এমবাপ্পে: বঁদির গলির ছেলে যে বিশ্বকাপের পুরো পাঁচ লক্ষ ডলার দিয়ে দিল প্রতিবন্ধী শিশুদের

২০১৮ সালের ১৫ জুলাই। মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে তখন রাত নামছে। ফ্রান্স ৪–২ গোলে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। স্টেডিয়ামের আলোর নিচে দাঁড়িয়ে উদযাপন করছেন এক ১৯ বছরের তরুণ, যার নাম আজ পৃথিবীর প্রতিটি কোণে পরিচিত। কিলিয়ান এমবাপ্পে — সেই রাতে ইতিহাসে ঢুকে গেলেন। ১৯৫৮ সালে পেলের পর তিনিই প্রথম কিশোর, যিনি বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করলেন। কিন্তু সেই রাতের উদযাপন শেষ হতে না হতেই এমবাপ্পে একটি সিদ্ধান্ত নিলেন, যা তাকে শুধু একজন মহান ফুটবলার নয় — একজন মহান মানুষ হিসেবেও চিহ্নিত করে দিল। টুর্নামেন্টে সাত ম্যাচে প্রতি ম্যাচে প্রায় ২২,৩০০ ডলার করে এবং ফাইনাল জয়ের বোনাস মিলিয়ে পেলেন প্রায় পাঁচ লক্ষ মার্কিন ডলার। পুরো টাকাটাই দিয়ে দিলেন, ‘প্রেমিয়ের দ্য কর্দে' নামের একটি দাতব্য সংস্থাকে, যারা প্রতিবন্ধী ও হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের জন্য বিনামূল্যে ক্রীড়া প্রশিক্ষণ দেয়। টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বললেন: 'আমার পেমেন্ট নেওয়ার দরকার ছিল না। আমি সেখানে গিয়েছিলাম দেশের রং রক্ষা করতে। আমি যথেষ্ট উপার্জন করি — অনেক টাকা। তাই মনে করি যারা কষ্টে আছেন, তাদের সাহায্য করা জরুরি। এ

এমবাপ্পে: বঁদির গলির ছেলে যে বিশ্বকাপের পুরো পাঁচ লক্ষ ডলার দিয়ে দিল প্রতিবন্ধী শিশুদের
২০১৮ সালের ১৫ জুলাই। মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে তখন রাত নামছে। ফ্রান্স ৪–২ গোলে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। স্টেডিয়ামের আলোর নিচে দাঁড়িয়ে উদযাপন করছেন এক ১৯ বছরের তরুণ, যার নাম আজ পৃথিবীর প্রতিটি কোণে পরিচিত। কিলিয়ান এমবাপ্পে — সেই রাতে ইতিহাসে ঢুকে গেলেন। ১৯৫৮ সালে পেলের পর তিনিই প্রথম কিশোর, যিনি বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করলেন। কিন্তু সেই রাতের উদযাপন শেষ হতে না হতেই এমবাপ্পে একটি সিদ্ধান্ত নিলেন, যা তাকে শুধু একজন মহান ফুটবলার নয় — একজন মহান মানুষ হিসেবেও চিহ্নিত করে দিল। টুর্নামেন্টে সাত ম্যাচে প্রতি ম্যাচে প্রায় ২২,৩০০ ডলার করে এবং ফাইনাল জয়ের বোনাস মিলিয়ে পেলেন প্রায় পাঁচ লক্ষ মার্কিন ডলার। পুরো টাকাটাই দিয়ে দিলেন, ‘প্রেমিয়ের দ্য কর্দে' নামের একটি দাতব্য সংস্থাকে, যারা প্রতিবন্ধী ও হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের জন্য বিনামূল্যে ক্রীড়া প্রশিক্ষণ দেয়। টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বললেন: 'আমার পেমেন্ট নেওয়ার দরকার ছিল না। আমি সেখানে গিয়েছিলাম দেশের রং রক্ষা করতে। আমি যথেষ্ট উপার্জন করি — অনেক টাকা। তাই মনে করি যারা কষ্টে আছেন, তাদের সাহায্য করা জরুরি। এটা আমার জীবন বদলায় না, কিন্তু ওদের জীবন বদলাতে পারে। তাহলেই আনন্দ।’ এই মানুষটি কোথা থেকে এসেছেন? কীভাবে এই বিনয়, এই মানবিকতা, এই সংবেদনশীলতা তার মধ্যে গড়ে উঠেছে? সেই গল্পের শুরু প্যারিসের এক অবহেলিত শহরতলিতে — বঁদিতে। বঁদি: যে শহরতলিকে পৃথিবী চিনত অস্থিরতায়, এখন চেনে এমবাপ্পেতে প্যারিসের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে সেন-সাঁ-দনি বিভাগে ছোট্ট একটি শহরতলি — বঁদি। ষাটের দশকের পুরনো অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক, অভিবাসী পরিবার, শ্রমজীবী মানুষ, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য। ফরাসিরা এই জায়গাগুলোকে বলে 'বনলিউ' — যে শব্দটির সাথে জড়িয়ে থাকে দাঙ্গা, অস্থিরতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ছবি। নিউইয়র্ক টাইমস একসময় লিখেছিল, বঁদি হলো ‘বড়, শ্রমজীবী, অশ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়ের জায়গা — যা অপরাধ ও সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত।’ কিন্তু ২০১৮ সালের পর থেকে বঁদির পরিচয় বদলে গেছে। সেই পুরনো অ্যাপার্টমেন্টের দেওয়ালে এখন বিশাল ম্যুরাল — এমবাপ্পের মুখ। বঁদির মাঠে যে ছেলেটি একসময় বল লাথি মেরেছিল, সে আজ রিয়াল মাদ্রিদের ব্যানার মাথায় নিয়ে সান্তিয়াগো বের্নাবেউতে খেলছে। ১৯৯৮ সালের ২০ ডিসেম্বর প্যারিসের ১৯তম অ্যারোঁদিসমোঁতে জন্ম হলো কিলিয়ান সানমি এমবাপ্পে লোতাঁর। বাবা উইলফ্রিদ এমবাপ্পে ক্যামেরুনের ডিয়েবালে দ্বীপ থেকে আসা মানুষ, পেশায় ফুটবল কোচ ও ক্লাব পরিচালক। মা ফাইজা লামারি আলজেরিয়ার কাবাইল বংশোদ্ভূত — একসময়ের পেশাদার হ্যান্ডবল খেলোয়াড়, পরবর্তীতে ছেলের ক্যারিয়ারের অন্যতম প্রধান ম্যানেজার। আফ্রিকার দুটি ভিন্ন দেশ, একটি ইউরোপীয় শহরতলি — আর তাদের মিলনে জন্ম নেওয়া এক শিশু, যে ভবিষ্যতে বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্র বদলে দেবে। এমবাপ্পের একটি ছোট ভাই আছেন — এতান, যিনি বর্তমানে লিল ক্লাবে খেলেন। একজন বড় দত্তক ভাইও আছেন — জিরেস কেম্বো একোকো, প্রাক্তন পেশাদার ফুটবলার। ক্রীড়ার এই পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন কিলিয়ান। ক্লাবের প্রেসিডেন্ট আতমান আইরুশ পরে বলেছিলেন: ‘বলা চলে কিলিয়ান এই ক্লাবেই জন্মেছে। বাবা যখন খেলোয়াড় ও কোচ ছিলেন, দুই বছর বয়সের কিলিয়ান মাঠের পাশে বল নিয়ে ঘুরত।’ ছয় বছরে মাঠ, ভয়কে জয় করার পাঠ মায়ের কাছে ছয় বছর বয়সে এএস বঁদির যুব দলে যোগ দিলেন এমবাপ্পে। সেখানে প্রথম কোচ হলেন বাবা নিজে। একটি পর্যায়ে এমন একটি মুহূর্ত এলো, যা তার জীবনের গতিপথ পাল্টে দিল। একটি ম্যাচের আগে ছোট্ট কিলিয়ান ভয় পেয়ে মাঠে নামতে রাজি হচ্ছিল না। তখন মা ফাইজা তার পাশে বসলেন এবং বললেন: 'ভয় পেয়ে না খেললে সেটা সারাজীবন তোমাকে তাড়া করবে।' এমবাপ্পে নিজে পরে বলেছেন, মায়ের সেই কথাটি তাকে এতটাই বদলে দিয়েছিল যে এরপর থেকে সারাজীবন কোনো মাঠে আর ভয় পাননি। এমবাপ্পের কোচ আন্তোনিও রিচার্দি পরে ইএসপিএনকে বলেছিলেন: ‘সে অন্যদের থেকে আলাদা ছিল। তাকে একবার কিছু বলতাম, দ্বিতীয়বার সে নিজেই করত। কিলিয়ান পারত অন্য বাচ্চাদের চেয়ে অনেক বেশি। তার ড্রিবলিং তখনই অসাধারণ ছিল, গতি ছিল অবিশ্বাস্য। সে ছিল আমি যাকে কোচ করেছি তাদের মধ্যে সেরা।’ বাবা উইলফ্রিদ ছিলেন কঠোর শিক্ষক — 'বঁদিতে শুধু কৌশল নয়, বাঁচতে হত। জিততে হত। এটাই বাস্তব জীবন,' — এমনটাই বলেছেন এমবাপ্পে। বারো বছর বয়সে ফ্রান্সের জাতীয় এলিট ফুটবল একাডেমি ক্লেরফঁতেনে জায়গা হলো তার। কিন্তু এমবাপ্পের বাবা-মা তাকে বাড়িতে রাখলেন — সপ্তাহান্তে ফিরে আসতে হত বঁদিতে, বাবার দলে খেলতে হত। তারা চেয়েছিলেন ছেলে একটি স্বাভাবিক জীবন যাপন করুক, একাডেমির বুদবুদে হারিয়ে না যাক। পরে এমবাপ্পে স্বীকার করেছেন, সেটা ছিল তার জীবনের সেরা সিদ্ধান্তগুলোর একটি। ১১ বছরে চেলসির মাঠে, ১৪ বছরে রিয়াল মাদ্রিদের জন্মদিনের উপহার প্রতিভার আলো ছড়াতে দেরি হলো না। ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজর পড়ল — রিয়াল মাদ্রিদ, চেলসি, লিভারপুল, ম্যানচেস্টার সিটি, বায়ার্ন মিউনিখ। ২০১০ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে চেলসির ফরাসি স্কাউট গাই হিলিওঁ তাকে লন্ডনের কোবহাম ট্রেনিং গ্রাউন্ডে এক সপ্তাহের ট্রায়ালে আমন্ত্রণ জানাল। চেলসির অনূর্ধ্ব-১২ দলের হয়ে চার্লটন আন্ডার-১২-এর বিরুদ্ধে একটি ম্যাচ খেললেন — ৮–০ গোলে জয়। সতীর্থদের মধ্যে ছিলেন ট্যামি আব্রাহাম ও ফরাসি ফুটবলার জেরেমি বোগা। সেই সফরে দিদিয়ে দ্রোগবা ও ফ্লোরাঁ মালুদার সাথে দেখা হলো — ছবিও তোলা হলো। এমবাপ্পে পরে The Players' Tribune-এ লিখেছেন: 'আমি এতটাই উত্তেজিত ও অবাক হয়ে গিয়েছিলাম যে বন্ধুদেরও বলতে পারিনি কোথায় যাচ্ছি। ফিরে আসার পর বললাম লন্ডনে ছিলাম, চেলসিতে। তারা বলল — অসম্ভব! আমি বললাম দ্রোগবার সাথেও দেখা হয়েছে। তারা বলল — মিথ্যা বলছ। বঁদির ছেলেদের সাথে দ্রোগবা দেখা করে না।' চেলসি তাকে রাখতে চেয়েছিল, কিন্তু পরিবার ফ্রান্স ছাড়তে রাজি ছিল না। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে, ঠিক যখন এমবাপ্পে ১৪ বছরে পা দিলেন, রিয়াল মাদ্রিদ তার বাবাকে ফোন করল — ছেলেকে মাদ্রিদে ট্রায়ালে নিয়ে যেতে। বাবা উইলফ্রিদ পরে ফ্রান্স ফুটবল পত্রিকাকে বলেছিলেন: 'আমরা মাদ্রিদে গিয়েছিলাম ছেলের সম্ভাবনা যাচাই করতে নয়, তাকে খুশি করতে। এটা ছিল তার জন্মদিনের উপহার।' জিনেদিন জিদান প্রথম ট্রেনিং সেশনে স্বাগত জানাতে এলেন। শৈশবের আইডল ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সাথে ছবি তোলা হলো। কিন্তু কিছুই পরিবারের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারল না। শেষ পর্যন্ত ২০১৩ সালে ১৪ বছর বয়সে মোনাকোর যুব একাডেমিতে যোগ দিলেন। রিয়াল মাদ্রিদের পাল্টা চেষ্টা থাকলেও মোনাকো তিন বছরের চুক্তি নিশ্চিত করল। ২০১৫ সালের ২ ডিসেম্বর মোনাকোর মূল দলে অভিষেক হলো তার — বয়স তখন ১৬। থিয়েরি অঁরির রেকর্ড ভেঙে হলেন মোনাকোর ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ মূল দলের খেলোয়াড়। ১৭ বছরে লিগ চ্যাম্পিয়ন, ১৮ কোটি ইউরোতে পিএসজি ২০১৬-১৭ মৌসুম এমবাপ্পের জীবন পাল্টে দিল। মোনাকোর নিয়মিত খেলোয়াড় হিসেবে লিগ ১-এ ১৫টি গোল করলেন। র‍্যাদামেল ফালকাওর সাথে মিলে মোনাকোকে ১৭ বছর পর লিগ শিরোপা এনে দিলেন। চ্যাম্পিয়নস লিগে দলকে সেমিফাইনালে নিয়ে গেলেন — জুভেন্টাসের কাছে হেরে থামতে হলো। সেই বছরই ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে পাঁচটি গোল করে ইউরোপীয় অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতালেন। ২০১৭ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে পিএসজিতে প্রথমে ধারে এলেন, পরের বছর পাকাপাকি স্থানান্তর হলো ১৮ কোটি ইউরোতে — তখনকার সময়ে ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মূল্যের ট্রান্সফার এবং সর্বকালের সবচেয়ে দামি কিশোর খেলোয়াড়ের স্থানান্তর। কিন্তু এই বিপুল অর্থ তাকে বদলায়নি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন: 'ফুটবলার মানেই ফেরারি গাড়ি নয়। আমার গাড়ি নেই, সেটা বড় কিছু নয়।' পিএসজিতে এমবাপ্পের ক্যারিয়ার ছিল অভূতপূর্ব। ২০১৮-১৯ মৌসুমে ২৯ ম্যাচে ৩৩ গোল করে লিগ ১-এর শীর্ষ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড়। এরপর টানা ছয় মৌসুমে লিগের শীর্ষ গোলদাতা — যা ফরাসি লিগের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড। পাঁচবার লিগের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। সব মিলিয়ে পিএসজির হয়ে ছয়টি লিগ শিরোপা। বিশ্বকাপের মঞ্চে পেলের পর প্রথম কিশোর ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্স দলে জায়গা পেলেন ১৯ বছরের এমবাপ্পে। গ্রুপ পর্বে পেরুর বিরুদ্ধে গোল করে হলেন ফ্রান্সের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপ গোলদাতা। কিন্তু সেই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি এলো রাউন্ড অব সিক্সটিনে — আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা তাকে থামাতে বক্সের মধ্যে ফাউল করতে বাধ্য হলেন। সেই ম্যাচে দুটো গোল করলেন — ১৯৫৮ সালে পেলের পর প্রথম কিশোর, যিনি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে দুটো গোল করলেন। ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে ৪–২ জয়ে গোল করলেন। টুর্নামেন্টে মোট চারটি গোল। পেলেন 'সেরা তরুণ খেলোয়াড়' পুরস্কার। বয়স তখন মাত্র ১৯। থিয়েরি অঁরি যে বয়সে ফ্রান্সের মূল দলেই ঢুকতে পারেননি, এমবাপ্পে সে বয়সে বিশ্বকাপ জিতলেন। টুর্নামেন্ট শেষে পাঁচ লক্ষ ডলার পুরস্কারের পুরোটাই দিয়ে দিলেন 'প্রেমিয়ের দ্য কর্দে' সংস্থাকে। সংস্থার পরিচালক সেবাস্তিয়াঁ রুফাঁ বলেছিলেন: 'কিলিয়ান একজন মহৎ মানুষ। যখনই সময় পান, আমাদের সাথে আসেন এবং শিশুদের সাথে নিজে খেলেন। শিশুদের সাথে কথা বলার সময় সবসময় সঠিক কথাটা খুঁজে পান তিনি।' এমবাপ্পে বলেছিলেন: 'আমি সেখানে গিয়েছিলাম দেশের রং রক্ষা করতে। বেতন নেওয়ার দরকার ছিল না।' সাফল্যের চূড়ায় উঠেও শিকড় ভোলেননি ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে এমবাপ্পে যেন আরও পরিপক্ব। আট গোল করলেন, গোল্ডেন বুট জিতলেন। ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করলেন — ফ্রান্স হেরে গেলেও সেই হ্যাটট্রিক ফুটবল ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে গেছে। বিশ্বকাপ ফাইনালে সর্বোচ্চ গোলের নতুন রেকর্ড তৈরি হলো তার নামে। ২০২৪ সালের জুনে ফ্রি ট্রান্সফারে পাঁচ বছরের চুক্তিতে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিলেন — শৈশবের স্বপ্নের ক্লাবে। শৈশনে ১৫ বছর বয়সে স্প্যানিশ ভাষা শেখা শুরু করেছিলেন কারণ জানতেন একদিন রিয়ালে খেলতে যাবেন। প্রথম মৌসুমেই লা লিগায় ৩১ গোল করে পিচিচি ট্রফি জিতলেন। ঘণ্টায় ৩৬ কিলোমিটার গতিতে ছুটে চলা এই ফরাসি তরুণ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির খেলোয়াড়দের একজন। বিশ্বের মঞ্চে পৌঁছেও এমবাপ্পে বঁদিকে ভোলেননি। ফিফার সেরা পুরস্কার অনুষ্ঠানে হোসে মোরিনিওর সাথে দেখা হলে তিনি শুধু মোরিনিওকেই নয়, তার সাথে থাকা প্রতিটি অপরিচিত বন্ধুর সাথেও করমর্দন করলেন। পরে বললেন, এটাই 'বঁদির শিক্ষা' — পাশে যে কজন মানুষ থাকুক, সবাইকে সমান সম্মান দাও। তিনি এখন চার ভাষায় কথা বলেন — ফরাসি, ইংরেজি, স্প্যানিশ ও ইতালীয়। এমবাপ্পের গোল উদযাপনের ভঙ্গিটিও অনন্য — বুকের উপর দুই হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে থাকেন। এই ভঙ্গি অনুপ্রাণিত তার ছোট ভাই এতানের কাছ থেকে, যিনি ভিডিও গেমে বড় ভাইকে হারালে এভাবেই উদযাপন করতেন। বিশ্বের মঞ্চে গোল করেও সেই ছোট ভাইকে মনে রাখেন। শিকড় ভোলেননি। বঁদি থেকে বাংলাদেশ: সুযোগের অভাবে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের কথা এমবাপ্পের গল্পটি প্যারিসের শহরতলির, কিন্তু এটি আসলে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের অবহেলিত মানুষের গল্প। বঁদির সেই পুরনো অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের সাথে ঢাকার মিরপুর, কামরাঙ্গীরচর কিংবা চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটের খুব বেশি ফারাক নেই — একই বৈষম্য, একই দারিদ্র্য, একই স্বপ্ন, একই লড়াই। ফরাসি বনলিউয়ের মতো আমাদের শহরতলির গলিতেও প্রতিভার অভাব নেই। অভাব সুযোগের। বঁদি থেকে এমবাপ্পের পথে তিনটি স্তম্ভ ছিল — পরিবার, কোচিং কাঠামো, এবং রাষ্ট্রীয় একাডেমি। বাবা উইলফ্রিদ শুধু স্বপ্ন দেখাননি, প্রতিদিন মাঠে পাশে দাঁড়িয়েছেন। মা ফাইজা ভয়কে জয় করতে শিখিয়েছেন। ক্লেরফঁতেন একাডেমি প্রতিভাকে পেশাদার কাঠামোয় ঢেলে সাজিয়েছে। মোনাকো ক্লাব ঝুঁকি নিয়েছে। এই চারটির যেকোনো একটি না থাকলে এমবাপ্পে হয়তো আজও বঁদির কোনো গলিতে সাধারণ জীবন যাপন করতেন। বাংলাদেশে এই চারটির কতটি আছে? পরিবারের সদিচ্ছা অনেকের আছে, কিন্তু জ্ঞান ও সামর্থ্য নেই। পেশাদার কোচিং কাঠামো প্রায় অনুপস্থিত। ক্লেরফঁতেনের মতো জাতীয় একাডেমি নেই। ক্লাবগুলো প্রতিভাবান কিশোরে বিনিয়োগ করতে অনিচ্ছুক। ফলে ময়মনসিংহের কোনো মাঠে হয়তো এখন একটি ছেলে দৌড়াচ্ছে — যার পায়ে সেই জাদু আছে। কিন্তু তাকে দেখার কেউ নেই, পথ দেখানোর কেউ নেই। আরও একটি কথা বলার আছে। এমবাপ্পে পাঁচ লক্ষ ডলার পুরস্কার পেয়ে পুরোটাই দিয়ে দিলেন প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য। অথচ বাংলাদেশে ক্রীড়া প্রশাসনের মানুষেরা কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ নিয়েও মাঠ পর্যন্ত পৌঁছান না। একজন ১৯ বছরের তরুণ যা বুঝেছিলেন — অর্থের চেয়ে মানুষের জীবন বড় — সেই সরল সত্যটি আমাদের নীতিনির্ধারকরা কবে বুঝবেন? উপসংহার: গলি থেকে গ্যালাক্সি — এবং ফিরে গলিতে বঁদির গলি থেকে মাদ্রিদের সান্তিয়াগো বের্নাবেউ স্টেডিয়াম — এই পথটি এমবাপ্পে একা হাঁটেননি। হেঁটেছেন বাবার হাত ধরে, মায়ের সাহস দেওয়া কথায়, কোচের অনুপ্রেরণায়, একটি দেশের ক্রীড়া ব্যবস্থার সহায়তায়। এবং সবকিছু পেয়েও মনে রেখেছেন — যে মানুষগুলো তাকে গড়েছে, যে মাটি থেকে উঠে এসেছেন, সেই মাটি থেকে মুখ ফেরানো যাবে না। মা ফাইজা একবার বলেছিলেন, ছেলে এখন আর রাস্তায় হাঁটতে পারে না। মাঝে মাঝে শুধু গাড়ি নিয়ে বঁদির রিং রোডে ঘুরে আসে — দেখে আসে সেই জায়গাগুলো, যেখানে সে ছিল। এই ছবিটি মনে রাখতে হবে — পৃথিবীর অন্যতম সেরা ফুটবলার রাতের বেলা গাড়ি চালিয়ে পুরনো পাড়ায় ফিরে যান, কারণ সেই গলিগুলো তাকে ছাড়তে পারেন না। কিলিয়ান এমবাপ্পে আমাদের মনে করিয়ে দেন — একটি শহরতলির ছেলেও পৃথিবী বদলাতে পারে। শর্ত একটাই: তাকে সুযোগ দিতে হবে। এবং সে সুযোগ পেলে তার হৃদয় যেন মাটির কাছেই থাকে — পাঁচ লক্ষ ডলার পেয়েও সেটা প্রতিবন্ধী শিশুদের দিয়ে দেওয়ার মতো করে। লেখক: আহমেদ সোহেল বাপ্পী মানবাধিকার কর্মী, গবেষক ও পর্যবেক্ষক গনতন্ত্র (সীমান্ত হীন) প্যারিস,ফ্রান্স

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow