ঈদুল আজহা কী ও মুসলমানরা কেন কোরবানি করে? যা বললেন মুফতি মেনক

মুসলমানদের জন্য বাৎসরিক বড় দুটি উৎসব রয়েছে যা ‘ঈদ’ নামে পরিচিত। এই আনন্দঘন দিনগুলো সব সময় আসে একটি বড় ত্যাগ, উৎসর্গ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিশেষ কোনো ইবাদত সম্পন্ন করার পর। যেমন প্রথম ঈদটি হলো ‘ঈদুল ফিতর’। হিজরি চন্দ্রবর্ষের নবম মাস অর্থাৎ পবিত্র রমজান মাসের শেষে এই ঈদ আসে। পুরো মাস জুড়ে মুসলমানরা রোজা রাখেন; আল্লাহর উদ্দেশ্যে দিনের আলোয় খাবার, পানি এবং বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা এবং নিজের ভেতর আত্মনিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা তৈরি করা। কারণ, ইসলাম মূলত শৃঙ্খলাই শিক্ষা দেয়। মাসব্যাপী এই আত্মশুদ্ধি এবং রোজা রাখার মাধ্যমে স্বাস্থ্যের উন্নতির পর, পুরস্কারস্বরূপ আল্লাহ তায়ালা আমাদের ঈদুল ফিতরের দিনটি দান করেছেন। অনুরূপভাবে, হিজরি চন্দ্রবর্ষের দ্বাদশ ও শেষ মাস অর্থাৎ ‘জিলহজ’ মাসেও একটি বড় উৎসব আসে। এই মাসের ১ তারিখ থেকে শুরু করে ৯ বা ১০ তারিখ পর্যন্ত মুসলমানদের অতিরিক্ত ইবাদত-বন্দেগিতে মগ্ন থাকার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, জিলহজের প্রথম দশ দিনের ইবাদত আল্লাহর কাছে বছরের অন্য যে কোনো দিনের ইবাদ

ঈদুল আজহা কী ও মুসলমানরা কেন কোরবানি করে? যা বললেন মুফতি মেনক

মুসলমানদের জন্য বাৎসরিক বড় দুটি উৎসব রয়েছে যা ‘ঈদ’ নামে পরিচিত। এই আনন্দঘন দিনগুলো সব সময় আসে একটি বড় ত্যাগ, উৎসর্গ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিশেষ কোনো ইবাদত সম্পন্ন করার পর। যেমন প্রথম ঈদটি হলো ‘ঈদুল ফিতর’। হিজরি চন্দ্রবর্ষের নবম মাস অর্থাৎ পবিত্র রমজান মাসের শেষে এই ঈদ আসে। পুরো মাস জুড়ে মুসলমানরা রোজা রাখেন; আল্লাহর উদ্দেশ্যে দিনের আলোয় খাবার, পানি এবং বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা এবং নিজের ভেতর আত্মনিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা তৈরি করা। কারণ, ইসলাম মূলত শৃঙ্খলাই শিক্ষা দেয়। মাসব্যাপী এই আত্মশুদ্ধি এবং রোজা রাখার মাধ্যমে স্বাস্থ্যের উন্নতির পর, পুরস্কারস্বরূপ আল্লাহ তায়ালা আমাদের ঈদুল ফিতরের দিনটি দান করেছেন।

অনুরূপভাবে, হিজরি চন্দ্রবর্ষের দ্বাদশ ও শেষ মাস অর্থাৎ ‘জিলহজ’ মাসেও একটি বড় উৎসব আসে। এই মাসের ১ তারিখ থেকে শুরু করে ৯ বা ১০ তারিখ পর্যন্ত মুসলমানদের অতিরিক্ত ইবাদত-বন্দেগিতে মগ্ন থাকার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, জিলহজের প্রথম দশ দিনের ইবাদত আল্লাহর কাছে বছরের অন্য যে কোনো দিনের ইবাদতের চেয়ে বেশি প্রিয়। এ দিনগুলোতে নফল রোজা, নামাজ ও জিকিরের বিশেষ ফজিলত আছে। নয় দিন ইবাদত করার পর দশম দিন উদযাপিত হয় ঈদুল আজহা।

ঈদুল আজহার কোরবানির সঙ্গে জড়িয়ে আছে হজরত ইব্রাহিমের (আ.) মহাত্যাগের ইতিহাস। আল্লাহর নির্দেশে তিনি তাঁর প্রিয় পুত্রকে কোরবানি করতে উদ্যত হয়েছিলেন। ইবরাহিম (আ.) ছিলেন আল্লাহর বহু নবী-রাসুলের পিতা (ইবরাহিমের (আ.) বংশধরদের মধ্যে অনেকেই আল্লাহ তাআলার নবী হয়েছিলেন, আমাদের নবী (সা.) তাদের অন্যতম) ও খলিলুল্লাহ বা আল্লাহর বন্ধু। তিনি মক্কায় আল্লাহর ইবাদতের জন্য পবিত্র কাবা ঘর নির্মাণ করেছিলেন।

ইবরাহিম জীবনের এক পর্যায়ে তিনি স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁর প্রিয়তম পুত্রকে কোরবানি করার ঐশী নির্দেশ পান। এই নির্দেশের পেছনে আমাদের সবার জন্য এক মহান শিক্ষা লুকিয়ে ছিল—তা হলো, যে কোনো কিছুর উর্ধ্বে সর্বশক্তিমান আল্লাহর আদেশ ও আনুগত্যকে স্থান দেওয়া। দুনিয়ার কোনো কিছুর প্রতি অতিরিক্ত বা অন্ধ মোহ কখনো কখনো মানুষের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। তা সন্তান, স্ত্রী বা যে কোনো পার্থিব সম্পদই হোক না কেন—ভালোবাসা যখন সীমা অতিক্রম করে, তখন তা মানুষের মনস্তত্ত্বকে দুর্বল করে দেয়। ফলে ভাগ্যের লিখন বা মৃত্যুর কারণে সেই প্রিয় বস্তুকে হারালে মানুষ পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং নিজের বা অন্যের ক্ষতি করে বসে। আল্লাহ আমাদের শেখাচ্ছেন যে, জীবনের চূড়ান্ত মালিকানা কেবল তাঁরই। ইবরাহিম (আ.) যখন তাঁর পুত্রকে স্বপ্নের কথা জানালেন, পুত্র ইসমাইল (আ.) সানন্দে উত্তর দিলেন, ‘বাবা! আপনাকে যা নির্দেশ করা হয়েছে তা-ই করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের কখনো লজ্জিত করবেন না।’

ইবরাহিম (আ.) যখন পুত্রকে শোয়ানোর পর আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে যাবেন, ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহ তায়ালা জান্নাত থেকে একটি দুম্বা পাঠিয়ে পুত্রের স্থানে রেখে দিলেন। এটি ছিল আল্লাহর প্রতি মানুষের চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আল্লাহ তাআলা ইবরাহিমের (আ.) এই আত্মসমর্পণকে এত বেশি ভালোবেসেছেন যে, পরবর্তী সমস্ত প্রজন্মের জন্য এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করাকে ইবাদত হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনের ঘোষণা অনুযায়ী কোরবানির পশুর মাংস বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, বরং মানুষের ভেতরের তাকওয়া বা খোদাভীতিটুকুই কেবল আল্লাহর দরবারে কবুল হয়।

এই ত্যাগের মহিমাকে ধারণ করে জিলহজ মাসের দশম দিনে ‘ঈদুল আজহা’ উদযাপিত হয়, যা পরবর্তী তিন দিন পর্যন্ত জারি থাকে। এই ঈদের অন্যতম মূল আমল হলো, কোরবানির পশুর মাংস দান করার মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র ও অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো। ইসলাম আমাদের উৎসাহ দেয় কোরবানির মাংসকে তিন ভাগে ভাগ করতে—এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের জন্য রাখতে, বাকি এক ভাগ দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দিতে।

ইসলামের প্রতিটি বিধান ও আমলের মূল লক্ষ্য মূলত দুটি:

  • ১. নিজের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ককে উন্নত করা।
  • ২. আল্লাহর সৃষ্টিজগতের অন্য সব কিছুর সাথে (মানুষ, প্রকৃতি ও অন্যান্য জীব) সুসম্পর্ক স্থাপন করা ও সুন্দর আচরণ করা।

আজকের পৃথিবীতে কিছু মানুষ নিজের ধর্ম, বর্ণ বা জাতিসত্তার বাইরে অন্য ধর্ম, বর্ণ বা জাতিসত্তার মানুষের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করে থাকে। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো, আদর্শ বা বিশ্বাসের ভিন্নতা থাকলেও আমরা সবাই হজরত আদম ও হাওয়ার (আ.) সন্তান হিসেবে একে অপরের ভাই ও বোন। কোনো মানুষ যদি ইসলামের বিশ্বাস নাও ধারণ করে, তবুও মানবতার খাতিরে একজন মানুষ হিসেবে তাকে সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। মতের অমিল থাকলেও মার্জিত, সুন্দর ও সম্মানজনক উপায়ে নিজের মতামত অন্যের কাছে তুলে ধরা উচিত, কাউকে গালিগালাজ বা আক্রমণ করে নয়। বর্তমান পৃথিবীতে এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের বড় অভাব।

পবিত্র ঈদুল আজহার এই বরকতময় উৎসবটি আমাদের মাঝে আত্মোপলব্ধি, ত্যাগ, ইবাদত এবং গরিব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরি করুক। এই ঈদ যেন একদিকে আমাদের সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্ককে মজবুত করে এবং অন্যদিকে আল্লাহর তৈরি বাকি সমস্ত সৃষ্টির সাথে ভালোবাসার বন্ধন গভীর করতে সাহায্য করে। আমিন।

সূত্র: লেখাটি বিশ্বখ্যাত মুফতি ইসমাইল মেনকের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত তার "What is Eid ul Adha and why do Muslims Sacrifice?" শীর্ষক বক্তব্য অবলম্বনে রচিত।

ওএফএফ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow