আঁকেন ছবি, সংগ্রহ করেছেন ৩০০ পুরোনো সামগ্রী

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান শিল্প কখনো শুধু রংতুলি নয়। কখনো তা হয়ে ওঠে জীবন, সংগ্রাম আর স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। তেমনই এক ব্যতিক্রমী চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস। যিনি একাধারে শিল্পী, শিক্ষক, কবি, গীতিকার, জাদুশিল্পী এবং পুরাতন ঐতিহ্যের নিবেদিত সংগ্রাহক। খুলনা আর্ট কলেজ থেকে চারুকলায় শিক্ষাগ্রহণ করা মিলন বিশ্বাস পেশাগতভাবে একজন চিত্রশিল্পী। পরিবারে মা, স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। তবে তার পরিচয় শুধু এই গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়—শিল্পচর্চাই তার জীবনের মূল সাধনা। শৈশব থেকেই বই-খাতার পাতায় আঁকিবুঁকি করতে করতে তার শিল্পযাত্রার শুরু। তখন মোবাইল বা আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া না থাকলেও গ্রামের মানুষ তাদের নকশিকাঁথা, টেবিল ক্লথ কিংবা রুমালে নকশা আঁকার জন্য ছুটে আসতেন তার কাছে। সবার প্রশংসাই তাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার সুকুমার কাকার উৎসাহ এবং পরামর্শেই খুলনা আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন জাগে। সেই স্বপ্নই তাকে আজকের মিলন বিশ্বাসে রূপ দিয়েছে। প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও বার্তাবাহী ছবি আঁকায় বিশেষ পারদর্শী মিলন বিশ্বাসের শিল্পে থাকে গভীর ভাবনা। তবে তার শিল্পচর্চার সবচেয়ে বিস্ম

আঁকেন ছবি, সংগ্রহ করেছেন ৩০০ পুরোনো সামগ্রী

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

শিল্প কখনো শুধু রংতুলি নয়। কখনো তা হয়ে ওঠে জীবন, সংগ্রাম আর স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। তেমনই এক ব্যতিক্রমী চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস। যিনি একাধারে শিল্পী, শিক্ষক, কবি, গীতিকার, জাদুশিল্পী এবং পুরাতন ঐতিহ্যের নিবেদিত সংগ্রাহক। খুলনা আর্ট কলেজ থেকে চারুকলায় শিক্ষাগ্রহণ করা মিলন বিশ্বাস পেশাগতভাবে একজন চিত্রশিল্পী। পরিবারে মা, স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। তবে তার পরিচয় শুধু এই গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়—শিল্পচর্চাই তার জীবনের মূল সাধনা।

শৈশব থেকেই বই-খাতার পাতায় আঁকিবুঁকি করতে করতে তার শিল্পযাত্রার শুরু। তখন মোবাইল বা আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া না থাকলেও গ্রামের মানুষ তাদের নকশিকাঁথা, টেবিল ক্লথ কিংবা রুমালে নকশা আঁকার জন্য ছুটে আসতেন তার কাছে। সবার প্রশংসাই তাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার সুকুমার কাকার উৎসাহ এবং পরামর্শেই খুলনা আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন জাগে। সেই স্বপ্নই তাকে আজকের মিলন বিশ্বাসে রূপ দিয়েছে।

প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও বার্তাবাহী ছবি আঁকায় বিশেষ পারদর্শী মিলন বিশ্বাসের শিল্পে থাকে গভীর ভাবনা। তবে তার শিল্পচর্চার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো মুখ দিয়ে ছবি আঁকা। ২০০৩ সালে বন্ধুর একটি চ্যালেঞ্জ থেকেই শুরু এ ব্যতিক্রমী যাত্রা। আজ তিনি মুখ দিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিও অঙ্কন করতে সক্ষম—যা দর্শকদের বিস্মিত করে।

art

২০০৩ সালে ‘নিশাত আর্ট কোচিং’ নামে ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করে তার প্রতিষ্ঠান, যা ২০০৮ সালে ‘খুলনা আর্ট একাডেমি’ নামে নতুন পরিচয় পায়। এখানে শিশু থেকে শুরু করে যে কোনো বয়সের মানুষ ছবি আঁকা শিখতে পারেন। প্রতি বছর প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী এ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নেন।

শুধু শেখানো নয়, শিক্ষার্থীদের স্বপ্নপূরণেও তিনি নিরলস। ২০১০ সাল থেকে চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং চালু করে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে পথ দেখিয়েছেন। ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৩০ জন শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত শিক্ষক। মিলন বিশ্বাসের ছবির অন্যতম প্রধান বিষয় পরিবেশ। মা, মাটি, মানুষ, নদী ও জীববৈচিত্র্যের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা ক্যানভাসে ফুটে ওঠে। কৃষকের ঘাম, বৃক্ষরোপণকারীর সংগ্রাম—সবকিছুই তার শিল্পে জায়গা পায়।

শুধু ছবি আঁকাতেই সীমাবদ্ধ নন তিনি। লিখেছেন প্রায় ৪০২টি গান, ৭৮৬টি কবিতা এবং ৫০টির বেশি ছোটগল্প। তার লেখা খুলনা অঞ্চলের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। নিজের লেখা প্রকাশের চেয়েও নবীনদের তুলে ধরতে বেশি আনন্দ পান তিনি। ২০২০ সাল থেকে একটি পত্রিকার সাহিত্য পাতার জন্য স্বেচ্ছায় লেখা সংগ্রহ করে সম্পাদকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন—কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই। প্রতি বছর ১-২ জন শিক্ষার্থীকে বিনা মূল্যে ছবি আঁকা শেখানোর পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য পরিচালিত একটি স্কুলেও সপ্তাহে একদিন ক্লাস নেন তিনি। তার কাছে শিল্প শুধু পেশা নয়, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা।

art

শিল্পচর্চার পাশাপাশি ইতিহাসের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে খুলনা আর্ট একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা মিলন বিশ্বাস গড়ে তুলেছেন ব্যতিক্রমী সংগ্রহশালা। খুলনা আর্ট একাডেমিতেই অবস্থিত এ সংগ্রহে বর্তমানে ৩০০টিরও বেশি পুরাতন সামগ্রী সংরক্ষিত আছে। এখানে আছে পিতলের হুক্কা, হারিকেন, হ্যাজাক লাইট, পুরাতন টেলিফোন, ভিডিও ক্যাসেট, সাদা-কালো টেলিভিশনসহ নানা ঐতিহ্যবাহী বস্তু—যা জীবন্ত ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে আছে ডায়েরি-সংযুক্ত রেডিও, পুরোনো ক্যামেরা এবং বিলুপ্তপ্রায় ইলেকট্রনিক ডিভাইস। এ সংগ্রহের অধিকাংশই তিনি নিজ খরচে পুরাতন ভাঙারি দোকান থেকে সংগ্রহ করেছেন। পাশাপাশি কিছু মূল্যবান সামগ্রী পেয়েছেন শুভানুধ্যায়ী ও গুণীজনদের কাছ থেকে।

গত ৩০ মার্চ ঝালকাঠি থেকে আগত শিফাত হাওলাদার ও মো. জুম্মান হাওলাদার একাডেমিটি পরিদর্শন করেন। তারা হুক্কা ও পুরোনো লোহার আয়রনসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী হাতে নিয়ে অতীতের অভিজ্ঞতা অনুভব করেন এবং এ উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

এ প্রসঙ্গে মিলন বিশ্বাস বলেন, ‘অচলকে সচল রাখতে চাই। পুরোনো রেডিও, ফাউন্টেন পেনসহ এসব জিনিস আমাদের ইতিহাসের অংশ, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।’ বর্তমানে তার সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত আছে তিন শতাধিক পুরোনো সামগ্রী, যার একটি অংশ একাডেমির শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে উপহার হিসেবেও এসেছে।

art

তার এ দীর্ঘ পথচলায় যেমন আছে সাফল্য; তেমনই আছে বেদনা। অনেক শিক্ষার্থী সফল হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানকে ভুলে গেলেও তাদের সাফল্যই তাকে আনন্দ দেয়। তিনজন প্রিয় শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করায় তাদের স্মরণে প্রতি রবিবার একাডেমি বন্ধ রাখা হয়—যা তার হৃদয়ের গভীর ক্ষত। তবুও গুণীজনদের প্রশংসা, শিক্ষার্থীদের সাফল্য, এমনকি এক ভিক্ষুকের দেওয়া ২৫ টাকাও তার জীবনের বড় প্রাপ্তি।

ভবিষ্যতে গ্রামের বাড়িতে ‘সুখ পুষ্প সংরক্ষণশালা’ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন মিলন বিশ্বাস। যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে। এ স্বপ্নের মধ্যেই তিনি বাঁচিয়ে রাখতে চান তার বাবা-মায়ের স্মৃতি এবং বাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য। মিলন বিশ্বাস প্রমাণ করেছেন—একজন মানুষ চাইলে ক্যানভাসে শুধু ছবি নয়, একটি সমাজ, একটি সময় এবং একটি ইতিহাসকেও আঁকতে পারেন।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow