ইরান যুদ্ধে অর্থনীতিতে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
ইরানে হামলা পাল্টা হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ভয়াবহ সংকট তৈরি করেছে। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে স্বল্প ও মধ্যমআয়ের দেশগুলো। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও শিল্পের কাঁচামালের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় মূল্যস্ফীতি, সরবরাহ সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চাপ বাড়ছে। এমতাবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি সাময়িক স্থিতিশীল মনে হলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর হতে পারে। আরও পড়ুন: যুদ্ধের প্রভাবে টিকে থাকার লড়াইয়ে ক্ষুদ্র ‘আয় বন্ধ থাকলেও খরচ থেমে নেই, দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না’ পাম্পে থাকছেন না ‘ট্যাগ অফিসার’, তেল বিতরণে সেই বিশৃঙ্খলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে সামনে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে যুদ্ধবিরতির ওপর। যদি যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়, তাহলে পরিস্থিতি আবার খারাপ হতে পারে। তবে আপাতত মনে হচ্ছে যুদ্ধবিরতি অব্যাহত থাকতে পারে। তিনি বলেন, ‘আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এ সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান হবে এমনটা মনে হ
ইরানে হামলা পাল্টা হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ভয়াবহ সংকট তৈরি করেছে। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে স্বল্প ও মধ্যমআয়ের দেশগুলো। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও শিল্পের কাঁচামালের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় মূল্যস্ফীতি, সরবরাহ সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চাপ বাড়ছে। এমতাবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি সাময়িক স্থিতিশীল মনে হলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর হতে পারে।
আরও পড়ুন:
যুদ্ধের প্রভাবে টিকে থাকার লড়াইয়ে ক্ষুদ্র
‘আয় বন্ধ থাকলেও খরচ থেমে নেই, দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না’
পাম্পে থাকছেন না ‘ট্যাগ অফিসার’, তেল বিতরণে সেই বিশৃঙ্খলা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে সামনে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে যুদ্ধবিরতির ওপর। যদি যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়, তাহলে পরিস্থিতি আবার খারাপ হতে পারে। তবে আপাতত মনে হচ্ছে যুদ্ধবিরতি অব্যাহত থাকতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এ সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান হবে এমনটা মনে হয় না। বরং পরিস্থিতি আরও কিছুটা দীর্ঘায়িত হতে পারে।’
তার মতে, নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার অন্যতম শর্ত হতে পারে ইরানের ভেতরে বিভাজন তৈরি হওয়া, কিন্তু এখন পর্যন্ত সে ধরনের কোনো বিভক্তি দেখা যায়নি।
বরং সম্প্রতি হামলা ও পাল্টা হামলার পর ইরানের অভ্যন্তরে এবং প্রবাসীদের মধ্যেও ঐক্য আরও দৃশ্যমান হয়েছে। ইরানের পাল্টা সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনও অভ্যন্তরীণ বিভক্তি কমিয়েছে বলে মনে করেন তিনি। এই ঐক্য বজায় থাকলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ এতে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ক্ষতি আরও বাড়বে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলো হরমুজ প্রণালি। প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং ২৫ শতাংশের বেশি এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) এই রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ায় এই রুটে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বেড়েছে এবং অনেক বিমা কোম্পানি যুদ্ধ ঝুঁকির বিমা প্রত্যাহার করেছে। এর ফলে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিশ্ববাজারে দাম দ্রুত বাড়ছে। এরইমধ্যে লোহিত সাগর ও হরমুজ অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৃহৎ তেলবাহী ট্যাঙ্কারের ভাড়া প্রায় ৩২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি চার দশমিক সাত শতাংশ থেকে কমে দুই দশমিক পাঁচ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একইসঙ্গে জ্বালানি দামের উল্লম্ফনে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের নেতৃত্বে একটি কূটনৈতিক উদ্যোগে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে বৈঠকের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আংশিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি পূর্ণ সমাধানের নিশ্চয়তা নয় বরং সাময়িক উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টা মাত্র।
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, বাংলাদেশের উচিত এ পরিস্থিতি মাথায় রেখে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া। বিশেষ করে জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা (স্টোরেজ ক্যাপাসিটি) বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে বিকল্প জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
আরও পড়ুন:
উৎপাদন বন্ধ থাকলেও চালু ইস্টার্ন রিফাইনারির প্ল্যান্ট!
নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশে ভালো
তিনি বলেন, সোলার এনার্জি, ইলেকট্রিক যানবাহন ও আধুনিক প্রযুক্তি এরইমধ্যে বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। চীনের মতো দেশের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এসব প্রযুক্তি উৎপাদন করলে খরচ কমবে এবং নির্ভরশীলতাও কমবে। তার মতে, জ্বালানি খাতে বহুমুখীকরণ, মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর নির্বাহী পরিচালক এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পারভেজ করীম আব্বাসী জাগো নিউজকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আপাতত একটি বিরতি তৈরি হয়েছে এবং কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে এটি স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা নয়।
তিনি বলেন, ইসরায়েলের আগ্রাসী অবস্থান এখনো অব্যাহত রয়েছে। লেবাননে হামলা, দক্ষিণ লেবাননে বাফার জোন তৈরির চেষ্টা এবং হিজবুল্লাহসহ ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। ইরান বলছে, কোনো শান্তিচুক্তি হলে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা তার পূর্বশর্ত।
এই যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাব ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো জোটেও বিভাজন সৃষ্টি করছে।
পারভেজ করিম বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সক্ষমতা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, তেল-গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে এবং ইউরিয়া, হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের মতো কাঁচামালের ঘাটতি বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, উচ্চ দামে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে, ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে। যুদ্ধ শেষ হলেও হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপ হলে জ্বালানি আমদানি খরচ আরও বাড়বে।
কৃষি ও রপ্তানি খাতেও বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইউরিয়া ও ডিজেল সংকট খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে, অন্যদিকে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের বিকল্প রুট ব্যবহারে পরিবহন খরচ ও বিমা প্রিমিয়াম বেড়ে যাচ্ছে, যা রপ্তানি প্রতিযোগিতাকে দুর্বল করছে।
আরও পড়ুন:
শান্তি আলোচনা, ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের প্রতিনিধিদল
ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন জেডি ভ্যান্স
পারভেজ করিম আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমে গেছে এবং অনেক প্রযুক্তি কোম্পানি কার্যক্রম সীমিত করেছে। এর ফলে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমানো জরুরি। নেপাল-ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানি, ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন ব্যবহার এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
পারভেজ করিমের মতে, হাইড্রোকার্বন অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি।
তিনি সতর্ক করে আরও বলেন, জ্বালানি সরবরাহে নির্ভরযোগ্য অংশীদার নিশ্চিত না করলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
এদিকে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনা শনিবার (১১ এপ্রিল) ইসলামাবাদে শুরু হচ্ছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা এরইমধ্যে ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন। এখন দেখার বিষয় তারা কী ধরনের সমাধান চান নাকি সংঘাত অব্যাহত থাকবে?
জেপিআই/এসএনআর/এএসএম
What's Your Reaction?