ঈদে গাজীপুর-নরসিংদীর ঘরে ঘরে ‘ফুল পিঠা’র সুবাস

সাব্বির হোসাইন ঈদ মানেই আনন্দ, আর গাজীপুর ও নরসিংদী অঞ্চলে এই আনন্দের বড় একটি অংশ জুড়ে থাকে ‘ফুল পিঠা’। শত বছরের ঐতিহ্য, নিপুণ হাতের ছোঁয়া আর গ্রামীণ সংস্কৃতির মেলবন্ধনে তৈরি এই নকশি পিঠা ছাড়া এই অঞ্চলের মানুষের ঈদের আপ্যায়ন যেন অপূর্ণই থেকে যায়। ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই গ্রামের বাড়িগুলোতে শুরু হয় এই পিঠা তৈরির প্রস্তুতি। পরিবারের নারী সদস্যরা একসঙ্গে বসে পিঠা বানানোর আয়োজন করেন, যা শুধু খাবার প্রস্তুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি পারিবারিক বন্ধন ও সংস্কৃতিরও এক অনন্য প্রকাশ। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে নারীদের শিল্পচর্চার সুযোগ সীমিত থাকায় তারা চালের আটা আর খেজুরের কাঁটাকেই বানিয়েছিলেন প্রতিভার হাতিয়ার। মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা আবেগ, সৃজনশীলতা ও শিল্পবোধ তারা ফুটিয়ে তুলতে শুরু করেন পিঠার গায়ে। ধীরে ধীরে এটি একটি লোকশিল্পে পরিণত হয় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। অঞ্চলভেদে এই পিঠার নকশায় রয়েছে বৈচিত্র্য। শাপলা বাহার, গোলাপ বাহার, কদম ফুল, মোরগ ঝুঁটি কিংবা ‘জামাই সুখ’ বাহারি সব নামে ডাকা হয় এদের। প্রতিটি নকশার পেছনে রয়েছে আলাদা সৌন্দর্য ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য। এই পিঠা তৈরির প্র

ঈদে গাজীপুর-নরসিংদীর ঘরে ঘরে ‘ফুল পিঠা’র সুবাস

সাব্বির হোসাইন

ঈদ মানেই আনন্দ, আর গাজীপুর ও নরসিংদী অঞ্চলে এই আনন্দের বড় একটি অংশ জুড়ে থাকে ‘ফুল পিঠা’। শত বছরের ঐতিহ্য, নিপুণ হাতের ছোঁয়া আর গ্রামীণ সংস্কৃতির মেলবন্ধনে তৈরি এই নকশি পিঠা ছাড়া এই অঞ্চলের মানুষের ঈদের আপ্যায়ন যেন অপূর্ণই থেকে যায়।

ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই গ্রামের বাড়িগুলোতে শুরু হয় এই পিঠা তৈরির প্রস্তুতি। পরিবারের নারী সদস্যরা একসঙ্গে বসে পিঠা বানানোর আয়োজন করেন, যা শুধু খাবার প্রস্তুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি পারিবারিক বন্ধন ও সংস্কৃতিরও এক অনন্য প্রকাশ।

JAGONEWSইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে নারীদের শিল্পচর্চার সুযোগ সীমিত থাকায় তারা চালের আটা আর খেজুরের কাঁটাকেই বানিয়েছিলেন প্রতিভার হাতিয়ার। মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা আবেগ, সৃজনশীলতা ও শিল্পবোধ তারা ফুটিয়ে তুলতে শুরু করেন পিঠার গায়ে। ধীরে ধীরে এটি একটি লোকশিল্পে পরিণত হয় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। অঞ্চলভেদে এই পিঠার নকশায় রয়েছে বৈচিত্র্য। শাপলা বাহার, গোলাপ বাহার, কদম ফুল, মোরগ ঝুঁটি কিংবা ‘জামাই সুখ’ বাহারি সব নামে ডাকা হয় এদের। প্রতিটি নকশার পেছনে রয়েছে আলাদা সৌন্দর্য ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য।

এই পিঠা তৈরির প্রক্রিয়াটিও বেশ ধৈর্যের। প্রথমে নতুন চালের গুঁড়া সেদ্ধ করে মসৃণ কাই (ডো) তৈরি করা হয়। এরপর স্টিলের থালায় রেখে খেজুরের কাঁটা বা সুচালো কাঠি দিয়ে পরম যত্নে আঁকা হয় নান্দনিক নকশা। একটি পিঠায় নিখুঁত নকশা ফুটিয়ে তুলতে অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যায়। প্রথমে পিঠাগুলো ডুবো তেলে হালকা ভেজে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। পরে ঈদের দিনে আরেকবার কড়া করে ভেজে, ডুবানো হয় নলেন গুড়ের রসে। ফলে পিঠা হয়ে ওঠে মুচমুচে, সুস্বাদু ও সুগন্ধি।

JAGONEWSএকসময় এই ফুল পিঠা শুধু বাড়ির সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনদের আপ্যায়নের জন্য তৈরি হলেও বর্তমানে এর জনপ্রিয়তা অনেক বেড়েছে। ঈদকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় বসে ফুল পিঠার অস্থায়ী বাজার। অনেক নারী উদ্যোক্তা এখন এই পিঠা তৈরি ও বিক্রির মাধ্যমে বাড়তি আয় করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষও এই ঐতিহ্যবাহী পিঠার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন।

আধুনিকতার ভিড়েও গাজীপুর ও নরসিংদীর ঘরে ঘরে আজও ঐতিহ্যের এই পিঠা তৈরির ধুম পড়ে। গ্রামীণ নারীদের হাত ধরে বেঁচে থাকা এই লোকশিল্পের সুনাম এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। শুধু একটি খাবার নয়, ফুল পিঠা এই অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি, পারিবারিক ঐতিহ্য ও নারীদের সৃজনশীলতার এক জীবন্ত প্রতীক। তাই ঈদের আনন্দে আজও ফুল পিঠা হয়ে আছে গাজীপুর ও নরসিংদীর মানুষের আবেগ, ঐতিহ্য ও আতিথেয়তার অন্যতম অনুষঙ্গ।

লেখক: শিক্ষার্থী,তা'মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা টঙ্গী

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow