চট্টগ্রামে এক বছরের ব্যবধানে বন্ধ হয়েছে প্রায় ৩০০ খামার। খরচ কুলিয়ে উঠতে না পারাসহ নানান কারণে এসব খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন খামারিরা। ফলে, গত বছরের তুলনায় এবার গবাদিপশুর উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭৮ হাজার।
তবে চাহিদার তুলনায় সাড়ে ৩৫ হাজার গবাদিপশু সংকট রয়েছে। যার প্রভাব পড়বে আসন্ন কোরবানির ঈদে। যদিও জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর দাবি করেছে, চট্টগ্রামে পশু সংকট হবে না। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা গবাদিপশু দিয়ে এ সংকট মোকাবিলা করা হবে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর বলেন, গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় খামারিরা গবাদিপশু হৃষ্টপুষ্টকরণে আগ্রহ হারাচ্ছেন। খরচ সামাল দিতে না পেরে জেলায় প্রায় ৩০০টি খামার ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে।
এবার চট্টগ্রামে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর চাহিদা ধরা হয়েছে ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৭১টি। এর বিপরীতে স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে ৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৫১টি পশু। ফলে প্রায় ৩৫ হাজার ৫২০টি পশুর ঘাটতি রয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর বলেন, চট্টগ্রামের চাহিদা পূরণে নাটোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলা এবং পার্বত্য অঞ্চল থেকে পশু আনা হবে। একইসঙ্গে অবৈধভাবে বিদেশি পশু প্রবেশ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, দেশীয় পশু দিয়েই এবারের কোরবানির চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন, গোখাদ্য, ওষুধ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় গবাদিপশু উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে অনেক খামারি পশু হৃষ্টপুষ্টকরণে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এবং ইতোমধ্যে জেলায় প্রায় ৩০০টি খামার বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে স্থানীয় উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর চট্টগ্রাম মহানগর ও ১৫টি উপজেলায় স্থানীয়ভাবে ৭ লাখ ৮৩ হাজার ৫৫টি গবাদিপশু হৃষ্টপুষ্ট করা হয়েছে, যা গত বছর ছিল ৮ লাখ ৬০ হাজার ৮৮২টি। এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭৭ হাজার ৭৩১টি। এর মধ্যে গরু রয়েছে ৪ লাখ ৯৯ হাজার ২৭৯টি, ছাগল ১ লাখ ৯৪ হাজার ৫১৯টি, মহিষ ৪৭ হাজার ৮৩৪টি এবং ভেড়া ৪১ হাজার ৪২৩টি।
খামারিরা জানিয়েছেন, শুধু গোখাদ্য নয়, ওষুধ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচও বেড়েছে। শ্রমিকদের মাসিক মজুরি ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে জেনারেটর চালানোর অতিরিক্ত খরচও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ কারণে অনেক খামারি পশু হৃষ্টপুষ্টকরণ কমিয়ে দিয়েছেন।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ওমর বলেন, গোখাদ্যের বাজারে কার্যকর তদারকি না থাকায় দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এতে উৎপাদকরা ইচ্ছামতো দাম বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন, যা খামারিদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের যে খাদ্যপণ্য চালসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে গেলে বাজার মনিটরিং করা হয়, অভিযান চলিয়ে জরিমানা করা হয়। এতে বাজার নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু গোখাদ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের কিছু হয় না। ফলে হঠাৎ করেই গোখাদ্যের উৎপাদকরা দাম দেড়গুণ করে ফেলে। যেমন সয়াবিনের খৈল ২৬শ টাকা থেকে ৩৩শ টাকা করে ফেলেছে, এটা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই।
চট্টগ্রামে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত গড়ে উঠেছে অসংখ্য পশুখামার। এসব খামারে দেশীয় গরুর পাশাপাশি বিদেশি জাতের গরুও লালন-পালন করা হচ্ছে। চট্টগ্রামে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে ১১ হাজারের বেশি খামার রয়েছে। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে প্রতিবছর শতাধিক মৌসুমি খামারও গড়ে ওঠে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে পশুর কেনাবেচা পুরোদমে শুরু হবে।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হাইদগাঁও এলাকার খামারি মো. আনিসুজ্জামান বলেন, শুধু গোখাদ্য নয়, ওষুধ ও অন্যান্য খরচও বেড়েছে। কৃমিনাশকসহ বিভিন্ন ওষুধের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একজন শ্রমিকের পেছনে মাসে ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত খরচ হয়, যা উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়।
এ অবস্থায় খামার টিকিয়ে রাখতে গোখাদ্যের বাজারে নিয়ন্ত্রণ, প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে ঋণসহ নীতিগত সহায়তা জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে স্থানীয় উৎপাদন আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিসংখ্যান বলছে, ফটিকছড়িতে সবচেয়ে বেশি গরু রয়েছে- মোট ৪৩ হাজার ৯৭৪টি। বাঁশখালীতে ৩৮ হাজার ৩৩২টি এবং মিরসরাইয়ে ৩৮ হাজার ৪১টি গরু কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এ ছাড়া পটিয়া, হাটহাজারী, সাতকানিয়া, রাঙ্গুনিয়া, সন্দ্বীপ, সীতাকুণ্ড, আনোয়ারা, চন্দনাইশ ও বোয়ালখালীসহ বিভিন্ন উপজেলায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পশু রয়েছে।
গরুর পাশাপাশি মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার সরবরাহও কম নয়। জেলায় মহিষ রয়েছে ৪৭ হাজার ৮৩৪টি, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সন্দ্বীপে। ছাগলের সংখ্যা এক লাখ ৯৪ হাজার ৫১৯টি এবং ভেড়া রয়েছে ৪১ হাজার ৪২৩টি।
প্রস্তুত পশুর হাট
ঈদুল আজহার জন্য প্রস্তুতি শুরু হয়েছে চট্টগ্রামের হাটগুলোতে। এরইমধ্যে প্রধান তিনটি হাট ইজারা দিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। নগরের প্রধান পশুর হাটগুলোর মধ্যে রয়েছে সাগরিকা পশুর হাট, বিবিরহাট পশুর বাজার এবং পোস্তারপাড় ছাগলের বাজার। এর পাশাপাশি বাকলিয়ার নূর নগর হাউজিংসহ বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে নগরে ১৬টি অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের অনুমতি ও নগর পুলিশের অনাপত্তি সাপেক্ষে এসব হাট ইজারা দেওয়া হবে।
সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল বলেন, পবিত্র ঈদুল আজহায় অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর জন্য জেলা প্রশাসনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। হাটগুলোর বিষয়ে নগর পুলিশের (সিএমপি) অনাপত্তি প্রয়োজন। নগর পুলিশ অনাপত্তি দিলে জেলা প্রশাসন হাট বসানোর অনুমতি দেবে। জেলা প্রশাসনের অনুমতি পাওয়ার পর হাটগুলো ইজারা দেওয়ার জন্য দরপত্র বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে।
চসিক সূত্র জানায়, নগরীর সাগরিকা, বিবিরহাট ও পোস্তারপাড় এলাকায় স্থায়ী হাট চালু থাকছে। অস্থায়ী হাটগুলোর মধ্যে রয়েছে-নগরের কর্ণফুলী গরু বাজার (নূর নগর হাউজিং এস্টেট), ৪০ নম্বর উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ডের পূর্ব হোসেন আহম্মদপাড়া সাইলো রোডের পাশে টিএসপি মাঠ, ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডের আউটার রিংরোডের সিডিএ বালুর মাঠ, ৩৭ নম্বর উত্তর-মধ্যম হালিশহর ওয়ার্ডের মুনিরনগর আনন্দবাজারসংলগ্ন রিংরোডের পাশে খালি জায়গা, ২৬ নম্বর উত্তর হালিশহর ওয়ার্ডের গলাচিপাপাড়া বারানিঘাটা রোডসংলগ্ন মাঠ, ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের চরপাড়া আলমগীর সাহেবের মাঠ, ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের বাটারফ্লাই পার্কের উত্তরে চেয়ারম্যান মাঠ, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের বড়পোল এলাকার খালপাড় অস্থায়ী পশুর বাজার, সল্টগোলা রেলক্রসিংসংলগ্ন খালি মাঠ ও ৩৮ নম্বর দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর ওয়ার্ডের ধুমপাড়া সাগরপাড় লিংক রোডসংলগ্ন রেজাউল আমিন মাঠ।
নগরের পাশাপাশি বিভিন্ন উপজেলায় দুই শতাধিক পশুর স্থায়ী ও অস্থায়ী হাট বসবে। হাটগুলোর মধ্যে মিরসরাইয়ে ২০টি, সীতাকুণ্ডে ১৫টি, সন্দ্বীপে ২০টি, ফটিকছড়িতে ২০টি, রাউজানে ১৬টি, রাঙ্গুনিয়ায় ২০টি, হাটহাজারীতে ২৩টি, বোয়ালখালীতে ১১টি, পটিয়ায় ১০টি, চন্দনাইশে ১৩টি, আনোয়ারায় ১৫টি, সাতকানিয়ায় ১৮টি, লোহাগাড়ায় ৭টি, বাঁশখালীতে ১২টি এবং কর্ণফুলীতে ২টি।
সিটি করপোরেশনের ভূসম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে সিটি করপোরেশনের পশুর হাট নিয়ে ইজারাদারদের আগ্রহ কমেছে। একসময় শুধু পশুর হাটকেন্দ্রিক বেচাবিক্রি ছিল। এখন বিশেষ করে পবিত্র ঈদুল আজহার সময় মানুষ বিভিন্ন খামার থেকে সরাসরি কোরবানির পশু কিনে নেন। আবার এ সময় নগরের অলিগলি ও আশপাশের এলাকায় অনেক অবৈধ হাট বসে। ফলে পশুর হাটে আগের মতো লোকজন আসেন না।
কোরবানির পশু কিনতে অনেকেই এখন হাটের পরিবর্তে সরাসরি খামারেই আগ্রহী হচ্ছেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পশু কেনাবেচাও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে হাটে জাল টাকা আর অনলাইন লেনদেনে প্রতারণার ঝুঁকি থাকায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।