‘আজ মার খাইলে প্রতিদিন মার খাওয়া লাগবো’
ঈদুল আজহা এলেই জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গ্রামগুলো যেন অন্য এক রূপ নেয়। উপজেলার অধিকাংশ মানুষের নেই সচ্ছলতা। অভাব আছে, কষ্ট আছে কিন্তু তারপরও ঈদ মানেই এখানে আনন্দ, ভালোবাসা আর একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার গল্প। ঈদের দিন ভোরে ফজরের আজানের শব্দে ঘুম ভাঙে গ্রামের মানুষের। ঘুম থেকে উঠেই ছোট বাচ্চারা দৌড়ে যায় ঈদের মাঠ দেখতে। কে কেমন প্যান্ডেল বানিয়েছে, কোথায় নতুন মাইক লাগানো হয়েছে। কত মানুষ নামাজ পড়তে আসবে এসব নিয়েই তাদের কৌতূহল। এসময় শিশুদের বলতে শোনা যায়, আজ বছরে প্রথম দিন, আজ মার খাইলে প্রতিদিন মার খাওয়া লাগবো! এই একদিন যেন তাদের সব দুষ্টুমির স্বাধীনতা। বাড়ির মহিলারা খুব ভোর থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কেউ রান্নাঘরে সেমাই বসাচ্ছেন, কেউ পোলাওয়ের চাল ধুচ্ছেন, আবার কেউ সকালের নাস্তার আয়োজন করছেন। দরিদ্র ঘর হলেও চেষ্টা থাকে সন্তানদের মুখে যেন ঈদের দিন একটু ভালো খাবার তুলে দেওয়া যায়। অনেক মা নিজের নতুন কাপড় না কিনে সন্তানের জন্য জামা কিনেছেন এ গল্প এখানকার প্রায় প্রতিটি ঘরের। এরপর শুরু হয় গোসলের প্রস্তুতি। ছোট ছোট বাচ্চার মায়েরা নিজ হাতে গোসল করিয়ে নতুন জামা পরিয়ে দেন। কেউ আতর লাগিয়ে দেয়, কেউ
ঈদুল আজহা এলেই জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গ্রামগুলো যেন অন্য এক রূপ নেয়। উপজেলার অধিকাংশ মানুষের নেই সচ্ছলতা। অভাব আছে, কষ্ট আছে কিন্তু তারপরও ঈদ মানেই এখানে আনন্দ, ভালোবাসা আর একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার গল্প।
ঈদের দিন ভোরে ফজরের আজানের শব্দে ঘুম ভাঙে গ্রামের মানুষের। ঘুম থেকে উঠেই ছোট বাচ্চারা দৌড়ে যায় ঈদের মাঠ দেখতে। কে কেমন প্যান্ডেল বানিয়েছে, কোথায় নতুন মাইক লাগানো হয়েছে। কত মানুষ নামাজ পড়তে আসবে এসব নিয়েই তাদের কৌতূহল।
এসময় শিশুদের বলতে শোনা যায়, আজ বছরে প্রথম দিন, আজ মার খাইলে প্রতিদিন মার খাওয়া লাগবো! এই একদিন যেন তাদের সব দুষ্টুমির স্বাধীনতা।
বাড়ির মহিলারা খুব ভোর থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কেউ রান্নাঘরে সেমাই বসাচ্ছেন, কেউ পোলাওয়ের চাল ধুচ্ছেন, আবার কেউ সকালের নাস্তার আয়োজন করছেন। দরিদ্র ঘর হলেও চেষ্টা থাকে সন্তানদের মুখে যেন ঈদের দিন একটু ভালো খাবার তুলে দেওয়া যায়। অনেক মা নিজের নতুন কাপড় না কিনে সন্তানের জন্য জামা কিনেছেন এ গল্প এখানকার প্রায় প্রতিটি ঘরের।
এরপর শুরু হয় গোসলের প্রস্তুতি। ছোট ছোট বাচ্চার মায়েরা নিজ হাতে গোসল করিয়ে নতুন জামা পরিয়ে দেন। কেউ আতর লাগিয়ে দেয়, কেউ টুপি ঠিক করে দেয়। বাবারা সন্তানদের হাত ধরে নিয়ে যান ঈদের নামাজে।
নাস্তা শেষ করে গ্রামের মানুষ দলে দলে ছুটে যান ঈদগাহ মাঠে। কারও গায়ে নতুন পাঞ্জাবি, কারও পুরোনো কাপড় তবুও সবার মুখে একই ঈদের হাসি। নামাজ শেষে শুরু হয় কোলাকুলি। ধনী-গরিব ভেদাভেদ ভুলে সবাই একে অপরকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান।
ঈদের নামাজ শেষে ছোটরা বড়োদের কাছে গিয়ে সালাম করে। আর বড়োরাও ভালোবেসে হাতে গুঁজে দেন ১০ কিংবা ২০ টাকার নতুন নোট। সেই নতুন টাকার গন্ধ আর হাতে সালামির টাকা পাওয়ার আনন্দে বাচ্চাদের মুখ ঝলমল করে ওঠে। অনেক শিশুর কাছে ঈদের সবচেয়ে বড় আনন্দই যেন এই সালামি। কেউ সেই টাকা জমায়, কেউ মেলায় গিয়ে আইসক্রিম কিনে খায়, আবার কেউ বন্ধুদের দেখিয়ে গর্ব করে।
এরপর অনেকেই ছুটে যান কবরস্থানে। বাবা-মা, ভাই-বোন কিংবা প্রিয় মানুষদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কেউ চুপচাপ দোয়া করেন, কেউ চোখের পানি লুকান। ঈদের আনন্দের মাঝেও তখন মনে পড়ে যায় হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর কথা।
ইসলামপুরের অধিকাংশ মানুষ খুব বেশি সচ্ছ্বল নন। তাই অনেক পরিবারই কোরবানি দিতে পারেন না। কিন্তু এখানকার মানুষের হৃদয়ে এখনো রয়েছে ভাগাভাগির সুন্দর সংস্কৃতি। যারা কোরবানি দেন, তারা নিজেরা শুধু মাংস খান না। পাশের গরিব প্রতিবেশীর কথাও ভাবেন।
অনেক সময় দেখা যায়, যারা কোরবানি দিতে পারেন না তাদের বাড়িতে গিয়ে ডেকে আনা হয়। বলা হয় আসেন ভাই, মাংস কাটতে সাহায্য করেন।
কেউ ছুরি ধরেন, কেউ মাংস ভাগ করেন, কেউ পলিথিনে ভরে দেন। কাজ শেষে তাদের হাতেও তুলে দেওয়া হয় কোরবানির মাংস। সেই মাংস নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় অনেকের মুখে যে হাসি দেখা যায়, সেটাই যেন ঈদের আসল আনন্দ।
গ্রামের অনেক এলাকায় এখনো মানুষ কোরবানির এক ভাগ মসজিদে দিয়ে দেন। পরে সেখান থেকে পুরো মহল্লার পরিবারগুলোর মাঝে ভাগ করে দেওয়া হয়। ছোট ছোট বাচ্চারা তখন বাটি হাতে অপেক্ষা করে এটা কোরবানি ঈদের আরেক আনন্দ ধনী-গরীব সবাই সেই মাংস নেয়।
বিকেলে গ্রামের মাঠে জমে ওঠে শিশুদের খেলাধুলায়। কেউ ক্রিকেট খেলছে, কেউ ঘুড়ি উড়াচ্ছে। আর ঘরে ঘরে তখন রান্না হচ্ছে গরুর মাংসের ঝোল। সন্ধ্যা নামলে বাড়ি বাড়ি শুরু হয় দাওয়াত আর গল্পের আসর।
অভাব হয়ত ইসলামপুরের মানুষের নিত্যসঙ্গী, কিন্তু ভালোবাসা আর মানবিকতায় তারা এখনো অনেক ধনী। এখানকার মানুষ জানে কোরবানি শুধু পশু জবাই নয়, কোরবানি মানে নিজের আনন্দ অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। আর সেই ভাগাভাগির মাঝেই প্রতি বছর নতুন করে বেঁচে ওঠে ইসলামপুরের ঈদ।
হৃদয় আহম্মেদ/এএইচ/জেআইএম
What's Your Reaction?