স্বকীয় সংস্কৃতিতে চিরযৌবনা নড়াইল
বাংলার নবাব তখন আলিবর্দি খাঁ। তার এক কর্মচারী ছিলেন মদনগোপাল দত্ত নামে। মদন সাহেব একবার সপরিবারে কিসমত কুড়িগ্রাম নামের এক জায়গায় নৌকাযোগে ঘুরতে যান। সেখানে তিনি কচুরির ধাপের ওপর নড়িয়াল ফকির নামের এক সাধুকে ধ্যানরত অবস্থায় দেখতে পান। দৃশ্যটি মন কাড়ে মদনগোপাল দত্তর। তিনি নত হয়ে নড়িয়াল ফকিরের আশীর্বাদ কামনা করেন। ফকির তার ওপর সন্তুষ্ট হন এবং তার হাতে থাকা নড়ি (লাঠি) উপহার দিয়ে ওই এলাকা আবাদ করার উপদেশ দেন। ফকিরের আশীর্বাদ পেয়ে মদনগোপাল কুড়িগ্রামে বসতি স্থাপন করেন এবং ধীরে ধীরে ওই এলাকায় লোকজনের বসবাস শুরু হয়। কথিত আছে, নড়িয়াল ফকিরের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ার জায়গাটির নাম হয় নড়িয়াল। তারপর লোকমুখে কিছুটা বিকৃত হয়ে তা রূপ নেয় আজকের 'নড়াইল' এ। চিত্রা নদীর পাড় ধরে গড়ে ওঠা ছোট্ট সুন্দর নির্মল শহর নড়াইল। নদীর প্রভাবে মানুষের মধ্যে এক ধরনের সরলতা জন্ম নেয়। নড়াইলের মানুষের মধ্যেও সেই সরলতা লক্ষণীয়। এমনকি নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা জীবনযাত্রাই নড়াইলের সংস্কৃতির প্রথম ভিত্তি তৈরি করে। মাঝি-মাল্লা, কৃষক-শ্রমিক, জেলেদের গান, উৎসব, বিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয় যাত্রাপালা, ভাটিয়ালি, সারি গান, নৌকাবাইচের মতো লোকজ সাংস্কৃতি
বাংলার নবাব তখন আলিবর্দি খাঁ। তার এক কর্মচারী ছিলেন মদনগোপাল দত্ত নামে। মদন সাহেব একবার সপরিবারে কিসমত কুড়িগ্রাম নামের এক জায়গায় নৌকাযোগে ঘুরতে যান। সেখানে তিনি কচুরির ধাপের ওপর নড়িয়াল ফকির নামের এক সাধুকে ধ্যানরত অবস্থায় দেখতে পান। দৃশ্যটি মন কাড়ে মদনগোপাল দত্তর। তিনি নত হয়ে নড়িয়াল ফকিরের আশীর্বাদ কামনা করেন। ফকির তার ওপর সন্তুষ্ট হন এবং তার হাতে থাকা নড়ি (লাঠি) উপহার দিয়ে ওই এলাকা আবাদ করার উপদেশ দেন। ফকিরের আশীর্বাদ পেয়ে মদনগোপাল কুড়িগ্রামে বসতি স্থাপন করেন এবং ধীরে ধীরে ওই এলাকায় লোকজনের বসবাস শুরু হয়। কথিত আছে, নড়িয়াল ফকিরের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ার জায়গাটির নাম হয় নড়িয়াল। তারপর লোকমুখে কিছুটা বিকৃত হয়ে তা রূপ নেয় আজকের 'নড়াইল' এ।
চিত্রা নদীর পাড় ধরে গড়ে ওঠা ছোট্ট সুন্দর নির্মল শহর নড়াইল। নদীর প্রভাবে মানুষের মধ্যে এক ধরনের সরলতা জন্ম নেয়। নড়াইলের মানুষের মধ্যেও সেই সরলতা লক্ষণীয়। এমনকি নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা জীবনযাত্রাই নড়াইলের সংস্কৃতির প্রথম ভিত্তি তৈরি করে। মাঝি-মাল্লা, কৃষক-শ্রমিক, জেলেদের গান, উৎসব, বিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয় যাত্রাপালা, ভাটিয়ালি, সারি গান, নৌকাবাইচের মতো লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ।
আধুনিকতা যখন পৃথিবীকে কৃত্রিম থেকে কৃত্রিমতর করে তুলেছে, সেই সময়েও নড়াইল তার স্বকীয় সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে আছে। পুরো শহরজুড়েই যেন শিল্প-সংস্কৃতির এক অপার ছোঁয়া রয়েছে। নড়াইলের সাংস্কৃতিক ধারা কোনো একক সময়ে বা নির্দিষ্ট ঘটনার মাধ্যমে গড়ে ওঠেনি। নদী, প্রকৃতি, মানুষের জীবনসংগ্রাম ও সামাজিক সম্পর্কের দীর্ঘ সহাবস্থানের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে এই জনপদের নিজস্ব সংস্কৃতি। অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত নড়াইলের সংস্কৃতি মূলত লোকজ জীবনধারাকে কেন্দ্র করেই বিকশিত হয়েছে।
একই সময়ে দাঁড়িয়ে যখন প্রযুক্তির কবলে পড়ে দেশজুড়ে হারাতে বসেছে আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ধারা, তখনও নড়াইলে যেন বইছে ভিন্ন এক স্রোত। আধুনিকতা নড়াইলকে ছুঁয়েছে ঠিকই, কিন্তু গ্রাস করতে পারেনি। বরং এই জনপদ যেন সম্মিলিত এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিজেদের সংস্কৃতিকে লালন করার।
নড়াইলের আরেকটি শক্তি হলো স্থানীয় উদ্যোগে সাংস্কৃতিক চর্চা। এখানে সংস্কৃতি ধরে রাখার দায়িত্ব কোনো বড় প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের ওপর পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া হয়নি। পাড়া-মহল্লার ক্লাব, স্কুল-কলেজকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন—সব মিলিয়ে একটি স্বতঃস্ফূর্ত সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এতে অংশ নেয় শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষ। সংস্কৃতি এখানে বয়সভিত্তিক নয়, সামষ্টিক।
নড়াইলের সংস্কৃতি বলতে গেলে যার নাম সবার আগে আসে, তিনি এস এম সুলতান। তিনি শুধু একজন চিত্রশিল্পীই নন, এই জনপদের সাংস্কৃতিক ভাবনার বড় একটি অংশ। তার ছবিতে উঠে এসেছে নদী, মাঠ-ঘাট, কৃষকের শক্ত জীবন। এসব ছবি নড়াইলের মানুষকে নিজের শিকড় চিনতে শিখিয়েছে। শিল্পের পাশাপাশি শিশুদের নিয়ে ছবি আঁকার আয়োজন, তাদের প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টাও ছিল সুলতানের বড় অবদান। আজও নড়াইলে যে সাংস্কৃতিক চর্চা দেখা যায়, তার ভেতরে কোথাও না কোথাও সুলতানের চিন্তা আর প্রভাব রয়ে গেছে।
নড়াইল জেলায় এখনো প্রায় ৪০টির বেশি সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম কিছু সংগঠন হলো চিত্রা থিয়েটার, নাট্য নন্দন, মূর্ছনা সংগীত একাডেমি, ছায়ানট, ললিত কলা পরিষদ, গণনাট্য সংসহা, রবীনন্দন সংগীত বিদ্যালয়, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক পরিষদ ইত্যাদি। নড়াইলের সাংস্কৃতিক চর্চার পেছনে এই সংগঠনগুলো প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে।
নড়াইলে বছরজুড়েই নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়ে থাকে । তার মধ্যে একুশে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবসে মোমবাতি প্রজ্বলন, এস এম সুলতান স্মরণে চিত্রকলা প্রদর্শনী, নাট্যোৎসব, লোকসংগীত সন্ধ্যা এবং ফটোগ্রাফি প্রদর্শনী অন্যতম। এসব অনুষ্ঠান নড়াইলের মানুষের জীবনের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। এই উৎসবগুলো শুধু তাদের আনন্দের উৎসই না বরং পরিচয়ের অংশ বলেই মনে করেন নড়াইলবাসী।
নড়াইলের সাংস্কৃতিক ধারার কথা বলতে গিয়ে চিত্রা থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হাসান লিজা বারবার ফিরে যান ইতিহাস, মানুষ আর পরিবেশের কথায়। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যুক্ত এই কর্মীর মতে, নড়াইলের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে বহুস্তরীয় প্রভাবের মধ্য দিয়ে।
তিনি বলেন,
'সত্তরের দশক থেকেই এখানে রেনেসাঁ সাংস্কৃতিক সংগঠনের মতো দলগুলো কাজ করেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এসএম সুলতান, জারি সম্রাট মুসলিম উদ্দিন বয়াতি, কমল দাসগুপ্তের মতো মানুষের প্রভাব। এগুলো মিলেই নড়াইলের সংস্কৃতিকে একটা আলাদা চরিত্র দিয়েছে।'
নড়াইলের সংস্কৃতির একটি বড় শক্তি ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। হিন্দু-মুসলমান মিলেমিশে পূজা-পার্বণ, ঈদ উৎসবে অংশ নেওয়ার যে সংস্কৃতি একসময় স্বাভাবিক ছিল, তা আজ অনেক জায়গায় দুর্বল হয়ে পড়লেও নড়াইলে এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারায় ভাটাও পড়েছে বলে মনে করেন লিজা।
'এখন দেখা যাচ্ছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আসা তরুণদের বড় একটা অংশ হিন্দু পরিবার থেকে আসে। মুসলমান পরিবারগুলো থেকে আগ্রহটা কমে গেছে। এটা আমাদের সংস্কৃতির জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ।'
নড়াইলের সংস্কৃতি আজ যে সংকটের মুখে, তার বড় কারণ হিসেবে উঠে আসে তরুণদের অনাগ্রহ ও তথাকথিত ‘আকাশ সংস্কৃতি।’। মঞ্চনাটক, সংগীত বা চিত্রকলার দীর্ঘ অনুশীলন, ধৈর্য ও শ্রমের জায়গা থেকে তরুণরা দ্রুত সরে যাচ্ছে, এমনটাই পর্যবেক্ষণ লিজার।
তার ভাষায়,
'একজন তরুণ থিয়েটারে আসে অনেক স্বপ্ন নিয়ে। হয়ত ভাবে যে এখান থেকে মিডিয়াতে যাবে। কিন্তু যখন দেখে এখানে ওয়ার্কশপ, শরীরচর্চা, দীর্ঘ অনুশীলন তখন হতাশ হয়ে ফিরে যায়। মোবাইল ফোনে যা সহজে পাওয়া যায়, সেটার দিকেই ঝুঁকে পড়ে।'
এই বাস্তবতায় শুধু তরুণদের নয়, অভিভাবকদের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। লিজার মতে, 'অনেক অভিভাবক খুব অল্প সময়ে বড় সাফল্য চান। গান শেখা বা ছবি আঁকার ‘এবিসি’ ধাপ পার করার ধৈর্য অনেকেরই নেই। এই মানসিকতাও সাংস্কৃতিক চর্চার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
নড়াইলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছেন শিল্পী এসএম সুলতান। লিজার ভাষায়, 'সুলতান মানেই একটা ক্যানভাস।'
চিত্রা নদী, গ্রামবাংলার প্রকৃতি, কৃষকের শরীরী শক্তি—এসবই সুলতানের ছবির ভাষা। এই ভাষা আজও নড়াইলের শিশুদের মধ্যে বেঁচে আছে। নড়াইলের ছোট শিশুদের প্রকৃতির ছবি আঁকতে বললে, ইট-পাথরের শহর নয়—গ্রাম আর নদীর ছবিই ফুটে ওঠে। এটিই সুলতানের প্রভাব।
নড়াইলের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তুলনামূলক নতুন সংযোজন ফটোগ্রাফি। নড়াইল ফটোগ্রাফি সোসাইটির সভাপতি আশিস কুমার রায় মনে করেন, সম্ভাবনা সবসময়ই ছিল—কিন্তু এখন প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা।
'এখন সবার হাতেই মোবাইল, সবার হাতেই ক্যামেরা। কিন্তু ছবি তোলা আর ফটোগ্রাফিকে শিল্প হিসেবে বোঝা—এই দুইটা এক জিনিস না।'
তার মতে, বর্তমান প্রজন্ম বেশি ঝুঁকছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছবি, রিলস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার দিকে। ফটোগ্রাফি সোসাইটির কাজ হলো সেই প্রবণতাকে শিল্পচিন্তার দিকে নিয়ে আসা—সাবজেক্ট, অবজেক্ট, আলো, বার্তা এসব বোঝানো।
এই উদ্যোগের ফলও মিলছে। নড়াইল থেকে এখন দেশের বিভিন্ন জেলা এমনকি জাতীয় পর্যায়ের প্রদর্শনীতেও ছবি যাচ্ছে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনেক জায়গায় স্থবির। উন্মুক্ত প্রদর্শনী বা আয়োজন নিয়ে সংশয় আছে। তবু আশিস কুমার রায় মনে করেন, সংস্কৃতিকে রাজনীতির বাইরে রাখাই সবচেয়ে জরুরি।
'আমরা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা চাই, কিন্তু প্রভাব চাই না। দলমত নির্বিশেষে সবাই যদি সংস্কৃতিকে বাঁচাতে চায় তাহলেই একটা জাতি বাঁচবে। সংস্কৃতি না থাকলে জাতির অস্তিত্ব থাকে না।'
নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ুয়া শিক্ষার্থী পার্থ সাহা মনে করেন, সাংস্কৃতিক চর্চা তরুণদের মানুষ হয়ে ওঠার জায়গা তৈরি করে।
'মোবাইল আর সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরে এসে যখন নাটকের রিহার্সাল করি বা গান শুনি, তখন নিজেকে আলাদা একজন মানুষ মনে হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত না থাকলে আমরা হয়ত ভালো নম্বর পাব, কিন্তু ভালো মানুষ হতে পারব না।'
অনেক কিছু বদলে যাচ্ছে—শহর, মানুষ, সময়। নড়াইলের সংস্কৃতিও আজ নানা চাপে জর্জরিত। তবু চিত্রা নদীর পাড়ে আজও ভেসে আসে গান, মঞ্চে জ্বলে ওঠে আলো, আর কোনো না কোনো উঠোনে জন্ম নেয় নতুন শিল্পী। নাটকের মঞ্চ, ছবির ক্যানভাস, ক্যামেরার ফ্রেম আর মানুষের অদম্য ইচ্ছায় এই জনপদ এখনো নিজের সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে আছে। ইতিহাস, মানুষ আর সংগ্রামের দীর্ঘ সহাবস্থানে গড়ে ওঠা এই ধারাকে বাঁচিয়ে রাখতে নড়াইল যেন আজও নিঃশব্দ এক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আর এই ধারাবাহিকতাই নড়াইলের শক্তি। সংস্কৃতি এখানে স্মৃতি নয়,এ এক চলমান জীবনধারা।
What's Your Reaction?