স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণভোট বাতিলের কোনো সুযোগ নেই বলে দাবি করেছেন জামায়াতের আইনজীবী শিশির মনির। গণভোট বাতিল হলে নির্বাচিত সংসদ আইনগত হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করেন তিনি। সোমবার (৩০ মার্চ) হাইকোর্টে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটির কর্মপরিষদের সদস্য ও আইনজীবী শিশির মনির।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১২টিকে ল্যাপস, ৩টিকে বাতিল এবং ৩১টিকে সংশোধন সাপেক্ষে সংসদে তোলার যে প্রস্তাব বিশেষ কমিটি দিয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
অধ্যাদেশগুলোর অধীনে ইতিমধ্যে সম্পন্ন হওয়া কাজগুলোকে সরকার ‘হেফাজত’ বা সংরক্ষণ করতে চাইলেও আইনগুলোকে বাতিল করার উদ্যোগ নিয়ে শিশির মনির সরাসরি প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, ‘ওনারা বলেছেন এগুলোকে সেভ করা হবে, হেফাজত করা হবে। আপনি যদি আইনটাকে হেফাজত না করেন, শুধু কাজটাকে হেফাজত করেন, এর অর্থ কী? আপনি কাজটাকে ভালো মনে করে হেফাজত করছেন, তাহলে আইনটাকে ভালো মনে করছেন না কেন?’
হাইকোর্টে বিচারক নিয়োগের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী হাইকোর্ট ডিভিশনে বিচারক নিয়োগ হয়েছে। এই অধ্যাদেশটা যদি বাদ করে দেন, তাহলে এই বিচারকদের কী হবে? তখন তারা (সরকার)বলছেন এই বিচারকদেরকে আমরা এখানে হেফাজত করবো। আর বাকি পরবর্তীতে যারা আসবে, তাদেরকে আর হেফাজত করতে হবে না? তারা হেফাজতের বাইরে চলে যাবে? এইজন্য, ইফ ইউ রিকগনাইজ এ সিস্টেম গুড, ইফ ইউ সেভ দ্যা অ্যাক্টিভিটি অফ এ পার্টিকুলার সিস্টেম, ইউ হ্যাভ টু সেভ অ্যাট দ্যা সেইম টাইম দ্যা প্রভিশন অফ ল অ্যাট দ্যা সেইম টাইম।’
অধ্যাদেশ বাতিলের পরিণতি সম্পর্কে তিনি দিয়ে বলেন, ‘আগেরটা ভালো মনে করে সেভ করছেন, পরেরটা কী করবেন? আগের মতোই করবেন গোপনে গোপনে? টেবিলের নিচ দিয়া? অমুকরে পছন্দ, তমুকরে অপছন্দ, অমুক আমার দলের লোক, তমুক আমার দলের লোক, এইভাবে বিচারক নিয়োগ করার জন্য আবার সেই রাস্তা ওপেন করছেন? দিস ইজ এ ব্যাড ইনটেনশন। নোবডি শুড ডু দিস।’
গণভোট অধ্যাদেশকে ‘ইনফ্রাকচুয়াস’ (অকার্যকর) হিসেবে ল্যাপস করার প্রস্তাবকে সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন শিশির মনির। তিনি বলেন, গণভোট অধ্যাদেশের সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ৬ ধারা, নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল এবং হাইকোর্টে বিচারাধীন রিটের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এগুলোকে তিনি ‘ইনসেপারেবল টুইনস’ (অবিভাজ্য যমজ) হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
১৯৯১ সালের গণভোট আইনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোট বিলুপ্ত হওয়ার পরও ওই আইনটি কার্যকর ছিল। তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষের মতামতকে (গণভোটের রায়) ফ্রাস্টেট করে কোনো উদ্যোগ নেওয়া উচিত হবে না। অন্যথায় আইনি বিশৃঙ্খলা (লিগ্যাল কেওস) তৈরি হবে।
গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ এবং মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিলের প্রস্তাবের কঠোর সমালোচনা করেন এই আইনজীবী। তিনি জানান, সরকার যুক্তি দিচ্ছে যে গুমের সঙ্গে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জড়িত, তাই আইনটি পাসের দরকার নেই।
এর জবাবে শিশির মনির প্রশ্ন রাখেন, ‘তাহলে গুমের তদন্ত করার যে এজেন্সি আছে, যারা ল এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি, ডিজিএফআই থেকে শুরু করে পুলিশ পর্যন্ত তারা আসামি হয়, এই তদন্ত করবে কে?’
তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশনকে সুয়োমুটো (স্বপ্রণোদিত) তদন্তের যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, তা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এটিকে তিনি পুরো সংস্কার প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি চরম অবজ্ঞা (ডিসরিগার্ড) বলে অভিহিত করেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক ও পরিচালক নিয়োগে সার্চ কমিটির বিধান বাতিলের উদ্যোগ নিয়েও তিনি কথা বলেন। শিশির মনির বলেন, ‘সরকার চাইলেই হায়ার এবং ফায়ার করতে পারবেন না। তারা বলছেন এই সার্চ কমিটির বিধানটাকে তারা বাতিল চান। তাহলে দুদকের মহাপরিচালক কিভাবে অ্যাপয়েন্টেড হবেন? সরকার যারে চাইবেন তাকেই বসাবেন, যাকে বাদ দিতে চাইবেন তাকেই বাদ দেওয়াবেন।’
বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশকে অসাংবিধানিক বলে বাতিলের যে যুক্তি সরকার দিচ্ছে, তা খণ্ডন করে শিশির মনির বলেন, হাইকোর্ট ইতিমধ্যে এই আইন চ্যালেঞ্জ করে করা একটি রিট খারিজ করে একে বৈধতা দিয়েছেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘তাহলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ হবে কি করে? আগের মত কানাকানি করে? টেবিলের নিচে দিয়ে? কে কার জুনিয়র আর কে কার সিনিয়র? কার রাজনৈতিক পরিচয় কি? এইভাবে নিয়োগ দেবেন?’
পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় অধ্যাদেশে ‘সরকার উপযুক্ত মনে করিলে’ শব্দগুচ্ছ যুক্ত করার প্রস্তাবের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘সরকার উপযুক্ত মনে করলে যদি এটা ফাংশন করতে পারে, তাহলে আর এই আইনের দরকার কি? সরকার উপযুক্ত মনে করলে বদলি হবে, ছুটি হবে, শৃঙ্খলা হবে—তাহলে অধস্তন বিচারকদের স্বাধীনতা কোথায় থাকবে? এখন এসে যে লাউ সেই কদুতে আবার ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছেন।’
ব্যাংক রেগুলেশন অধ্যাদেশ ল্যাপস করার প্রস্তাবের পেছনে মানি লন্ডারারদের বাঁচানোর উদ্দেশ্য দেখছেন শিশির মনির। তিনি বলেন, ‘তাহলে ওই মানি লন্ডারিংয়ের চাপে পড়েছেন নাকি? যারা মানিটা লন্ডার করল, ব্যাংককে খালি করলো তাদেরকে তো সেভ করে দিচ্ছেন । হোয়াই দি গভমেন্ট ইজ প্রপোজিং দিস টাইপ অফ ল্যাপসিং অর্ডিন্যান্সেস? এক ইসলামী ব্যাংক থেকে এস আলম ৭০ হাজার কোটি টাকা সরিয়েছে। অ্যান্ড নাউ, ইউ দি গভমেন্ট, ইজ কামিং আপ উইথ ইউর ওন ইন্টারপ্রিটেশন অ্যান্ড গিভিং দেম শেল্টার। কিভাবে? কেন?’
সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার ফ্যাসিবাদী আচরণ করছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শিশির মনির বলেন, ‘পার্লামেন্টে পাশ করা যেকোনো আইনই পরবর্তীতে বিচার বিভাগ দিয়ে রিভিউ করার সুযোগ থাকে। আমরা এখন গভমেন্টকে বলছি, প্লিজ ডু নট টেক এনি আনরিজনেবল, আনকনস্টিটিউশনাল এন্টি-রিফর্ম প্রজেক্ট। যদি এমন কিছু পাস করা হয়, দ্যাট উইল বি চ্যালেঞ্জড বিফোর দি হাইকোর্ট সাবসিকুয়েন্টলি।’
তিনি আরও বলেন, ‘মেজরিটি যদি কারও থাকে, তারা যদি যুক্তির চাইতে অহংকার আর শক্তি প্রদর্শন করেন, এটা শেষ পর্যন্ত জাতিগতভাবে ভালো কোনো রেজাল্ট দেয় না।’