একটি সাধারণ স্কেচ যখন প্রাণ পেয়ে কথা বলে ওঠে, আর নিছক কিছু পিক্সেল যখন দর্শকদের হাসায় কিংবা কান্নায় ভাসায়—ঠিক তখনই সার্থক হয় একজন অ্যানিমেটরের নিপুণ কারিগরি।
অনেকেই মনে করেন এনিমেশন মানেই কেবল শিশুদের রঙিন জগত। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে এই ধারণা এখন ইতিহাস! অ্যানিমেশন আজ সব বয়সী মানুষের বিনোদনের প্রধান খোরাক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এ আই এর জাদুকরী ছোঁয়া থেকে শুরু করে ২ডি ও ৩ডি-র এক অভাবনীয় ফিউশন, সব মিলিয়ে অ্যানিমেশন ইন্ডাস্ট্রি এখন পার করছে তার ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তেজনাকর সময়।
গত এক দশকে এই ঘরানার চলচ্চিত্রগুলো জনপ্রিয়তায় হার মানিয়েছে বড় বড় লাইভ-অ্যাকশন সিনেমাকেও। তাই এবারের ঈদের ছুটিতে অ্যানিমে-প্রেমীদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিতে আজকের আয়োজনে থাকছে জনপ্রিয় ৪ সিনেমার গল্প। লিখেছেন: তামজিদ হোসেন।
মাই ফাদার্স ড্রাগন
রুথ স্টাইলস গ্যানেটের ক্লাসিক শিশুতোষ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র ‘মাই ফাদার’স ড্রাগন’ যেন এক জীবন্ত ছবির বই। আইরিশ অ্যানিমেশন স্টুডিও কার্টুন সেলুনের এই ছবিটি মূলত ছোটদের জন্য তৈরি হলেও এর আবেদন বয়সের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। কোমল আবেগ, রঙিন কল্পনা আর গভীর মানবিক ভাবনা—সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে এক হৃদয়স্পর্শী অভিযানের গল্প।
চলচ্চিত্রটির পরিচালনায় রয়েছেন নোরা টুমি, যিনি এর আগে ‘দ্য ব্রেডউইনার’-এর মতো প্রশংসিত কাজ উপহার দিয়েছেন। আর চিত্রনাট্য লিখেছেন পিক্সারের ‘ইনসাইড আউট’-খ্যাত লেখক মেগ লে ফোভ। গল্পের কেন্দ্রে আছে ছোট্ট এক ছেলে—এলমার এলিভেটর। তার কণ্ঠ দিয়েছেন জেকব ট্রেম্বলে।
অভিবাসী মা–কে নিয়ে নতুন শহরে এসে যেন পুরো পৃথিবীটাই তার কাছে অচেনা হয়ে যায়। পুরোনো জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন বাস্তবতায় মানিয়ে নিতে গিয়ে সে ভীষণ অস্থির ও একাকী হয়ে পড়ে।
একসময় সেই অস্থিরতা তাকে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে বাধ্য করে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় তার এক আশ্চর্য অভিযাত্রা। পথে তার দেখা হয় এক মায়াবী ড্রাগন—বোরিসের সঙ্গে, যার কণ্ঠে প্রাণ এনেছেন গ্যাটেন মাতারাজ্জো।
এলমার পৌঁছে যায় এক বিস্ময়কর জায়গায়—‘ওয়াইল্ড আইল্যান্ড’। জীববৈচিত্র্যে ভরা এই দ্বীপে রয়েছে অদ্ভুত সব প্রাণী, রহস্য আর নানা মজার মুহূর্ত। গল্পের মাঝে মাঝে আছে শিশুসুলভ দুষ্টুমি, হাস্যরস, এমনকি কিছু মজার ‘ফার্ট জোক’-ও, যা ছোটদের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দেয়।
তবে শুধুই রূপকথার আনন্দ নয়, ছবিটি গভীর কিছু অনুভূতিকেও স্পর্শ করে। পরিবেশ রক্ষা, অভিবাসী জীবনের টানাপোড়েন, ভয়, উদ্বেগ ও বন্ধুত্ব—এই সব বিষয় গল্পের ভেতরে খুব স্বাভাবিকভাবে মিশে গেছে। নোরা টুমি তার নিপুণ নির্মাণশৈলীতে একটি সরল কাহিনিকে রূপ দিয়েছেন আবেগময় ও অর্থবহ এক যাত্রায়। এই সিনেমায় কণ্ঠাভিনয় করেছেন,
জ্যাকব ট্রেম্বলে, গ্যাটেন মাতারাজ্জো, গোলশিফতেহ ফারাহানি, ডায়ান উইয়েস্ট, রিটা মোরেনো এবং ক্রিস ও'ডাউড। ছবিটি ওটিটি প্লাটফর্ম নেটফ্লিক্সে দেখা যাবে।
ওরিয়ন অ্যান্ড দ্য ডার্ক
অস্তিত্ববাদী ভাবনা আর শিশুতোষ কল্পনার এক অদ্ভুত মিশ্রণ নিয়ে হাজির হয়েছে অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র ‘ওরিয়ন অ্যান্ড দ্য ডার্ক’। যদি চার্লি কাফম্যানের দার্শনিক প্রশ্ন আর অস্বস্তিকর বাস্তবতার অনুভূতি ঢুকে পড়ে শিশুদের এক সরল গল্পে—তাহলে কেমন হতে পারে সেই অভিজ্ঞতা? এই ছবিটি যেন সেই প্রশ্নেরই উত্তর।
প্রিয় শিশুতোষ লেখক এমা ইয়ারলেটের জনপ্রিয় বই অবলম্বনে নির্মিত এই অ্যানিমেশনটির চিত্রনাট্য লিখেছেন চার্লি কাফম্যান। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে ছোট্ট ছেলে ওরিয়ন, যার কণ্ঠ দিয়েছেন জ্যাকব ট্রেম্বলে। বাইরে থেকে সে অন্য সাধারণ শিশুদের মতোই, কিন্তু তার মনে বাসা বেঁধে আছে অসংখ্য ভয় আর দুশ্চিন্তা। বিশেষ করে অন্ধকার তাকে ভীষণভাবে আতঙ্কিত করে।
তবে গল্পে আসে অদ্ভুত এক মোড়। এক রাতে সেই অন্ধকারই যেন জীবন্ত হয়ে ওরিয়নের সামনে হাজির হয়—এক মানবিক রূপে। সেই চরিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন পল ওয়াল্টার হাউসার। শুরু হয় ভয়কে বোঝা এবং তাকে মোকাবিলা করার এক অদ্ভুত যাত্রা।
প্রথমবারের মতো পরিচালকের আসনে বসে শান চারম্যাটজ ছবিটিকে এগিয়ে নিয়েছেন দারুণ দক্ষতায়। এই পারিবারিক অ্যানিমেশনে শিশুদের সরল কল্পনা আর বড়দের দার্শনিক ভাবনা একসঙ্গে মিলেছে। এমনকি সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য রয়েছে ডেভিড ফস্টার ওয়ালেসের বিখ্যাত উপন্যাস ‘ইনফিনিট জেস্ট’-এর একটি চমকপ্রদ উল্লেখও।
মাত্র চল্লিশ পৃষ্ঠার একটি বই থেকে শুরু হলেও সিনেমাটি কল্পনা ও ভিজ্যুয়ালের বিস্তারে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে ‘ওরিয়ন অ্যান্ড দ্য ডার্ক’ প্রমাণ করে—শিশুদের গল্পেও গভীর চিন্তার জায়গা তৈরি করা সম্ভব।
যাদের কণ্ঠাভিনয় গল্পের আবেগ ও হাস্যরসকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে, তারা হলেন, জ্যাকব ট্রেম্বলে, পল ওয়াল্টার হাউসার, কলিন হ্যাঙ্কস, মিয়া আকেমি ব্রাউন, আইকে বারিনহোল্টজ ও কার্লা গুগিনো। ছবিটি দেখা যাবে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সে।
প্যাডিংটন ২
সবাই ভালোবাসে প্যাডিংটনকে। নির্মাতা পল কিং পরিচালিত ও মাইকেল বন্ড-এর জনপ্রিয় শিশুতোষ গল্প থেকে নির্মিত এই অবিশ্বাস্যরকম হৃদয়ছোঁয়া চলচ্চিত্রটি যেন নির্মল আনন্দের এক দারুণ উদাহরণ। ভীষণ পরিবারবান্ধব একটি গল্প নিয়ে তৈরি এই ছবিতে শিরোনাম চরিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন বেন হুইশাও। যিনি এক দুষ্টুমি-প্রিয় এবং মার্মালেডপ্রেমী পেরুভিয়ান ভালুক, যার সরলতা দর্শকের মন জয় করে নেয়।
বেশি অবাক করার বিষয় হলো, এর সিক্যুয়েল প্যাডিংটন ২ যেন প্রথম ছবির থেকেও আরও ভালো। এই ছবিতে নিজের স্বভাবসিদ্ধ আত্ম-বিদ্রূপাত্মক অভিনয়ে দারুণভাবে চমকে দিয়েছেন
হিউ গ্রান্ট (যিনি পরে আবার কিংয়ের সঙ্গে ওনকা -তে ওম্পা লুম্পা চরিত্রে কাজ করেন)।
এই সিক্যুয়েলে প্যাডিংটন এবং ব্রাউন পরিবার খুঁজতে বের হয় তার আন্টি লুসির চুরি হয়ে যাওয়া জন্মদিনের উপহার।
তাই আপনি যদি যান্ত্রিক জীবনের ভিড়ে একটুখানি বিশুদ্ধ আনন্দ আর বুকভরা উষ্ণতা খুঁজে পেতে চান, তবে প্যাডিংটন ২ হতে পারে আপনার জন্য সেরা চয়েস। এটি কেবল একটি সিনেমা নয়, বরং দয়ালু হওয়ার এক দারুণ অনুপ্রেরণা। পরিবারের সবাইকে নিয়ে আজই বসে পড়ুন এই জাদুকরী অভিযানে। সিনেমাটি ইতোমধ্যে নেটফ্লিক্সে স্ট্রিমিং হচ্ছে।
দ্য সী বিস্ট
দ্য সী বিস্ট-এর মাধ্যমে একক পরিচালক হিসেবে দারুণ দক্ষতা দেখিয়েছেন ক্রিস উইলিয়ামস। এর আগে তিনি বিগ হিরো ৬ এবং বোল্ট সিনেমায় সহ-পরিচালনা করেছিলেন। দ্য সী বিস্ট মূলত পুরোনো ধাঁচের এক রোমাঞ্চকর সমুদ্রযাত্রার গল্প, কিন্তু তার ভেতরে রয়েছে একেবারেই নতুন ভাবনা।
এই সোর্ড-ঝলসানো, সমুদ্রভিত্তিক অ্যানিমেটেড অ্যাডভেঞ্চারটি একদিকে যেমন মোয়ানা এবং হাউ টু ট্রেইন ইয়োর ড্রাগন এর কথা মনে করিয়ে দেয়, তেমনি আবার নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যও বজায় রাখে। চলচ্চিত্রটি কেবল তার চমৎকার ও সূক্ষ্ম অ্যানিমেশনের জন্যই নয়, বরং আমাদের বর্তমান বিশ্বের নানা প্রশ্ন ও বাস্তবতা নিয়ে যে বার্তা দেয় তার জন্যও সমানভাবে প্রশংসনীয়।
গল্পে কিংবদন্তি দানব-শিকারি জ্যাকব হল্যান্ড চরিত্রে দারুণ প্রাণবন্ত অভিনয় করেছেন কার্ল আরবান। এক দানব শিকারের অভিযানে তার সঙ্গে যোগ দেয় দুষ্টু, কৌতূহলী এক কিশোরী স্টোঅ্যাওয়ে মেইজি, যার কণ্ঠ দিয়েছেন জ্যারিস-অ্যাঞ্জেল হ্যাটর। তাদের এই অভিযানের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে প্রশ্ন উঠতে থাকে—আসলে তাদের পৃথিবীতে সত্যিকারের দানব কারা?
চলচ্চিত্রের নামধারী লাল রঙের দানব ‘রেড’ অসাধারণ প্রাণী-নকশা ও সিজি কম্পোজিশনের এক বিস্ময়, যা শিশুদের হৃদয় সহজেই জয় করবে। তবে এর পাশাপাশি ঔপনিবেশিক ইতিহাসের শিকড় নিয়ে সাহসীভাবে প্রশ্ন তোলার যে প্রচেষ্টা দেখা যায়, তা শিশুদের কল্পনাকে যেমন স্পর্শ করে, তেমনি তাদের চিন্তাভাবনাকেও উসকে দেয়। সিনেমাটি দেখতে পাবেন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সে।