‘একটি বুলেটের’ নিদারুণ অপচয়
একজন মানুষ নিখোঁজ হন। কয়েক ঘণ্টা পর তার মরদেহ পাওয়া যায়। খবরটি পড়ে আমরা এগিয়ে যাই। কিন্তু রাষ্ট্র কি এগোয়? নাকি এখানেই থেমে যায় একটি বিনিয়োগ, একটি সম্ভাবনা, একটি জীবনের পূর্ণতা? বুলেট বৈরাগী। বয়স ৩৪। কালবেলা অনলাইনে পড়লাম, শনিবার কুমিল্লায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বুলেট আক্ষরিক অর্থেই ‘বুলেট’ ছিলেন। মেধায়, চেহারায় অতুলনীয়। সুঠাম দেহ। এক পলকে মনে হবে সিনেমার নায়ক। পরিবার সূত্রে জানলাম, ক্লাসে কোনোদিন দ্বিতীয় হননি তিনি। বিবিরবাজার স্থলবন্দর কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা। তার এই একটি পরিচয়ের পেছনে লুকিয়ে আছে বহু বছরের প্রস্তুতি, প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। একটি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে এসএসসি, এইচএসসি, বিশ্ববিদ্যালয় এরপর বিসিএস। প্রতিটি ধাপে পরিবার যেমন ব্যয় বহন করেছে, তেমনি রাষ্ট্রও করেছে অবকাঠামোগত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের বিনিয়োগ। ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্সে একটি ধারণা আছে ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্ট’। একজন মানুষকে দক্ষ করে তুলতে যে সময়, অর্থ, প্রশিক্ষণ ও নীতিগত সহায়তা লাগে, তা আসলে ভবিষ্যতের উৎপাদনশীলতার ভিত্তি তৈরি করে। বুলেট সেই বিনিয়োগের একটি
একজন মানুষ নিখোঁজ হন। কয়েক ঘণ্টা পর তার মরদেহ পাওয়া যায়। খবরটি পড়ে আমরা এগিয়ে যাই। কিন্তু রাষ্ট্র কি এগোয়? নাকি এখানেই থেমে যায় একটি বিনিয়োগ, একটি সম্ভাবনা, একটি জীবনের পূর্ণতা?
বুলেট বৈরাগী। বয়স ৩৪। কালবেলা অনলাইনে পড়লাম, শনিবার কুমিল্লায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বুলেট আক্ষরিক অর্থেই ‘বুলেট’ ছিলেন। মেধায়, চেহারায় অতুলনীয়। সুঠাম দেহ। এক পলকে মনে হবে সিনেমার নায়ক। পরিবার সূত্রে জানলাম, ক্লাসে কোনোদিন দ্বিতীয় হননি তিনি। বিবিরবাজার স্থলবন্দর কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা। তার এই একটি পরিচয়ের পেছনে লুকিয়ে আছে বহু বছরের প্রস্তুতি, প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। একটি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে এসএসসি, এইচএসসি, বিশ্ববিদ্যালয় এরপর বিসিএস। প্রতিটি ধাপে পরিবার যেমন ব্যয় বহন করেছে, তেমনি রাষ্ট্রও করেছে অবকাঠামোগত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের বিনিয়োগ।
ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্সে একটি ধারণা আছে ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্ট’। একজন মানুষকে দক্ষ করে তুলতে যে সময়, অর্থ, প্রশিক্ষণ ও নীতিগত সহায়তা লাগে, তা আসলে ভবিষ্যতের উৎপাদনশীলতার ভিত্তি তৈরি করে। বুলেট সেই বিনিয়োগের একটি ফল। কিন্তু সেই ফল রাষ্ট্র ভোগ করার আগেই হারিয়ে গেল।
এখানেই আসে আরেকটি কঠিন শব্দ ‘ডেডওয়েট লস’। অর্থনীতির ভাষায় এটি এমন ক্ষতি, যা কোনো পক্ষই পুনরুদ্ধার করতে পারে না। বুলেটের মৃত্যু ঠিক তেমনই। রাষ্ট্র তাকে তৈরি করেছে, কিন্তু তার কর্মদক্ষতা থেকে প্রত্যাশিত রিটার্ন আর পাবে না। পরিবার তাকে বড় করেছে, কিন্তু জীবনের নিরাপত্তা বা স্থিতি পেল না। সমাজ একজন সম্ভাবনাময় পেশাজীবী হারাল, যার অবদান হয়তো রাজস্ব আদায় থেকে শুরু করে প্রশাসনিক শুদ্ধতায় প্রভাব ফেলতে পারত।
কিন্তু এই ক্ষতি শুধু অর্থনীতির ভাষায় ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। এটি একটি ইনস্টিটিউশনাল ফেইলিওর-এর গল্পও। একজন মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর যে দ্রুততা, সমন্বয় ও প্রতিক্রিয়া রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় থাকার কথা, সেখানে আমরা দেখি বিভ্রান্তি, দায়িত্ব এড়ানো এবং একধরনের প্রশাসনিক জড়তা। লোকেশন ছিল। সময় ছিল। কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ ছিল না।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান আমাদের শেখায়, একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার আইন বা বাহিনীতে নয়, বরং তার ‘রেসপন্সিভনেস’। নাগরিক বিপদে পড়লে রাষ্ট্র কত দ্রুত সাড়া দেয়, সেই পরীক্ষায় আমরা বারবার পিছিয়ে পড়ছি।
বুলেটের গল্পে আরেকটি স্তর আছে-সোশ্যাল কস্ট। তার স্ত্রী, যিনি কয়েক দিন আগেই বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করেছেন, এখন এক সন্তানের মা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে। ৯ মাসের শিশুটি বড় হবে বাবাহীন বাস্তবতায়। বৃদ্ধ বাবা-মা হারালেন সন্তানকে। এই ক্ষতির কোনো পরিমাপ নেই। এটি জিডিপিতে ধরা পড়ে না, বাজেটে ধরা পড়ে না, কিন্তু সমাজের গভীরে দাগ কেটে যায়।
একজন কর্মকর্তা মারা গেছেন-এই বাক্যটি তাই যথেষ্ট নয়। এখানে মারা গেছে একটি সম্ভাবনা, একটি বিনিয়োগ, একটি আস্থাও।
প্রশ্ন হলো, এই অপচয়ের দায় কার?
ছিনতাইকারী হলে দায় অপরাধীর। কিন্তু সময়মতো সমন্বিত পদক্ষেপ না থাকলে দায় কি কেবল অপরাধীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে? নাকি সেটি ছড়িয়ে পড়ে ব্যবস্থার ভেতরেও?
পাবলিক পলিসির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘অ্যাকাউন্টেবিলিটি চেইন’। একটি ঘটনার প্রতিটি ধাপে কে দায় নেবে, কীভাবে নেবে-এই শৃঙ্খল যদি দুর্বল হয়, তবে ফলাফল হয় এমনই। একজন মানুষ হারিয়ে যায়, আমরা ব্যাখ্যা খুঁজি কিন্তু জবাবদিহি খুঁজে পাই না।
বুলেট বৈরাগীর মৃত্যু তথাকথিত কোনো ক্রাইম রিপোর্ট নয়। এটি একটি আয়না। যেখানে দেখা যায় আমাদের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ভঙ্গুরতা, প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা এবং মানবজীবনের অবমূল্যায়ন।
একটি রাষ্ট্র তার নাগরিককে তৈরি করে ভবিষ্যতের জন্য। কিন্তু যদি সেই নাগরিক নিরাপদ না থাকে, তবে সেই বিনিয়োগ কি টেকসই?
বুলেট আর ফিরবেন না। কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকে যাবে। আর সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাই হয়তো এখন সবচেয়ে জরুরি।
What's Your Reaction?