উৎমা ‘পাথর কোয়ারি’ এখন ‘ফুটবল মাঠ’

1 day ago 4

সিলেট শহর থেকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ বাজার। এরপর ভাটরাই হয়ে চড়ার বাজার পার হয়ে উৎমা পাথর কোয়ারি। ছোট ছোট বাঁকের রাস্তা পেরিয়ে পাথর কোয়ারির শেষ গন্তব্যে পৌঁছানোর একমাত্র ভরসা পায়ে হাঁটা অথবা মোটরসাইকেল।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার একেবারে শেষ প্রান্তে থাকা এ এলাকার নাম উৎমা পাথর কোয়ারি। সরকারিভাবে দীর্ঘদিন পাথর সংগ্রহ বন্ধ থাকায় এর সৌন্দর্য যেন বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। তবে সেসব এখন শুধুই ছবির দৃশ্য। সিলেটে একযোগে পাথর চুরির ঘটনায় বাদ যায়নি এই পাথর কোয়ারিও। পাথর তুলে এই কোয়ারির এমন অবস্থা করা হয়েছে যে দেখলে মনে হবে ধু ধু বালুর মাঠ। সেই মাঠেই এখন চলছে ফুটবল খেলার আয়োজন। স্থানীয় কিশোর-তরুণরা প্রতিদিন ফুটবল খেলায় মত্ত থাকছে।

মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। পাহাড়ের শেষ সীমান্তে কাঁটাতারের এ পারে বাংলাদেশ। মেঘালয় থেকে নেমে আসা পানির প্রবাহে সৃষ্টি উৎমাছড়া নদী। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য যেন পেখম মেলে বসেছে এখানে। পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির স্রোতের গর্জন আর বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে থাকা পাথরই এখানকার সৌন্দর্যের উৎস। সেই সৌন্দর্য ম্লান পাথরখেকোদের দাপটে।

সীমান্ত এলাকা দিয়ে যখন মাদক আসে, আমরা যখন ইনফরমেশন পাই তখন অভিযান হয়। এটা চলমান। জৈন্তাপুর, জাফলং বা কোম্পানীগঞ্জের সীমান্ত এলাকায় অভিযান হচ্ছে। মামলাও হচ্ছে। মোবাইল কোর্ট, টাস্কফোর্স অভিযান নিয়মিত চলছে।- মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সিলেট জেলার উপ-পরিচালক মলয় ভূষণ চক্রবর্তী

উৎমা পাথর কোয়ারি পর্যটন এলাকা হিসেবে বেশি পরিচিত নয়। তবে পর্যটকরা নিয়মিতই যান। গত ঈদের ছুটিতে একদল পর্যটক উৎমাছড়ায় গোসলে নামেন। স্থানীয় আলেমরা তখন সেই পর্যটকদের বাধা দেন। সে সময়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এ নিয়ে নানান সমালোচনাও তৈরি হয়। তবে লাভ হয়নি। দীর্ঘদিন স্থানীয়রা এ এলাকায় পর্যটক যেতে বাধা দেন। এতে পর্যটকরা আর ওই এলাকায় প্রবেশ করতে পারতো না। এ সুযোগই লুফে নেয় পাথরখেকোরা। সব পাথর লুট হয়ে যায় নিমিষে।

উৎমা ‘পাথর কোয়ারি’ এখন ‘ফুটবল মাঠ’

খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর (বিএমডি) তথ্য বলছে, উৎমা পাথর কোয়ারির বরমা সিদ্দিপুর মৌজা ৩৩ দশমিক ১৪ একর, বিজয় পাড়ুয়া ১৪৮ দশমিক ৬০ একর, বনপুর ৭৭ দশমিক ২৮ একর এবং লামাগ্রাম মৌজায় মোট পাথর কোয়ারির জমির পরিমাণ ৪৬ দশমিক ৮৭ একর। সব মিলিয়ে উৎমা পাথর কোয়ারির মোট জমির পরিমাণ ৩০৫ দশমিক ৮৯ একর।

সরেজমিনে পাথর কোয়ারি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কিছু পর্যটক আসায় নদীর পাড়ে ছোট ছোট চারটি দোকান বসেছে। স্থানীয়রা চকলেট, চিপসসহ বিভিন্ন খাবার এসব দোকানে বিক্রি করছেন। এসব দোকানি পাথরের বিষয়ে কথা বলতে নারাজ। পরিচয় গোপন করেও তাদের কাছ থেকে কিছু জানা যায়নি।

ছোট নদী পার হয়েই কয়েক একর জায়গা। পড়ন্ত বিকেলে স্থানীয় কিশোরদের সেখানে ফুটবল খেলতে দেখা যায়। অথচ এখানেই বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছিল পাথর। ভোলাগঞ্জে সাদা পাথর লুটের ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হলে গত ১৯ আগস্ট প্রশাসন এসে কিছু পাথর জব্দ করে। সেসব পাথর নদীর পাড়ে রাখা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের কথায়, কোয়ারির ভালো পাথর যা ছিল সব লুট করা হয়েছে। আর ‘মরা পাথর’ বা সেসব পাথর আসলে কোনো কাজে ব্যবহার করা যায় না সেগুলো ফেলে রাখা হয়েছে।

পাথর কোয়ারির পাশেই বিজিবির ক্যাম্প। সারাক্ষণ টহলে থাকেন বিজিবি সদস্যরা। এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে এসব পাথর লুট হলো সেটি এখন প্রশ্নের বিষয়।

উৎমা ‘পাথর কোয়ারি’ এখন ‘ফুটবল মাঠ’

এ বিষয়ে গত ২৩ আগস্ট সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার লালাখাল এলাকায় টহল কার্যক্রম শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ১৯ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জুবায়ের আনোয়ার বলেন, সিলেটে পাথর লুটপাটের ঘটনায় বিজিবির দায়িত্বে অবহেলা আছে কি না তা খতিয়ে দেখতে বিজিবির সদর দপ্তর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিত টাস্কফোর্সের অভিযান অধিক পরিমাণে চালানো হলে এত ব্যাপক লুটপাট হতো না।’

উৎমা পাথর কোয়ারি সম্পর্কে জানতে কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলার দায়িত্বে থাকা বিজিবি সিলেট-৪৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হককে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

কোম্পানীগঞ্জের সিএনজি অটোরিকশাচালক জহির বলেন, ‘পর্যটক ঢুকতে বাধা দিয়ে সব পাথর লুট করেছে। এখন আর ভালো কোনো পাথর নেই। লুটপাট করে সব শেষ। এসব এলাকায় পর্যটক আসতে ভয় পায়। বাইক এলে স্থানীয়রা তেল, লুকিং গ্লাস চুরি করে নিয়ে যায়। অনেক সময় মোবাইল, মানিব্যাগ কেড়ে নেয়। এরা খুব খারাপ। মাদক ব্যবসাও করে এসব এলাকার লোকজন।’

পাথর চুরি শেষে এখন পর্যটকরা অবাধে এই এলাকায় প্রবেশ করতে পারছেন। সেদিন বেশ কিছু পর্যটকের দেখাও মিললো। ঢাকা থেকে যাওয়া পর্যটক সিফাত কায়েস বলেন, ‘আমরা ছয় বন্ধু মিলে ঘুরতে এসেছি। এখানকার ভিডিও ফেসবুকে দেখে এলাম। জায়গাটা আগে সুন্দর ছিল, অনেক পাথর ছিল। এখন তো দেখি পাথরই নেই।’

উৎমা ‘পাথর কোয়ারি’ এখন ‘ফুটবল মাঠ’

মাদকের হটস্পট, অবাধে চলে বিক্রি

উৎমা পাথর কোয়ারির আশপাশে পর্যটকদের দেখলে ইশারায় হাত দিয়ে কিছু বোঝাতে চান স্থানীয় কিছু যুবক। জাগো নিউজের এই প্রতিবেদকও এমন পরিস্থিতিতে পড়েন। হাফ প্যান্ট আর টি-শার্ট পরা এক যুবক জিজ্ঞাস করেন, ‘মাল লাগবে নাকি?’
উত্তরে, ‘কী মাল আছে?’ প্রশ্ন করলে তিনি- কী চাই জানতে চান। কিছুক্ষণ কথোপকথনের পর নদীর পাড়ে কিছুটা ঝোপ-জঙ্গল থেকে মদ, ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য বের করে আনেন। এই যুবকের ভাষ্য, ‘দামে সস্তা, ঢাকার অর্ধেকেরও কম দাম। নিয়ে নেন। একটু আনন্দ-মাস্তি করে যান।’

এসব কথোপকথনের মধ্যে আরও চার থেকে পাঁচজন কাছাকাছি বয়সের যুবক ঘিরে ধরেন। তারা জানান, ভারত থেকে সীমান্ত দিয়ে এসব মাদকদ্রব্য আনা হয়। পরে কিছুটা নিরাপত্তা শঙ্কায় ওই স্থান ত্যাগ করা হয়।

কয়েকজন পর্যটক জানান, তারাও এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। সবার চোখের সামনে মাদক কেনার জন্য তাদের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আশরাফুল নামে এক পর্যটক বলেন, ‘আমরা ঘুরতে এসেছি। আমাদের বলে ভাই মাদক লাগবে নাকি। এরপর বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদের বোতল দেখায়। যখন বললাম নেবো না, তখন কিছুটা চড়াও হয় তারা। পরে কোনোরকম স্যরি বলে ফিরে এসেছি।’

এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সিলেট জেলার উপ-পরিচালক মলয় ভূষণ চক্রবর্তী জাগো নিউজকে বলেন, ‘সীমান্ত এলাকা দিয়ে যখন মাদক আসে, আমরা যখন ইনফরমেশন পাই তখন অভিযান হয়। এটা চলমান। জৈন্তাপুর, জাফলং বা কোম্পানীগঞ্জের সীমান্ত এলাকায় অভিযান হচ্ছে। মামলাও হচ্ছে। মোবাইল কোর্ট, টাস্কফোর্স অভিযান নিয়মিত চলছে।’

উৎমা ‘পাথর কোয়ারি’ এখন ‘ফুটবল মাঠ’

মাদক সরবরাহ বন্ধ কেন হচ্ছে না— এমন প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা অভিযান পরিচালনা করছি নিয়মিত যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য। দেখা যায় সীমান্ত দিয়ে মাদক নিয়ে ঢুকলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে মামলা করি। আবার অন্য কেউ নিয়ে আসছে। কিন্তু অভিযান হচ্ছে।’

২০২০ সালের আগে সংরক্ষিত এলাকা বাদে সিলেটের আটটি কোয়ারি ইজারা দিয়ে পাথর উত্তোলনের সুযোগ দিতো খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি)। তবে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতির কারণে ২০২০ সালের পর আর পাথর কোয়ারি ইজারা দেওয়া হয়নি। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একযোগে শুরু হয় পাথর লুট। ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর লুটের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে আলোচনায় এলেও অন্য পাথর কোয়ারির লুট হওয়া পাথর নিয়ে তেমন আলোচনা দেখা যায়নি।

উৎমা ছড়ার পাথর ও মাদক নিয়ে জানতে চাইলে সিলেটের নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘সীমান্ত এলাকা তো… এখানে অনেকগুলো ইস্যু আছে। দেখি আমরা কতটুকু কি করতে পারি।’

এনএস/এএসএ/এমএফএ/এএসএম

Read Entire Article