উম্মে হাবিবা কনা
স্বপ্ন, ঐশ্বরিক ঘটনা ও ইতিহাসের মেলবন্ধনে উঠে এসেছে ইমহোটেপ ও যোসেফ নামের দুটি চরিত্র। ইমহোটেপ, যিনি প্রাচীন মিশরের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। যাকে ইতিহাসের প্রাচীনতম চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও স্থপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। অপরদিকে যোসেফ বাইবেলের সেই প্রজ্ঞাবান চরিত্র, যিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে মিশরের ফারাওয়ের কাছে শ্রদ্ধা ও আস্থা অর্জন করেছিলেন।
অথচ বিকল্পধারার ইতিহাসবিদেরা দাবি করেছেন, ইমহোটেপ ও যোসেফ আসলে দু’জন আলাদা মানুষ নয় বরং একই ব্যক্তি। তাদের এ তত্ত্বে উঠে এসেছে ইমহোটেপের কাজ, ব্যক্তিত্ব এবং যোসেফের জীবনের মধ্যকার বিস্ময়কর মিল থেকে। কিন্তু দুজনের সময়কালের মধ্যে রয়েছে বিশাল ব্যবধান। তাহলে কীভাবে তারা অভিন্ন হতে পারেন?
এই বইতে সেই রহস্যের গভীরে প্রবেশ করার চেষ্টা করা হয়েছে। তত্ত্ব, প্রমাণ ও যুক্তির আলোকে খুঁজে দেখা হয়েছে ইমহোটেপ ও যোসেফ কি সত্যিই একই ব্যক্তি, না-কি দিনশেষে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুজন মানুষ। ইমসেফের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আপনার সামনে ধীরে ধীরে সেই রহস্যের জট খুলতে শুরু করবে।
১৩টি অধ্যায় সম্বলিত বইটিতে প্রাচীন মিশর ও রাজাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক ঘটনার চমৎকার বর্ণনা রয়েছে। বইটির প্রথম অধ্যায়ে স্বপ্ন ও মিশর পটভূমিতে মিশরের রাজা, রাজবংশ, আব্রাহামিক বা সেমেটিক ধর্মের কথা উল্লেখ আছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায়ে স্বপ্ন, মুসলাম-খ্রিষ্টান-ইহুদি ধর্মে উল্লেখিত ব্যক্তি ইব্রাহিম বা আব্রাহামের কথা বলা হয়েছে। যার বাবা মাটির মূর্তি বানাতো এবং বিক্রি করতো। লোকেরা সেসব কিনে পূজা-অর্চনা করতো। ইব্রাহিম সেসব বানাতে ও বিক্রি করতে নিষেধ করে। বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা করায় সবাই বিরক্ত হয় এবং শত্রুতে পরিণত হতে থাকে।
এখানে আমরাফেল বা নমরুদের উল্লেখ আছে, যিনি নিজেকে ঈশ্বর দাবি করেছিলেন। আল্লাহ বা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তার পতন কীভাবে হয় সে বর্ণনাও আছে বইটিতে।
বইটিতে স্বপ্নের কথা উল্লেখ আছে, স্বপ্নের মাধ্যমে নির্দেশনা পেতেন ইব্রাহিম। পরে তিনি বিয়ে করেন এবং দুটি ছেলেসন্তান লাভ করেন, যারা হচ্ছে এষৌ ও জ্যাকব। জ্যাকবও স্বপ্নের মাধ্যমে অনেক কিছু দেখতে পেতো। পরে জ্যাকবের ছেলে যোসেফ যে বইটির প্রধান চরিত্র, সে-ও স্বপ্নের মাধ্যমে নির্দেশনা পেতো। চতুর্থ ও পঞ্চম অধ্যায়ে যোসেফ বা ইউসুফ-জুলেইখা ও মিশরের উজিরের বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়া আছে যোসেফের ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়া, বড় হয়ে ক্রীতদাস হয়ে হাতবদল হয়ে পরিশেষে কয়েদী হওয়া।
তারপর দেখতে পাই, ফারাওয়ের স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে তার নজরে পরে ভাগ্য বদল হতে। এভাবে সে পর্যায়ক্রমে উজির নিযুক্ত হয়। ষষ্ঠ অধ্যায়ে সে পরিকল্পনা করে মিশরকে দুর্ভিক্ষের কবল থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। যোসেফ থেকে ইমহোটেপ নামকরণের বিষয়টা দেখতে পাই এখানে। সপ্তম ও অষ্টম অধ্যায়ে লেখক ইমহোটেপ-দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে বলার চেষ্টা করেছেন। এখানে ইমহোটেপকে একাধারে স্থপতি, উজির পুরোহিত ও চিকিৎসাবিদ বলা হয়েছে। এ অধ্যায়ে মূলত সাদৃশ্য তুলে ধরে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, যোসেফ বা ইউসুফই আসলে ইমহোটেপ।
নবম অধ্যায়ে পিরামিড, হায়ারোগ্লিফিক্স, মন্দির এসবের বর্ণনা করেছেন। দশ, এগারো ও বারো অধ্যায়ে যোসেফ ও ইমহোটেপ যে একই ব্যক্তি এটা প্রমাণ করার জন্য ইতিহাসসহ ধর্মগ্রন্থের রেফারেন্স দিয়ে বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। সর্বশেষ তেরোতম অধ্যায়ে বিশ্বাস বনাম যুক্তি শিরোনামে পাঠকদের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছে, আসলে কি একই ব্যক্তি যোসেফ বা ইউসুফ ও ইমহোটেপ?
বইয়ের প্রচ্ছদ দেখেই একটা চমৎকার ধারণা পেয়েছিলাম বইটি সম্পর্কে। ইতিহাসকেন্দ্রিক গল্প-উপন্যাস পড়তে ভালো লাগে। দীর্ঘদিন পর সুযোগ হলো এমন বই পড়ার। জানা কিছু বিষয়ও খুঁজে পেয়েছি বইটিতে। যারা ইতিহাস পড়তে ভালোবাসেন, যাদের মধ্যে কৌতূহল তুলনামূলক বেশি; তারা বইটি খুব উপভোগ করবেন। বইটির শেষ পৃষ্ঠায় তথ্যসূত্র উল্লেখ আছে, কোথা থেকে নেওয়া বা ডিটেইলস জানতে চাইলে কোথায় খুঁজে পেতে পারবেন।
বই: ইমসেফ
লেখক: লতিকা হালদার
প্রকাশনী: দূরবীণ
প্রচ্ছদ: জুলিয়ান
মূল্য: ২৫০ টাকা।
এসইউ/জেআইএম