হাঁস রাখাল থেকে মাফিয়া ডন, মানব পাচারকারী আজিজের উত্থান

এক সময়ের হাঁস গরুর রাখাল আজিজ এখন কোটিপতি। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর হাওরে তাকে ‘হাঁস রাখাল আজিজ’ নামেই সবাই চিনত। সাত-আট বছর আগে যে আজিজ এলাকায় হাওরে হাঁস ও গরু রাখালী করত, সে এখন মাফিয়া ডন। ভারত হয়ে চোরাই পথে লিবিয়া গিয়ে মাফিয়া চক্রের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে হতদরিদ্র আজিজ এখন কোটিপতি। সে মাফিয়া চক্রের সঙ্গে মিশে ইউরোপে মানব পাচার শুরু করে।বর্তমানে আজিজ লিবিয়ায় মাফিয়াদের কাছে মানুষ বিক্রি করছে। আবার লিবিয়া থেকে ইতালি, গ্রীস, স্পেন যাওয়ার জন্য ‘গেমের’ মাধ্যমে লোকজনকে ভূমধ্যসাগরে নৌকা দিয়ে পাঠায়। এসব বিপজ্জনক পথে মানুষ মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে প্রতি মাসে কোটি টাকা উপার্জন করাই তার নেশা ও পেশা। সম্প্রতি সাগরপথে ৫০ জনকে গ্রীস পাঠাতে গিয়ে ২২ জনের প্রাণহানি হয়েছে। ২২ জন জীবিত ফিরেছেন এবং কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন। এই মাফিয়া ডন আজিজের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার ইছড়গাঁও গ্রামে। তার বাবার নাম মন্তাজ মিয়া। আট বছর আগে সে স্থানীয় ঘোষগাঁও, টিয়ারগাঁও ও ইছরগাঁও গ্রামের নিকটবর্তী হাওরের মধ্যে মানুষের হাঁস খামারের হাঁস ও গরু রাখালী করতো। অল্প দিনেই সে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়েছে।তার খপ্পরে পড়ে ভূমধ্যসাগ

হাঁস রাখাল থেকে মাফিয়া ডন, মানব পাচারকারী আজিজের উত্থান

এক সময়ের হাঁস গরুর রাখাল আজিজ এখন কোটিপতি। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর হাওরে তাকে ‘হাঁস রাখাল আজিজ’ নামেই সবাই চিনত। সাত-আট বছর আগে যে আজিজ এলাকায় হাওরে হাঁস ও গরু রাখালী করত, সে এখন মাফিয়া ডন। ভারত হয়ে চোরাই পথে লিবিয়া গিয়ে মাফিয়া চক্রের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে হতদরিদ্র আজিজ এখন কোটিপতি। সে মাফিয়া চক্রের সঙ্গে মিশে ইউরোপে মানব পাচার শুরু করে।

বর্তমানে আজিজ লিবিয়ায় মাফিয়াদের কাছে মানুষ বিক্রি করছে। আবার লিবিয়া থেকে ইতালি, গ্রীস, স্পেন যাওয়ার জন্য ‘গেমের’ মাধ্যমে লোকজনকে ভূমধ্যসাগরে নৌকা দিয়ে পাঠায়। এসব বিপজ্জনক পথে মানুষ মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে প্রতি মাসে কোটি টাকা উপার্জন করাই তার নেশা ও পেশা। সম্প্রতি সাগরপথে ৫০ জনকে গ্রীস পাঠাতে গিয়ে ২২ জনের প্রাণহানি হয়েছে। ২২ জন জীবিত ফিরেছেন এবং কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন। এই মাফিয়া ডন আজিজের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার ইছড়গাঁও গ্রামে। তার বাবার নাম মন্তাজ মিয়া। আট বছর আগে সে স্থানীয় ঘোষগাঁও, টিয়ারগাঁও ও ইছরগাঁও গ্রামের নিকটবর্তী হাওরের মধ্যে মানুষের হাঁস খামারের হাঁস ও গরু রাখালী করতো। অল্প দিনেই সে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়েছে।

তার খপ্পরে পড়ে ভূমধ্যসাগরে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় সিলেট ও সুনামগঞ্জের ১৮ জন যুবকের। যাদের মৃতদেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে সাগরে। ১৪ লাখ টাকায় চুক্তি ছিল যে, সবাইকে লিবিয়া থেকে বড় নৌকায় তুলে দিয়ে সাগর পার করিয়ে গ্রীস পৌঁছে দেবে। কিন্তু সে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে, টাকা বাঁচানোর জন্য সবাইকে জোরপূর্বক, মারপিট করে ও গুলির মুখে ছোট নৌকায় তুলে দিয়ে নৌকা ভাসিয়ে দেয়। নৌকার সঙ্গে কোনো ট্রেকিং মোবাইল বা জিপিএস ট্রেকার ও লোকেশন ম্যাপ দেওয়ার কথা থাকলেও, সে তা দেয়নি। তার এই অতি লোভের কারণে সিলেটের ১৮টি তরতাজা প্রাণ সমুদ্রের মধ্যে মারা যায়। মোট ২২ জনের মৃত্যু হয় এবং সবার লাশ তার লোকজন সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছে। স্বজনরা এখন আহাজারি করছেন। এই আজিজ দালাল এখন তার বাড়িতে কোনো মানুষ রাখে না। সবাইকে সিলেট শহরের একটি আলিশান বাসায় রাখছে। তার শ্বশুরবাড়ি হবিগঞ্জে বলে জানা গেছে। এই মাফিয়া চক্রের ব্যবসার সঙ্গে তার বউ, শাশুড়ি, শালা সবাইকে জড়িত করেছে। এদের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করে। অসহায় পরিবারগুলো জায়গা জমি বিক্রি করে এই দালাল চক্রকে টাকা দিয়েছে। এখন টাকাও গেছে, তাদের মানুষও গেছে, একটি লাশও ফেরত পাবে না। এই আজিজ দালালকে ধরিয়ে দিতে দেশে-প্রবাসে থাকা সবার সহযোগিতা কামনা করা হচ্ছে।

দালাল আজিজের খপ্পরে পড়ে লিবিয়ায় মাফিয়াদের কাছে এখনও বন্দী জগন্নাথপুরের কয়েকজন যুবক। স্বপ্নের শহর ইতালি যাওয়ার জন্য দালালের খপ্পরে পড়ে লিবিয়ায় অবস্থান করছেন জগন্নাথপুরের শ্রীধরপাশা গ্রামের এক যুবক। তার পরিবারে চলছে আহাজারি। লিবিয়া থেকে বাংলাদেশে আসা এক যুবক জানান, ইতালি নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ইছগাঁও গ্রামের দালাল আজিজ চার লাখ টাকায় বিক্রি করেছে সিলেটের মাফিয়া এনামের কাছে। শরিফের নির্যাতনের শিকার অনেক লোক।

লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে প্রাণ হারানো ১৮ বাংলাদেশির একজন শহীদুল ইসলামের খালাতো ভাই আলী আহমদ (২২)। ভয়াবহ এ যাত্রায় প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন রোহান আহমেদ। ২৫ বছরের এই যুবকের মাধ্যমে শহীদুল জেনেছেন সুনামগঞ্জের তিন উপজেলার ১২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর বর্ণনা।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, দালাল আজিজুলের পাল্লায় পড়ে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের টিয়ারগাঁও গ্রামের শায়েক আহমদ জনিকে (২৫) সে ঐ গ্রামের আখলুছ মিয়ার পুত্র। একই উপজেলার চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের চিলাউড়া মাঝপাড়া গ্রামের দুলন মিয়ার ছেলে নাঈম মিয়া (২২), একই গ্রামের শামছুল হকের ছেলে ইজাজুল হক রেজা (২৩), ইছগাঁও গ্রামের বশির মিয়ার ছেলে আলী আহমদ (২২) ও পাইলগাঁও (হাড়গ্রাম) গ্রামের সাবেক শিক্ষক হাবিবুর রহমানের ছেলে আমিনুর রহমান (২৬)। দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারপাশা গ্রামের আবু সর্দারের ছেলে নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩২)। দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিমের (২০) সে ফয়েজ উদ্দিন ও হেলেনা বেগম দম্পতির একমাত্র সন্তান। রানীগঞ্জ ইউনিয়নের ইছগাঁও গ্রামের দালাল আজিজ মিয়ার খপ্পরে পড়ে বাবা-মাসহ পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে স্বপ্নের দেশ গ্রীস যাওয়ার উদ্দেশ্যে দালাল মারফত পাড়ি জমান মরুভূমির দেশ লিবিয়ায়। লিবিয়া যাওয়ার তিন মাস পর মাফিয়ার কাছে ধরা পড়ার খবর দেয় আজিজ দালাল। পরে পরিবারের লোকজন ভিটেমাটি বিক্রি করে ওই মাফিয়াকে ১২ লাখ টাকা দেন তাদের গ্রীসে পাঠানোর জন্য।

কে এই দালাল আজিজ?

জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের ইছগাঁওয়ের মন্তাজ মিয়ার ছেলে আজিজুল প্রায় আট বছর ধরে লিবিয়ায় আছেন। জগন্নাথপুরসহ আশপাশের উপজেলা থেকে দেশে থাকা আরও কিছু দালালের মাধ্যমে মানব পাচার করেন তিনি। গ্রীস, ইতালি ও লিবিয়ায় যাওয়ার লোভে অনেকেই তাকে টাকা দিয়েছেন। কেউ যেতে পেরেছেন, কেউবা টাকা খুইয়েছেন। এখনও আজিজ দালাল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। জগন্নাথপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম জানান, আজিজুলের বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow