এই যুদ্ধ প্রাচীন যুগকেও হার মানিয়েছে
পৃথিবীর ইতিহাসে আজ অবধি দেখা যায়নি, কোনো শান্তি আলোচনায় বসে, দুপক্ষের মধ্যে সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছে হঠাৎ একপক্ষ আক্রমণ করে বসল! অথচ ইরানের সঙ্গে গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধ এবং এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধে ইরানের বিরুদ্ধে তাই করল যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল! যুদ্ধের জন্য কোন পক্ষ দায়ী, কারা জয়ী হবে সে আলোচনা নয়, বরং যুদ্ধের চরিত্র কতটা নষ্ট হয়েছে সেটাই বড় আকারে বিশ্ববাসীকে ভাবিয়ে তুলছে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে যুদ্ধ কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা না। যুদ্ধ একটি নির্মম বাস্তবতা। রাষ্ট্রের ক্ষমতা বিস্তার, ভূখণ্ড রক্ষা, ধর্মীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠা কিংবা রাজনৈতিক আধিপত্যের জন্য জ্ঞাত ইতিহাসের সব যুগে, সব শতাব্দীতেই অসংখ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। ইতিহাস তার সাক্ষী। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো- যুদ্ধ যত ভয়াবহই হোক না কেন, যুদ্ধ পরিচালনারও কিছু নীতি ও নিয়ম ছিল, এমনকি প্রাচীন যুগেও। যোদ্ধারা সবসময় সেই নিয়ম মেনে চলতে চেষ্টা করত। অনেক যোদ্ধা নিরপরাধ মানুষের উপর আঘাত হানা অসম্মানজনক বলে বিবেচনা করতো। বিভিন্ন জনপদে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য কিছু অলিখিত নিয়মও বিদ্যমান ছিল। অনেক সমাজেই নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং অসহায় মানুষের উপর আক
পৃথিবীর ইতিহাসে আজ অবধি দেখা যায়নি, কোনো শান্তি আলোচনায় বসে, দুপক্ষের মধ্যে সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছে হঠাৎ একপক্ষ আক্রমণ করে বসল! অথচ ইরানের সঙ্গে গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধ এবং এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধে ইরানের বিরুদ্ধে তাই করল যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল! যুদ্ধের জন্য কোন পক্ষ দায়ী, কারা জয়ী হবে সে আলোচনা নয়, বরং যুদ্ধের চরিত্র কতটা নষ্ট হয়েছে সেটাই বড় আকারে বিশ্ববাসীকে ভাবিয়ে তুলছে।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে যুদ্ধ কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা না। যুদ্ধ একটি নির্মম বাস্তবতা। রাষ্ট্রের ক্ষমতা বিস্তার, ভূখণ্ড রক্ষা, ধর্মীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠা কিংবা রাজনৈতিক আধিপত্যের জন্য জ্ঞাত ইতিহাসের সব যুগে, সব শতাব্দীতেই অসংখ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। ইতিহাস তার সাক্ষী। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো- যুদ্ধ যত ভয়াবহই হোক না কেন, যুদ্ধ পরিচালনারও কিছু নীতি ও নিয়ম ছিল, এমনকি প্রাচীন যুগেও। যোদ্ধারা সবসময় সেই নিয়ম মেনে চলতে চেষ্টা করত। অনেক যোদ্ধা নিরপরাধ মানুষের উপর আঘাত হানা অসম্মানজনক বলে বিবেচনা করতো।
বিভিন্ন জনপদে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য কিছু অলিখিত নিয়মও বিদ্যমান ছিল। অনেক সমাজেই নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং অসহায় মানুষের উপর আক্রমণ করা নিষিদ্ধ বলে বিবেচিত হতো। কৃষিজমি ধ্বংস করা কিংবা অপ্রয়োজনীয়ভাবে সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদ নষ্ট করাও অনেক ক্ষেত্রে নিন্দনীয় ছিল। যোদ্ধাদের মধ্যে সাহস, সততা এবং বীরত্বের মূল্য ছিল। শত্রুর সঙ্গে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধ করা এবং পেছন থেকে আঘাত না করা ছিল বীরত্বের পরিচয়।
উপমহাদেশের প্রাচীন যুদ্ধনীতির নিয়ে মহাকাব্যিক কাহিনীগুলোতে অসংখ্য বর্ণনা আছে। মহাভারতের বর্ণনায় সূর্যাস্তের পর যুদ্ধ বন্ধ রাখা, আহত সৈন্যদের চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া এবং নিরস্ত্র শত্রুকে হত্যা না করার নিয়ম কঠোরভাবে পালন করা হয়। একইভাবে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতায়ও যুদ্ধের সময় কিছু নিয়ম মেনে চলার প্রথা ছিল। বন্দিদের অনেক সময় মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত করার সুযোগ দেওয়া হতো এবং নিরপরাধ নাগরিকদের হত্যা করা অনেক ক্ষেত্রে অমানবিক বলে বিবেচিত হতো।
আবার মধ্যযুগে এসে যুদ্ধের নৈতিকতার ধারণা আরও সুসংগঠিত হয়েছিল। ইউরোপে নাইটদের মধ্যে “চিভ্যালরি” বা বীরোচিত আচরণের একটি আদর্শ গড়ে ওঠে। এই আদর্শ অনুযায়ী একজন যোদ্ধার দুর্বল ও নিরস্ত্র মানুষকে রক্ষা করা, নারীদের সম্মান করা এবং শত্রুর সঙ্গেও একটি ন্যায্য আচরণ বজায় রাখা রেওয়াজ হয়ে উঠেছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে সাহস ও মর্যাদার সঙ্গে লড়াই করা ছিল নাইটদের গৌরবের বিষয়। আত্মসমর্পণকারী শত্রুকে হত্যা করা কিংবা অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করা একজন বীরের জন্য অসম্মানের বিষয় হিসেবে দেখা হতো। তবে চেঙ্গিস খানদের মতো কিছু নিষ্ঠুর শাসক এসব নিয়ম মানেন নাই।
মধ্যযুগীয় ইসলামী সভ্যতায়ও যুদ্ধ পরিচালনার কিছু নৈতিক বিধান ছিল। যুদ্ধের সময় নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের হত্যা না করার নির্দেশ দেওয়া হতো। কৃষিজমি, গাছপালা ও পশুপাখির অযথা ধ্বংস সাধন থেকেও বিরত থাকতে বলা হতো। যুদ্ধের বন্দিদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করার নির্দেশও ছিল। এসব নিয়ম যুদ্ধকে সম্পূর্ণ মানবিক করে তুলতে না পারলেও অন্তত কিছু সীমারেখা নির্ধারণ করেছিল, যা অযথা নিষ্ঠুরতা কমাতে সাহায্য করত।
যুক্তরাষ্ট্র একাই জাতিসংঘকে একটি অকার্যকর, বিবৃতি নির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো হয় শক্তিশালী পক্ষের হয়ে কথা বলছে, অথবা বিবৃতি দিয়ে দায় মেটাচ্ছে। গণমাধ্যমকে বাধ্য করা হচ্ছে সাপ্লাই করা সংবাদ প্রচার করতে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেওয়া হচ্ছে। ইরান-ইসরায়েল দুই দেশই মিডিয়া ব্লাকআউট করে দিয়েছে। সুতরাং এটা পরিষ্কার, অস্ত্র আধুনিক হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রগুলোর মানসিকতা আবার ফিরে গেছে প্রাচীন যুগের চেয়েও পেছনে।
কিন্তু সভ্যতা যত আগাচ্ছে, রাষ্ট্রগুলো যেন তত বেশি পাশবিক হয়ে উঠছে। বিংশ শতাব্দীর দুটি বিশ্বযুদ্ধ আধুনিক যুদ্ধের নিষ্ঠুরতার এক ভয়াবহ উদাহরণ। এসব যুদ্ধে শুধু সৈন্য নয়, লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষও নিহত হয়েছিল। শহরের পর শহর ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল বোমা হামলায়। যুদ্ধের লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল শিল্পকারখানা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং এমনকি জনবসতিপূর্ণ নগরীগুলোও। ফলে যুদ্ধ আর শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সাধারণ মানুষের জীবনও সরাসরি এর শিকার হয়েছে। সেটা ঠেকাতে আধুনিক যুগে আন্তর্জাতিক আইন ও বিভিন্ন সংস্থা তৈরি হয়েছিল। তারা যুদ্ধের নিয়ম নির্ধারণের চেষ্টা করেছে।
যুদ্ধবন্দিদের অধিকার, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং নিষিদ্ধ অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনের শর্তে পরিষ্কার বলা হয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে আহত এবং অসুস্থ সেনাদের হত্যা করা যাবে না, বরং চিকিৎসা দিতে হবে। চিকিৎসা কর্মী এবং হাসপাতালে আক্রমণ করা চলবে না। সমুদ্রে আহত ও জাহাজডুবি সৈন্যদের উদ্ধার করতে হবে, চিকিৎসা দিতে হবে। যুদ্ধবন্দিদের নির্যাতন বা অপমান করা যাবে না, পর্যাপ্ত খাবার দিতে হবে এবং জোর করে কোনো তথ্য আদায় করা যাবে না। যুদ্ধে বেসামরিক লোজনের উপর হামলা করা যাবে না এবং নারী ও শিশুকে সুরক্ষা দিতে হবে।
কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোতে এইসব শর্ত মানা তো দূরের কথা, এর বিপরীতটাই ঘটে চলেছে, যার সর্বশেষ উদাহরণ ইরান যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের শুরুতেই দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে একটি স্কুলে বিমান হামলা চালিয়ে দেড়শতাধিক স্কুল বালিকাকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার দায় ইসলায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র কেউ নিতে চাচ্ছে না। কিন্তু এটা এখন নিশ্চিত হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের টমা হক ক্রুজ মিসাইল দিয়ে ওই স্কুলের উপর হামলা চালানো হয়। নিরীহ মানুষ নারী শিশু হত্যার ব্যাপারে প্রাচীন ও মধ্যযুগ যে নিয়ম মেনে চলতো আধুনিক মানুষ তা যুদ্ধের শুরুতেই উপেক্ষা করছে। উল্লেখ্য, ইসরায়েলের সঙ্গে গাজায় যুদ্ধটা হামাসের সঙ্গে। কিন্তু নিরীহ প্রায় ৮০ হাজার মানুষ এ পর্যন্ত জীবন দিয়েছে। অথচ বিশ্বব্যাপী মনে হচ্ছে যেন এটাই স্বাভাবিক, যুদ্ধ যেন নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধেই হওয়ার কথা!
যুদ্ধ শুরুর আগেই ভারতে এসেছিল ইরানের একটি ফ্রিগেড আইআরআইএস দেনা। প্রায় নিরস্ত্র। অর্থাৎ কমব্যাট প্রস্তুতি ছিল না। মহড়া শেষ করে যখন ফিরে যাচ্ছিল তখন আন্তর্জাতিক জলসীমায় শ্রীলঙ্কার কাছাকাছি সেটিকে টর্পেডোর আঘাতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। ১০৪ জন নাবিক এতে নিহত হয়। বাকিদেরও সলিল সমাধি হতো যদি শ্রীলঙ্কা উদ্ধার না করতো। অথচ এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তাদের গর্ব করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে ইরানের পক্ষ হয়ে হেজবুল্লাহ, হামাস এবং হুতিরা যত আক্রমণ চালিয়েছে তার সবই প্রায়, বিশেষ করে ইসরাইলের বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে।
জাতিসংঘ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। এখনো তা সবাই কাগজে কলমে মান্য করে, কিন্তু বাস্তবে নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র একাই জাতিসংঘকে একটি অকার্যকর, বিবৃতি নির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো হয় শক্তিশালী পক্ষের হয়ে কথা বলছে, অথবা বিবৃতি দিয়ে দায় মেটাচ্ছে। গণমাধ্যমকে বাধ্য করা হচ্ছে সাপ্লাই করা সংবাদ প্রচার করতে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেওয়া হচ্ছে। ইরান-ইসরায়েল দুই দেশই মিডিয়া ব্লাকআউট করে দিয়েছে। সুতরাং এটা পরিষ্কার, অস্ত্র আধুনিক হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রগুলোর মানসিকতা আবার ফিরে গেছে প্রাচীন যুগের চেয়েও পেছনে।
লেখক: সাংবাদিক, আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
এইচআর/জেআইএম
What's Your Reaction?