এই অপেক্ষা আসলে একজন ব্যক্তিকে দেখার অপেক্ষা নয়। এটি একটি রাষ্ট্রীয় মানসিকতার পরিবর্তনের অপেক্ষা। যে সংসদ আজও বংশ, অর্থ, ক্ষমতা আর তথাকথিত এলিট পরিচয়ের চারপাশে ঘোরে, সেখানে একজন রাজমিস্ত্রির সন্তানের প্রবেশ মানে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যাওয়া।
রাজমিস্ত্রির ছেলে মানে সেই পরিবার, যে ঘর বানায় কিন্তু নিজের জন্য স্থায়ী ঘর নিশ্চিত করতে পারে না। যে স্কুল বানায়, কিন্তু তার সন্তান মানসম্মত শিক্ষা পায় না। যে শহরের অবকাঠামো দাঁড় করায়, কিন্তু সেই শহরের নীতিনির্ধারণে তার কোনো কণ্ঠস্বর থাকে না। সংসদে তার সন্তানের উপস্থিতি মানে এই নীরব মানুষের কথা রাষ্ট্রের কেন্দ্রে পৌঁছে যাওয়া।
এটি শ্রেণি উল্টে দেওয়ার রাজনীতি নয়। এটি মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার রাজনীতি। এখানে প্রশ্ন এই নয়― কে কোন পেশার সন্তান। প্রশ্ন হলো কে মানুষের কথা বোঝে, কে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে। একজন রাজমিস্ত্রির ছেলে সংসদে গেলে সংসদ ছোট হয় না, বরং বড় হয়। কারণ তখন সংসদ বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়।
এই অপেক্ষা তাই কেবল একটি আসনের জন্য নয়। এটি সেই দিনের অপেক্ষা, যেদিন শ্রম, ঘাম আর সততার সন্তানদের আর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। যেদিন রাষ্ট্র বলবে, তুমি কার ছেলে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তুমি কেমন মানুষ সেটাই শেষ কথা।
এখানে যে বক্তব্যটি উঠে আসে, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক নতুন বাংলাদেশের ছবি। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বসবাস এ ভূখণ্ডে। এরা কেউ সংখ্যামাত্র নয়। এরা প্রত্যেকে একটি করে সম্পূর্ণ জীবন, একটি করে গল্প, একটি করে সম্ভাবনা। এই মানুষগুলো প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানে থেকে নিজেদের মতো করে জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তুলেছে। তারা জানে না এমন কিছু নেই, তারা পারে না এমন কিছু নেই। তবুও এই মানুষগুলো আজও বদ্ধ খাঁচার ভেতরে আটকে আছে কিছু মানুষ নামের দানবের কাছে।
এই দানবরা নিজেদের সমাজের এলিট শ্রেণি বলে দাবি করে। তাদের ভাষা, পোশাক, ক্ষমতা আর অর্থের আড়ালে তারা একটি মুখোশ পরে থাকে। এই মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ভয়, শোষণ আর বৈষম্য। এই ভণ্ড দাবি আর মুখোশধারী ক্ষমতার কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করাই আজ নতুন বাংলাদেশের প্রথম শর্ত।
নতুন বাংলাদেশে একজন মানুষ মিস্ত্রি হোক বা রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি বা কামার, এতে কিছু যায় আসে না। কারণ মানুষ তার পেশায় নয়, পরিচিত হয় তার প্রতিভা ও শ্রমের গুণে। এই মানুষগুলো তাদের মনের মাধুরী দিয়ে বাস্তব জীবনের প্রতিটি প্রয়োজনীয় বস্তু তৈরি করে, যা সরাসরি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। আমরা যে ঘরে থাকি, যে চেয়ারে বসি, যে হাঁড়িতে ভাত রান্না করি, যে রাস্তা দিয়ে চলি, সবকিছুর পেছনেই আছে এই মানুষের হাতের স্পর্শ।
ভাবুন, কামারের হাতুড়ির আঘাতে লোহা যে আকার নেয়, তা কেবল একটি বস্তু নয়। তা একটি সভ্যতার চিহ্ন। কুমারের চাকায় ঘুরতে থাকা মাটির দলা থেকে যে পাত্র জন্ম নেয়, সেটি কেবল মাটি নয়। সেটি জীবনের ধারক। অথচ এই মানুষগুলোই আজও সমাজে অবহেলিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত। আধুনিকতার সব আলো ঝলমলে কথার মাঝেও তারা থেকে যায় অন্ধকার প্রান্তে।
কৃষকের কথা ভাবুন, যিনি সূর্য ওঠার আগেই মাঠে নামেন, কিন্তু তার সন্তান ঠিকমতো শিক্ষা পায় না। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কথা ভাবুন, যিনি শহর পরিষ্কার রাখেন, অথচ সমাজ তাকে দূরে সরিয়ে রাখে। গার্মেন্টস শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, জেলে, তাঁতি, নার্স, ক্ষুদ্র দোকানি, পরিবহন শ্রমিক, শিক্ষক, সবাই এই সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের শ্রমেই রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে, অথচ রাষ্ট্র তাদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়।
নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন তখনই বাস্তব হবে, যখন শ্রম আর প্রতিভাকে শ্রেণির চোখে দেখা বন্ধ হবে। যখন একজন মানুষের মূল্য নির্ধারিত হবে তার মানবিকতায়, দায়বদ্ধতায় আর সৃজনশীলতায়। অধিকার তখন ভিক্ষা নয়, হবে স্বীকৃত সত্য।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন প্রজন্মের অহংকার হিসেবে উঠে আসে হাসনাত আব্দুল্লাহর মতো নাম। তিনি কোনো ক্ষমতাধর পরিবারের উত্তরাধিকারী নন। তিনি এসেছেন এক অতি সাধারণ পরিবার থেকে। তার বাবার রয়েছে এক অসাধারণ বৈশিষ্ট্য। তিনি সন্তানের মধ্যে ভয় নয়, আত্মসম্মান গড়ে তুলেছেন। তিনি শিখিয়েছেন মাথা নত না করে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে। এই শিক্ষাই হাসনাতকে তৈরি করেছে সাহসী, স্পষ্টভাষী এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে।
হাসনাতের গল্প আসলে ব্যতিক্রম নয়। এটি সম্ভাবনার প্রতীক। এই দেশ এমন হাজারো হাসনাতের জন্ম দিতে পারে, যদি সমাজ বংশ নয়, যোগ্যতাকে মূল্য দেয়। যদি রাষ্ট্র ক্ষমতার নয়, মানুষের পক্ষে দাঁড়ায়।
নতুন বাংলাদেশ কোনো অলীক কল্পনা নয়। এটি গড়ে উঠবে কামারের ঘামে, কুমারের মাটিতে, কৃষকের মাঠে, শ্রমিকের ক্লান্ত হাতে, শিক্ষকের চিন্তায় এবং নতুন প্রজন্মের সাহসে। এই বাংলাদেশে মানুষ আর এলিট নয়। মানুষই হবে পরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি। এখানেই এই লেখার মূল আহ্বান।
হাসনাত আব্দুল্লাহর ক্ষেত্রে শুধু তার শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। কারণ তার প্রকৃত পরিচয় কেবল সার্টিফিকেটে সীমাবদ্ধ নয়। গণঅভ্যুত্থানের সময় এবং তার পরবর্তী পর্যায়ে যে সাহস, সচেতনতা ও নেতৃত্ব তিনি দেখিয়েছেন, তা একটি প্রজন্মের মানসিক কাঠামোকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সংকটের মুহূর্তে যখন অনেকেই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে চেয়েছে, তখন হাসনাত সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন সেই মানুষের, যাদের কথা শোনার কেউ ছিল না।
গণঅভ্যুত্থানের সময় তার ভূমিকা ছিল সংগঠকের, চিন্তকের এবং সাহস জাগানো এক তরুণ কণ্ঠের। তিনি উত্তেজনা নয়, দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। প্রতিশোধ নয়, দায়িত্বের কথা বলেছেন। আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে যখন বিভ্রান্তি, হতাশা আর ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, তখনো তিনি স্থির থেকেছেন। তার নেতৃত্বের বড় গুণ হলো, তিনি মানুষকে ব্যবহার করেননি, মানুষকে বিশ্বাস করেছেন।
এই কারণেই তার প্রতি শ্রদ্ধা কেবল ব্যক্তিগত আবেগের জায়গা থেকে নয়, রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যতের প্রশ্ন থেকেও জরুরি। হাসনাত দেখিয়েছেন নেতৃত্ব মানে মাইক ধরা নয়। নেতৃত্ব মানে সময়ের আগে এগিয়ে থাকা এবং সঠিক সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। তিনি প্রমাণ করেছেন যে সাধারণ পরিবার থেকেও রাষ্ট্রচিন্তার মানুষ উঠে আসতে পারে, যদি সমাজ সেই সুযোগটুকু দেয়।
নতুন বাংলাদেশের জন্য এমন নেতৃত্বই প্রয়োজন, যারা ক্ষমতার জন্য নয়, দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত থাকে। হাসনাত আব্দুল্লাহ সেই সম্ভাবনার নাম। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা তাকে প্রস্তুত করেছে, কিন্তু তার সংগ্রাম, অবদান আর মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই তাকে প্রজন্মের অহংকারে পরিণত করেছে।
আরও একটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে বলা প্রয়োজন। হাসনাত আব্দুল্লাহ একজন রাজমিস্ত্রির ছেলে। এই পরিচয় কোনো দুর্বলতা নয়। এটি তার শক্তির মূল। সে জানে কীভাবে গড়তে হয়, কারণ সে ছোটবেলা থেকেই দেখেছে তার বাবার হাতে ইট, বালি আর সিমেন্ট কীভাবে ধীরে ধীরে একটি ঘরে রূপ নেয়। সে জানে ভিত্তি মজবুত না হলে দেয়াল দাঁড়ায় না, আর তাড়াহুড়ো করলে নির্মাণ ভেঙে পড়ে।
এই বাস্তব শিক্ষা তাকে কেবল একজন শিক্ষিত মানুষ বানায়নি। তাকে ধৈর্যশীল ও দায়বদ্ধ নেতৃত্বের পাঠ দিয়েছে। রাজমিস্ত্রির ছেলে হওয়ায় সে জানে পরিকল্পনা কী, শ্রমের মূল্য কী এবং প্রতিটি স্তরের মানুষের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সে বোঝে, দেশ গড়া মানে কাগজে নকশা আঁকা নয়। দেশ গড়া মানে মাটিতে নেমে কাজ করা।
এই কারণেই তার নেতৃত্ব আলাদা। সে শুধু কথা বলে না, সে গড়তে জানে। যেমন করে তার বাবা একটি ঘর গড়েন, তেমন করেই সে স্বপ্ন দেখে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার। এই পরিচয়ই তাকে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি এনেছে এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশে একটি বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্বের জায়গায় দাঁড় করিয়েছে।
সব কিছুর শেষে, একজন মানুষ হিসেবে, একজন নাগরিক হিসেবে এবং একটি প্রজন্মের সম্ভাবনার প্রতি বিশ্বাস রেখে আমি হাসনাত আব্দুল্লাহর সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করি। তার পথ যেন সোজা থাকে, তার সাহস যেন অটুট থাকে এবং মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতা যেন কোনোদিন ক্ষয়ে না যায়। নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন আমরা দেখি, সেই স্বপ্ন গড়ার শক্তি ও প্রজ্ঞা তার ভেতরে আরও দৃঢ় হোক।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন