দীর্ঘকাল ধরে কোলন বা মলাশয়ের ক্যানসারকে কেবল বয়স্কদের রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, বর্তমান সময়ের চিত্রটি বেশ ভিন্ন এবং উদ্বেগজনক। গত তিন দশকে বিশ্বজুড়ে তরুণ ও কর্মক্ষম ব্যক্তিদের মধ্যে এই মরণব্যাধির প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে প্রখ্যাত অনকোলজিস্ট ড. রবি কে গুপ্ত এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, বর্তমানে কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত প্রতি পাঁচজন নতুন রোগীর মধ্যে একজনের বয়সই ৫৫ বছরের নিচে। আগে যেখানে ৫০ বা ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি ছিল, সেখানে এখন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই রোগের বিস্তৃতি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। এই পরিবর্তনের পেছনে মূলত আমাদের আধুনিক জীবনধারা, খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবেশগত পরিবর্তনগুলো দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অণুজীব বা ‘গাট মাইক্রোবায়োম’-এ পরিবর্তন
ড. রবি কে গুপ্তের মতে, আমাদের অন্ত্রে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া থাকে যা শরীরের সার্বিক সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু আধুনিক খাদ্যাভ্যাসের কারণে এই ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। খাবারে পর্যাপ্ত আঁশ বা ফাইবারের অভাব, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ এবং ঘন ঘন অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের ফলে অন্ত্রের উপকারি ব্যাকটিরিয়া ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, E. coli এবং Fusobacterium nucleatum-এর মতো নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
খাদ্যাভ্যাসের ক্ষতিকর প্রভাব
গত কয়েক দশকে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে আমূল পরিবর্তন এসেছে। আগের প্রজন্মের তুলনায় বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা অনেক বেশি অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনিযুক্ত পানীয় এবং উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। বিপরীতে, শাকসবজি বা ফলমূলের মতো ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের হার কমেছে। বড় আকারের জনসংখ্যা ভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত প্রক্রিয়াজাত খাবার খান, তাদের কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি, বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও প্রবল।
মেটাবলিক স্বাস্থ্য ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতিও কোলন ক্যানসার বাড়ার অন্যতম কারণ। ড. গুপ্ত জানান, স্থূলতা, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এই রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই পরিস্থিতিগুলো শরীরের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি করে এবং ইনসুলিনের মতো কিছু হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা ক্যান্সারের কোষ বৃদ্ধিতে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে।
যেসব লক্ষণ অবহেলা করা চলবে না তরুণ বয়সে
সাধারণত কেউ ক্যানসারের কথা ভাবেন না, ফলে প্রাথমিক লক্ষণগুলো অনেক সময় এড়িয়ে যাওয়া হয়। ড. গুপ্ত জোর দিয়ে বলেছেন যে, বয়স কম হলেও নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে:
মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া।
মলত্যাগের অভ্যাসে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন।
কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া।
আয়রনের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া।
স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা কখন জরুরি?
তরুণদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ বাড়তে থাকায় স্ক্রিনিং বা রোগ নির্ণয় পরীক্ষার নির্দেশিকাও পরিবর্তন করা হয়েছে। আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটি এখন সাধারণ ঝুঁকির ব্যক্তিদের জন্য স্ক্রিনিংয়ের বয়স ৫০ থেকে কমিয়ে ৪৫ বছর নির্ধারণ করেছে। তবে যাদের পরিবারে কোলন ক্যান্সারের ইতিহাস আছে বা যারা অন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত রোগে ভুগছেন, তাদের আরও আগে থেকেই নিয়মিত পরীক্ষা শুরু করা উচিত।
পরিশেষে বলা যায়, কোলন ক্যানসার প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কোনো বিকল্প নেই। ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ, প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন, নিয়মিত ব্যায়াম এবং শরীরের কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণই পারে এই মরণব্যাধি থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে।
তথ্যসূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস