অনলাইন জুয়ার ভয়াল থাবায় বরিশালের তরুণ ও যুবসমাজ

গভীর রাত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মেসেঞ্জার কিংবা হোয়াটসঅ্যাপে হঠাৎ ভেসে আসে পরিচিত কারও বার্তা “খুব বিপদে আছি, জরুরি একশ', পাঁচশ' কিংবা হাজার টাকা দরকার। সকালে ফিরিয়ে দেব।” মানবিক কারণে অনেকে টাকা পাঠিয়ে দিয়ে থাকেন কিন্তু পরে দেখা যায় ধার নেওয়া ব্যক্তি আর যোগাযোগ করছেন না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টাকাগুলো গেছে অনলাইন জুয়ার অ্যাকাউন্টে। বরিশালে সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলেছে। শিক্ষার্থী, বেকার তরুণ, যুবক, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যেও অনলাইন জুয়ার বিস্তার ঘটেছে। একসময় নির্দিষ্ট আড্ডাকেন্দ্র বা গোপন আসরে সীমাবদ্ধ থাকা জুয়া এখন স্মার্টফোনের মাধ্যমে মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয় নয়; বরং সামাজিক, পারিবারিক ও মানসিক সংকটের একটি বড় উৎসে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বেট, এক্সবেট, বেটওয়ে, ডাফাবেট, জেটবাজ, টেনক্রিকসহ বিভিন্ন অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্ম এবং ক্যাসিনোভিত্তিক অ্যাপ ব্যবহার করে বিপুলসংখ্যক তরুণ ও যুবকরা প্রতিদিন অর্থের ঝুঁকিপূর্ণ খেলায় অংশ নিচ্ছেন। অনেকেই ক্রিকেট, ফুটবল ব

অনলাইন জুয়ার ভয়াল থাবায় বরিশালের তরুণ ও যুবসমাজ

গভীর রাত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মেসেঞ্জার কিংবা হোয়াটসঅ্যাপে হঠাৎ ভেসে আসে পরিচিত কারও বার্তা “খুব বিপদে আছি, জরুরি একশ', পাঁচশ' কিংবা হাজার টাকা দরকার। সকালে ফিরিয়ে দেব।” মানবিক কারণে অনেকে টাকা পাঠিয়ে দিয়ে থাকেন কিন্তু পরে দেখা যায় ধার নেওয়া ব্যক্তি আর যোগাযোগ করছেন না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টাকাগুলো গেছে অনলাইন জুয়ার অ্যাকাউন্টে। বরিশালে সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলেছে। শিক্ষার্থী, বেকার তরুণ, যুবক, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যেও অনলাইন জুয়ার বিস্তার ঘটেছে। একসময় নির্দিষ্ট আড্ডাকেন্দ্র বা গোপন আসরে সীমাবদ্ধ থাকা জুয়া এখন স্মার্টফোনের মাধ্যমে মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয় নয়; বরং সামাজিক, পারিবারিক ও মানসিক সংকটের একটি বড় উৎসে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বেট, এক্সবেট, বেটওয়ে, ডাফাবেট, জেটবাজ, টেনক্রিকসহ বিভিন্ন অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্ম এবং ক্যাসিনোভিত্তিক অ্যাপ ব্যবহার করে বিপুলসংখ্যক তরুণ ও যুবকরা প্রতিদিন অর্থের ঝুঁকিপূর্ণ খেলায় অংশ নিচ্ছেন।

অনেকেই ক্রিকেট, ফুটবল বা অন্যান্য ক্রীড়া প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে বাঁজি ধরেন। কেউ কেউ অনলাইন ক্যাসিনো, লুডু বেটিং কিংবা ভার্চ্যুয়াল গেমিংয়ের মাধ্যমেও জুয়ার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।

জানা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিচিত বন্ধু বা সহপাঠীর মাধ্যমে তরুণ ও যুবকরা প্রথমে এই জগতে প্রবেশ করেন। শুরুতে অল্প কিছু টাকা জিতে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। সহজে অর্থ উপার্জনের মোহ তৈরি হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা বড় অঙ্কের বাজিতে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পরেন।

বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের এক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, গত বছর এক বন্ধুর মাধ্যমে তিনি অনলাইন বেটিংয়ে যুক্ত হন। প্রথমদিকে কয়েকবার জিতে যাওয়ায় বিষয়টিকে সহজ আয়ের মাধ্যম বলে মনে হয়েছিল। পরে হারতে হারতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা হেরেছেন। পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে পাশাপাশি তার পড়াশোনাও ব্যাহত হয়েছে।

তিনি বলেন, “শুরুতে মনে হয়েছিল ভাগ্য আমার পক্ষে। কিন্তু পরে বুঝেছি, এটি এমন একটি ফাঁদ, যেখান থেকে বের হওয়া খুব কঠিন। জেতার নেশায় আমি নিজের বিবেচনাশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম। অনলাইন জুয়া শুধু অর্থ নয়, মানুষের আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎও কেড়ে নেয়।”

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, পরিবার থেকে অতিরিক্ত টাকা এনে তিনি নিয়মিত অনলাইন বেটিং করতেন। কয়েকটি ম্যাচে জেতার পর বড় অঙ্কের বাঁজি ধরতে শুরু করেন। এরপর ধারাবাহিকভাবে তিনি ক্ষতির মুখে পরেছেন।

তিনি বলেন, “একসময় বুঝতে পারলাম আমি বের হতে চাই, কিন্তু পারছি না। প্রতিবার হারার পর মনে হয়েছে পরেরবার জিতবো। কিন্তু সেই আশাই আমাকে আরও ডুবিয়েছে। জুয়ার টাকা কখনো স্থায়ী হয় না, আবার জুয়ার মধ্যেই ফিরে যায়।”

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অনেক ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি প্রতিদিন এক হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাঁজি ধরছেন। কেউ কেউ সাময়িকভাবে লাভবান হলেও অধিকাংশই দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। জুয়ার টাকা জোগাতে গিয়ে অনেকেই ঋণ নিচ্ছেন, ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করছেন, এমনকি প্রতারণা বা চুরির মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছেন।

মনোবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদদের মতে, অনলাইন জুয়ার প্রভাব অর্থনৈতিক ক্ষতির বাইরে গিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যেও গুরুত্বর প্রভাব ফেলে। দীর্ঘসময় স্ক্রিনের সামনে কাটানো, বারবার জেতা-হারার উত্তেজনা, ঋণের চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অনেককে হতাশা, উদ্বেগ, অনিদ্রা ও আচরণগত সমস্যার দিকে ঠেলে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে মাদকাসক্তি, পর্নোগ্রাফি আসক্তি এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের সঙ্গেও এর সম্পর্ক তৈরি হয়।

শিক্ষাবিদ ও সংগঠক অধ্যাপক টুনু রাণী কর্মকার বলেন, “মাদকের মতো অনলাইন জুয়াও তরুণ সমাজকে গভীরভাবে আক্রান্ত করছে। অনেক পরিবার অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটে পড়ছে। শুধু আইন প্রয়োগ নয়, পরিবারকেও সন্তানের ডিজিটাল কর্মকাণ্ডের দিকে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।” বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ হলেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জুয়া সিন্ডিকেট বিদেশি সার্ভার ব্যবহার করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. আব্দুল হান্নান বলেন, “অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত চক্র এবং আসক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন জুয়ার সাইট শনাক্ত ও বন্ধের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।

এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow