ইরাকের জার্সিতে বিশ্বকাপ মাতাবেন ‘রাষ্ট্রহীন’ ৪ ফুটবলার!

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর মাঝে মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি এক পলিটিক্যাল ও মানবিক মহাকাব্যের গল্প লিখে চলেছে এশিয়ার প্রতিনিধি ইরাক। আসন্ন এই ফুটবল মহাযজ্ঞে ইরাক এমন এক দলের প্রতিনিধিত্ব করবে, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে ভিন্ন দুটি পতাকা ও ভিন্ন দুটি রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের গল্প। আগামী ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া এই বিশ্বমঞ্চে ইরাকের ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াডে জায়গা করে নিয়েছেন চারজন কুর্দি ফুটবলার। এর মাধ্যমে ফিফা টুর্নামেন্টে খেলার যোগ্যতা না থাকা বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্রহীন জাতি ‘কুর্দিস্তান’ পরোক্ষভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছে এই ফুটবল বিশ্বকাপে। গত ৩১ মার্চ বলিভিয়াকে প্লে-অফ ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে যখন ইরাক তাদের ফুটবল ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে, তখন খেলোয়াড়দের বাঁধভাঙা উল্লাসেই লুকিয়ে ছিল এক ভিন্ন বার্তা। ১৯৮৬ সালের পর অর্থাৎ দীর্ঘ ৪০ বছর পর বিশ্বকাপের মূল আসরে ফেরা এই দলটিকে দেশে বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হলেও বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছেন দলের রাইট-ব্যাক মেরচাস দোসকি। ১৯৯৯ সালে জার্মানির হ্যানোভারে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলার উদযাপনের একপর্যায়ে পরম গৌরবে উঁচিয়ে ধরেন কুর্দ

ইরাকের জার্সিতে বিশ্বকাপ মাতাবেন ‘রাষ্ট্রহীন’ ৪ ফুটবলার!

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর মাঝে মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি এক পলিটিক্যাল ও মানবিক মহাকাব্যের গল্প লিখে চলেছে এশিয়ার প্রতিনিধি ইরাক। আসন্ন এই ফুটবল মহাযজ্ঞে ইরাক এমন এক দলের প্রতিনিধিত্ব করবে, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে ভিন্ন দুটি পতাকা ও ভিন্ন দুটি রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের গল্প।

আগামী ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া এই বিশ্বমঞ্চে ইরাকের ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াডে জায়গা করে নিয়েছেন চারজন কুর্দি ফুটবলার। এর মাধ্যমে ফিফা টুর্নামেন্টে খেলার যোগ্যতা না থাকা বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্রহীন জাতি ‘কুর্দিস্তান’ পরোক্ষভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছে এই ফুটবল বিশ্বকাপে।

গত ৩১ মার্চ বলিভিয়াকে প্লে-অফ ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে যখন ইরাক তাদের ফুটবল ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে, তখন খেলোয়াড়দের বাঁধভাঙা উল্লাসেই লুকিয়ে ছিল এক ভিন্ন বার্তা। ১৯৮৬ সালের পর অর্থাৎ দীর্ঘ ৪০ বছর পর বিশ্বকাপের মূল আসরে ফেরা এই দলটিকে দেশে বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হলেও বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছেন দলের রাইট-ব্যাক মেরচাস দোসকি।

১৯৯৯ সালে জার্মানির হ্যানোভারে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলার উদযাপনের একপর্যায়ে পরম গৌরবে উঁচিয়ে ধরেন কুর্দিস্তানের জাতীয় পতাকা। সার্বভৌম বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো রাষ্ট্র না হওয়ায় ফিফার কোনো টুর্নামেন্টে কুর্দিস্তানের সরাসরি খেলার সুযোগ নেই।

কিন্তু নিজের শিকড় ও ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে দোসকি বিশ্বকে মনে করিয়ে দিয়েছেন তাদের অস্তিত্বের কথা। দোসকি ছাড়াও ইরাক দলের অন্য তিন কুর্দি ফুটবলার হলেন রেবিন সুলাকা, ইউসেফ আমিন এবং আইমার শের। এর ফলে এবারের বিশ্বকাপে কুর্দিস্তানের সবচেয়ে বেশি প্রতিনিধি থাকা দলে পরিণত হয়েছে ইরাক। অবশ্য কুর্দি বাবার সন্তান দারিও নামো-কেও অস্ট্রেলিয়ান কোচ গ্রাহাম আরনল্ড প্রীতি ম্যাচের দলে ডেকেছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াডে তার জায়গা হয়নি।

বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ জনসংখ্যার কুর্দিরা হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী, যারা মূলত দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্ক, উত্তর-পূর্ব সিরিয়া, উত্তর ইরাক এবং উত্তর-পশ্চিম ইরান; এই চার দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করছেন। ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হলেও তারা নিজস্ব ভাষা ও সমৃদ্ধ প্রাচীন সংস্কৃতি টিকিয়ে রেখেছেন। তাদের একটি নিজস্ব পতাকায় রয়েছে লাল, সাদা ও সবুজ স্ট্রাইপ; যার কেন্দ্রে রয়েছে ২১টি রশ্মি বিশিষ্ট একটি সূর্য, যা ইয়েজিদিবাদের মতো ওই অঞ্চলের ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতীক। এর আগে পোপ ফ্রান্সিসের এরবিল সফরের সময়ও এই পতাকাটি বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিল।

কুর্দিস্তানের এই বঞ্চনার ইতিহাস প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার। অটোমান সাম্রাজ্যের পতনে সহযোগিতার বিনিময়ে মিত্রশক্তি কুর্দিদের নিজস্ব রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি দিলেও যুদ্ধ শেষে সেই প্রতিশ্রুতি আর আলোর মুখ দেখেনি। ফলে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন অধরাই থেকে যায় কুর্দিদের। এরপর সাদ্দাম হোসেনের ২৪ বছরের শাসনামলে বহু কুর্দি নির্মম নির্যাতন ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হন। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে ইরাকের সংবিধানে কুর্দিস্তানকে একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০১৭ সালে এক গণভোটে ৯৩ শতাংশ মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিলেও আন্তর্জাতিক সমর্থন ও ইরাক সরকারের হস্তক্ষেপে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন আবারও ভেস্তে যায়।

স্বাধীনতার এই আকুতি ফুটবল মাঠেও ছড়িয়ে পড়েছিল। কুর্দিরা তাদের নিজস্ব একটি জাতীয় ফুটবল দল গঠন করে, যা ফিফার বাইরে থাকা দলগুলোর সংগঠন ‘কনিফা’-র অধীনে বেশ কয়েকটি বিশ্বকাপে অংশ নেয়। এমনকি ইরাকি লিগেও বেশ কিছু কুর্দি ক্লাব খেলে, যার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘এরবিল স্পোর্টস ক্লাব’। ২০০৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ৪টি ঘরোয়া লিগ জেতার পাশাপাশি এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স লিগ (এএফসি কাপ)-এর ফাইনালে পৌঁছানো প্রথম ইরাকি ক্লাব ছিল এটি।

এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘আই’-এ ইরাকের প্রতিপক্ষ শক্তিশালী ফ্রান্স, নরওয়ে এবং সেনেগাল। দলে অধিনায়ক জালাল হাসান, শীর্ষ গোলদাতা আয়মেন হুসেইন, বায়ার্ন মিউনিখ থেকে ধারে থাকা তরুণ উইং-ব্যাক জুসেফ নাসরাওয়ে এবং ন্যাশভিল এসসি-র অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার আহমেদ কাসেমদের মতো প্রতিভারা থাকলেও বিশ্ববাসীর চোখ থাকবে কুর্দিস্তানের এই চার সন্তানের ওপর। যে দেশ বা রাষ্ট্রব্যবস্থা একসময় তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল, আজ বিশ্বমঞ্চে সেই দেশের জার্সি গায়ে জড়িয়েই দোসকি, সুলাকা ও আমিনরা বিশ্বকে দেখাতে চান মানচিত্রের সীমানা দিয়ে কুর্দিদের অস্তিত্বকে কখনো মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow