আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে চলছে সারা জেবিনের শিল্প প্রদর্শনী ‘চৌকাঠ’

ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে চলছে শিল্পী সারা জেবিনের শিল্প প্রদর্শনী। ব্যক্তিগত স্মৃতিকে কীভাবে সামষ্টিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসে রূপান্তর করা যায়, সেই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই শিল্পী সারা জেবিন তার এই দ্বিতীয় একক প্রদর্শনী ‘চৌকাঠ’কে নির্মাণ করেছেন। এটি নস্টালজিয়ার প্রদর্শনী নয়। একে বলা যায় সময়, স্মৃতি, উত্তরাধিকার ও পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতার একটি সংবেদনশীল শিল্প-অনুসন্ধান। দ্রুত নগরায়ণ, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং সাংস্কৃতিক অভ্যাসের ক্রমবিলুপ্তির প্রেক্ষাপটে শিল্পী সারা জেবিন অতীতকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন না, বরং হারিয়ে যেতে থাকা অভিজ্ঞতাগুলোর নীরব সাক্ষ্য সংরক্ষণ করেন। ‘চৌকাঠ’ প্রদর্শনীটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্মৃতিকে কেবল মানসিক অভিজ্ঞতা হিসেবে নয়, বরং একটি বস্তুগত ও সাংস্কৃতিক নির্মাণ হিসেবে বিবেচনা করা। পুরান ঢাকার স্থাপত্য, গৃহস্থালি সংস্কৃতি, পারিবারিক আচার, নারীর জীবন এবং বসবাসের অভিজ্ঞতা এখানে একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ফলে স্মৃতি এখানে ব্যক্তিগত পরিসর অতিক্রম করে একটি বৃহত্তর সামাজিক ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। নারী এই প্রদর্শনীর কেন্দ্রীয় চরিত্র। তবে তিনি নি

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে চলছে সারা জেবিনের শিল্প প্রদর্শনী ‘চৌকাঠ’

ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে চলছে শিল্পী সারা জেবিনের শিল্প প্রদর্শনী। ব্যক্তিগত স্মৃতিকে কীভাবে সামষ্টিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসে রূপান্তর করা যায়, সেই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই শিল্পী সারা জেবিন তার এই দ্বিতীয় একক প্রদর্শনী ‘চৌকাঠ’কে নির্মাণ করেছেন।

এটি নস্টালজিয়ার প্রদর্শনী নয়। একে বলা যায় সময়, স্মৃতি, উত্তরাধিকার ও পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতার একটি সংবেদনশীল শিল্প-অনুসন্ধান। দ্রুত নগরায়ণ, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং সাংস্কৃতিক অভ্যাসের ক্রমবিলুপ্তির প্রেক্ষাপটে শিল্পী সারা জেবিন অতীতকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন না, বরং হারিয়ে যেতে থাকা অভিজ্ঞতাগুলোর নীরব সাক্ষ্য সংরক্ষণ করেন।

‘চৌকাঠ’ প্রদর্শনীটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্মৃতিকে কেবল মানসিক অভিজ্ঞতা হিসেবে নয়, বরং একটি বস্তুগত ও সাংস্কৃতিক নির্মাণ হিসেবে বিবেচনা করা। পুরান ঢাকার স্থাপত্য, গৃহস্থালি সংস্কৃতি, পারিবারিক আচার, নারীর জীবন এবং বসবাসের অভিজ্ঞতা এখানে একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ফলে স্মৃতি এখানে ব্যক্তিগত পরিসর অতিক্রম করে একটি বৃহত্তর সামাজিক ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।

নারী এই প্রদর্শনীর কেন্দ্রীয় চরিত্র। তবে তিনি নিছক প্রতিকৃতি নন, তিনি উত্তরাধিকার, গৃহ সংস্কৃতি এবং অদৃশ্য শিল্পচর্চার ধারক। মায়ের হাতের সূচিকর্ম, নানির সাজানো ঘর কিংবা অলংকৃত আয়নার মতো আপাত সাধারণ বিষয়গুলোকে শিল্পী শিল্প-ইতিহাসের আলোচনায় নিয়ে এসেছেন। দীর্ঘদিন ধরে গৃহস্থালির এই সৃজনশীল শ্রমকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। ‘চৌকাঠ’ সেই অবহেলিত নন্দনতত্ত্বকে নতুন গুরুত্ব দিয়েছে।

‘Bon Void’ লিনোকাট সিরিজটি প্রদর্শনীর অন্যতম শক্তিশালী অংশ। মুক্তিযুদ্ধের বছরে জন্ম নেওয়া এক নারীর জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত হলেও এটি মূলত দক্ষিণ এশিয়ার অসংখ্য নারীর অভিজ্ঞতার প্রতীক। শৈশবের উন্মুক্ততা থেকে বিবাহ, সংসার ও মাতৃত্বের সীমাবদ্ধতায় প্রবেশ— এই রূপান্তরকে শিল্পী কোনো নাটকীয়তা ছাড়াই সংযত অথচ গভীর ভিজ্যুয়াল ভাষায় প্রকাশ করেছেন। লিনোকাটের খোদাই প্রক্রিয়া এখানে শুধু একটি কারিগরি পদ্ধতি নয়, বরং স্মৃতির নিজস্ব প্রকৃতির রূপক। প্রতিটি খোদাই যেমন কিছু সংরক্ষণ করে এবং কিছু মুছে দেয়, তেমনি স্মৃতিও মনে রাখা ও বিস্মৃতির মধ্য দিয়েই নির্মিত হয়।

‘Sharshi’ এবং ‘Unforgotten’ সিরিজে মসলিন, সুতা ও তামার তারের ব্যবহার প্রদর্শনীকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। স্বচ্ছ কাপড়ের স্তরগুলো স্মৃতির অনিশ্চয়তা ও পরিচয়ের আংশিক দৃশ্যমানতাকে ধারণ করে। অন্যদিকে তারের রেখায় নির্মিত গৃহস্থালি আচার-অনুষ্ঠানের প্রতীকগুলো প্রশ্ন তোলে— ঐতিহ্য কি কেবল আচার টিকিয়ে রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি তার প্রাণ নিহিত থাকে মানুষের সম্পর্ক ও অনুভূতিতে? এই প্রশ্নই প্রদর্শনীকে সমকালীন সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করেছে।

সোপ কম্পোজিট ভাস্কর্যগুলো প্রদর্শনীর সবচেয়ে কাব্যিক অংশ। পুরান ঢাকার বিলীয়মান স্থাপত্যকে সাবানের মতো ক্ষয়প্রবণ উপাদানে নির্মাণ করে শিল্পী উপকরণ ও ভাবনার এক অসাধারণ সমন্বয় ঘটিয়েছেন। সময় যেমন স্মৃতি ও স্থাপত্যকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে, তেমনি সাবানের ভঙ্গুর শরীরও সেই অস্থায়িত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে। এখানে উপকরণ কেবল মাধ্যম নয়, অর্থ নির্মাণের সক্রিয় অংশ।

তবে প্রদর্শনীটি সচেতনভাবে কোনো চূড়ান্ত উত্তর দেয় না। বরং দর্শককে স্মৃতি, পরিচয় ও উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। কিছু কাজ আরও সংযত সম্পাদনা পেলে ধারণাগুলোর ঘনত্ব হয়তো আরও স্পষ্ট হতে পারত। তবু সামগ্রিকভাবে ‘চৌকাঠ’ সমকালীন বাংলাদেশি শিল্পচর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এটি দেখিয়ে দেয়, শিল্পের কাজ কেবল অতীতকে সংরক্ষণ করা নয়, বরং হারিয়ে যেতে থাকা অভিজ্ঞতার ভেতরে নিহিত বর্তমানের অর্থ উদ্ধার করা।

সারা জেবিনের ‘চৌকাঠ’ শেষ পর্যন্ত একটি শিল্প প্রদর্শনীর চেয়ে বেশি কিছু। এটি সময়, স্মৃতি ও পরিচয়ের মধ্যবর্তী সেই অদৃশ্য চৌকাঠ, যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা আমাদের ব্যক্তিগত ইতিহাসকে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে নতুনভাবে আবিষ্কার করি।

প্রদর্শনীটি গত ৩১ জুলাই শুরু হয়েছে। চলবে আগামী ৮ আগস্ট পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৯টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য চালু রয়েছে প্রদর্শনীটি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow