হাড় হিম করা রহস্যময় প্রাচীন মসজিদের খোঁজে

আশরাফুল ইসলাম আকাশ গ্রীষ্মের তালপাকা দুপুর। সূর্যটা মাথার ওপর তীব্র আগুন হয়ে ঝলসে দিচ্ছে চারপাশ। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে; বাতাস পর্যন্ত গরম হয়ে উঠেছে। এই প্রচণ্ড গরমের দিনে ঠিক করলাম বেরিয়ে পড়বো বগুড়ার প্রাচীন জনপদ কাহালুর দিকে। আমার সঙ্গী মেহেদী। রহস্যময় প্রাচীন এক মসজিদের খোঁজে। পুরোনো এই স্থাপনাকে ঘিরে আছে ভয়ংকর কাহিনির আধার! স্টেশন রোড থেকে সিএনজিতে চেপে পৌঁছালাম কাহালু স্টেশনে। গ্রামীণ পরিবেশের সাদামাটা হোটেলের টুলে বসে সকালের নাস্তা শেষ করলাম। কিছুপথ পায়ে হেঁটে নসিমনে উঠে রওয়ানা দিলাম বোরতা গ্রামের দিকে। সরু মেঠোপথে গাড়ি চলতে থাকলো। বাতাস বইছে ঠিকই, তবে সেই বাতাস যেন আগুনের মতো দাউদাউ করে ধেয়ে আসছিল মুখপানে। রাস্তার দুপাশে ধানক্ষেত, মাঝে মাঝে ঘোর-মহিষের গাড়ি—সব মিলিয়ে এক শান্ত গ্রাম্য দৃশ্য। এসব উপভোগ করতেই মনের মাঝে উঁকি দিলো জটিল এক প্রশ্ন—লোকমুখে শোনা ভৌতিক মসজিদের গল্প কতটা সত্য? বোরতা গ্রামে পৌঁছেছি। পাকা সড়কের ধারে যাকে পাচ্ছি, তাকেই জিজ্ঞেস করছি বটগাছে ঘেরা মসজিদটা কোথায়? তবে ব্যস্ততার অজুহাতে কেউ সেভাবে সাড়া দিলেন না। অবশেষে এক বৃদ্ধ আমাদের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিলেন

হাড় হিম করা রহস্যময় প্রাচীন মসজিদের খোঁজে

আশরাফুল ইসলাম আকাশ

গ্রীষ্মের তালপাকা দুপুর। সূর্যটা মাথার ওপর তীব্র আগুন হয়ে ঝলসে দিচ্ছে চারপাশ। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে; বাতাস পর্যন্ত গরম হয়ে উঠেছে। এই প্রচণ্ড গরমের দিনে ঠিক করলাম বেরিয়ে পড়বো বগুড়ার প্রাচীন জনপদ কাহালুর দিকে। আমার সঙ্গী মেহেদী। রহস্যময় প্রাচীন এক মসজিদের খোঁজে। পুরোনো এই স্থাপনাকে ঘিরে আছে ভয়ংকর কাহিনির আধার!

স্টেশন রোড থেকে সিএনজিতে চেপে পৌঁছালাম কাহালু স্টেশনে। গ্রামীণ পরিবেশের সাদামাটা হোটেলের টুলে বসে সকালের নাস্তা শেষ করলাম। কিছুপথ পায়ে হেঁটে নসিমনে উঠে রওয়ানা দিলাম বোরতা গ্রামের দিকে। সরু মেঠোপথে গাড়ি চলতে থাকলো। বাতাস বইছে ঠিকই, তবে সেই বাতাস যেন আগুনের মতো দাউদাউ করে ধেয়ে আসছিল মুখপানে।

রাস্তার দুপাশে ধানক্ষেত, মাঝে মাঝে ঘোর-মহিষের গাড়ি—সব মিলিয়ে এক শান্ত গ্রাম্য দৃশ্য। এসব উপভোগ করতেই মনের মাঝে উঁকি দিলো জটিল এক প্রশ্ন—লোকমুখে শোনা ভৌতিক মসজিদের গল্প কতটা সত্য?

বোরতা গ্রামে পৌঁছেছি। পাকা সড়কের ধারে যাকে পাচ্ছি, তাকেই জিজ্ঞেস করছি বটগাছে ঘেরা মসজিদটা কোথায়? তবে ব্যস্ততার অজুহাতে কেউ সেভাবে সাড়া দিলেন না। অবশেষে এক বৃদ্ধ আমাদের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিলেন! তারপর আঙুল তুলে দূরের বিশাল বটগাছ দেখিয়ে বললেন, ‌‌‘ওই গাছের নিচেই লুকিয়ে আছে মসজিদ। দিনে দেখতে পারো, কিন্তু রাতে কাছে যেও না। আজান ছাড়া ভৌতিক সব শব্দ শোনা যায়!’

masjid

পাকা সড়ক থেকে নেমে চাষের জমিতে পা রাখলাম। সেচের জমা হাটু পর্যন্ত পানি উঠেছে। তবে কোনো ময়লা নেই। জমির নরম মাটির তলদেশ পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। তবে ভারী শরীরের পা পড়লেই স্বচ্ছ পানির সঙ্গে কাদা মিশে যাবে। শুরুতে মন চাইলো না। তবু উপায় না পেয়ে এই পথেই পা বাড়াতে হলো। পায়ের জুতা হাতে নিয়ে, প্রথম বাধা অতিক্রম করলাম। এরপর জমির সরু আল ধরে রহস্যময় বটগাছের দিকে এগোতে থাকলাম।

বটগাছে ঘেরা মসজিদের দিকে যত এগোতে থাকলাম, গরম ততই অসহনীয় লাগছিল। কিন্তু বটগাছের ছায়ায় যেতেই হঠাৎ শরীর কাঁপিয়ে শীতল হাওয়া দোলা দিলো। চিটচিটে গরমটা যেন কোথায় মিলিয়ে গেল।

বিশাল বটগাছের শেকড় নেমে এসেছে মাটিতে। আর দেওয়ালের মতো ঘিরে রেখেছে পুরোনো এক নিদর্শন—তিন গম্বুজ বিশিষ্ট প্রাচীন মসজিদ। মাটির সঙ্গে বটগাছের শেকড় মিলিয়ে যেতেই কিছু রঙিন সুতা, আগরবাতি আর দেশি মুদ্রা চোখে পড়লো। সুযোগ পেলেই গ্রামের অনেকেই এখানে এসে মনের কথা বলে যান।

masjid

বটগাছে আচ্ছাদিত মসজিদের পূর্বপাশে তিনটি গেট, শেকড় আটকে উত্তর পাশের জানালা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল দেওয়ালে ম্লান হয়ে যাওয়া রঙিন আল্পনা। তবুও মনে হচ্ছিল, কোনো অদৃশ্য হাত সেগুলোকে প্রতিদিন নতুন করে সাজায়।

ঠিক তখনই মৃদু এক সুর ভেসে এলো। মনে হলো যেন কেউ আজান দিচ্ছে। কিন্তু আশেপাশে তো কেউ নেই! আমি মেহেদীর দিকে তাকালাম। সে ভয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘তুমি কি শুনছো?’ আমি শুধু মাথা নেড়ে হ্যাঁ সম্মতি জানালাম। বুক ধকধক করতে লাগল!

মসজিদের ভেতরে দাঁড়ালে মনে হচ্ছিল কেউ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। শ্যাওলা ঢাকা গম্বুজগুলো যেন প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। মিম্বারের জায়গাটা ধ্বংস হয়ে গেছে, তবুও মনে হচ্ছিল সেখানেই কেউ দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছে। খসে পড়া ইটের দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন মুসল্লি!

masjid

মনে তখন ভয়ের রাজত্ব কায়েম করছে। তবু কিছুটা সাহস নিয়ে চারপাশ ঘুরে দেখলাম। পশ্চিম পাশে যাওয়ার সাহস জুটলো না। একে তো দিঘি, তার ওপর সাঁতার জানা নেই! মন চাইলেও মসজিদের অগ্রভাগে যাওয়ার ইচ্ছেটা ফিকে হলো।

মসজিদের পাশেই লম্বা এক কবর। দৈর্ঘে প্রায় ১২ থেকে ১৪ ফুট। গ্রামের মানুষেরা বিশ্বাস করে এটি কোনো অলৌকিক সাধকের কবর। লোকমুখে প্রচলিত আছে, তিনি এখনো এখানে আছেন। রাতে নাকি কবর থেকে আলো বের হয়। কখনো মসজিদের পাশে আগুন জ্বলে ওঠে। পাশের দিঘিতে মধ্যেমাঝেই ভেসে ওঠে ধবধবে সাদা মাছ আর আলখেল্লা পরিহিত একটি শরীর! ভরদুপুরে এসব কথা শুনে তো হুঁশ হারার মতো অবস্থা।

কবরের কাছে যেতেই হঠাৎ শীতল বাতাস বইলো। তপ্ত দুপুরে শরীরটা কেঁপে উঠলো। মনে হলো, যেন কেউ আমাদের পাশ দিয়ে চলে গেল। কিন্তু আশেপাশে কেউ নেই। মেহেদী ভয়ের সুরে বলল, ‘চলো, এখানে দাঁড়ানো ঠিক হচ্ছে না।’

গ্রামের এক কৃষক এগিয়ে এসে জানালেন, ‘এখানে রাতে গেলে বটগাছের শেকড় নড়ে ওঠে। আর ভেতর থেকে শোনা যায় নামাজের শব্দ। কখনো আবার কারো কান্নার আওয়াজও শোনা যায়।’ রোদে পোড়া খালি গায়ের চাষির কথা শুনে গলা শুকিয়ে গেল! দূরে তাকালাম। বটগাছের শেকড় সত্যিই যেন একটু দুলছিল। গরম বাতাসে, নাকি সত্যিই কিছু ঘটছে—বুঝতে পারলাম না।

masjid

সূর্য তখনো মাথার ওপর। তালপাকা গরম শরীরকে পুড়িয়ে দিচ্ছিল। দ্রুত গ্রাম ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু ফিরে আসার সময় বারবার মনে হচ্ছিল কেউ আমাদের পিছু নিচ্ছে। নসিমনে উঠেই শেষবারের মতো তাকালাম বটগাছের দিকে। গম্বুজের আড়ালে যেন ছায়ামূর্তি নড়াচড়া করছে।

মেহেদী কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘আজ আমরা শুধু প্রাচীন নিদর্শন দেখিনি, কিছু অদ্ভুত জিনিসও অনুভব করেছি।’ আমি তাতে খুব বেশি সায় দিলাম না। কেবল গরমের ভেতর শরীর বেয়ে ঠান্ডা ঘাম গড়িয়ে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল, বটগাছে আচ্ছাদিত সেই মসজিদ এখনো আমাদের পিছু নিচ্ছে।

ফিরে এসে যতবার চোখ বন্ধ করেছি, বারবার মনে হয়েছে আমি আবার সেই মসজিদের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি। দেওয়ালের আল্পনা, শেকড়ে আটকে যাওয়া জানালা আর মিম্বারে অদৃশ্য কেউ প্রার্থনা করছে।

গ্রীষ্মের তালপাকা দুপুরে আমাদের এই ভ্রমণ শেষ হলেও রহস্যের যাত্রা এখনো চলছে। হয়তো মসজিদটি শুধু প্রাচীন স্থাপত্য নয়—বরং অদৃশ্য এক জগতের দরজা; যা খুলে যায় কেবল সাহসীদের জন্য।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow