ইতিকাফ আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো, অবস্থান করা, নিবেদিত হওয়া, নিরবচ্ছিন্ন হওয়া ইত্যাদি। পরিভাষায় ইতিকাফ হলো, আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে দুনিয়ার যাবতীয় ব্যস্ততাকে গুটিয়ে এমন মসজিদে অবস্থান করা, যেখানে জামাতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয়।
ইতিকাফ তিন প্রকার—সুন্নত ইতিকাফ, নফল ইতিকাফ এবং ওয়াজিব ইতিকাফ।
১. সুন্নত ইতিকাফ
রমজানের শেষ দশকে একুশ তারিখের রাত (অর্থাৎ ২০ তারিখ সূর্যাস্তের আগ) থেকে ঈদের চাঁদ দেখা পর্যন্ত ইতিকাফ করা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি বছর এ দিনগুলোতে ইতিকাফ করতেন, তাই একে সুন্নত ইতিকাফ বলা হয়।
২. নফল ইতিকাফ
রমজানের শেষ দশকে পূর্ণ দশ দিনের কম ইতিকাফ করা। অথবা বছরের অন্য যেকোনো সময় যতক্ষণ ইচ্ছা, ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করা।
৩. ওয়াজিব ইতিকাফ
মান্নতকৃত ইতিকাফ এবং সুন্নত ইতিকাফ ফাসেদ হয়ে গেলে তার কাজা আদায় করা।
ইতিকাফের স্থান
সওয়াবের দিক থেকে ইতিকাফের জন্য সর্বোত্তম স্থান হলো মসজিদে হারাম। এরপর মসজিদে নববী। তারপর মসজিদে আকসা। এরপর যেকোনো জামে মসজিদ। তারপর যেকোনো পাঞ্জেগানা মসজিদ। তবে নারীদের জন্য ইতিকাফের স্থান হলো ঘরের নির্দিষ্ট কোনো স্থান। ( শরহু মুখতাসারিত তহাবী : ২/৪৭০, মাবসূত, সারাখসী : ৩/১১৫; বাদায়েউস সানায়ে : ২/২৮০-২৮১, রদ্দুল মুহতার : ২/৪৬৯)
ইতিকাফের ফজিলত
ইতিকাফ শিআরে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত একটি মাসনূন আমল। উপরন্তু রমজানের ফজিলত ও বরকত লাভ করার ক্ষেত্রে ইতিকাফের ভূমিকা অপরিসীম।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদানি জীবনে কেবল একটি রমজানে (জিহাদের সফরে থাকার কারণে ) ইতিকাফ করতে পারেননি। তাই পরবর্তী বছর ২০ দিন ইতিকাফ করে তা পূরণ করে নিয়েছেন। এছাড়া তিনি সব রমজানে ইতিকাফ করেছেন। সাহাবীগণও তাঁর সঙ্গে ইতিকাফে শরিক হয়েছেন। হাদিস শরীফে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানে শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। কিন্তু এক বছর ইতিকাফ করতে পারেননি। পরবর্তী বছর বিশ রাত (দিন) ইতিকাফ করেছেন। (আবু দাউদ : ২৪৬৩)
ইতিকাফের মাধ্যমে লাইলাতুল কদর লাভ করার সম্ভাবনাও অনেক বেশি থাকে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাইলাতুল কদর লাভের আশায় একবার রমজানের প্রথম দশ দিন ইতিকাফ করেন। এরপর কয়েকবার ইতিকাফ করেন মাঝের দশ দিন। এরপর একসময় শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতে শুরু করেন এবং ইরশাদ করেন, তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ কর। (বোখারি : ২০২০, লাতাইফুল মাআরিফ : পৃষ্ঠা ৩৫৩)
আরেক হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের মাঝের দশ দিন ইতিকাফ করতেন। এক বছর এভাবে ইতিকাফ করার পর যখন রমজানের ২১তম রাত এলো, তিনি ঘোষণা করলেন, যে ব্যক্তি আমার সঙ্গে ইতিকাফ করেছে সে যেন শেষ দশকে ইতিকাফ করে। কারণ আমাকে শবে কদর সম্পর্কে অবগত করা হয়েছিল (যে, তা শেষ দশকের অমুক রাত।) এরপর তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ... সুতরাং তোমরা শেষ দশকে শবে কদর অন্বেষণ করো এবং প্রতি বেজোড় রাতে অন্বেষণ কর। (বোখারি : ২০২৭)
ইতিকাফের ফায়দা
রাজধানীর জামিয়া মাহমুদিয়াযাত্রাবাড়ীর প্রধান মুফতি রেজাউল করীম আবরার কালবেলাকে বলেন, ইতিকাফের গুরুত্বপূর্ণ একটি ফায়দা হলো ইতিকাফকারী অত্যন্ত পবিত্র ও গোনাহমুক্ত পরিবেশে থাকে। শরিয়তের দৃষ্টিতে এখানে তার অবস্থানটিই এক ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। তাই সে অবসর সময়ে কোনো আমল না করলেও দিনরাত তার মসজিদে অবস্থান করাটাই ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়।
মুফতি আবরার আরও বলেন, এমনিভাবে ইতিকাফকারী দুনিয়ার যাবতীয় ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে। আল্লাহর ইবাদতের জন্য নিজেকে পূর্ণ প্রস্তুত করে আল্লাহ-অভিমুখী হয়। অভিজ্ঞজনমাত্রই জানেন, এটা যে কারো জন্য, যে কোনো সময় সহজেই সম্ভব হয় না।
তাছাড়া ইতিকাফের মাধ্যমে রোজার যাবতীয় হক ও আদাব রক্ষা করার তাওফিক হয়। সর্বোপরি ইতিকাফ অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও মহিমান্বিত একটি ইবাদত। যার ফায়েদা ও প্রভাব মানুষের মন ও মননে এবং জীবন ও জগতে অনেক গভীর হয়ে থাকে।