ইবাদতে তৃপ্তি পাচ্ছেন না? তাহলে এই ৪টি কাজ করুন

ইবাদতে তৃপ্তি এমন একটি নেয়ামত, যা কারো হাসিল হলে তিনি জীবনকে সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেন। পার্থিব অন্য সব স্বাদ ও ভোগ-বিলাস তার কাছে তুচ্ছ মনে হবে। কারণ, তখন আল্লাহর সাথে এক সুনিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পার্থিব স্বার্থ কখনো তাকে নীতিহীন করতে পারে না। আল্লাহর ইবাদতের স্বাদ পাওয়া মানুষ যদি মনোবেদনায়ও থাকেন, সেই বেদনা ও কষ্ট তার কাছে তুচ্ছ মনে হয় এবং তার জন্য সালাত আদায় করা বোঝা মনে হয় না; বরং তা হয়ে ওঠে চোখের শীতলতা, কোরআন তেলাওয়াত দায়িত্ব মনে হয় না; বরং অন্তরের প্রশান্তি। কিন্তু ইদানিং অনেকেই অভিযোগ করেন, নামাজ পড়ি, কোরআন তেলাওয়াত করি, জিকিরও করি তবু ইবাদতে সেই তৃপ্তি বা হৃদয়ের প্রশান্তি অনুভব হয় না। অথচ ইবাদত তো মানুষের আত্মার খোরাক এবং হৃদয়ের প্রশান্তি লাভের মাধ্যমে। বাস্তবে ইবাদতের স্বাদ শুধু বাহ্যিক আমলের ওপর নির্ভর করে না; বরং হৃদয়ের পবিত্রতা, হালাল-হারামের প্রতি সতর্কতা এবং গোনাহ থেকে দূরে থাকার সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কোরআন-সুন্নাহর আলোকে এমন কিছু কাজ বা আমল রয়েছে, যা ইবাদতের প্রশান্তি ও মিষ্টতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কালবেলার পাঠকদের জন্য ইবাদতে তৃপ্তি পে

ইবাদতে তৃপ্তি পাচ্ছেন না? তাহলে এই ৪টি কাজ করুন

ইবাদতে তৃপ্তি এমন একটি নেয়ামত, যা কারো হাসিল হলে তিনি জীবনকে সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেন। পার্থিব অন্য সব স্বাদ ও ভোগ-বিলাস তার কাছে তুচ্ছ মনে হবে। কারণ, তখন আল্লাহর সাথে এক সুনিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পার্থিব স্বার্থ কখনো তাকে নীতিহীন করতে পারে না। আল্লাহর ইবাদতের স্বাদ পাওয়া মানুষ যদি মনোবেদনায়ও থাকেন, সেই বেদনা ও কষ্ট তার কাছে তুচ্ছ মনে হয় এবং তার জন্য সালাত আদায় করা বোঝা মনে হয় না; বরং তা হয়ে ওঠে চোখের শীতলতা, কোরআন তেলাওয়াত দায়িত্ব মনে হয় না; বরং অন্তরের প্রশান্তি।

কিন্তু ইদানিং অনেকেই অভিযোগ করেন, নামাজ পড়ি, কোরআন তেলাওয়াত করি, জিকিরও করি তবু ইবাদতে সেই তৃপ্তি বা হৃদয়ের প্রশান্তি অনুভব হয় না। অথচ ইবাদত তো মানুষের আত্মার খোরাক এবং হৃদয়ের প্রশান্তি লাভের মাধ্যমে।

বাস্তবে ইবাদতের স্বাদ শুধু বাহ্যিক আমলের ওপর নির্ভর করে না; বরং হৃদয়ের পবিত্রতা, হালাল-হারামের প্রতি সতর্কতা এবং গোনাহ থেকে দূরে থাকার সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কোরআন-সুন্নাহর আলোকে এমন কিছু কাজ বা আমল রয়েছে, যা ইবাদতের প্রশান্তি ও মিষ্টতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কালবেলার পাঠকদের জন্য ইবাদতে তৃপ্তি পেতে  সহায়ক ৪টি করণীয় তুলে ধরা হলো:

১. চোখের হেফাজত করুন

চোখের হেফাজত করে দৃষ্টির গোনাহ থেকে বেঁচে থাকুন। কারণ, হারাম দৃষ্টি হৃদয়কে অন্ধকার করে দেয়। অপ্রয়োজনীয় ও কুদৃষ্টিতে তাকানো অন্তরকে কলুষিত করে এবং ইবাদতের স্বাদ নষ্ট করে দেয়। একজন মুমিন যখন নিজের দৃষ্টিকে সংযত রাখে, তখন তার অন্তর আরও পবিত্র হয় এবং ইবাদতে এক ধরনের প্রশান্তি অনুভূত হয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।’ (সুরা আন-নুর: ৩০)

হাদিসে দৃষ্টিকে শয়তানের বিষাক্ত তীর বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ইবনু মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘দৃষ্টি শয়তানের বিষাক্ত তীর। যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে দৃষ্টির হেফাজত করবে, তৎপরিবর্তে আল্লাহ তাকে এমন ঈমান দান করবেন, যার মিষ্টতা সে অন্তরে অনুভব করবে।’ (তাবরানি: ১০৩৬২)

অধিকাংশ বড় গোনাহের সূচনা হয় একটি হারাম দৃষ্টি থেকে। যদি একজন মানুষ তার দৃষ্টিকে হেফাজত করতে পারে, তাহলে সে অসংখ্য গোনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে। আর যে ব্যক্তি চোখের গোনাহ থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সে নামাজে, কোরআন তিলাওয়াতে, জিকিরে এবং অন্যান্য ইবাদতে এক ভিন্নরকম প্রশান্তি অনুভব করতে শুরু করবে—ইনশাআল্লাহ।

২. সব ধরনের গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করুন

গোনাহ মানুষের অন্তরে কালো দাগ ফেলে। গোনাহ যত কম হবে, হৃদয় তত বেশি নির্মল ও পরিচ্ছন্ন থাকবে। আর নির্মল হৃদয়ই আল্লাহর ইবাদতে প্রকৃত প্রশান্তি-স্বাদ ও একাগ্রতা অনুভব করে। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, কখনো নয়; বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরের ওপর মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে। (সুরা আল-মুতাফফিফিন: ১৪)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বান্দা যখন একটি গোনাহ করে, তখন তার হৃদয়ে একটি কালো দাগ পড়ে। (তিরমিজি: ৩৩৩৪)

৩.পরিপূর্ণ মনোযোগ সহকারে ইবাদত করা

অনেক সময় আমরা নামাজ পড়ি কোরআন তেলাওয়াত করি জিকির করি অথবা অন্য কোনো আমল করি, কিন্তু আমাদের মনোযোগ থাকে না। বাহ্যিকভাবে ইবাদতে লিপ্ত থাকলেও হৃদয়ে ঘুরে বেড়াই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। এভাবে এবাদত করে যদিও দায়িত্ব পালন হবে, কিন্তু ইবাদতে কখনো স্বাদ বা হৃদয়ের প্রশান্তি পাওয়া যাবে না।

আল্লাহ তাআলা কোরআনে সফল মুমিনদের প্রথম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সফল হয়েছে সেই মুমিনরা, যারা তাদের সালাতে গভীর বিনয় ও একাগ্রতা অবলম্বন করে।’ (সুরা আল-মুমিনুন: ১-২)

এই মর্মে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এক ব্যক্তি নামাজ শেষ করে, অথচ তার জন্য নামাজের সওয়াব লেখা হয় মাত্র এক-দশমাংশ, কিংবা এক-নবমাংশ, এক-অষ্টমাংশ, এক-সপ্তমাংশ, এক-ষষ্ঠাংশ,অ এক-পঞ্চমাংশ, এক-চতুর্থাংশ, এক-তৃতীয়াংশ অথবা অর্ধেক’ (আবু দাউদ: ৭৯৬)। অর্থাৎ, নামাজের সওয়াব নির্ভর করে মনোযোগ ও খুশু-খুজুর ওপর।

অন্য এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত কর, যেন তুমি তাঁকে দেখছো। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে অন্তত এই বিশ্বাস রাখো যে, তিনি তোমাকে দেখছেন।’ (বোখারি: ৫০)

৪. হারাম থেকে নিজেকে দূরে রাখুন এবং হালাল জীবিকা গ্রহণ করুন

হারাম উপার্জন ও হারাম খাদ্য শুধু দোয়া কবুলের অন্তরায় নয়, বরং ইবাদতের নূর ও বরকতও কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে হালাল রিজিক অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং ইবাদতে এক বিশেষ প্রশান্তি এনে দেয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে রাসুলগণ! তোমরা পবিত্র (হালাল) বস্তু আহার করো এবং সৎকাজ করো।’ (সুরা আল-মুমিনূন: ৫১)

লক্ষ্য করুন, আল্লাহ তাআলা আগে হালাল খাদ্যের কথা বলেছেন, তারপর সৎকাজের কথা বলেছেন। যেন বুঝিয়ে দিয়েছেন, হালাল জীবিকা ইবাদতের ভিত্তি।

হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র; তিনি কেবল পবিত্র (হালাল) জিনিসই গ্রহণ করেন।’ (মুসলিম: ১০১৫)

অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারাম দ্বারাই প্রতিপালিত হয়েছে। তাহলে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?’ (মুসলিম: ১০১৫)

হারাম উপার্জন শুধু দোয়া কবুল হওয়ার পথে বাধা নয়; এটি হৃদয়কে এমনভাবে কঠিন করে দেয় যে, মানুষ ধীরে ধীরে ইবাদতের স্বাদও হারিয়ে ফেলে।

ইমাম ইবনু রজব হাম্বলী (রহ.) বলেন, ‘হালাল খাদ্য হৃদয়কে আলোকিত করে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে ইবাদতের প্রতি উদ্যমী করে। আর হারাম খাদ্য হৃদয়কে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে এবং গোনাহের দিকে টেনে নিয়ে যায়।’ (জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম, হাদিস নং ১০-এর ব্যাখ্যা)

ইবাদতের স্বাদ কেবল বেশি বেশি আমল করার মাধ্যমে অর্জিত হয় না; বরং তা অর্জিত হয় একটি পরিশুদ্ধ হৃদয়, সংযত দৃষ্টি, ইবাদতে মনোযোগ, গোনাহমুক্ত জীবন এবং হালাল জীবিকার মাধ্যমে। তাই যদি আমরা ইবাদতে প্রকৃত প্রশান্তি, খুশু এবং আল্লাহর নৈকট্য অনুভব করতে চান, তবে বাহ্যিক আমলের পাশাপাশি নিজেদের অন্তর ও চরিত্রকেও পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করতে হবে। যে হৃদয় গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেয়, সেই হৃদয়ই ইবাদতের প্রকৃত তৃপ্তি অনুভব করতে পারে।

লেখক: শরিয়াহ কনসালট্যান্ট

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow