স্বপ্ন, সাহস ও সৃষ্টির অমর নাম নুরুল ইসলাম বাবুল
একটি ছোট কারখানা থেকে শুরু করে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী গড়ে তোলার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম বাবুল। ১৯৭৪ সালে মাত্র একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা দিয়ে যাত্রা শুরু করা যমুনা গ্রুপ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দূরদর্শী বিনিয়োগ, অদম্য সাহস এবং বহুমুখী শিল্পায়নের মাধ্যমে আজ বাংলাদেশের অন্যতম শক্তিশালী শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। ১৯৪৬ সালের ৩ মে ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার চুরাইন ইউনিয়নের কামালখোলা গ্রামে জন্ম নেন নুরুল ইসলাম। বাবা আমজাদ হোসেন এবং মা জোমিলা খাতুন। শৈশব কেটেছে ইছামতী নদীর তীরে। পরে ঢাকায় এসে স্থাপত্যবিদ্যায় প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত প্রশিক্ষণ নেন। নকশা তৈরি থেকে বাস্তবে বড় স্থাপনা নির্মাণের এই শিক্ষা পরে তার শিল্পায়নের চিন্তা ও পরিকল্পনার ভিত্তি হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য। অংশ নেন ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সব অভিযানে। যুদ্ধজয়ের পর বিধ্বস্ত দেশের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাই একটি জাতির প্রকৃত মুক্তি নিশ্
একটি ছোট কারখানা থেকে শুরু করে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী গড়ে তোলার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম বাবুল। ১৯৭৪ সালে মাত্র একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা দিয়ে যাত্রা শুরু করা যমুনা গ্রুপ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দূরদর্শী বিনিয়োগ, অদম্য সাহস এবং বহুমুখী শিল্পায়নের মাধ্যমে আজ বাংলাদেশের অন্যতম শক্তিশালী শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।
১৯৪৬ সালের ৩ মে ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার চুরাইন ইউনিয়নের কামালখোলা গ্রামে জন্ম নেন নুরুল ইসলাম। বাবা আমজাদ হোসেন এবং মা জোমিলা খাতুন। শৈশব কেটেছে ইছামতী নদীর তীরে। পরে ঢাকায় এসে স্থাপত্যবিদ্যায় প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত প্রশিক্ষণ নেন। নকশা তৈরি থেকে বাস্তবে বড় স্থাপনা নির্মাণের এই শিক্ষা পরে তার শিল্পায়নের চিন্তা ও পরিকল্পনার ভিত্তি হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য। অংশ নেন ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সব অভিযানে। যুদ্ধজয়ের পর বিধ্বস্ত দেশের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাই একটি জাতির প্রকৃত মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে।
সে উপলব্ধিই তাকে শিল্পোদ্যোক্তা হওয়ার পথে এগিয়ে দেয়, ১৯৭৪ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে যমুনা গ্রুপ। পরের বছর ‘যমুনা ইলেকট্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমদানিবিকল্প শিল্পের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা হয়। ১৯৮০-এর দশকে আবাসন, প্রকৌশল ও কেবলস খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করা হয়। ১৯৯০-এর দশকে শামীম স্পিনিং ও যমুনা নিটিং প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়। ১৯৯৯ সালে মুক্ত গণমাধ্যমের স্বার্থে জাতীয় দৈনিক ‘যুগান্তর’ প্রকাশ করা হয়।
২০০০-এর দশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম শপিং মল ‘যমুনা ফিউচার পার্ক’, ‘যমুনা টেলিভিশন’, ‘যমুনা ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড অটোমোবাইলস’ এবং ‘যমুনা পেপার মিলস’-এর সফল যাত্রার মাধ্যমে শিল্পগোষ্ঠীটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছে। টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাতে শামীম স্পিনিং, শামীম কম্পোজিট এবং যমুনা নিটিংয়ের মাধ্যমে রপ্তানিমুখী শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে যমুনা গ্রুপ। এছাড়া ইলেকট্রনিকস খাতে যমুনা রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, টেলিভিশন ও মোটরসাইকেল উৎপাদনের মাধ্যমে আমদানি সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখছে প্রতিষ্ঠানটি।
আবাসন ও মেগা প্রকল্প খাতে ‘যমুনা ফিউচার পার্ক’ এবং ‘যমুনা বিল্ডার্স’ দেশের আধুনিক নগরায়ণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। গণমাধ্যম ও শিক্ষা খাতে জাতীয় দৈনিক ‘যুগান্তর’, ‘যমুনা টেলিভিশন’ এবং ‘যমুনা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া কেমিক্যাল, লেদার, বেভারেজ, কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে যমুনা গ্রুপ দেশের শিল্প ও অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক অবদান রেখে চলেছে।
বর্তমানে যমুনা গ্রুপের অধীনে রয়েছে ৪২টি বড় ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। তার শিল্পদর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবসম্পদের উন্নয়ন। তিনি শ্রমিকদের দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করতেন। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সবসময় গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি সবসময় বিশ্বাস করতেন, দেশের টাকা দেশের মাটিতেই বিনিয়োগ করা উচিত। প্রতিকূল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি কখনো বিদেশের মাটিতে অর্থ পাচার বা অফশোর ব্যবসা গড়ে তোলার কথা ভাবেননি। তার সব পুঁজি ও মেধা তিনি বিনিয়োগ করেছেন এদেশের মাটিতে, এদেশের মানুষের জন্য। বর্তমানে যমুনা গ্রুপে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে; পরোক্ষভাবে আরও কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা এই শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত।
১৩ জুলাই ২০২০-স্বপ্নদ্রষ্টা শিল্পোদ্যোক্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম বাবুল ইন্তেকাল করেন। তিনি চলে গেলেও তার স্বপ্ন, কর্ম ও সৃষ্টির উত্তরাধিকার আজও দেশের শিল্পায়নের প্রতিটি অগ্রযাত্রায় অনুপ্রেরণা হয়ে বেঁচে আছে।
তার দেখানো পথ ধরেই যমুনা গ্রুপের ভার নেন নুরুল ইসলাম বাবুলের সহধর্মিণী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম। ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম ইসলামের নেতৃত্বে এবং পরিচালক সুমাইয়া রোজালিন ইসলাম, মনিকা নাজনীন ইসলাম ও শারিয়াত তাসরিন সোনিয়া ইসলামের সক্রিয় অংশগ্রহণে গ্রুপটি আজও তার আদর্শ ও কর্মদর্শন অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছে। নতুন প্রজন্মের এই নেতৃত্ব শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে কাজ করছে।
What's Your Reaction?