আজও চালু হয়নি গাজী টায়ার কারখানা, বেকার শ্রমিকদের বোবা কান্না

2 days ago 7

কর্মমুখর কারখানায় এখন ‘ভুতুড়ে পরিবেশ
বেকার ১২ হাজার শ্রমিক
অগ্নিসংযোগে ক্ষতি আনুমানিক ১০ হাজার কোটি টাকা
এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা
দ্রুত কারখানা চালুর দাবি শ্রমিকসহ স্থানীয়দের

এক বছর আগেও দেশের চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করতো গাজীপুরের গাজী পাইপ ও গাজী টায়ার কারখানায় উৎপাদিত প্লাস্টিক, টায়ার, টিউব ও ইলেকট্রনিক পণ্য। দুটি কারখানায় কর্মরত ছিলেন প্রায় সাড়ে ১২ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী। গাজী পাইপ কারখানায় ১০ হাজার ২০০ জন এবং গাজী টায়ারস কারখানায় দুই হাজার ৩০০ জন কর্মরত ছিলেন।

রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভার রূপসী, খাদুন, মৈইকুলি ও কর্ণগোপসহ আশপাশের ১০-১২টি গ্রামের মানুষ তাদের বাসাবাড়ি ভাড়া, বিভিন্ন দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালিয়ে বেশ লাভবান ছিলেন। এ দুটি কারখানার বদৌলতে পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে লেগেছিল উন্নয়নের ছোঁয়া। এখন সেই কারখানা দুটি শুধু ধ্বংসস্তূপ।

jagonews24

হাজার হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পদচারণা ও কর্মযজ্ঞের ব্যস্ততম কারখানা দুটিতে এখন সুনসান নীরবতা। অফিস ভবন থেকে শুরু করে কারখানার প্রতিটি স্থানে ধ্বংসযজ্ঞ, লুটতরাজ ও পোড়া চিহ্ন নিয়ে কঙ্কালসার রূপ ধারণ করে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। একসময়ের কর্মমুখর কারখানা দুটিতে এখন ‘ভুতুড়ে পরিবেশ।

গত বছরের ৫ আগস্ট উত্তেজিত জনতার দেওয়া আগুনে কারখানা দুটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি।

২০১৩ সালে তারাব পৌরসভার কর্ণগোপ এলাকায় প্রায় ৩০০ বিঘা জমির ওপর গাজী পাইপ কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন গোলাম দোস্তগীর গাজী। সমসাময়িক সময়েই তারাব পৌরসভার খাদুন এলাকায় ৯৪ বিঘা জমির ওপর গাজী গ্রুপের আরও একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান গাজী টায়ারস কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। পাইপ কারখানায় পাইপ ও ডোর সেকশনে সাত হাজার, পাম্প সেকশনে তিন হাজার এবং ২০০ অফিস স্টাফসহ সব মিলিয়ে ১০ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করতেন।

অন্যদিকে খাদুন এলাকার গাজী টায়ারসে শ্রমিক-কর্মচারী অফিস স্টাফসহ দুই হাজার ৩০০ শ্রমিক কাজ করতেন। উপজেলার এ দুটি কারখানায় সবমিলিয়ে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজে কারখানা দুটি এক বছর ধরে বন্ধ থাকায় অনেক শ্রমিক-কর্মচারী এখনো বেকার।

jagonews24

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর এ দুটি উৎপাদনশীল কারখানায় অগ্নিসংযোগের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অনেকেই বলছেন, গোলাম দস্তগীর গাজী সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এক নাগাড়ে তিনবারের এমপি এবং পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী ছিলেন। সে সুবাদে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে দুটি কারখানাই করেছেন স্থানীয়দের জায়গা জমি জবরদখল করে। এ কারণে গণঅভ্যুত্থানের পর স্থানীয়দের রোষানলে পড়ে কারখানা দুটি।

আবার কেউ কেউ বলছেন, ব্যক্তি গাজী ক্ষমতার দাপটে অন্যায় অপরাধ করে থাকলে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিচার করা হোক। শিল্প প্রতিষ্ঠানতো কারও ক্ষতি করেনি। এ দুটি প্রতিষ্ঠান হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করতে ভূমিকা রেখেছে। কারখানা দুটি বন্ধ হওয়ায় কয়েক হাজার লোক বেকার হয়েছেন। স্থানীয় অর্থনীতিতে মন্দাভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কারখানা দুটিতে অগ্নিসংযোগ করে সর্বোপরি দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে।

গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর মালিকানাধীন এ দুটি উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালায় উত্তেজিত জনতা। এসময় মিলে ভাঙচুর ও লুটপাট শেষে আগুন ধরিয়ে দেন তারা। আগুন মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে পণ্য উৎপাদনকারী শেড, গোডাউন এবং অফিস ভবনসহ প্রতিটি সেকশনে। এতেও ক্ষান্ত হননি দুর্বৃত্তরা। আরও কয়েক দফায় কারখানা দুটিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

গত ২৪ আগস্ট রাতে রাজধানীর শান্তিনগর এলাকা থেকে গোলাম দস্তগীর গাজীকে গ্রেফতারের পর নারায়ণগঞ্জের আদালত ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ২৫ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় সর্বশ্রেণির মানুষ কারখানাটিতে গণহারে লুটপাট চালান এবং আগুন ধরিয়ে দেন।

আগুন লাগার সময়ও লুট করতে কারখানার ভেতরে গিয়ে ৪-৫ শতাধিক মানুষ ভেতরে আটকা পড়েন। এসময় দোতলা ও তিনতলার জানালা দিয়ে অনেকেই নিচে লাফিয়ে পড়েন। অন্যরা বের হতে পারেননি। গাজী গ্রুপের টায়ার তৈরির কারখানায় দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনের ঘটনায় অন্তত ১৭৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি করেন পরিবারের সদস্যরা।

দ্বিতীয় দফায় গত বছরে ২৫ আগস্টের অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের পর্যায়ক্রমে ডেমরা, কাঁচপুর, আদমজী, ইপিজেড ও কাঞ্চন ফায়ার স্টেশন থেকে একে একে যোগ দেয় ১২টি ইউনিট। প্রায় ৩২ ঘণ্টার প্রাণপণ প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। সেই থেকেই কারখানা দুটি রাজনীতির আগুনে পোড়া ক্ষত নিয়ে কঙ্কালসার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

গাজী পাইপ কারখানার গেটের পাশের একটি ভবনের নিচতলায় অলস সময় পার করছিলেন মিলের উপ-মহাব্যবস্থাপক মামুন। কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘বেশ কয়েক বছর ধরে আমি এ কারখানায় দায়িত্ব পালন করছি। প্রতিষ্ঠানটির মায়ায় পড়ে গেছি। অগ্নিসংযোগের ঘটনার প্রায় এক বছর হলো কারখানাটি বন্ধ। তবুও অন্য কোথাও যাইনি। কারখানাটি আবার চালু হবে এই আশায় আছি।’

jagonews24

সাবেক শ্রমিক জামিলা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আট বছর আগে গ্রামের বাড়ি বরিশাল থেকে কাজের সন্ধানে সপরিবারে এই এলাকায় আসি। পরে আমি গাজী পাইপ কারখানায় পাইপ সেকশনে আর আমার স্বামী পাম্প সেকশনে চাকরি নিই। আমার ছেলে এ এলাকায় অটো চালাইতো।’

তিনি বলেন, ‘তখন খুবই ভালো চলতে পারতাম। গত বছর মিল পুড়ে যাওয়ার পর থেকে অনেক কষ্টে দিন পার করছি। আমি আর আমার স্বামী বেকার। পুতের কামাই দিয়া কষ্ট করে সংসার চালাইতাছি। মাঝে মধ্যেই মিলে আসি। যারা থাকে তাদের জিজ্ঞাসা করি কবে মিল চালু হবে। সবাই শুধু বলে চালু হবে।’

স্থানীয় বাড়িওয়ালা আলাউদ্দিন মিয়া বলেন, ‘ঘর ভাড়া দেওয়াই আমার প্রধান আয়ের উৎস। গাজী পাইপ কারখানা বন্ধ হওয়ার পর এলাকায় লোক নাই। দুইটা বিল্ডিংয়ের রুম ও দোকান ঘরগুলো খালি পড়ে আছে। আর্থিক সংকটে খুবই ঝামেলায় আছি।’

খাদন এলাকার বাসিন্দা তাইজুল ইসলাম। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্যক্তি গাজী ক্ষমতার দাপটে জবরদখল করেছেন। প্রচলিত আইনে তার বিচার হোক। কিন্তু কারখানা বন্ধ করায় আশপাশের এলাকাগুলো শ্মশানে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি বাড়িতে রুম খালি, ভাড়াটিয়া নেই। দোকানপাটে বেচাবিক্রি নেই। এলাকার অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ যাচ্ছে।’

একইভাবে হতাশার কথা জানান স্থানীয় দোকানদার মারুফ। তিনি বলেন, ‘মিল বন্ধ হওয়ার পর এলাকায় লোক কমে গেছে। বেচাবিক্রি নেই। প্রতিমাসেই লস গুনতে হচ্ছে।’

স্থানীয় বাসিন্দা আবেদ ভূঁইয়া বলেন, ‘আমারসহ কর্ণগোপ এলাকার বেশ কিছু মানুষের জমি বাউন্ডারি দিয়ে দিয়ে দখল করে রেখেছেন গাজী পাইপের মালিক গোলাম দস্তগীর গাজী। প্রতিবাদ করলেই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনেককে অত্যাচার-জুলুম করেছেন। এসব অপরাধের বিচার হওয়া উচিত। তবে কারখানা বন্ধ হোক, এটা আমাদের কাম্য নয়।’

কথা হয় গাজী টায়ারসের সিকিউরিটি ইনচার্জ জামাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ কারখানায় কয়েক হাজার মানুষ কাজ করতেন। এদের বেশিরভাগই এখন কর্মহীন। আগে শতাধিক অফিসার ছিলেন। এখন ৪-৫ জন বাদে সবাই চলে গেছেন। মিলকে কেন্দ্র করে এলাকায় গড়ে ওঠা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। সবাই চায় মিলটি দ্রুত চালু হোক। মালিক পক্ষও মিলটি পুনরায় চালু করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছে।’

গাজী টায়ারস ইন্ডাস্ট্রিজের অ্যাডমিন অফিসার বিপ্লব হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এই মুহূর্তে সঠিক বলতে পারছি না। তবে কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমরা মিলটি চালুর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। আর্থিক সংকট মোচনে ব্যাংকের সহযোগিতাসহ প্রশাসন ও সরকারের সহযোগিতা পেলে এবং লোকাল সমস্যা সমাধান হলে মিলটি পুনরায় চালু করা সম্ভব বলে মনে করি।’

কারখানার জেনারেল ম্যানেজার হেদায়েত হোসেন হিরো জাগো নিউজকে বলেন, ‘দুষ্কৃতকারীদের লুটপাটের পর অগ্নিসংযোগে মিলটি (কারখানা) সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। এতে আমাদের আনুমানিক প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। এখন পর্যন্ত মিলটি বন্ধ আছে। আমরা মিলটি চালুর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।’

এসআর/জিকেএস

Read Entire Article