হারিয়ে যাওয়া বন্ধুরা: মানুষের দ্বৈততা ও স্মৃতির শহরে বন্ধুত্বের পথচলা

মানুষ বড় অদ্ভুত প্রাণি। সে একদিকে স্বপ্ন দেখে, অন্যদিকে বাস্তবের সঙ্গে আপস করে। একদিকে ভালোবাসতে চায়, আবার সুযোগ পেলে নিজেকেই আগে বাঁচায়। এই দ্বৈততা তার স্বভাবেই মিশে আছে। ঠিক এই দ্বৈততার ভেতরেই গড়ে ওঠে মানুষের সম্পর্ক—বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, নির্ভরতা। আর সেই বন্ধুত্বের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে এক ধরনের হারিয়ে যাওয়ার গল্প, যেটা আমরা সবাই কমবেশি বয়ে বেড়াই। জীবনের প্রথম বন্ধুত্বটা হয় স্কুলে। তখন জীবন খুব সহজ। জটিলতা নেই, হিসাব নেই, নেই কোনো বড় স্বপ্নের ভার। শুধু আছে সাদা খাতা, কালো বোর্ড আর পাশে বসা একজন মানুষ—যে খুব অচেনা, অথচ খুব আপন হয়ে ওঠে। টিফিন ভাগ করে খাওয়া, একসঙ্গে হাসা, অকারণে ঝগড়া করা—এইসব ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই একদিন স্মৃতির সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে দাঁড়ায়। তখন আমরা ভাবি, এই বন্ধুত্ব চিরদিন থাকবে। কিন্তু সময় আমাদের ধীরে ধীরে শেখায়—কিছুই চিরদিন থাকে না। স্কুল শেষ হয়। আমরা বড় হই। কলেজে যাই। তখন বন্ধুত্ব আরেকটু জটিল হয়ে ওঠে। এখানে এসে আমরা বুঝতে শুরু করি—সবাই সমান নয়, সবাই একরকমও না। এখানে প্রতিযোগিতা আছে, আছে নিজের অবস্থান তৈরি করার লড়াই। তবুও এই লড়াইয়ের মাঝেই কেউ কেউ পাশে থাকে। রাত জেগে পড়া, পর

হারিয়ে যাওয়া বন্ধুরা: মানুষের দ্বৈততা ও স্মৃতির শহরে বন্ধুত্বের পথচলা

মানুষ বড় অদ্ভুত প্রাণি। সে একদিকে স্বপ্ন দেখে, অন্যদিকে বাস্তবের সঙ্গে আপস করে। একদিকে ভালোবাসতে চায়, আবার সুযোগ পেলে নিজেকেই আগে বাঁচায়। এই দ্বৈততা তার স্বভাবেই মিশে আছে। ঠিক এই দ্বৈততার ভেতরেই গড়ে ওঠে মানুষের সম্পর্ক—বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, নির্ভরতা। আর সেই বন্ধুত্বের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে এক ধরনের হারিয়ে যাওয়ার গল্প, যেটা আমরা সবাই কমবেশি বয়ে বেড়াই।

জীবনের প্রথম বন্ধুত্বটা হয় স্কুলে। তখন জীবন খুব সহজ। জটিলতা নেই, হিসাব নেই, নেই কোনো বড় স্বপ্নের ভার। শুধু আছে সাদা খাতা, কালো বোর্ড আর পাশে বসা একজন মানুষ—যে খুব অচেনা, অথচ খুব আপন হয়ে ওঠে। টিফিন ভাগ করে খাওয়া, একসঙ্গে হাসা, অকারণে ঝগড়া করা—এইসব ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই একদিন স্মৃতির সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে দাঁড়ায়। তখন আমরা ভাবি, এই বন্ধুত্ব চিরদিন থাকবে। কিন্তু সময় আমাদের ধীরে ধীরে শেখায়—কিছুই চিরদিন থাকে না।

স্কুল শেষ হয়। আমরা বড় হই। কলেজে যাই। তখন বন্ধুত্ব আরেকটু জটিল হয়ে ওঠে। এখানে এসে আমরা বুঝতে শুরু করি—সবাই সমান নয়, সবাই একরকমও না। এখানে প্রতিযোগিতা আছে, আছে নিজের অবস্থান তৈরি করার লড়াই। তবুও এই লড়াইয়ের মাঝেই কেউ কেউ পাশে থাকে। রাত জেগে পড়া, পরীক্ষার আগে টেনশন ভাগ করা, অজানা ভবিষ্যৎ নিয়ে আড্ডা—এই সময়ের বন্ধুরা আমাদের জীবনের দিশা খুঁজতে সাহায্য করে।

কিন্তু মানুষ যত বড় হয়, তার ভেতরেও দ্বৈততা ততই বাড়তে থাকে। সে একদিকে বন্ধুদের কাছে নিজের সবটা দিতে চায়, আবার অন্যদিকে নিজের অবস্থানও ধরে রাখতে চায়। এই টানাপোড়েন থেকেই অনেক সম্পর্ক ভেঙে যায়। কলেজের সেই ঘনিষ্ঠ বন্ধুটিই একদিন ধীরে ধীরে অচেনা হয়ে যায়। ফোনে কথা হয় না, দেখা হয় না। শুধু ফেসবুকে কখনো-সখনো তার একটি ছবি চোখে পড়ে, আর আমরা চুপচাপ তাকিয়ে থাকি।

এরপর আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন। এখানে বন্ধুত্বের রং আরও গভীর হয়। এখানে মানুষ তার ভেতরের মানুষটিকে খুঁজে পেতে চায়। বন্ধুরা হয়ে ওঠে নিজের মতো করে ভাবার এক নিরাপদ জায়গা। এখানে কেউ কারও কাছে শুধু সহপাঠী নয়—বরং একজন বিশ্বাসী শ্রোতা, একজন নীরব সঙ্গী।

এই সময়ের বন্ধুরা জীবনের সবচেয়ে জটিল সময়গুলোতে পাশে থাকে। ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা, নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন—এইসবের ভেতরে বন্ধুরাই একমাত্র আশ্রয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুত্ব অনেক সময় আজীবনের হয়, আবার অনেক সময় তা-ও হারিয়ে যায়। কারণ, মানুষ বদলায়। তার চিন্তা, তার পথ, তার গন্তব্য বদলে যায়।

আর থাকে পাড়ার বন্ধুরা। তারা যেন আমাদের জীবনের একেবারে ভিন্ন এক অধ্যায়। এই বন্ধুত্বে কোনো শর্ত নেই, কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই। সকালে দেখা, বিকেলে দেখা, সন্ধ্যায় আড্ডা—এইভাবেই কেটে যায় দিনগুলো। পাড়ার বন্ধুরা আমাদের শৈশবকে আরও রঙিন করে তোলে। মাঠে খেলা, বৃষ্টিতে ভেজা, অকারণে গল্প করা—এইসব স্মৃতি যেন জীবনের এক অনন্ত সুখ।

আমরা যদি কখনো হারাতাম না, তাহলে হয়তো আমরা কোনো কিছুই এত গভীরভাবে অনুভব করতে পারতাম না। হারিয়ে যাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ভালোবাসার গভীরতা। হারানোর কষ্টই আমাদের শেখায়—কীভাবে ধরে রাখতে হয়। মানুষ আসলে তার বন্ধুত্বের মধ্য দিয়েই নিজেকে চিনে নেয়। স্কুলের বন্ধু, কলেজের বন্ধু, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, কিংবা পাড়ার বন্ধু—প্রত্যেকেই আমাদের জীবনের একেকটি অধ্যায়। তারা কেউ পুরোপুরি যায় না, আবার পুরোপুরি থাকেও না। তারা থেকে যায় আমাদের গল্পের ভেতরে, আমাদের স্মৃতির ভেতরে।

কিন্তু এখানেও সেই একই গল্প—সময়ের গল্প। একসময় সবাই বড় হয়ে যায়। কেউ শহরে চলে যায়, কেউ অন্য দেশে, কেউবা নিজের সংসারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আর পাড়ার সেই আড্ডা ধীরে ধীরে নিভে যায়। যে বন্ধুর সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হতো, সে এখন বছরে একবারও দেখা দেয় না। কিন্তু তার জায়গাটা কোথাও হারিয়ে যায় না। সে থেকে যায়, আমাদের ভেতরের কোনো এক নীরব কোণে।

মানুষের এই হারিয়ে যাওয়া বন্ধুরাই আসলে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। তারা আমাদের শেখায়—সময়ের কোনো স্থায়িত্ব নেই, সম্পর্কও চিরস্থায়ী নয়। তবুও কিছু সম্পর্ক হৃদয়ে এমনভাবে গেঁথে যায় যে, তারা কখনো হারায় না। তারা শুধু দূরে সরে যায়, কিন্তু মুছে যায় না।

মানুষের এই দ্বৈততা বন্ধুত্বকেও প্রভাবিত করে। আমরা একদিকে বন্ধুদের জন্য সব করতে চাই, আবার অন্যদিকে নিজের সীমাবদ্ধতার ভেতরে আটকে যাই। আমরা বলি, “তুই থাকবি সবসময়”—কিন্তু সেই “সবসময়” একসময় কোথায় যেন হারিয়ে যায়। মানুষ নিজের অজান্তেই বদলে যায়, আর সেই বদলের স্রোতে ভেসে যায় অনেক সম্পর্ক।

তবুও কিছু বন্ধুত্ব টিকে থাকে। সেই টিকে থাকা বন্ধুরা আমাদের জীবনের এক ধরনের আশ্রয় হয়ে ওঠে। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে আমরা বুঝতে পারি—সবাই চলে গেলেও কিছু মানুষ থেকে যায়। তারা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ পুরোপুরি একা নয়।

হারিয়ে যাওয়া বন্ধুরা আমাদের মাঝে মাঝে কষ্ট দেয়। কোনো পুরোনো গান, কোনো পুরোনো রাস্তা, কোনো পুরোনো বিকেল—এইসব আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই সময়ের কাছে, যখন আমরা ভাবতাম, এই বন্ধুরা কখনো হারাবে না। তখন বুকের ভেতর হালকা একটা ব্যথা অনুভব হয়। আমরা বুঝি, সময় কারও জন্য থেমে থাকে না।

কিন্তু এই হারিয়ে যাওয়া এক ধরনের সৌন্দর্যও বয়ে আনে। কারণ, আমরা যদি কখনো হারাতাম না, তাহলে হয়তো আমরা কোনো কিছুই এত গভীরভাবে অনুভব করতে পারতাম না। হারিয়ে যাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ভালোবাসার গভীরতা। হারানোর কষ্টই আমাদের শেখায়—কীভাবে ধরে রাখতে হয়।

মানুষ আসলে তার বন্ধুত্বের মধ্য দিয়েই নিজেকে চিনে নেয়। স্কুলের বন্ধু, কলেজের বন্ধু, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, কিংবা পাড়ার বন্ধু—প্রত্যেকেই আমাদের জীবনের একেকটি অধ্যায়। তারা কেউ পুরোপুরি যায় না, আবার পুরোপুরি থাকেও না। তারা থেকে যায় আমাদের গল্পের ভেতরে, আমাদের স্মৃতির ভেতরে।

জীবনের শেষে হয়তো আমরা বুঝতে পারি—সবাইকে ধরে রাখা সম্ভব ছিল না। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ ছিল, যারা আমাদের জীবনের মানে বদলে দিয়েছিল। সেই হারিয়ে যাওয়া বন্ধুরাই আমাদের সবচেয়ে আপন হয়ে থাকে।

আর তাই, যখন কোনো পুরোনো বন্ধুর কথা মনে পড়ে, আমরা একটু চুপ হয়ে যাই। বাইরে তখন হয়তো সবকিছু স্বাভাবিক, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। সেই নীরবতার ভেতরেই আমরা আবার খুঁজে পাই আমাদের হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে—একটি হাসি, একটি স্মৃতি, একটি সময়ের টুকরো হয়ে।

এভাবেই মানুষ বাঁচে—হারিয়ে যাওয়া মানুষদের স্মৃতি নিয়ে, আর টিকে থাকা সম্পর্কের উষ্ণতায়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow