্ত্রী সন্তানের খোঁজ খবর নিয়েছেন।

আহমদ আলীর মৃত্যুটি শুধু কোনো দুর্ঘটনার খবর নয়; এটি এক প্রবাসীর অদম্য সংগ্রামের কাহিনি। ইফতারের পর ক্লান্ত শরীর নিয়ে বেরিয়ে পড়া আহমদ আলী জানতেন না, সেটিই হবে তার শেষ যাত্রা। তিনি শুধু পানি পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু নিয়তি তাকে পৌঁছে দিল অনন্তের পথে। যে মানুষটি রোজার ক্লান্তি ভুলে অন্যের তৃষ্ণা মেটাতে বেরিয়েছিলেন, তিনি নিজের পরিবারের বুকেই রেখে গেলেন চিরতৃষ্ণার এক শূন্যতা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow