ঈদ হলো ভ্রাতৃত্বের বন্ধন, সহমর্মিতার উজ্জ্বল প্রকাশ। ঈদ মানে ধনী-গরিবের বিভেদ ভুলে সুখ-দুখ ভাগাভাগির দিন। পবিত্র এই উৎসব আসে আনন্দের বার্তা নিয়ে। ভোরের সোনালি রবির মতো চারধারে ছড়িয়ে দেয় ভালোবাসার কিরণ। মূলত, আনন্দ-উল্লাস আল্লাহ প্রদত্ত মানবিক বৈশিষ্ট্য। এ-বৈশিষ্ট্য ছাড়া মানুষের জীবন সুস্থ-স্বাভাবিক থাকতে পারে না।
ইসলাম যেহেতু মানবিক ও চিরন্তন ধর্ম, তাই বলার অবকাশ রাখে না—সুমহান এ-ধর্ম মানবিক এ বৈশিষ্ট্যকে শুধু ইতিবাচক হিসেবে দেখে না; বরং উৎসাহিতও করে। কুরআন-সুন্নাহ ও ইতিহাসে এর অসংখ্য প্রমাণ ও দৃষ্টান্ত বিদ্যমান।
তবে, ইসলামের অনুসারীদের যেহেতু নির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ রয়েছে এবং রয়েছে ভালো-মন্দ ও দেনা-পাওনার হিসাব, তাই আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের লাগামহীন ছেড়ে দেননি; বরং বছরের অন্যান্য দিন ও কাজের মতো ঈদের আনন্দ প্রকাশেও বেঁধে দিয়েছেন সুনির্দিষ্ট বিধিনিষেধ। বলেছেন, তোমরা আল্লাহর রশি (বিধিবিধান) আঁকড়ে ধরো। (সুরা আলে-ইমরান: ১০৩)
কালবেলার পাঠকদের জন্য এখানে পবিত্র ঈদুল আজহার দিনে কিছু করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় আলোচনা করা হলো—
যা করবেন ঈদের দিনে
১. ঈদের রাতে ইবাদত ও মোনাজাত
ঈদের রাত বিশেষ ফজিলতপূর্ণ। তাই এ রাতে বেশি-বেশি ইবাদত করুন। নামাজ, জিকির ও কোরআন তেলাওয়াত করুন এবং দোয়ায় মগ্ন থাকুন। প্রাণ খুলে আল্লাহর কাছে মনের যাচনাগুলো পেশ করুন। হাদিসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণিত, ৫টি রাত আছে এমন—সে রাতগুলোতে আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়া হলে তিনি পূরণ করেন। এই রাতগুলোর মধ্যে থেকে দুই ঈদের রাত অন্যতম। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক: ৭৯২৭)
২. ভোরে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠা
রাতভর ইবাদত করে যেন ফজর কাজা না-হয়ে যায়, তাই ফজর আদায়ে বিশেষ গুরুত্ব দিন। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি জামাতের সাথে এশার নামাজ আদায় করে, সে অর্ধ রাত নফল নামাজ আদায়ের সওয়াব পায়। আর যে ব্যক্তি ফজর আদায় করল জামাতের সাথে, সে পূর্ণ রাত নফল নামাজ আদায়ের সওয়াব পায়।’ (সহিহ মুসলিম: ৬৫৬)
প্রয়োজনে রাতে দ্রুত ঘুমিয়ে শেষ রাতে উঠুন। তাহাজ্জুদ পড়ুন। ঈদের ভোরে দ্রুত ঘুম থেকে উঠে, মহল্লার মসজিদে ফজর পড়া মোস্তাহাব। (আল-ফিকহুল মুয়াসসার: সালাতুল ঈদ অধ্যায়)
৩. মেসওয়াক, গোসল, সুগন্ধি ব্যবহার ও ভালো পোশাক পরিধান
মেসওয়াক, পরিচ্ছন্নতা ও সুগন্ধি ব্যবহার—একজন আদর্শ মুসলিমের দৈনন্দিন অভ্যাস। তবে ঈদের ভোরে এসবের বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলত রয়েছে। রাসুল (সা.) এগুলো আদায়ে জোর দিতেন। সাহাবায়ে কেরামও পিছিয়ে থাকতেন না। হাদিসের ভাষ্য, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ঈদগাহে যাওয়ার আগে গোসল করতেন।’ (মুয়াত্তায়ে মালিক: ৪৮৮)
অন্য হাদিসে আছে, তিনি ভালোভাবে গোসল করতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন এবং সেরা পোশাক পরে ঈদের নামাজে যেতেন।’ (শরহুস সুন্নাহ: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩০২)
৪. উচ্চস্বরে তাকবির বলা
ঈদের দিনের অন্যতম সুন্নত হলো তাকবির পাঠ। ঈদুল আজহায় উচ্চস্বরে তাকবির বলতে বলতে ঈদগাহের দিকে যাওয়া সুস্পষ্ট এবং সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। জিলহজের প্রথম দশদিন (ঈদের দিনসহ) হজরত ইবনে উমর (রা.) ও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর তাকবিরের আওয়াজ শুনে তাদের সঙ্গে কণ্ঠ মেলাতো বাজারের অন্যরাও। মিনার দিনগুলোতে তাকবিরের সুরে মুখরিত হতো চারপাশ! মহিলারাও বলতো অনুচ্চস্বরে। (সহিহ বোখারি, ফাতহুল বারি: ২/৫৩০-৫৩৬)
৫. ঈদুল আজহার দিন খালি পেটে ঈদগাহে যাওয়া
ঈদুল আজহার আরেকটি সুন্নত হলো, ভোরে কিছু না-খেয়ে খালি পেটে ঈদগাহে যাওয়া। নামাজের পর কোরবানির পশুর গোশত দিয়ে খাবার শুরু করা। নবীজি (সা.) এমনটাই করতেন। (সুনানে তিরমিজি: ৫৪২)
৬. আনন্দ প্রকাশ করা
ঈদের দিন মন খারাপ করে থাকতে বারণ করা হয়েছে হাদিসে। এ দিন খুশির দিন, আনন্দ উদযাপন আর প্রাণ খুলে হাসার দিন। আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের জন্য দুই ঈদ নির্ধারণ করেছেন এজন্যই। প্রাক ইসলাম যুগে মদিনাবাসী বছরে দুদিন আনন্দ উদযাপন করত। দিন দুটির নাম তারা রেখেছিল ‘নওরোজ’ আর ‘মেহেরজান’। রাসুল (সা.) মদিনায় এসে যখন এ দৃশ্য দেখলেন—তিনি সাহাবিদের বললেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের এ দুইদিনের পরিবর্তে এরচেয়ে উত্তম দুটি দিন নির্ধারণ করেছেন। একটি ঈদুল ফিতর অপরটি ঈদুল আজহা। (সুনানে আবু দাউদ: ১১৩৪, সুনানে নাসায়ি: ১৫৫৫)
ঈদের দিন যা করবেন না
১. রোজা রাখা
দুই ঈদের কোনোটাতেই রোজা রাখা যাবে না। স্পষ্ট হাদিসের মাধ্যমে এ দিনগুলো রোজা রাখা হারাম করা হয়েছে (বোখারি: ১৯৯২)। একইসঙ্গে ঈদুল আজহার পরবর্তী তিনদিন তথা ১১, ১২ ও ১৩ জিলহজও রোজা রাখা হারাম। (সহিহ মুসলিম: ১১৪১)
২. হিংসা-বিদ্বেষ এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা
এই আনন্দমুখর দিনে সমস্ত হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সহমর্মী হয়ে ওঠা ইমানের দাবি৷ হিংসা এক মারাত্মক ব্যাধি। এটি মনের ভেতর লালন করা হারাম এবং কবিরা গোনাহ। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘সাবধান! হিংসা থেকে দূরে থাকো। কারণ, হিংসা নেককর্ম এমনভাবে ধ্বংস করে দেয়, যেভাবে আগুন খড়ি বা খড়কুটো পুড়িয়ে ফেলে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯০৩)
৩. বাজি-পটকা ও জুয়া
সমাজে এ এক মহামারী। ঈদ এলেই বাজি-পটকা ফোটানো এবং নানারকম জুয়া খেলার হুল্লোড় পরে যায় চারপাশে। কোরআনে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এসেছে জুয়ার ব্যাপারে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ—এসবই শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং তোমরা এগুলো বর্জন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা মায়েদা: ৯০)
বাজি-পটকা হারাম মূলত অপচয়ের কারণে। আল্লাহ তায়ালা সুরা বনি-ইসরাইলের ২৭ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ।’
পবিত্র এই দিনে আনন্দের বন্যা বয়ে যাক চারধারে। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সমাজের প্রতিটা মানুষের ঠাঁই হোক এক কাতারে, একই সারিতে। রাসুলের আদর্শে বিভাসিত হোক পবিত্র এই দিন। পাপ ও অনাচার মুক্ত হোক জীবন।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী