একগুচ্ছ অনুগল্প: ঈদের সালামি

নাজিফা রাসেল স্বপ্না ১. সালামির নোটের গন্ধ ঈদের সকাল মানেই ছিল নতুন জামার গন্ধ, সেমাইয়ের হাঁড়ি আর আব্বুর পাঞ্জাবির পকেট। আমি ঘুরঘুর করতাম তার আশপাশে। আব্বু ভান করতেন কিছু বুঝছেন না। তারপর নামাজ থেকে ফিরে হাসতে হাসতে বলতেন, ‘এই যে, আমার ছোট্ট সোনা মা কোথায়?’ একটা কচকচে দশ টাকার নোট হাতে পেতেই মনে হতো আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ। সেই নোটের গন্ধে যেন পুরো ঈদ লেগে থাকত। ২. এবার আমি সালামি দিচ্ছি ছোটবেলায় যাদের সামনে হাত পাততাম, আজ তাদেরই একজন হয়ে গেছি। ভাগ্নি এসে লাজুক মুখে সালাম করতেই নতুন একটা নোট বের করলাম। টাকাটা হাতে নিয়েই সে লাফিয়ে উঠলো। ঠিক তখন বুঝলাম, সালামির আনন্দ শুধু পাওয়ার না দেয়ার মাঝেও এক অদ্ভুত প্রশান্তি আছে। মনে হলো, আব্বুও হয়ত আমাকে টাকা দেওয়ার সময় এমন করেই চুপচাপ হাসতেন। ৩. বৃদ্ধাশ্রমের ঈদ বৃদ্ধাশ্রমের বারান্দায় বসে থাকা মানুষটার হাতে আজও কিছু নতুন নোট। নার্স অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘চাচা, এগুলো দিয়ে কী করবেন?’ বৃদ্ধ লোকটা ধীরে বললেন, ‘আমার ছেলেটা ছোটবেলায় ঈদের দিন ঘুম থেকে উঠেই সালামি চাইত। আমি লুকিয়ে রাখতাম। তারপর খুঁজে পেয়ে ও খুব খুশি হতো…’ তিনি একটু থামলেন। তারপর নোটগ

একগুচ্ছ অনুগল্প: ঈদের সালামি

নাজিফা রাসেল স্বপ্না

১. সালামির নোটের গন্ধ

ঈদের সকাল মানেই ছিল নতুন জামার গন্ধ, সেমাইয়ের হাঁড়ি আর আব্বুর পাঞ্জাবির পকেট। আমি ঘুরঘুর করতাম তার আশপাশে। আব্বু ভান করতেন কিছু বুঝছেন না। তারপর নামাজ থেকে ফিরে হাসতে হাসতে বলতেন, ‘এই যে, আমার ছোট্ট সোনা মা কোথায়?’

একটা কচকচে দশ টাকার নোট হাতে পেতেই মনে হতো আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ। সেই নোটের গন্ধে যেন পুরো ঈদ লেগে থাকত।

২. এবার আমি সালামি দিচ্ছি

ছোটবেলায় যাদের সামনে হাত পাততাম, আজ তাদেরই একজন হয়ে গেছি। ভাগ্নি এসে লাজুক মুখে সালাম করতেই নতুন একটা নোট বের করলাম। টাকাটা হাতে নিয়েই সে লাফিয়ে উঠলো। ঠিক তখন বুঝলাম, সালামির আনন্দ শুধু পাওয়ার না দেয়ার মাঝেও এক অদ্ভুত প্রশান্তি আছে। মনে হলো, আব্বুও হয়ত আমাকে টাকা দেওয়ার সময় এমন করেই চুপচাপ হাসতেন।

৩. বৃদ্ধাশ্রমের ঈদ

বৃদ্ধাশ্রমের বারান্দায় বসে থাকা মানুষটার হাতে আজও কিছু নতুন নোট। নার্স অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘চাচা, এগুলো দিয়ে কী করবেন?’

বৃদ্ধ লোকটা ধীরে বললেন, ‘আমার ছেলেটা ছোটবেলায় ঈদের দিন ঘুম থেকে উঠেই সালামি চাইত। আমি লুকিয়ে রাখতাম। তারপর খুঁজে পেয়ে ও খুব খুশি হতো…’

তিনি একটু থামলেন। তারপর নোটগুলোর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করলেন, ‘এখনো অভ্যাসটা যায়নি।’

৪. কবরের পাশে ঈদ

ঈদের নামাজ শেষে সবাই যখন কোলাকুলিতে ব্যস্ত, শফিক সাহেব চলে গেলেন কবরস্থানে। দুটি কবর পাশাপাশি। একটায় মা, আরেকটায় বাবা। ছোটবেলায় ঈদের সকাল শুরু হতো তাদের থেকে পাওয়া সালামির খুশি দিয়ে।

আজ হাতে নতুন নোট আছে, নতুন পোশাক আছে- ‘শুধু কেউ বলার নেই, এই নাও তোমার সালামি, ঈদ মোবারক।’ মাটির নিচে মানুষ ঘুমিয়ে গেলে ঈদের আনন্দও কেমন নিঃশব্দ হয়ে যায়।

৫. যে সালামি আর খরচ হলো না

আলমারির ড্রয়ারে এখনো ছোট্ট একটা খাম রাখা। তার উপর আছিয়ার আব্বুর কাঁপা হাতে লেখা- ‘আমার ছোট্ট মেয়েটার ঈদের সালামি।’ তিন বছর হয়ে গেছে মেয়েটা নেই। ঘরটা শূন্য করে শৈশবের বয়স পেরোনোর আগেই ওপারে পাড়ি জমিয়েছে। তবুও প্রতি ঈদে বাবা নতুন নোট তুলে রাখেন।

মা কিছু বলেন না। শুধু রাতে খামটা বুকে চেপে কাঁদেন। কিছু শূন্যতা আছে, যা কোনো কিছুর বিনিময়ে পূরণ হয়না।

৬. সালামির অঙ্ক

শৈশবে ঈদের সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল কে কত সালামি দিলো। খালা বিশ টাকা দিলে ফুপুকে হারানো যেত, মামা একশো দিলে তো রাজা হয়ে যেতাম! সন্ধ্যায় বিছানার উপর সব টাকা সাজিয়ে হিসাব করতাম। মনে হতো, এই টাকাতেই বুঝি জীবন কেটে যাবে। আজ সেই বয়সটা আর নেই। ঈদের দিন সেই বিছানার উপর বসে টাকা গোনার আনন্দ আর কোথাও খুঁজে পাই না।

৭. শেষ সালামি

বাবা মৃত্যুর আগের ঈদে ছেলেকে ডেকে বলেছিলেন, ‘তুই তো এখন বড় হয়ে গেছিস, তবুও এটা রাখ।’
ছেলে হেসে বলেছিলো, ‘এই বয়সেও সালামি?’

বাবা বলেছিলেন, ‘সন্তান যত বড়ই হোক, বাবা-মায়ের কাছে ছোটই থাকে।’ টাকাটা আজও খরচ করা হয়নি। কারণ ওটা শুধু সালামি না, ওটাই বাবার হাতের শেষ স্পর্শ।

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow