১৯৫৪’র স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে চায় অস্ট্রিয়া

অস্ট্রিয়ার ফুটবলের ইতিহাসে ২০২৬ বিশ্বকাপ যেন এক নতুন ভোরের নাম। দীর্ঘ ২৮ বছরের অপেক্ষা শেষে আবারও ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ফিরছে ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী দলটি। কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে অস্ট্রিয়ানরা। ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলবে অস্ট্রিয়া। অথচ একসময় বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি ছিল দেশটি। ১৯৫৪ বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জন ছিল তাদের সর্বোচ্চ সাফল্য। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এবারও বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখছে রালফ রাংনিকের দল। রালফ রাংনিকের হাত ধরে নতুন জাগরণ অস্ট্রিয়ার বর্তমান পুনর্জাগরণের নেপথ্যের সবচেয়ে বড় নাম রালফ রাংনিক। ২০২২ সালের এপ্রিলে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দলটিকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে অন্তর্বর্তীকালীন হিসেবে কাজ করা এই সাবেক এই জার্মান কোচ। বিশ্ব ফুটবলে ‘প্রেসিং ফুটবলের জনক’ হিসেবেই পরিচিত রাংনিক। জার্মান ক্লাব ফুটবলে স্টুটগার্ট, শালকে, হ্যানোভার ও হফেনহাইমের মতো ক্লাবে কাজ করার পর সবচেয়ে বড় সাফল্য পান আরবি লাইপজিগে। তার পরিকল্পনাতেই আঞ্চলিক লিগ থেকে উঠে

১৯৫৪’র স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে চায় অস্ট্রিয়া

অস্ট্রিয়ার ফুটবলের ইতিহাসে ২০২৬ বিশ্বকাপ যেন এক নতুন ভোরের নাম। দীর্ঘ ২৮ বছরের অপেক্ষা শেষে আবারও ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ফিরছে ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী দলটি। কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে অস্ট্রিয়ানরা।

১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলবে অস্ট্রিয়া। অথচ একসময় বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি ছিল দেশটি। ১৯৫৪ বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জন ছিল তাদের সর্বোচ্চ সাফল্য। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এবারও বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখছে রালফ রাংনিকের দল।

রালফ রাংনিকের হাত ধরে নতুন জাগরণ

অস্ট্রিয়ার বর্তমান পুনর্জাগরণের নেপথ্যের সবচেয়ে বড় নাম রালফ রাংনিক। ২০২২ সালের এপ্রিলে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দলটিকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে অন্তর্বর্তীকালীন হিসেবে কাজ করা এই সাবেক এই জার্মান কোচ।

বিশ্ব ফুটবলে ‘প্রেসিং ফুটবলের জনক’ হিসেবেই পরিচিত রাংনিক। জার্মান ক্লাব ফুটবলে স্টুটগার্ট, শালকে, হ্যানোভার ও হফেনহাইমের মতো ক্লাবে কাজ করার পর সবচেয়ে বড় সাফল্য পান আরবি লাইপজিগে। তার পরিকল্পনাতেই আঞ্চলিক লিগ থেকে উঠে এসে বুন্দেসলিগার শক্তিশালী ক্লাবে পরিণত হয় লাইপজিগ।

পরবর্তীতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর অস্ট্রিয়ার দায়িত্ব নিয়ে দলটিকে নতুন পরিচয় দেন। রাংনিকের অধীনে অস্ট্রিয়া হয়ে ওঠে আক্রমণাত্মক, দ্রুতগতি সম্পন্ন এবং সংগঠিত একটি দল।

ইউরো ২০২৪-এ দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখে অস্ট্রিয়া। বায়ার্ন মিউনিখের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে রাংনিক জাতীয় দলের সঙ্গেই থেকে যান এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে ফেরান দলটিকে।

বাছাইপর্বে দারুণ অস্ট্রিয়া

ইউরোপিয়ান বাছাইপর্বের গ্রুপ ‘এইচ’-গ্রুপে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, রোমানিয়া, সাইপ্রাস ও সান মারিনোর সঙ্গে পড়েছিল অস্ট্রিয়া। শুরু থেকেই দুর্দান্ত খেলতে থাকে তারা।

প্রথম পাঁচ ম্যাচ টানা জিতে গ্রুপের শীর্ষে উঠে যায় রাংনিকের দল। এই সময়ে সান মারিনোকে ১০-০ গোলে বিধ্বস্ত করে নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয়ও তুলে নেয় অস্ট্রিয়া। সেই ম্যাচে চার গোল করে দেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন মার্কো আর্নাউতোভিচ।

তবে রোমানিয়ার কাছে নাটকীয় ১-০ ব্যবধানে হেরে কিছুটা চাপে পড়ে যায় দলটি। পরে সাইপ্রাসকে হারিয়ে শেষ ম্যাচে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে একটি ড্র-ই যথেষ্ট ছিল গ্রুপসেরা হওয়ার জন্য।

ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত সেই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে শুরুতেই পিছিয়ে পড়ে অস্ট্রিয়া। কর্নার থেকে হারিস তাবাকোভিচের হেডে এগিয়ে যায় বসনিয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৭৮ মিনিটে মাইকেল গ্রেগোরিশের গোলে ১-১ সমতা ফেরায় স্বাগতিকরা। সেই ড্রতেই ২০২৬ বিশ্বকাপ নিশ্চিত হয় অস্ট্রিয়ার।

বাছাইপর্বের পরিসংখ্যান

গ্রুপ ‘এইচ’-এ অস্ট্রিয়ার রেকর্ড ছিল:

* ম্যাচ: ৮
* জয়: ৬
* ড্র: ১
* হার: ১
* গোল করেছে: ২২
* গোল হজম: ৪
* গোল ব্যবধান: +১৮
* পয়েন্ট: ১৯

গ্রুপ টেবিলে তাদের নিচে ছিল বসনিয়া (১৭ পয়েন্ট), রোমানিয়া (১৩), সাইপ্রাস (৮) ও সান মারিনো (০)।

বিশ্বকাপ ২০২৬-এ অস্ট্রিয়ার গ্রুপ ও সূচি

বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে তুলনামূলক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে অস্ট্রিয়া। গ্রুপে তাদের প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা, আলজেরিয়া ও জর্ডান।

অস্ট্রিয়ার ম্যাচসূচি:

* ১৬ জুন: অস্ট্রিয়া বনাম জর্ডান- সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া স্টেডিয়াম
* ২২ জুন: আর্জেন্টিনা বনাম অস্ট্রিয়া- ডালাস স্টেডিয়াম
* ২৭ জুন: আলজেরিয়া বনাম অস্ট্রিয়া- কানসাস সিটি স্টেডিয়াম

অভিজ্ঞতা ও তরুণদের মিশেলে স্কোয়াড

অস্ট্রিয়ার বর্তমান স্কোয়াডে রয়েছে অভিজ্ঞতা ও তরুণ প্রতিভার দারুণ সমন্বয়। দলের সবচেয়ে বড় তারকা ডেভিড আলাবা। ইনজুরি কাটিয়ে আবারও জাতীয় দলে ফিরেছেন রিয়াল মাদ্রিদে খেলা (সদ্য ক্লাব ছেড়েছেন তিনি) এই অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার। এছাড়া মার্কো আর্নাউতোভিচ, মার্সেল সাবিৎসার ও মাইকেল গ্রেগোরিশের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রাও আছেন দলে।

সবচেয়ে বড় চমক দুটি তরুণ মিডফিল্ডার কার্নি চুকুয়েমেকা ও পল ভ্যানার। ইংল্যান্ড ও জার্মানির পরিবর্তে অস্ট্রিয়ার হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর এবার প্রথম বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছেন তারা।

অস্ট্রিয়ার বিশ্বকাপ ইতিহাস

* কনফেডারেশন: উয়েফা
* প্রথম বিশ্বকাপ: ১৯৩৪
* সর্বশেষ বিশ্বকাপ: ১৯৯৮
* বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: ৮ বার
* সেরা সাফল্য: তৃতীয় স্থান (১৯৫৪)

বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার সামগ্রিক রেকর্ড:

* ম্যাচ: ২৯
* জয়: ১২
* ড্র: ৪
* হার: ১৩
* গোল করেছে: ৪৩
* গোল হজম: ৪৭

১৯৫৪: অস্ট্রিয়ার সোনালি অধ্যায়

অস্ট্রিয়ার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় ১৯৫৪ বিশ্বকাপ। সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সেই আসরে তারা তৃতীয় স্থান অর্জন করে।

গ্রুপপর্বে স্কটল্যান্ডকে ১-০ ও চেকোস্লোভাকিয়াকে ৫-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে অস্ট্রিয়া। এরপর স্বাগতিক সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি গোলের ম্যাচে ৭-৫ ব্যবধানে জয় পায় তারা।

সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে ৬-১ গোলে হারলেও তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে উরুগুয়েকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ব্রোঞ্জ জেতে অস্ট্রিয়া। পুরো টুর্নামেন্টে তারা ১৭ গোল করেছিল।

১৯৯৮: শেষ বিশ্বকাপ স্মৃতি

ফ্রান্স ১৯৯৮ ছিল অস্ট্রিয়ার সর্বশেষ বিশ্বকাপ। ইতালি, চিলি ও ক্যামেরুনের সঙ্গে একই গ্রুপে পড়ে তারা। চিলি ও ক্যামেরুনের বিপক্ষে দুটি ম্যাচই ১-১ ড্র করে অস্ট্রিয়া। ইতালির বিপক্ষে শেষ ম্যাচে শেষ মুহূর্তে গোল করলেও ২-১ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিতে হয় তাদের। মাত্র এক পয়েন্টের জন্য দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠতে পারেনি অস্ট্রিয়া।

বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার সর্বোচ্চ গোলদাতা

বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার সর্বোচ্চ গোলদাতা এরিখ প্রোবস্ট। ১৯৫৪ বিশ্বকাপে তিনি করেছিলেন ৬ গোল। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জয়সূচক গোলের পর চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন তিনি। এছাড়া সুইজারল্যান্ড ও পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষেও গোল করেছিলেন এই কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড।

সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড

বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার হয়ে সবচেয়ে বেশি ১১টি করে ম্যাচ খেলেছেন চার ফুটবলার- ফ্রিডরিখ কনসিলিয়া, এরিখ ওবারমায়ার, ব্রুনো পেজ্জে, হারবার্ট প্রোহাস্কা। ১৯৭৮ ও ১৯৮২ বিশ্বকাপে তারা দলের মূল ভরসা ছিলেন।

অস্ট্রিয়ার স্মরণীয় বিশ্বকাপ মুহূর্ত

অস্ট্রিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ম্যাচগুলোর একটি ১৯৭৮ বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানে জয়। সে ম্যাচটি ‘মিরাকল অব কর্ডোবা’ নামে পরিচিত। কারণ ৪৭ বছর পর প্রথমবার জার্মানিকে হারিয়েছিল অস্ট্রিয়া। সেই হারেই বিদায়ী চ্যাম্পিয়ন পশ্চিম জার্মানি টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায়।

নতুন স্বপ্নের অপেক্ষা

দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে অস্ট্রিয়া এবার শুধু অংশ নিতেই আসছে না, তারা নতুন ইতিহাসও লিখতে চায়। রালফ রাংনিকের শৃঙ্খলাবদ্ধ কৌশল, আলাবা-সাবিৎসারদের অভিজ্ঞতা এবং তরুণদের উদ্যম মিলিয়ে অস্ট্রিয়া এখন ইউরোপের অন্যতম বিপজ্জনক দল।

১৯৫৪ সালের সেই সোনালি স্মৃতি ফিরিয়ে আনা হয়তো সহজ হবে না, তবে অস্ট্রিয়ানরা বিশ্বাস করে—২০২৬ বিশ্বকাপই হতে পারে তাদের ফুটবল পুনর্জাগরণের সবচেয়ে বড় মঞ্চ।

আইএইচএস/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow