আহমদ রাজুর গল্প- রুমালী

‘যদি আবার সেই কথা সবার সামনে তুলে ধরো তাহলে বুঝতে পারছো তোমার অস্তিত্বটা কোথায় যেয়ে দাঁড়াবে?’ শাড়ির আঁচল দিয়ে নাকের পানি মুছতে মুছতে কথাগুলো বললো পারুল। ইদ্রিস টি-শার্টের দুই হাতার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে সবেমাত্র মাথাটা বাড়িয়েছিল গলার ছিদ্রে ঢোকাবার জন্যে। সে থমকে যায়। বললো, ‘কী বললে তুমি? সেই কথা তাহলে সবাইকে বলে দিয়েছো? হায় মাবুদ; এ কী করেছো?’ পারুল কোনো কথা বলে না। তার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় ঝরে চলেছে নোনা জল। একবার অবশ্য ভেবেছিল হয়তো তারই ভুল। পরক্ষণে সেসব চিন্তা মনের বন্দর থেকে কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। তবে সে যা করেছে তা অবশ্যই ঠিক করেছে। না হলে আজ- এই সময়ে অন্যরকম হতে পারতো তার চিন্তার বহর। একদম স্বাভাবিক পারুল। যেন কিছুই হয়নি। সেও বিস্মিত। বললো, ‘কোনো কথা?’ ইদ্রিস টি-শার্টের ভেতরে মাথা পুরে বললো, ‘কোনো কথা বুঝতে পারছো না? তোমাকে পই পই করে বলেছিলাম, যতই ঝড় ঝাপ্টা আসুক এইকথা কখনও কোনদিন কাউকে বলবে না। তুমি তাও বলে দিলে!’  পারুল যেন আকাশ থেকে পড়ে। সে নীরবে দাঁড়িয়ে কী যে ভাবতে থাকে। কথাটা যে কোনো দিকে যাচ্ছে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। বললো, ‘কী অযৌতিক বকছো তুমি ইদ্রিস! আমি কাকে কী বলেছি?’  ‘এ

আহমদ রাজুর গল্প- রুমালী

‘যদি আবার সেই কথা সবার সামনে তুলে ধরো তাহলে বুঝতে পারছো তোমার অস্তিত্বটা কোথায় যেয়ে দাঁড়াবে?’ শাড়ির আঁচল দিয়ে নাকের পানি মুছতে মুছতে কথাগুলো বললো পারুল। ইদ্রিস টি-শার্টের দুই হাতার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে সবেমাত্র মাথাটা বাড়িয়েছিল গলার ছিদ্রে ঢোকাবার জন্যে। সে থমকে যায়। বললো, ‘কী বললে তুমি? সেই কথা তাহলে সবাইকে বলে দিয়েছো? হায় মাবুদ; এ কী করেছো?’


পারুল কোনো কথা বলে না। তার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় ঝরে চলেছে নোনা জল। একবার অবশ্য ভেবেছিল হয়তো তারই ভুল। পরক্ষণে সেসব চিন্তা মনের বন্দর থেকে কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। তবে সে যা করেছে তা অবশ্যই ঠিক করেছে। না হলে আজ- এই সময়ে অন্যরকম হতে পারতো তার চিন্তার বহর।


একদম স্বাভাবিক পারুল। যেন কিছুই হয়নি। সেও বিস্মিত। বললো, ‘কোনো কথা?’
ইদ্রিস টি-শার্টের ভেতরে মাথা পুরে বললো, ‘কোনো কথা বুঝতে পারছো না? তোমাকে পই পই করে বলেছিলাম, যতই ঝড় ঝাপ্টা আসুক এইকথা কখনও কোনদিন কাউকে বলবে না। তুমি তাও বলে দিলে!’ 


পারুল যেন আকাশ থেকে পড়ে। সে নীরবে দাঁড়িয়ে কী যে ভাবতে থাকে। কথাটা যে কোনো দিকে যাচ্ছে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। বললো, ‘কী অযৌতিক বকছো তুমি ইদ্রিস! আমি কাকে কী বলেছি?’ 
‘এই যে বললে- যদি আবারো সেই কথা সবার সামনে তুলে..!’


ফিক করে হেসে ওঠে পারুল। এতক্ষণে সে বুঝতেই পারেনি ইদ্রিস কী ভেবে বোকা বনে গিয়েছে। তবে যাই হোক না কেন, স্বামীকে সে কখনও বোকা দেখতে চায় না। কৌতুক করেও না। না হলে সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে তার সাথে চলে আসে! মাঝে মাঝে অবসাদ শ্রাবণের অঝোর ধারার মতো আষ্টে পিষ্টে জড়িয়ে ধরলেও ক্ষণেক পরেই চারদিক ফকফকা। ঠিক না হয়ে যে বিকল্প কোনো পথই খোলা নেই তার সামনে। সেদিন এমন মনে হয়েছিল যে, আবারো ফিরে যেতে ইচ্ছে হয়েছিল নিজেদের গাঁয়ে- যেখানে তার কেটেছে শৈশব-কৈশোর। পারেনি ইদ্রিসের কথা ভেবে। সেতো আর কোনো অপরাধ করেনি। যদি এই বাড়ির বউ হয়ে না আসতো তাহলেও কথা ছিল; হয়তো অভিযোগের পাল্লা ভারী হতে পারতো। যেহেতু সে নিজেই সবকিছু দেখছে- সবকিছু জানছে; তাইতো আর যাই হোক, ওকে কিছু বলা একদম বেমানান। একজনের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোর পক্ষপাতি সে নয়। 


কাছে এসে পারুলের মুখ চেপে ধরে ইদ্রিস। হাসির শব্দ বাইরে প্রকাশ মানে আবারো নতুন কথার জন্ম। মাকে সে প্রচণ্ড বেশি ভয় পায়। কেউ কোন প্রশ্ন না করলেও মা যে প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করে ছাড়বে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। তিনি কেন এমন করেন? পারুলকে একদম সহ্য করতে পারে না। কিন্তু কেন? সরাসরি কিছু না বললেও আকার ইঙ্গিতে কী বলতে চায় ইদ্রিস বোঝে তা। পারুল কি বোঝে? ইদ্রিস অবশ্য মনে মনে ভেবেই নিয়েছে- পারুল সব বোঝে। হয়তো তাকে অত্যাধিক ভালবাসে বলে মায়ের অবহেলা নীরবে সহ্য করে। মায়েরা কেন এমন হয়? এমন প্রশ্ন ইদ্রিস তার মনের কাছে করলেও কোনো উত্তর খুঁজে পায়নি আজও। 


তবে যে কথা দু’জনের মনের কোণে বারবার উঁকি দেয় সে কথা কাউকে বলা যাবে না। না হলে হিতে বিপরীত হতে পারে। যে কথা গোপন আছে সে কথা যেন গোপনই থাকে সে চেষ্টা করে চলেছে অহরহ। কখনও সখনও পারুল ভাবে- ইদ্রিস কি তার পরিবারের কাছে সব কথা খুলে বলবে! যদি তাই হয় তাহলে এ বাড়িতে তার আর থাকার কোন সুযোগ থাকবে না। সেদিনই সকল মায়া ত্যাগ করে বেরিয়ে যেতে হবে অজানার উদ্দেশ্যে। কারণ নিজের বাড়ি যাবার সুযোগ নেই। ইদ্রিসের হাত ধরে বেরিয়ে আসার সময়ই সে পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে আপন খেয়ালে। আজ সেই ইদ্রিসই অবাক হয়ে যায়। না বলা কথা কি তাহলে পারুল বলে দিয়েছে অনেক আগেই? যদি বলে থাকে তবে কাকে বলেছে? সে কি কথাগুলো মনের গহিনে বন্ধ খাঁচায় আটকিয়ে রেখেছে? এমন এক কথা, যা কখনও আটকানো যায় না। আবার বাইরে প্রকাশ পেলেই চারিদিকে ছড়িয়ে যাবে শহুরে গন্ধের মতো।


‘আমি চললাম, দুপুরে আজ আর আসা হবে না। একেবারে রাতে ফিরবো।’ সাবলিলভাবে কথাটি বলে বাজারের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় ইদ্রিস। যেন কিছুক্ষণ আগে তাদের মধ্যে কিছুই হয়নি! পারুল কয়েক পা এগিয়ে এসে দরজার কাছে ঠাঁই দাঁড়িয়ে চোখ ফেলে প্রাণপতির হেঁটে যাওয়া পথের দিকে।


কাঠ দিয়ে তৈরি পঁচিশ বর্গফুটের ছোট্ট পানের দোকান। প্রায় চার বছর হলো বাস স্ট্যাণ্ডের গা ঘেঁসে বসিয়ে রাখা হয়েছে। ভেতরে ঘুরতে ফিরতে একটু সমস্যা হয় সত্যি তবে তাতে কোন আক্ষেপ নেই ইদ্রিসের। প্রয়োজনে যে কোন জায়গায় দুই জনে দুইপাশ ধরে নিয়ে যাওয়া যায় সহজে। এই কয় বছরে কতবার যে দোকানটি সরানো হয়েছে তা ইদ্রিস বোধকরি সঠিকভাবে বলতে পারবে না। বিভিন্ন ব্রাণ্ডের সিগারেট আর সামনে ঝুলিয়ে রাখা শিশুদের নিম্নমানের খাবার, চিপস্, চকলেট, চানাচুর থাকলেও ইদ্রিসের পানের দোকান না বললে যেন কেউ চিনতেই চায় না। অথচ পানের চেয়ে ঢের বেশি বিক্রি হয় অন্যান্য মালামাল। বিশেষ করে সিগারেট বিক্রি হয় ধুমছে। তারপরও কেন যে ওই নামটা সারা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে তা তার মাথায় আসে না।


আটটা-পাঁচটা ডিউটি শেষ করে নিয়মিত সন্ধ্যায় দোকান খুললেও আজ কারখানা বন্ধ থাকায় এসেছে সকালে; সূর্য যখন প্রথম আলো দেওয়া শুরু করেছে দোকানের চালের ওপর। আসলে সে লাভ ক্ষতির হিসেব করে ব্যবসা করে না। মূল উদ্দেশ্য, অবসর সময়টাকে কাজে লাগানো। আর পুরস্কারস্বরূপ বাড়তি কিছু আয়। এ ক্ষেত্রে সফলদের সাথে তার নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। পারুলের সর্বাত্মক সহযোগিতায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কখনো ভোলেনি ইদ্রিস। তাইতো কারণে- অকারণে প্রায়ই বলে, ‘পারুল যদি তার জীবনে না আসতো তাহলে হয়তো চাকরির পরে ব্যবসা করাই হতো না।’


রাতে যখন বাড়ি ফেরে তখন অন্যরকম আবেশ অনুভূত হয় ইদ্রিসের। তার এতো ভালো আগে কোনদিন লাগেনি। কেন এমন হচ্ছে তা ঠিক বুঝতে পারে না। ঘরে ঢুকে যা শোনে সে কথা শোনার জন্যে বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিল না। তার বাবা-মা নাকি একটা ছোট্ট মেয়ে এতিমখানা থেকে দত্তক নিয়ে এসেছে! দু’জনের বয়স যেখানে এসে ঠেকেছে সেখানে অন্তত এমনটা শোভা পায় না; তা সে জানে। তাইতো পারুলের কথায় প্রথমে বিশ্বাস না করলেও দ্রুতপায়ে বাবা-মায়ের ঘরে যেয়ে বিশ্বাস তাকে করতেই হয়। একটা ফুটফুটে মেয়ে- বয়স বড়জোর পাঁচ কী ছয় বছর হবে। ইদ্রিস মনের অজান্তেই বলে ওঠে, ‘আহা রে, এমন ফুটফুটে মেয়েকে কোনো বাবা- মা কি পারে এতিমখানায় দিতে!’ সে নিজের মায়া মমতা নিয়ন্ত্রণে রেখে বললো, ‘কী শুনছি বাবা, তোমরা নাকি এতিমখানা থেকে একজনকে দত্তক নিয়েছো?’
ছেলের প্রশ্ন শুনে সেদিকে ঘুরে বসেন মনিরুদ্দি। বললেন, ‘সে তো দেখতেই পারছিস। আমরা কি কোন ভুল করেছি? দ্যাখ কেমন ফুটফুটে মেয়েটা।’


বাবার মুখের ওপরে অদ্যবধি কোনো কথা বলার সাহস হয়নি ইদ্রিসের। আজ তার ব্যতিক্রম হবে এমন ভাবা অমুলক। বললো, ‘আমি ভুলের কথা বলছি না। কিন্তু এই বয়সে তোমরা কি পারবে মেয়েটিকে যথাযথভাবে মানুষ করতে?’
ছটুবিবি এবারে মুখ খোলেন। বললেন, ‘কী একখান আজগুবি কথা বলছিস খোকা? আমরা মানুষ করতে যাবো কেন? আমাদের কি আর সেই বয়স আছে?’


বিস্ময়ে চোখ কপালে ওঠে ইদ্রিসের। সে মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে বললো, ‘আচ্ছা; বুঝতে পারছি। তাহলে তোমরা মেয়েটিকে দত্তক নাওনি?’
মনিরুদ্দি বললেন, ‘বোকার মতো কথা বলিস নাতো খোকা। দত্তক না নিলে এতিমখানা কর্তৃপক্ষ আমাদের হাতে শিশুটিকে দেবে কোন ভরসায়? আইনও কি আমাদের সাপোর্ট করবে?’
‘তাহলে! এই যে বললে....।’


ছটুবিবি বললেন, ‘তোর বাবা ঠিকই বলেছে। আমরা মানুষ করবো কোন দুঃখে? যেখানে ছেলে রয়েছে- ছেলের বউ রয়েছে; সেখানে আমাদের কি এসব শোভা পায়? নাকি সেই বয়স আছে?’
‘আমরা মানুষ করবো!’ ইদ্রিসের হতাশাজনক বিস্ময় প্রকাশ।
মনিরুদ্দি বললেন, ‘যেন আকাশ থেকে পড়লি! তোর কি মনে হয় দুনিয়ায় কাজ শুধু তোরাই করছিস- আর সবাই হাত গুটিয়ে বসে থাকে?’
‘না; তা ঠিক নয়। তবে তোমাদের বৌমার সাথে কি পরামর্শ করে নিয়েছিলে?’
‘আমাদের ঘরের বউ। আমরা যে সিদ্ধান্ত নেবো- যে আদেশ দেবো, সে সেটা পালন করতে বাধ্য।’
‘সে তো ঠিকই আছে; তবুও...’


‘এর ভেতরে কোনো তবুও নেই। আমরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেটাই ফাইনাল। শিশুটিকে তোদের মেয়ের মতো মানুষ করতে হবে এবং এটা আমার আদেশ।’ রূঢ় গলায় বললেন মনিরুদ্দি।


ইদ্রিস আর কথা বাড়ায় না। সে কোনোভাবেই বাবার সাথে তর্কযুদ্ধে লিপ্ত হতে চায় না। কিন্তু পারুল কি এটা মেনে নেবে? বউ বলে তাকে যে সবকথা শুনতে হবে- মানতে হবে, এমনটা মনে করে না ইদ্রিস। বরং বিয়ের আগে তাকে কথা প্রসঙ্গে বলেছিলো, ‘তোমার ওপর স্বামীর কর্তৃত্ব ফলাতে চেষ্টা করবো না। অন্যায় কখনো মেনে নিতে চাপ প্রয়োগ করবো না।’ অথচ এই বাড়িতে যেদিন সে বউ হয়ে পা রেখেছিল সেদিনই ঐ কথাটি জাদুঘরে স্থান নিয়েছে। নেহাৎ পারুলের একটা দুর্বলতা আছে বলে সে নীরবে সহ্য করে চলেছে সবকিছু। 
‘আমি আসছি বাবা।’ বলে ইদ্রিস ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সময় ছটুবিবি বললেন, ‘মেয়েটাকে নিয়ে যা। ও তোদের সাথে ঘুমাবে।’
মায়ের কথায় পেছন দিকে ঘুরে দাঁড়ায় ইদ্রিস। বললো, ‘তোমার কথা ঠিক বুঝতে পারিনি মা।’


‘না বোঝার মতো কিছু তো বলিনি। আজ থেকে মেয়েটির সকল দায়িত্ব তোদের। আশাকরি ওর কোন অমর্যাদা হবে না।’
মনিরুদ্দি বাধা দিয়ে বললেন, ‘থাক না ইদ্রিসের মা, কয়েক রাত ও আমাদের সাথে ঘুমাক। ওর জন্যে দেখেছো আমাদের বিকেলটা কেমন চমৎকার কেটে গেল। অথচ অন্যদিন সময় যেন যেতেই চাই না।’ 


‘সে তুমি ঠিকই বলেছো। আমি অবশ্য মনে মনে চেয়েছিলাম ও কিছুদিন আমাদের সাথে ঘুমাক। পাছে তুমি কিছু বলো সেই কারণে...’
ছটুবিবির কথার মাঝে মনিরুদ্দি বললেন, ‘তুই যা খোকা, খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়। ও কিছুদিন আমাদের সাথে ঘুমাক। তারপর তোদের সাথে ঘুমাবে। আর হ্যাঁ, আমি আবারো বলছি, মেয়েটি আজ থেকে এ বাড়ির সদস্য, তোদের মেয়ে। ওর যেন কোন অবহেলা- অমর্যাদা না হয়। বউমাকে সেটা বলে দিস।’


বাবা-মায়ের খামখেয়ালীপনা খুব বেশি ভালো লাগে না ইদ্রিসের। সে মন খারাপ করে নিজের ঘরে যেয়ে খাটের ওপর বসে পড়ে। পারুল তার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বললো, ‘এতো ভেঙে পড়ার মতো কিছু হয়নি। বাবা-মা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আমাদের উচিৎ তাকে সম্মান জানানো।’


স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে ইদ্রিস বললো, ‘তারা তো বলছে মেয়েটিকে আমাদের মেয়ের মতো মানুষ করতে হবে!’
‘না; তা হয় না। হ্যাঁ হতো, যদি বছরের পর বছর পেরিয়ে যেতো- আমাদের সন্তান সন্ততি না হতো। বাধ্য হয়ে দত্তক নেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোন পথ থাকতো না। আশাকরি মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের নিরাশ করবেন না। তাছাড়া...’


পারুলের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ইদ্রিস বললো, ‘আমিতো তাদের সেটাই বুঝাতে চেষ্টা করছি। কিন্তু সব কথা কি আর মুখে বলা যায়? আচ্ছা তুমি থাকতে তারা এমন সিদ্ধান্ত নিল কীভাবে? আমাকে অন্তত একটা ফোন করতে পারতে?’


‘তুমি বিশ্বাস করো, আমার সাথে তারা কোন আলোচনাই করেননি। বুঝতে পারছি না, হঠাৎ তাদের কেন দত্তক নিতে হলো!’ বললো পারুল।
আর কথা বাড়ায় না ইদ্রিস। সে মনে মনে ভাবে- যা হয় হোক। নিশ্চয়ই ভালো কিছু আছে এই আগমনে। তা না হলে কেন বহুবছর পরে উঠানে পা দিতেই এই ভালোলাগা? 

মেয়েটিকে বাড়ি নিয়ে আসার পর অনেককিছু পাল্টাতে শুরু করেছে। যে শাশুড়ি সময় অসময় পারুলের খুঁত ধরতো সে কেমন যেন পাল্টে গিয়েছে। এখন ভালোভাবে কথা বলে। চুল আঁচড়িয়ে দেয়, বেনি করে দেয়। এটা খাওয়া উচিত- ওটা করা উচিত নয় ইত্যাদি উপদেয় দেয়। পারুলও তার শাশুড়ির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তাদের দেখে মনে হয় না, এই তো সেদিন দুজনের ভেতরে কত যোজন যোজন দূরত্ব ছিল।


সারাবাড়ি মেয়েটি মাতিয়ে রাখে। ছুটে বেড়ায় কাঠবিড়ালীর পিছে, গাঙ শালিকের ডানার নিচেই। দেখতে দেখতে মাস পেরিয়ে যায় এইতো সেদিন। ইদ্রিস বাজার থেকে খেলনা নিয়ে আসে; মিষ্টি নিয়ে আসে। সে মেয়েটিকে আপন করার চেষ্টা করে বারবার ব্যর্থ হয় মনের কাছে। নিজেকে কোনভাবেই পিতার স্থানে বসাতে পারে না। মনিরুদ্দি তাকে দু’দিন ধমকও দিয়েছে। কিছুতেই কিছু হয়নি।


পারুলের মনে এক পুরোনো ক্ষত বার বার পীড়া দিলেও মায়ের দায়িত্ব পালন করার যথাসাধ্য চেষ্টা করে। সে মেয়েটির সাথে সকাল থেকে রাত অবধি ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকে। সময় হলে গোসল করিয়ে লোশন মাখিয়ে দেয়, খাইয়ে দেয়, খুনসুটি করে; আরো কত কী। মনিরুদ্দি উপভোগ করে তাদের আপন হবার মুহূর্তগুলি। আজ রাতে তাকে ঘুমানোর জন্যে শ্বশুর- শাশুড়ীর ঘরে দিয়ে ফিরে যাবার সময় চোখের পানি ধরে রাখতে পারে না পারুল। সে আড়ালে আঁচল দিয়ে চোখে মোছে। ঘর থেকে বের হবার সময় পেছন থেকে শ্বশুর ডাক দেন। ঘুরে দাঁড়িয়ে পারুল বললো, ‘কিছু বলছেন বাবা?’


মনিরুদ্দি বললেন, ‘কাছে এগিয়ে এসো। আমি দশ গ্রামের মাতব্বর ছিলাম, তুমি কি সেটা জানো?’ 
শ্বশুরের কথায় থতমত খেয়ে যায় পারুল। সে একটু আড়াল করে আঁচল দিয়ে নাকের জল মুছে বললো, ‘জ্বী বাবা আমি জানি।’ 
ইতিমধ্যে দরজার সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে ইদ্রিস। সেদিকে মনিরুদ্দি একনজর তাকিয়ে বললেন, ‘তাহলে এটাও জেনে থাকবে, সেসময় অনেক কঠিন কঠিন সমস্যা থানা পর্যন্ত যেতে দিইনি; নিজেই শালিসের মাধ্যমে মিটিয়েছি।’


শ্বশুর তাকে কী বলতে চায় কিছুই বুঝতে পারে না পারুল। সে স্বামীর দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময় মনিরুদ্দি খাটের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির হাত ধরে কোলের কাছে টেনে নিয়ে বললেন, ‘এমন চাঁদের মতো মেয়েকে রেখে তুমি ঘুমাও কীভাবে বৌমা?’
এবার যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে পারুল। সে যা ভেবেছিল তেমন নয়। তার সে গোপন কথা গোপনই রয়ে গিয়েছে। ইদ্রিস বললো, ‘আমি বলছিলাম কী...’ তার কথা শেষ না হতেই মনিরুদ্দি বললেন, ‘না; তুই কোন কথা বলবি না। আমি বৌমার সাথে কথা বলছি। তুই শুধু শুনতে থাক।’


পারুল বললো, ‘আপনি যেমন ভাবছেন তেমন নয় বাবা। আমি তো ওর সবসময় খেয়াল রাখি। সে তো আপনি জানেনই।’
কিঞ্চিৎ হেসে ওঠে মনিরুদ্দি। বললেন, ‘শাক দিয়ে তুমি বড় সাইজের মাছ ঢাকতে পারবে সত্যি কিন্তু নাড়ির দাগ ঢাকবে কী দিয়ে?’
‘আমি ঠিক বুঝিনি আপনার কথা বাবা।’


ছটুবিবি বললেন, ‘তোমার শ্বশুর অন্য ভাষায় তো কিছু বলেনি? সে সরল ভাষায় যে প্রশ্ন করেছে তার উত্তর কি তোমার কাছে আছে?’
পারুল বুঝতে পারে না কী উত্তর দেবে। তাহলে কি সবকিছু জেনেই গিয়েছে? ইদ্রিস কি তাহলে বলে দিয়েছে? অথচ কথা ছিল, কেউ কথাটা প্রকাশ করবে না। মনিরুদ্দি মেয়েটির মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘আমরা কি খুব খারাপ শ্বশুর-শাশুড়ী তোমার কাছে বৌমা? নাকি খুব খারাপ বাবা-মা?’


পারুল যেন থতমত খেয়ে যায়। বললো, ‘তা হবে কেন? আমি তো কোন অভিযোগ করিনি বাবা!’
‘তাহলে কেন তোমার আগের বিয়ের কথা, সন্তানের কথা আমাদের কাছ থেকে লুকিয়েছো?’
দু’জনে যেন আকাশ থেকে পড়ে। যে কথা এতোদিন গোপন ছিলো তা আজ আর গোপন থাকে না! পারুল ছল ছল চোখে বললো, ‘ভেবেছিলাম আপনারা কীভাবে নিবেন বিষয়টি সে কারণে কিছু জানাইনি। বিশ্বাস করুন সেখানে আমার কোন দোষ ছিল না।’
‘তোমার স্বামী এক রোড এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছিল সেটা আমি জানি। কিন্তু শিশুটির কী দোষ ছিল? তাকে তুমি...’
চোখের পানি আর আটকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। পারুল ফুপাতে ফুপাতে বললো, ‘আমার আর কোন উপায় ছিল না বাবা। কলিজা রক্তাক্ত করে মেয়েটিকে শেষ পর্যন্ত এতিমখানায় রেখে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম। না হলে ওকে যে না খেয়ে মরতে হতো।’
‘তুমি শিক্ষিত। কোন একটা কাজ জোগাড় করে নিতে পারতে?’

‘সে চেষ্টা যে করিনি তা নয়; অনেকের কাছে গিয়েছিলাম। কিন্তু.....’ আর কথা বলতে পারে না পারুল। সে হু হু করে কেঁদে ওঠে।
‘এই বাড়ি আসার সময় তাকে নিয়ে আসতে পারতে। আমরা কিছু মনে করতাম কিনা তখন দেখতে।’
শ্বশুরের কথার কী জবাব দেবে পারুল? পাশে ইদ্রিস অসাঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে কোন কথা নেই।
পারুল আঁচল দিয়ে চোখ আর নাকের পানি মুছতে মুছতে বললো, ‘আমি যদি জানতাম আপনারা আমার কলিজার টুকরোকে মেনে নিবেন তাহলে এতটুকুন বয়সে তাকে এতিমখানায় রেখে আসতে হতো না। আমাকেও তীলে তীলে দ্বগ্ধ হতে হতো না বছরের পর বছর। এ অপরাধ আল্লাহ আমাকে কোনদিন ক্ষমা করবেন না।’


ছটু বিবি বললেন, ‘এতদিন কি তার কোন খোঁজ নিয়েছো? তোমার উচিৎ ছিল নিয়মিত তার খোঁজ নেওয়া, ভালো-মন্দ দেখা।’
‘আমি ভুল করেছি মা। এ ভুলের কোন ক্ষমা নেই। নিজের সুখের কথা ভেবে....।’
মনিরুদ্দি ইদ্রিসকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘খোকা তুইতো বিষয়টা জানিস; আমাদের সাথে আলোচনা করা উচিৎ ছিল না? এতবড় অপরাধ তোদের দ্বারা আমি অন্তত আশা করিনি।’
‘আমি তোমার বৌমাকে নিয়ে সকালেই যাবো তাকে সেখান থেকে নিয়ে আসার জন্যে।’
‘কোথা থেকে?’ মনিরুদ্দির প্রশ্ন।
‘পটুয়াখালীর যে এতিমখানায় তাকে রাখা হয়েছিল; সেখানে।’
‘সে তো সেখানে নেই।’
‘কী বলছেন বাবা!’ হঠাৎ যেন ভয়ংকর কিছু কানে গেল পারুলের। সে চমকে ওঠে।
‘আমি ঠিকই বলছি।’

শ্বশুরের কথায় পারুল যেন এক অন্ধকার যুগে পা বাড়াতে শুরু করেছে। তার চারিদিকে আঁধার হয়ে আসে। এতবছর সে ভেবে এসেছে, নিজে খবর নিতে না পারলেও মেয়েটি ওখানে ভালো থাকবে। কিন্তু এখন সেই ভালোর পরিবর্তে তাকেই হারিয়ে ফেলেছে! হঠাৎ মাথার ভেতরে চক্কর দিয়ে ওঠায় সে নিজেকে সামলাতে পারে না। জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে পড়ে যায়।
ছটুবিবি পারুলের মাথায় তেলপানি মালিশ করতে করতে বৌমা বলে বার কয়েক ডাক দেন। বেশ কিছুক্ষণ পরে পারুলের জ্ঞান ফেরে। সে চারিদিক একনজর তাকায়। ‘রুমালী, আমার রুমালী আমাকে তুই ক্ষমা করে দিস।’ অনাবরত চোখের জল ঝরাতে থাকে সে।
 মনিরুদ্দি বললেন, ‘বৌমা কান্না থামাও। তোমার মেয়ে হারিয়ে যায়নি।’
‘কোথায় আমার নয়নের মনি- আমার মানিক?’
‘সে তোমার কাছেই আছে।’
পারুল হতভম্ব। কী বলে তার শ্বশুর! বললো, ‘আমার কাছে!’
মনিরুদ্দি বললেন, ‘হ্যাঁ তোমার কাছে। যাকে তুমি মেয়ের মতো এতোদিন মানুষ করছো সেই আসলে তোমার নিজের মেয়ে- তোমার রুমালী।’
‘আমার রুমালী! কী বলছেন বাবা আপনি!’ বিস্ময়ে চোখ ছানা বড়া হয়ে যায় পারুলের। ইদ্রিসও কম বিস্মিত হয়নি। সেও বাবার কথায় হতবাক।

‘সেদিন তোমাদের দুজনের কথা কাটাকাটি আমার মনের ভেতরে খটকা লেগেছিল। বুঝেছিলাম, নিশ্চয়ই আমাদের কাছ থেকে তোমরা কিছু লুকাচ্ছো। তাইতো খোঁজ নিতে তোমাদের গ্রামের বাড়ি পর্যন্ত পৌছে যাই। তোমার প্রথম বিয়ে, দুর্ঘটনা, সন্তান এতিমখানায় দেওয়া সবই জানতে পারি। আমার নাতনী তো আর এতিমখানায় থাকতে পারে না। আমি তোমাদের আগেই সবকিছু জানাতে পারতাম, জানাইনি। দেখতে চেয়েছিলাম যে, কোন পরিস্থিতিতে অন্যের সন্তানকে তোমরা কতটা গ্রহণ করো। আমার মনে হয় তোমরা পুরোপুরি সফল হওনি। আমি নির্দেশ দিয়েছিলাম বলেই হয়তো এতটুকু করেছো। না হলে...।’
মহাপ্রাপ্তির সাথে অনাকাঙ্ক্ষিত লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে পারুলের মুখ। সে রুমালীকে বুকের সাথে আঁকড়িয়ে ধরে অনুভব করে ক্ষণেক সুখের জন্যে ফেলে আসা অসমাপ্ত সুখ। 

কবি পরিচিতি। আহমদ রাজু গল্পকার হলেও তিনি একাধারে কবি, উপন্যাসিক, চিত্রশিল্পী। শিক্ষায় হাতেখড়ি স্থানীয় জঙ্গলবাঁধাল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। লেখালেখি শুরু ছেলেবেলায়। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ছড়া, কবিতা, গান মোটকথা সাহিত্যের সব শাখাতেই পদার্পণ তার। দেশ-বিদেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকসহ স্থানীয় ও বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত। ‘মেঘবালিকা’ তার প্রথম গল্পগ্রন্থ।


২০১৩ সালে ‘অরণি গল্প প্রতিযোগিতা’য় তার ‘মুকুট’ গল্প শ্রেষ্ঠ গল্পের পুরস্কার লাভ করে। তাছাড়া ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়ান সংবাদপত্র ‘সুপ্রভাত সিডনি’ তাকে শ্রেষ্ঠ গল্প লেখক সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করে।
লেখক বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্র ‘সুপ্রভাত সিডনি’র বিশেষ বিভাগীয় সম্পাদকসহ বিদ্রোহী সাহিত্য পরিষদ, যশোরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।


আহমদ রাজু
(কবি ও কথাশিল্পী)
সভাপতি-
বিদ্রোহী সাহিত্য পরিষদ (বিএসপি) যশোর।

বিশেষ বিভাগীয় সম্পাদক-
সুপ্রভাত সিডনি, অস্ট্রেলিয়া
www.suprovatsydney.com.au
ইমেইল : [email protected]
মুঠোফোন : ০১৭১২-৮১০ ৯২৯

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow