২০০ বছর আগের এক দুর্ঘটনা থেকেই দেয়াশলাইর আবিষ্কার
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো আগুন। রান্না থেকে শুরু করে আলো বা তাপ-সবকিছুর পেছনেই এর ভূমিকা আছে। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে, আগুন জ্বালানো ছিল অনেকটাই সময়সাপেক্ষ ও কষ্টকর একটি কাজ। ঠিক সেই সময়েই এক আকস্মিক ঘটনা বদলে দেয় ইতিহাসের ধারা। মনে আছে তো? প্রস্তর যুগে যখন মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখেছিল পাথরে পাথর ঘষে। যুক্তরাজ্যের প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৪ লাখ বছর আগে আদি নিয়ান্ডারথাল মানুষেরা প্রথম আগুন জ্বালানোর কৌশল আয়ত্ত করেছিল। কিন্তু আমাদের বর্তমান অবস্থা ওতটা কঠিন নয়, তবে এখন আমরা যে দেয়াশলাই কাঠি দিয়ে খুব সহজে আগুন জ্বালাতে পারছি তার আবিষ্কার হয়েছিল ২০০ বছর আগে। ১৮২৬ সালের দিকে ইংল্যান্ডের একজন ফার্মাসিস্ট জন ওয়াকার রাসায়নিক নিয়ে কাজ করার সময় এমন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, যা পরে হয়ে ওঠে যুগান্তকারী আবিষ্কারের সূচনা। বিস্ফোরক তৈরির জন্য ব্যবহৃত একটি মিশ্রণ শুকিয়ে কাঠিতে লেগে ছিল। সেটি সরাতে গিয়ে ফায়ারপ্লেসের পাথরে ঘষা লাগতেই হঠাৎ আগুন জ্বলে ওঠে। এই ছোট্ট দুর্ঘটনাই পরবর্তীতে মানবজাতির আগুন ব্যবহারের ইতিহাসকে নতুন পথে নিয়
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো আগুন। রান্না থেকে শুরু করে আলো বা তাপ-সবকিছুর পেছনেই এর ভূমিকা আছে। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে, আগুন জ্বালানো ছিল অনেকটাই সময়সাপেক্ষ ও কষ্টকর একটি কাজ। ঠিক সেই সময়েই এক আকস্মিক ঘটনা বদলে দেয় ইতিহাসের ধারা।
মনে আছে তো? প্রস্তর যুগে যখন মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখেছিল পাথরে পাথর ঘষে। যুক্তরাজ্যের প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৪ লাখ বছর আগে আদি নিয়ান্ডারথাল মানুষেরা প্রথম আগুন জ্বালানোর কৌশল আয়ত্ত করেছিল। কিন্তু আমাদের বর্তমান অবস্থা ওতটা কঠিন নয়, তবে এখন আমরা যে দেয়াশলাই কাঠি দিয়ে খুব সহজে আগুন জ্বালাতে পারছি তার আবিষ্কার হয়েছিল ২০০ বছর আগে।
১৮২৬ সালের দিকে ইংল্যান্ডের একজন ফার্মাসিস্ট জন ওয়াকার রাসায়নিক নিয়ে কাজ করার সময় এমন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, যা পরে হয়ে ওঠে যুগান্তকারী আবিষ্কারের সূচনা। বিস্ফোরক তৈরির জন্য ব্যবহৃত একটি মিশ্রণ শুকিয়ে কাঠিতে লেগে ছিল। সেটি সরাতে গিয়ে ফায়ারপ্লেসের পাথরে ঘষা লাগতেই হঠাৎ আগুন জ্বলে ওঠে। এই ছোট্ট দুর্ঘটনাই পরবর্তীতে মানবজাতির আগুন ব্যবহারের ইতিহাসকে নতুন পথে নিয়ে যায়।
জন ওয়াকার ১৭৮১ সালে ইংল্যান্ডের স্টকটন-অন-টিস অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। এটি ছিল শিল্পবিপ্লবের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়, যখন ১৭৭৬ সালে জেমস ওয়াটের বাষ্পীয় ইঞ্জিন বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে শিল্প ও পরিবহনে বিপ্লব আনে।
১৮২৫ সালে স্টকটনে প্রথম পাবলিক রেলওয়ে পৌঁছায়, আর কয়েক বছরের মধ্যেই জর্জ স্টিফেনসনের তৈরি আধুনিক স্টিম ইঞ্জিন ‘রকেট’ প্রমাণ করে যে ট্রেন ঘণ্টায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার গতিতেও চলতে পারে। এতে করে দীর্ঘ যাত্রার সময় নাটকীয়ভাবে কমে যায়। ঘোড়ায় চড়ে ১২ দিন পর যে গন্তব্যে পৌঁছানো যেত, সেটা মাত্র আট ঘণ্টায় সম্পন্ন হতে থাকে।
তবে সেই সময়েও আগুন জ্বালানো ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। মানুষ চকমকি পাথর ও ইস্পাতের উপর নির্ভর করত, কিংবা সব সময়ই অঙ্গার বা কয়লা জ্বালিয়ে রাখতে হতো। এই বাস্তবতায় ওয়াকারের আবিষ্কার এক নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয় সহজে ও দ্রুত আগুন জ্বালানোর উপায়।
ওয়াকার ছিলেন পেশায় একজন প্রশিক্ষিত সার্জন, তবে ৮শ শতকে হাসপাতালের কঠিন ও অস্বস্তিকর পরিবেশ থেকে বিরক্ত হয়ে তিনি পরে প্রশিক্ষণ নিয়ে ওষুধ প্রস্তুতকারক বা ড্রাগিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৮২৬ সাল নাগাদ তিনি মানুষের পাশাপাশি ঘোড়া, গরু, এমনকি মুরগির জন্যও ওষুধ তৈরি করেছিলেন বলে লেখক অ্যালান মিডলটনের লেখায় উঠে আসে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওয়াকার রাসায়নিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করছিলেন।
ওয়াকার একজন বুদ্ধিমান এবং খুবই সদয় মানুষ ছিলেন, কেউ কেউ তাকে একটু আলাদা ধরনের মানুষ বলেও মনে করতেন তাকে। তিনি তার এক কৃষক বন্ধুর জন্য পারকাশন ক্যাপ (যে যন্ত্র বন্দুক ছুঁড়তে সাহায্য করে) তৈরি করতে রাসায়নিক মিশ্রণ করতেন। একদিন তিনি একটি নির্দিষ্ট মিশ্রণ তৈরি করে শুকোতে রাখেন। রাসায়নিক মিশ্রণ শুকিয়ে যাওয়ার পর তিনি সেটি একটি কাঠির মাধ্যমে সরাতে গিয়ে ফায়ারপ্লেসের পাথরে আঘাত করেন। এতে সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে যায়। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং দ্রুতই এর ব্যবহারিক সম্ভাবনা বুঝতে পারেন।
পরবর্তীতে তিনি যে আগুন জ্বালানোর কাঠি তৈরি করেন, তা ‘ফ্রিকশন ম্যাচ’ নামে পরিচিত হয়। এগুলো ছিল পাতলা চ্যাপ্টা কাঠির এক প্রান্তে বিশেষ রাসায়নিকের প্রলেপ দেওয়া। সেই মিশ্রণে ছিল পটাশিয়াম ক্লোরেট, অ্যান্টিমনি সালফাইড, গাম অ্যারাবিক এবং পানি। এগুলো শুকিয়ে গেলে শিরিষ কাগজ বা ঘষার উপযুক্ত কোনো পৃষ্ঠে ঘষলেই সহজে আগুন জ্বলে উঠত।
প্রথমদিকে এগুলো টিনের কৌটায় বিক্রি হতো এবং বড় সংখ্যায় উৎপাদন করা হতো। প্রথম বিক্রি হয় ১৮২৭ সালের এপ্রিল মাসে। যদিও ওয়াকার তার আবিষ্কারের কোনো পেটেন্ট নেননি এবং সূত্রও গোপন রাখেন, তবুও দ্রুতই তার পণ্য স্থানীয় চাহিদা পূরণে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে তার তৈরি দেশলাই পুরোপুরি নিখুঁত ছিল না। কখনো কখনো জ্বলন্ত রাসায়নিক কাঠি থেকে পড়ে গিয়ে কাপড় বা মেঝেতে ক্ষতি করার ঝুঁকি তৈরি করত।
এর কিছু বছর পর, ১৮২৯ সালে লন্ডনের স্যামুয়েল জোন্স ‘লুসিফার’ নামে অনুরূপ একটি দেশলাই বাজারে আনেন এবং ব্যাপক উৎপাদন শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য উদ্ভাবকেরা প্রযুক্তিকে উন্নত করতে থাকেন। প্যাকেটের নকশাও বদলে যেতে থাকে এবং ১৮৪৪ সালে সুইডিশ একটি সংস্করণ আধুনিক দেশলাই বাক্সের ভিত্তি তৈরি করে দেয়, যেটি প্রথম পেটেন্ট করা ডিজাইনগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়।
পরবর্তীতে দেশলাই তৈরি অনেক জায়গায় একটি গৃহভিত্তিক শিল্পে পরিণত হয়। বিশেষ করে কারখানার আশপাশে বসবাসকারী নারী ও শিশুরা পারিশ্রমিকভিত্তিক কাজের মাধ্যমে বাক্স তৈরি করত, যা অনেক পরিবারের জন্য অতিরিক্ত আয়ের উৎস ছিল। পরে শিল্পায়নের মাধ্যমে এটি বড় বাণিজ্যে রূপ নেয়।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিগারেট লাইটারের আবিষ্কার দেশলাই শিল্পের চাহিদা কমিয়ে দেয়। অনেক প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে বাজার থেকে হারিয়ে যায়। আজও দেশলাই বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হলেও এর গুরুত্ব কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। এখন এটি শুধু একটি প্রয়োজনীয় জিনিস নয়, অনেক ক্ষেত্রে ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিংয়ের কারণে ফ্যাশনের অংশও হয়ে উঠেছে।
তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর মূল উদ্ভাবক জন ওয়াকার দীর্ঘ সময় ধরে তেমন স্বীকৃতি পাননি। ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি যদি নিজের আবিষ্কারকে আরও বাণিজ্যিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতেন, তবে তিনি আরও বড় পরিচিতি পেতে পারতেন।
তবুও স্থানীয়ভাবে তার অবদান স্মরণ করা হয় এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন আয়োজনে তার কাজকে নতুন করে তুলে ধরা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তার আবিষ্কারই আধুনিক আগুন ব্যবহারের পদ্ধতিকে সহজ, দ্রুত এবং দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে দিয়েছে যার প্রভাব আজও আমরা অনুভব করি।
সূত্র: বিবিসি, ব্রিটিশ ম্যাচবক্স লেবেল অ্যান্ড বুকম্যাচ সোসাইটি
- আরও পড়ুন
ঈদে গাজীপুর-নরসিংদীর ঘরে ঘরে ‘ফুল পিঠা’র সুবাস
নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা, ফ্রিজে জমে বাবার ভালোবাসা সন্তানদের অপেক্ষা
কেএসকে
What's Your Reaction?