এক দুর্ঘটনায় নিভে গেল পরিবারের দুই প্রদীপ

দেড় বছর বয়সী হালিমা এখনো বুঝতে শেখেনি- জীবন কখন, কীভাবে সবকিছু বদলে দেয়। সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিখলা গ্রামের এক কোণে, ভাঙাচোরা একটি বাড়ির উঠোনে বসে আপন মনে খেলছে সে। তার নিষ্পাপ হাসি, মাটির খেলায় মগ্নতা-সবকিছুই স্বাভাবিক। অথচ তার এই ছোট্ট পৃথিবীর ঠিক পাশেই বারান্দায় বসে বুকভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তার দাদি। সেই কান্না যেন শুধু একজন মায়ের নয়, এক পুরো পরিবারের ধ্বংসের আর্তনাদ। হালিমা জানে না- আজ সকালেই সিলেটে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাবা আজির উদ্দিন (২২) আর একমাত্র চাচা আমির উদ্দিন (১৯) দুজনেই প্রাণ হারিয়েছেন। আরও নির্মম হলো-তার দাদি এখনো জানেন, বড় ছেলে আজির মারা গেছেন; কিন্তু ছোট ছেলে আমীরও যে আর নেই, সেই হৃদয়বিদারক সত্য এখনও তার অজানা। এমন এক সত্য, যা জানলে হয়তো এই মায়ের বুক আর সেই আঘাত সহ্য করতে পারবে না। দিনমজুর আব্দুল গফ্ফারের সংসার যেন জন্ম থেকেই দুঃখের সঙ্গে বাঁধা। অভাব, অনটন আর সংগ্রাম ছিল তাদের প্রতিদিনের সঙ্গী। দুই ছেলে-আজির ও আমির-ছিলেন এই পরিবারের একমাত্র ভরসা। আর আছে এক প্রতিবন্ধী মেয়ে রাজমিনা, আর অসুস্থ স্ত্রী, যিনি নিজেও কিছুদিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে

এক দুর্ঘটনায় নিভে গেল পরিবারের দুই প্রদীপ

দেড় বছর বয়সী হালিমা এখনো বুঝতে শেখেনি- জীবন কখন, কীভাবে সবকিছু বদলে দেয়।

সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিখলা গ্রামের এক কোণে, ভাঙাচোরা একটি বাড়ির উঠোনে বসে আপন মনে খেলছে সে। তার নিষ্পাপ হাসি, মাটির খেলায় মগ্নতা-সবকিছুই স্বাভাবিক। অথচ তার এই ছোট্ট পৃথিবীর ঠিক পাশেই বারান্দায় বসে বুকভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তার দাদি। সেই কান্না যেন শুধু একজন মায়ের নয়, এক পুরো পরিবারের ধ্বংসের আর্তনাদ।

হালিমা জানে না- আজ সকালেই সিলেটে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাবা আজির উদ্দিন (২২) আর একমাত্র চাচা আমির উদ্দিন (১৯) দুজনেই প্রাণ হারিয়েছেন। আরও নির্মম হলো-তার দাদি এখনো জানেন, বড় ছেলে আজির মারা গেছেন; কিন্তু ছোট ছেলে আমীরও যে আর নেই, সেই হৃদয়বিদারক সত্য এখনও তার অজানা। এমন এক সত্য, যা জানলে হয়তো এই মায়ের বুক আর সেই আঘাত সহ্য করতে পারবে না।

দিনমজুর আব্দুল গফ্ফারের সংসার যেন জন্ম থেকেই দুঃখের সঙ্গে বাঁধা। অভাব, অনটন আর সংগ্রাম ছিল তাদের প্রতিদিনের সঙ্গী। দুই ছেলে-আজির ও আমির-ছিলেন এই পরিবারের একমাত্র ভরসা। আর আছে এক প্রতিবন্ধী মেয়ে রাজমিনা, আর অসুস্থ স্ত্রী, যিনি নিজেও কিছুদিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে বাড়িতে শয্যাশায়ী। সেই সংসারে আজ নেমে এসেছে এক ভয়ংকর শূন্যতা।

জানা গেছে, রোববার ভোর ৬টার দিকে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমার তেলিবাজার এলাকায় একটি পিকআপ ও কাঁঠাল বোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটে। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান কয়েকজন, পরে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮ জনে। তাদের মধ্যেই ছিলেন দুই ভাই-আজির ও আমীর। দুই তরুণ প্রাণের সঙ্গে নিভে গেছে একটি পরিবারের সব আশা, সব স্বপ্ন।

মুক্তিখলা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, একটি ঝুপড়ি ঘরের বারান্দায় বসে আহাজারি করছেন তাদের মা। তার কান্নায় বারবার ফিরে আসে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি। ফজরের নামাজের পর ছেলে ফোন করে বলেছিল-‘মা, কাজে যাইতাছি।’ এর আগে রাতেই বলেছিল, ‘মা, তিন হাজার টাকা পাঠাইছি।’ এখন সেই টাকার কোনো মূল্য নেই তার কাছে। বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন ‘আমার টাকার দরকার নাই, আমার সোনার পুতরে আইনা দাও।’

ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে আরও করুণ আর্তনাদ। আজির উদ্দিনের স্ত্রী শাহানা বেগম-সন্তানসম্ভবা এক নারী-হারিয়েছেন তার জীবনের একমাত্র অবলম্বন। ইতোমধ্যে তিন সন্তানের জননী তিনি। বড় ছেলে হাবিব (৬), হাফিজুর (৪) আর ছোট্ট হালিমা। সামনে আরও একটি নতুন প্রাণ আসছে পৃথিবীতে-কিন্তু সেই সন্তানের বাবার মুখ দেখার সুযোগ আর হবে না কখনো।

তার কান্নায় বারবার উঠে আসে একটাই প্রশ্ন- ‘এখন আমার আর আমার সন্তানদের কী হবে?’
বাড়ির উঠোনে শিশুদের নির্ভাবনা খেলা যেন বাস্তবতার সঙ্গে এক নির্মম বৈপরীত্য তৈরি করেছে। হাবিবকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, তার বাবা কোথায়-সে সরলভাবে বলে, ‘বাবা সিলেটে গেছে।’ এই ‘যাওয়া আর ‘ফিরে না আসা’র পার্থক্য বুঝতে তার এখনো অনেক সময় বাকি।

গ্রামের মানুষজন ছুটে এসেছেন শোকসন্তপ্ত পরিবারটিকে সান্ত্বনা দিতে। কিন্তু এমন ক্ষত কি কোনো সান্ত্বনায় ভরে? সবাই অপেক্ষা করছেন-দুই ভাইয়ের মরদেহ শেষবারের মতো গ্রামের মাটিতে রেখে দেওয়ার জন্য।

গ্রামের মহরম আলী বলেন, ‘আমাদের গ্রামে এই পরিবারের চেয়ে গরিব কেউ নেই। এই দুই ছেলেই ছিল তাদের ভরসা। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই- এই অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর জন্য।’
এই একটি দুর্ঘটনা শুধু দুটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি-এটি ধ্বংস করে দিয়েছে একটি পুরো পরিবারকে। কেড়ে নিয়েছে এক মায়ের দুই সন্তান, এক স্ত্রীর স্বামী, কয়েকটি শিশুর ভবিষ্যৎ।

আর ছোট্ট হালিমা! সে এখনো খেলছে। এখনো হাসছে।

সে জানে না- তার জীবনের সবচেয়ে বড় শোক নেমে এসেছে নিঃশব্দে।

একদিন সে বুঝবে-তার শৈশবের সেই উঠোনে, যে কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল, সেটিই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে গভীর বেদনার শুরু।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow